গৃহকত্রী সুইমিং পুলের কাছে একটা তাবুতে আছেন, আপনি কী স্যার কষ্ট করে এদিকে একবার আসবেন? গাজন বলে ওঠে!
ইংরেজদের বাড়ির বাইরে বসে থাকার প্রবৃত্তি দেখে হারকিউল পৈরট বরং ক্ষুব্ধই হয়। গ্রীস্মাধিক্যের সময় এই খেয়াল সহ্য করা গেলেও এই সেপ্টেম্বরের শেষে সে সুযোগ কোথায়! দিনটায় ঠান্ডার আমেজ থাকলেও হাওয়ায় যেন একটা আর্দ্রতা–শরতে প্রায়ই এমনটা দেখা যায়। এই সময়টা অগ্নিকুণ্ড মুক্ত বসবার ঘরটাই যথেষ্ট আরামদায়ক। কিন্তু ফরাসি জানলা দিয়ে একটা মুক্ত জায়গার ভেতর দিয়ে রকারি পেরিয়ে একটা ছোট দরজার মধ্যে দিয়ে বাদাম গাছের ভেতর দিয়ে যে রাস্তাটা গিয়েছে তাকে সেই পথেই নিয়ে যাওয়া হল।
এ্যাঙ্গক্যাটেলদের বরাবরই অভ্যাস একজন অতিথিকেই নিমন্ত্রণ করা এবং আবহাওয়া ভালো থাকলে ককটেল পার্টিও সুইমিং পুলের পাশের তাবুতেই অনুষ্ঠিত হয়। লাঞ্চ টাইমের সময় অবশ্য একটা তিরিশ মিনিটে, তাই এ সময়ের মধ্যে অনিয়মানুবর্তী অতিথিও এসে উপস্থিত হবে।
হারকিউল পৈরটের কাছে ব্যবস্থা বেশ ভালো বলেই মনে হয়। নিমেষের মধ্যে তার মনে হল যে, যেখান থেকে সে শুরু করেছে সেখানে আবার ফিরে যাবে।
নিজের জুতোর প্রতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সে গাজনকে নিঃশব্দ অনুসরণ করল।
ঠিক এই সময়ে সামনের দিক থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল। এরজন্য পৈরটের বিরক্তি বোধহয় আরও বহুগুণ বেড়ে গেল। এই ব্যাপারটা তার কাছে খুবই অযৌক্তিক অনুচিত মনে হতে থাকল। পরে যখন সে এই অবস্থার কথা ভাবল, সেই সময়ে ভয়, হাতাশা আর বিস্ময়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে পরিবেষ্টিত করে রেখেছিল। সে শুধু এইটুকু বলতে পারে যে, এই ব্যাপারটা সত্যিই অপ্রত্যাশিত।
হারকিউল পৈরট সুইমিং পুলের চতুর্দিকের মুক্ত স্থানে পা রাখতেই চমকে ওঠে। ক্রোধে সে তখন শক্ত কাঠ হয়ে গেছে। পৈরটের মনে হয়, বাড়াবাড়ির মাত্রাটা বোধহয় একটু বেশি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে–হ্যাঁ, খুব বেশিই মনে হচ্ছে। এ্যাঙ্গক্যাটেলদের সে এত সস্তা মনের ভাবে না। অনেকদূর হেঁটে আসা-বাড়িতে বিমুখ হওয়া–এখন আবার সেই একইরূপের বাহার। ইংরেজদের সত্যিই কী অশোভন কৌতুক।
সে এত ভীষণভাবে রেগে গিয়েছিল এবং এমনভাবে একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে এই কৌতুকের মাধ্যমেই।
সে যেন একটা কৃত্রিম হত্যাকাণ্ডের পৈশাচিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছে। পুলের পাশে কৃত্রিমভাবে সজ্জিত হয়ে পড়ে আছে একটি প্রাণহীন দেহ, বাইরে থেকে হাতটা এলিয়ে পড়েছে এবং লাল প্রসাধন যেন কংক্রিট থেকে পুলের নীল জলে গড়িয়ে পড়েছে। মৃতদেহটা এক সুদর্শন পুরুষের যার মস্তকে সুন্দর চুলের কেশরাজি। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মধ্যবয়সী বেঁটে সুডোল এক স্ত্রীলোক যার হাতে ধরা রিভলবার। তার মুখ জুড়ে বিরাজমান অদ্ভুত উদাস এক অভিব্যক্তি।
