হেনরিয়েটাকে সে আর নির্যাতন করবে না। শাসন করা যায় বলেই কি তাকে শাসন করা উচিত?-হেনরিয়েটা তো সেরকম স্বভাবের মেয়ে নয়। তার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেলেও নিশ্চল-নিথর হয়েই সে দাঁড়িয়ে থাকে, বিস্ফারিত নেত্রে সে একথাই ভাবতে থাকে।
জন ভাবে, আমি গিয়ে হেনরিয়েটার কাছে সব কথা খুলে বলব। হতচকিত হয়ে সে তাকাল, অপ্রত্যাশিত কোনো ছোট্ট শব্দে সে বিব্রত বোধ করল। বনের মধ্যে থেকে গুলির শব্দ কানে আসছিল, সেই সঙ্গে ছিল বনের স্বাভাবিক শব্দ, পাখির কাকলি, পাতা-ঝরার মৃদু ঝঝর শব্দ, বাতাসের শ-শন্ আওয়াজ। কিন্তু এই শব্দের আওয়াজটা ছিল অন্য ধরনের–ক্ষীণ প্রণালীবদ্ধ একটি টিকটিক ধ্বনি।
হঠাৎ করে বিপদের আশঙ্কায় জন সচকিত হয়ে ওঠে। কতক্ষণ সে এভাবে বসেছিল? আধঘণ্টা? কেউ হয়তো তাকে লক্ষ্য করেছে। কেউ হয়তো
আবার সেই প্রণালীবিদ্ধ টিকটিক্ আওয়াজহা, সেই শব্দ–কিন্তু সে কী করবে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিল না, তাই সে দ্রুততার সঙ্গে কোনো ভূমিকা নিতে পারল না।
বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের করার মতো শক্তি তার ছিল না।
গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে জন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। হাত-পা এলিয়ে সুইমিং পুলের কিনারে এসে তার দেহ অবিন্যস্ত ভাবে পড়ে রইল।
তার বুকের ঠিক বাম দিকের একটা কালো দাগ থেকে ধীরে ধীরে রক্ত নিঃসৃত হয়ে সুইমিং পুলের কংক্রিটের কিনারা থেকে বিন্দু বিন্দু করে নীল জলে এসে মিশতে লাগল।
১১. হারকিউল পৈরট
১১.
হারকিউল পৈরট জুতো থেকে সর্বশেষ ধুলোকণাটি ঝেড়ে ফেলে দিল। সে খুব যত্নসহকারে লানচন-পার্টির জন্য পোষাক চড়িয়েছে, তার বেশভূষা ভালো হওয়ায় মনের দিক থেকে সেও খুশী। সে জানত, ইংল্যান্ডের গ্রামে রবিবারে কেমন পোষাক ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ইংরেজি ধারণার বশবর্তী সে নয়। তার কাছে শহরতলীর চতুরতা অনেক বেশী পছন্দের। ইংল্যান্ডের পল্লীর ভদ্রলোক সে নয়। সে হারকিউল পৈরট! সে অবশ্য এটাই স্বীকার করে যে, পল্লীগ্রাম তার কোনোদিন পছন্দের ছিল না। কিন্তু বন্ধুদের অনুরোধ সে উপেক্ষা করতে পারেনি বলেই বিশ্রামাগার কিনতে সে দ্বিধা বোধ করেনি। এই বিশ্রাম আশ্রয়ের আকারটাই তার খুব পছন্দ, আর কোনো বিষয়ে তার আসক্তি নেই। চৌকো বাক্সের মতোই এই বাড়িটা, পারিপার্শ্বিকের দৃশ্যও খুব মনোরম, হারকিউল জানতো যে, প্রাকৃতিক দৃশ্য যখন ভালো তো হবেই–তাতেও তার মন ওঠে না, কারণ গাছপালার বিন্যাসে তার রুচি কোনোদিনই ছিল না–কেমন যেন বুনো-বুনো। গাছের পাতা ঝরানোকে সে ভাবে নোংরা স্বভাব–এই জন্যই সে গাছ তেমন কোনোদিনই পছন্দ করে না, পপলার গাছকে সে বরদাস্ত করতে পারে। এই অবসর বিনোদনের পোতাশ্রয়ের মধ্যে তার কাছে সব থেকে আকর্ষণীয় হলো–ছোট সবজির বাগানটি–বেলজিয়ামের মালী ভিক্টরের নিপুণ হস্তের পরিচ্ছন্ন কাজ। ইতিমধ্যে ফ্রাঙ্কয়েস, মালীর স্ত্রী, সযত্নে মালিকের পাকস্থলির সেবায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছে।
