পরে সে গুলিবিদ্ধ লোকটার দিকে একবার দৃষ্টি দিল। মৃত্যুপথযাত্রীর হা-হা করছিল চোখগুলো। তার সুগভীর নীল চোখে অভিব্যক্তির এমন বিচিত্র রূপ ফুটে উঠেছিল যেটা পড়তে পৈরটের মতো লোকেরও অসুবিধে হচ্ছিল, কিন্তু তাকে সে গভীর সতর্কতা বা অবগতি বলেই বর্ণনা করেছিল।
কিন্তু হঠাৎ করে পৈরটের মনে হলো যে, এখানে উপস্থিত সব লোকের মধ্যে একজনকে দেখেই জীবন্ত বলে মনে হচ্ছিল–যে লোকটি মৃতপ্রায় তাকে এই মুহূর্তে প্রকৃত জীবন্ত বলেই মনে হচ্ছিল পৈরটের। জীবনের এমন সুন্দর অভিব্যক্তি, এমন নিখুঁত প্রকাশ এর আগে আর কোনো লোকের মধ্যে পৈরট প্রত্যক্ষ করেনি। অন্যসব অভিনেতা যেন বিবর্ণ, শ্রীহীন এবং ছায়ার মতো। কিন্তু প্রকৃত লোক বলতে ছিল এই ব্যক্তিই।
জন ক্রিস্টো মুখ খুলল এবং কথা বলল। তার স্বর ছিল সবল, বিস্ময়হীন এবং দরকারী। সে বলে ওঠে-হেনরিয়েটা
এই কথা বলার পরে তার চোখের পাতা বুজে গেল, তার মাথা পাশে ঝুলে পড়ল।
হারকিউল পৈরট হাঁটু গেড়ে বসল, নিশ্চিত হওয়ার পরেই উঠে দাঁড়াল। যন্ত্রচালিতের মতো নিজের পোযাকের ধুলো ঝেড়ে সে বলে ওঠে, হা, সে আর বেঁচে নেই।
ছবি ভেঙে গেল, কেঁপে উঠল এবং নতুন রশ্মিসম্পাতে পুনর্গঠিত হল। এখন তার মধ্যে প্রস্ফুটিত হল ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া–খুব সাধারণ তুচ্ছ ঘটনাসমূহ। পৈরট নিজের সম্বন্ধে যথেষ্ট সজাগ ছিল। কান আর চোখ খোলা রেখেছে–এই দুটোর সাহায্যেই সে সবকিছু লিপিবদ্ধ করছে।
একটা ব্যাপার সে লক্ষ্য করছিল যে, লেডি এ্যাক্যাটেলের হাত থেকে ডিমের ঝুড়িটা পড়ে যাচ্ছিল–তাড়াতাড়ি করে এগিয়ে এসে গাজন ধরে নেয়। যন্ত্রচালিতের মতো গাজনকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইতস্তত হয়ে বলে ওঠেন, জার্দা
রিভলবার হাতে স্ত্রীলোকটি নড়ে চড়ে বসল। সে তার চারপাশে সকলের দিকে একবার তাকিয়ে নিল। সে কথা বলছিল–কিন্তু ভাষা কিছুই বোধগম্য হল না–অবিন্যস্ত কতগুলো বিক্ষিপ্ত আওয়াজ শুধু শোনা গেল।
সে বলে ওঠে, জন মারা গেছে, জন আর বেঁচে নেই।
তড়িৎগতিতে কটা চুলের লম্বা যুবতীটি আভিজাত্যের ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বলে ওঠে, জার্দা, ওটা আমার কাছে দাও।
পৈরট কোনোরকম বাধা দেবার আগেই জার্দা ক্রিস্টোর হাত থেকে রিভলবারটা নিয়ে নিল।
পৈরট তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নেবার আশায় অগ্রসর হল। সে বলে ওঠে, আপনার এমন করা মোটই উচিত নয় মহাশয়া।
যুবতীটি তার কণ্ঠস্বরে হঠাৎ চমকে যায়, তার হাত থেকে রিভলবারটা সোজা এসে পুলের জলে পড়ে।
অত্যন্ত অপ্রস্তুতের সঙ্গেই সে ওঃ!’ বলে পৈরটের দিকে ক্ষমাপ্রার্থীর মতোই তাকিয়ে রইল। পরে শুধু বলল, আমি কি এতই বোকা! আন্তরিকভাবে অমি দুঃখিত!
