জন (দীর্ঘশ্বাস ফেলে)–সান মিগুয়েলে আমি ফিরে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো ভেরোনিকা, আমার জীবনে তোমার সঙ্গে এভাবে দেখা হওয়া সুদূর অতীতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, তুমিও যেন সেই অতীতের এক বাসিন্দা। কিন্তু আজ আজ একেবারেই অন্যরকম। আজ আমি সে সময়ের চেয়ে পনেরো বছরের বড়। আজকে আমার সম্পূর্ণ পরিচয় পেলে তোমার বোধহয় ভালো লাগবে না, পরিচয় না পেলে তুমি হয়তো আমাকে মানুষ বলেই জ্ঞান করতে।
ভেরোনিকা–আমার থেকে তুমি তোমার স্ত্রী এবং সন্তান সন্ততিদের ব্যাপারে বেশি উৎসাহী এবং তাদেরই তুমি প্রাধান্য দিচ্ছ।
জন–তোমার অসুবিধে হচ্ছে না তো?
ভেরোনিকা–কিন্তু জন, তুমি তো আমাকে ভালোবেসেছ?
জন–সত্যি আমি দুঃখিত ভেরোনিকা।
ভেরোনিকা–তুমি আমাকে আগের মতো আর ভালোবাসো না?
জন–এই বিষয়ের একটা নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। তুমি নিঃসন্দেহে অপরূপা, অনিন্দ্যসুন্দরী রমণী তুমি, কিন্তু আমি তোমায় ভালোবাসি না।
ভেরোনিকা নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো এমনভাবে বসে রইল যে, দেখলে হঠাৎ করে মোমর পুতুল ভেবে ভ্রম হলেও হতে পারে। তার এই ধৈর্য জনকেও বিচলিত করে তুলল।
ভেরোনিকা যখন তার মুখ খুলল, তার মুখ দিয়ে এমন বিষ ঝরতে লাগল যে, জন ভয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল।
ভেরোনিকা-কে সে?
জন–সে? তুমি কার কথা বলতে চাইছ?
ভেরোনিকা–গতরাতে অগ্নিকুণ্ডের ওপরের তাকের পাশে যে স্ত্রীলোকটি বসেছিল?
জন ভাবতে থাকে, হেনরিয়েটা হবে হয়তো? কিন্তু সে ভেরোনিকার কি ক্ষতি করতে চাইবে?
উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠে, তুমি কার কথা বলছ? মিডগে হার্ডক্যাসল? ভেরোনিকা-মিডগে? চৌকো দেহের সেই মহিলাটির কথা বলছ?
-না, আমি তার কথা বলিনি, তোমার স্ত্রীর প্রসঙ্গেও কিছু বলছি না। আমি সেই উদ্ধত শয়তানিটার কথা বলছি, শুধু তার মুখ চেয়েই তুমি আমাকে আজ খালি হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছ। তোমার স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে অন্তত নৈতিকতার কোনো ভান কোরো না। তুমি ঐ স্ত্রীলোকটার জন্যই আমার প্রতি বিমুখ হচ্ছ।
ভেরোনিকা উঠে এসে জনের খুব কাছে তার গা ঘেঁষে বসে পড়ল। আঠারো মাস আগে ইংল্যান্ডে আসার সময় থেকেই তোমার কথা ভেবে চলেছি, তুমি এ সবের কিছুই জান না। আমি বাড়ি করার জন্য এই বিশ্রী স্থানটা বেছে নিলাম তুমি কোনোদিন কল্পনা করতে পারবে? আমি জেনেছিলাম যে, তুমি মাঝেমধ্যেই এ্যাঙ্গক্যাটেলদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে এখানে উপস্থিত হও। এখানে থাকলে তোমার সান্নিধ্য পাব এই আশা নিয়েই এই জায়গায় আমার বাড়ি করা।
জন–গতরাতে তাহলে পরিকল্পনা করেই এখানে হাজির হয়েছিল?
ভেরোনিকা–জন, তুমি আমার! তুমি চিরকালই আমার ছিলে!
ভেরোনিকার সুন্দর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছিল অপূর্ব রূপের এক দ্যুতি, অফুরন্ত খুশি জনকে সে আলিঙ্গন করে বসে। বুকের মধ্যে সজোরে টেনে এনে চুম্বন করে।
জন–আমি কারুর নই ভেরোনিকা। জীবনে কি এখনও সে শিক্ষা তুমি পাওনি যে, মানুষের দেহ ও মনের অধিকারী কেউ হতে পারে না? আমি যখন বয়সে যুবা ছিলাম, সেই সময় তাকে ভালোবেসেছিলাম। আমার জীবনের সঙ্গে তোমাকেও কাছে পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি তখন ফিরিয়ে দিয়েছিলে!