হারকিউল পৈরট সদর দরজা পেরিয়ে যায়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর একবার নিজের চকচকে জুতোজোড়ার দিকে তাকাল, পাংশু-ধূসর হমবর্গের হ্যাঁটের সঙ্গে কোনো মিল হচ্ছে কিনা পুনরায় আরও একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিল, এবং রাস্তার এদিকে-ওদিকে তাকাতে থাকল।
ডাভকোট দেখার পর সে চমকে ওঠে। ডাভকোট এবং রেস্টহেভন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই নির্মাতার তৈরি। একটা বাক্সে ছাদ দিয়ে নানাধরনের আধুনিক কলাকৌশলে বানানো হয়েছে রেস্টহেভন। অর্ধেক কাঠ ব্যবহার করে প্রাচীন যুগের সব কারুকার্য যেন একত্র করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ছোট ডাভকোট বাড়িটাতে। ন্যাশনাল ট্রাস্ট আর তার বেশি কিছু করতে দেয়নি, তার কারণ, তাদের মনে ভয় ছিল, পল্লীর শ্রী এতে বিঘ্নিত হতে পারে। দুটি বাড়ি যেন চিন্তাশীল দুই ব্যক্তিবিশেষের সৃষ্টির ফল।
হারকিউল পৈরট আপন মনেই মহড়া দিতে শুরু করে দেয়, সে কীভাবে ‘হলোতে গিয়ে উপস্থিত হবে। তার অজানা ছিল নামে, একটু উপরের দিকে একটা গেট এবং একটা পথও আছে। এই পথ সদর রাস্তার চাইতে অন্তত আধমাইল দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। আদবকায়দায় পটু হারকিউল পৈরট দীর্ঘপথটা ধরেই এগিয়ে চলল এবং সদর দরজা দিয়েই অন্দরমহলে প্রবেশ করল।
স্যার হেনরি এবং লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের বাড়ি পৈরটের এটাই বোধহয় প্রথম আগমন। যেভাবে নিমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিদের সদর দরজা দিয়ে আসাটাই আধুনিক কালের ফ্যাশন।
নিমন্ত্রিত হয়ে পৈরট মনে মনে বেশ খুশীই হয়েছিল। তাছাড়া, বাগদাদ থেকে এ্যাঙ্গক্যাটেলদের ওপরই বরাবরই তার ধারণা খুব ভালো ছিল, বিশেষ করে লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের ওপর।
ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় সময় মিলিয়ে পৈরট এসে হাজির হল। সে যখন সদর দরজার ঘন্টায়। হাত রাখল, ঘড়িতে তখন একটা বাজতে এখনও এক মিনিট বাকি। মনে মনে সে খুবই খুশী কারণ সময় বুঝেই সে উপস্থিত হতে পেরেছে। এতটা পথ হেঁটে আসার জন্য শরীরটা একটু ক্লান্ত লাগছিল, হাঁটার ব্যাপারে কোনোদিনই অভ্যাস নেই।
সুসজ্জিত পোষাকে গাজন এসে দরজা খুলে দিল, পৈরট মনে মনে বেশ খুশীই হয়। কিন্তু যেমন অভ্যর্থনা সে মনে মনে আশা করেছিল, অভ্যর্থনাটা তেমন ভাবে না পেয়ে সে একটু মুষড়ে গেল।