কিছুক্ষণের জন্য কোনো কথা বলার ভাষা খুঁজে পেল না পৈরট। সে একজোড়া জলভরা চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল এবং ভেবেও নিল, তার সাময়িক সন্দেহ অমূলক কিনা। সে আস্তে আস্তে ধীরে সুস্থে কোনোরকমে উচ্চারণ করে, কোনো জিনিস স্পর্শ করা বোধহয় উচিত হবে না। সবকিছু যেমন আছে, ঠিক তেমনি ভাবে রেখে দিতে হবে–পুলিস এসে স্বচক্ষে দেখবে।
সবার মধ্যে তখন চাপা উত্তেজনা দেখা দিল–একটা অস্বস্তি যেন চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল মৃদুস্বরে বলে ওঠেন, অবশ্য–আমার মনে হয়, হা, পুলিসই
শিকারীর কোট পরনে লোকটা বলে ওঠে, আমার ভয় হচ্ছে, লুসি, এই ঘটনাটা হয়তো ঘটতই।
সেই নীরবতার মধ্যেও পদশব্দ এবং গোলমাল কানে এল। সেই পথ ধরে সার হেনরি এ্যাঙ্গক্যাটেল এবং মিডগে হার্ডক্যাসল হাসতে হাসতে এদিকেই এগিয়ে আসছিলেন।
পুলের ধারে লোকদের দেখামাত্র তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ব্যাপার কি? কী হয়েছে?
তার স্ত্রী বললেন, জার্দা–পরে তাড়াতাড়ি করে বলে ফেললেন, আমি বলছি–জন—
হতবুদ্ধির মতো মুখ করে বলে ওঠে, গুলি করে জনকে মারা হয়েছে। সে আর বেঁচে নেই।
সকলে বিব্রত হয়ে তার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল তাড়াতাড়ি করে বলে ওঠেন, আমার মনে হয়–এই সময়ে জার্দার গিয়ে শুয়ে পড়া উচিত। এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে আমাদের সকলেরই উচিত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া। হেনরি তুমি আর পৈরট এখানে হাজির থেকে পুলিসের জন্য অপেক্ষা করতে পার।
সেটাই বরং একপক্ষে ভালো হবে। গাজন, তুমি বরং পুলিসকে একটা ফোন করে দাও, যা যা ঘটেছে তা বলে দিও, পুলিসকে এখানেই নিয়ে আসবে।
লম্বা দেহের লোকটি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, এসো জাদা, এই বলেই সে অন্য স্ত্রীলোকদের সঙ্গে নিয়ে চলে গেল। জার্দা যেন স্বপ্নের ঘোরে তাদের অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে। গাজন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সকলকে যাবার নির্দেশ দিয়ে ডিমের ঝুড়ি হাতে নিঃশব্দে তাদের অনুসরণ করল।
স্যার হেনরি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে ওঠেন, এসব কী ব্যাপার? আসলে কী ঘটেছে?
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল মিছিমিছি হাত-পা নেড়ে অসহায়ের ভঙ্গি করলেন। হারকিউল পৈরট মাধুর্য এবং আবেদন উপভোগ করছিল।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, ঠিক কী ঘটেছে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, কারণ মুরগী নিয়ে আমি কাজে ব্যস্ত ছিলাম। বেশি দূরে, নয় খুব কাছ থেকেই একটা গুলির আওয়াজ কানে এসেছিল, তখন আমি এই ব্যাপারটা সম্বন্ধে কিছুই ভাবতে পারিনি, পরে পুলের কাছে আসতে চোখে পড়ল জনের নিথর দেহ এবং জার্দা রিভলবার হাতে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। এইসময় হেনরিয়েটা এবং এডওয়ার্ড সেখানে এসে উপস্থিত হল।