ভেরোনিকা–আমার জীবন এবং জীবিকা তোমার থেকে অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। যে কেউ ইচ্ছে করলেই ডাক্তার হতে পারে!
জন একথা শোনার পর ক্রুদ্ধ হয়। তুমি নিজেকে যতটা অত্যাশ্চর্য মনে করো ভেরোনিকা, তুমি আসলে কি তাই?
ভেরোনিকা–তুমি বলতে চাইছ যে, আমি এখনও বৃক্ষের চূড়ায় আরোহণ করতে পারিনি। হয়তো এখনও পারিনি। কিন্তু এবার করব! নিশ্চয়ই করব!
জন বিতৃষ্ণার দৃষ্টি নিয়ে ভেরোনিকার দিকে তাকাল।আমি মনেপ্রাণে একথা বিশ্বাস করতে পারি না যে, তুমি বৃক্ষচূড়ায় আরোহণ করবে। তোমার মধ্যে একটা জিনিষের বড় অভাব ভেরোনিকা। আমার মনে কী হয় জানতোমার পাশবিক এবং ছিনিয়ে নেওয়ার শক্তি হয়তো আছে–নেই শুধু প্রকৃত উদারতা।
ভেরোনিকা আর বসে থাকতে পারে না, উঠে পড়ে। শান্তকণ্ঠে সে বলে ওঠে–আমাকে তুমি পনেরো বছর আগের ‘আমিতে’ ফিরিয়ে দিয়েছিলে। আজকে আবার তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ। তোমার এই কর্মের জন্য তুমি একদিন আপসোস করবে–দুঃখও পেতে পার, তবে তোমাকে আমি দুঃখ দিয়েই ছাড়ব, জন।
জন উঠে দরজার দিকে এগিয়ে চলে। সে বলে, আমি যদি তোমার অন্তরে ব্যথা দিয়ে থাকি তার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত ভেরোনিকা। তুমি সত্যিই সুন্দর, তুমি আমার যথেষ্ট প্রিয়, তোমাকে আমি আরও একবার ভালোবাসতাম! তার বলা শেষ হলে জন ভেরোনিকাকে চুম্বন করে। ভেরোনিকার হাত ধরে মিনতির সুরে বলে ওঠে, মনে কিছু কোরো না লক্ষ্মীটি, আমরা কি আমাদের ভালোবাসাকে এই সীমা পর্যন্ত রেখে দিতে পারি না?
ভেরোনিকা–বিদায় জন, আমরা আমাদের ভালোবাসাকে ঠিক এই জায়গাতেই ছেড়ে দিচ্ছি না। একদিন ওটাকে তোমায় গ্রহণ করতে হবে। আমার মনে হয়, এই জগতে আমি যদি সব থেকে কাউকে বেশি ঘৃণা করি সে তুমি–মানুষ বোধহয় কোনো মানুষকে এমন ঘৃণা করতে পারে না।
জন নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ে। সে বলে, আমি দুঃখিত, বিদায় ভেরোনিকা।
বনের মধ্যে দিয়ে জন আবার ফিরে গেল। সুইমিং পুলের কাছে এসে সে একটা বেঞ্চের ওপর বসে পড়ল। ভেরোনিকার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছে তার জন্য সে মোটেই অনুতপ্ত নয়। সে আপন মনেই ভাবতে থাকে, পক্ষপাতশূন্য ভাবে বলতে গেলে ভেরোনিকা মোটেই ভালো স্বভাবের নয়। বরাবরই তার হাবভাবটা এইরকম। এখন তার মন তৃপ্ত এই ভেবে যে, ভেরোনিকার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক শেষ করে এসেছে, তার জীবনে এটাই বোধহয় সব থেকে ভালো কাজ যা সে করতে পেরেছে। সময় থাকতে থাকতে সে যদি সম্পর্ক ছেদ না করে তো, ভগবান জানেন অদৃষ্টে কি ঘটতো! তবে একটাই সুখ, অতীতের নাগপাশ থেকে এখন সে পুরোপুরি মুক্ত। তাই নতুন ভাবে। জীবন শুরু করার ব্যাপারে তার আর কোনো বাধা থাকতে পারে না। এখন সে মুক্ত বিহঙ্গ। কয়েকটা বছর তাকে কতই না দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। মনে কখনো শান্তি পায়নি। কিন্তু জাদা নিঃস্বার্থভাবে তাকে খুশী করতে, তার মনোরঞ্জন করার আশায়, কত না আপ্রাণ চেষ্টাই সে দিনের পর দিন করে চলেছে। জার্দার ব্যাপারে সে তাহলে আগের থেকে অনেক বেশি সদয় হবে।