আরও তিনজন অভিনেতা ছিলেন। দূরে পুলের ঠিক ধারে দাঁড়িয়েছিল এক যুবতী, যার মাথার কেশ গাঢ় বাদামী রঙা শরতের পাতার সাদৃশ্য টেনে আনছিল, তার হাতে ধরা ছিল ঝুড়ি ভরা ডালিয়া ফুল। একটু দূরত্বে লম্বা দেহের একজন ভদ্রলোককে চোখে পড়েছিল, পরনে ছিল শিকারীর কোট। বন্দুক হাতে সে দাঁড়িয়েছিল। তার ঠিক বামদিকে দাঁড়িয়ে আছে এক বাস্কেট ডিম হাতে গৃহকত্রী, লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল। হারকিউল পৈরটের কাছে একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, সুইমিং পুলের চতুর্দিক থেকে অনেক রাস্তা এসে সেখানে মিশেছিল। ব্যাপারটা ছিল কিছুটা গাণিতিক এবং কিছুটা কৃত্রিম। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে এখন কী করবে? তারা তার কাছ থেকে কি আশা নিয়ে এসেছিল? সে কি এই অপরাধ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবে না বিশ্বাসের ভান করবে? সে কি হতাশা না ভয় প্রকাশ করবে? সে কি তার গৃহকর্তাকে বলবে, আঃ, ইহা খুব রমণীয়, আমার জন্য আপনারা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
আসলে, সমস্ত ব্যাপারটা ঘটেছে অনেকটা নির্বোধের মতোই। রানী ভিক্টোরিয়া নাকি বলেছিলেন, আমরা হাসি-তামাসা-আনন্দটুকু পর্যন্ত করতে পারলাম না। পৈরটের মুখে ঠিক ঐ ভাষাই এসে উপস্থিত হয়েছিল, আমি পৈরট, কৌতুক বা আনন্দ বোধ অনুভব হয় না।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল মৃতদেহের দিকেই এগিয়ে গেলেন। তাকে অনুসরণ করতে করতে গাজন জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে এগিয়ে যাচ্ছিল। পুলের অন্যদিক থেকে দুজন লোক এগিয়ে আসছিল, তারা এখন নিকটে এসে দাঁড়ায়।
পৈরটের একবার মনে হলো, সে যেন ছায়াচিত্রের ছবি দেখানোর উদ্দেশ্যে এখানে হাজির হয়েছে। কিন্তু তবু সে উপলব্ধি করল, কৃত্রিমতার মধ্যেও একটা সত্য লুকিয়ে আছে।
নিচে পড়ে থাকা লোকটির দিকে তার চোখ গেল, সে ভালোভাবে তাকে প্রত্যক্ষ করল মৃত, না হলেও মৃতের সমান।
রিভলবার হাতে যে লোকটি মৃতদেহের পাশটিতে এসে দাঁড়িয়েছিল, পৈরট একবার তার দিকে তাকাল। তার মুখে অনুভূতির লেশমাত্র নেই–সম্পূর্ণ উদাস দৃষ্টি। নেহাতই এক নির্বোধের মতন মুখ করে সে দাঁড়িয়েছিল।
সে ভাবে, সত্যি কী অদ্ভুত!
গুলি ছুঁড়ে সে কি সবকিছু হারিয়ে বসেছে? সমস্ত আবেগ এবং অনুভূতি কি নিঃশেষ হয়ে গেল? বর্তমানে তার অবস্থা কি একটা গুলির মতোই মূল্যহীন ও অসাড়? এখন হয়তো তার হাবভাব ঐরকমটাই হয়ে গিয়েছে।
