আধা-কাঠের বাড়ির জানালা থেকে ভেরোনিকা সেইকথাই ভাবছিল। সে অবশ্য আগে থেকেই জনের প্রতীক্ষায় বসেছিল। ভেরোনিকার বাড়িটা দেখতে সত্যিই সুন্দর, শিল্পীমনের পরিচয় ফুটে উঠেছে তার সর্বাঙ্গে। জনের মনে হল, শিল্পসৌন্দর্যের থেকে বিশেষভাবে দাম্ভিকতা যেন আত্মপ্রচারে সদা ব্যস্ত।
ভেতরে এসো জন, আজ সকালটায় বড্ড শীত পড়েছে।
বসার ঘরে আগুন জ্বালানো ছিল। ঘরটা ঈষৎ সাদা রঙের, সারা ঘর পাংশু বর্ণের সোফায় সজ্জিত। তার দিকে তাকিয়ে বিচারের চোখ নিয়ে আজ দিনের আলোতে ভোেনিকাকে ভালোভাবে দেখল। কাল হয়তো এত ভালো করে দেখার সুযোগ হয়নি। যে ভেরোনিকাকে সে একদিন জানতো সে ভেরোনিকা আর নেই। তার মধ্যে এখন আমূল পরিবর্তন এসে গেছে। সপ্তদশী বালিকাকে আজ বত্রিশ বছরের ভেরোনিকার মধ্যে কোন্ মিল চোখে পড়বে।
সত্যি বলতে কী, জনের মনে হয় যে, ভেরোনিকার রূপের ছটা আগের থেকে অনেক বেশি সুন্দর। সে নিজেও সে ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন এবং সর্বদা সে নিজের সৌন্দর্য বাড়াতে সচেষ্ট। নিজের দেহের কিসে দেহজ সৌষ্ঠব বাড়ে এবং কী কী পন্থায় তার দেহের যত্ন নিতে হবে তা সে ভালোভাবেই বোঝে। তার গাঢ় সোনালি রঙের কেশ এবং রুপোলি প্লাটিনাম রঙে রাঙিয়ে উঠেছে। তার –যুগলও অন্যরকম ছিল, এখন তাতে প্রকাশের তীব্রতা অনেক বেশি। কোনোদিনই সে নির্বোধ সৌন্দর্যের অধিকারী ছিল না। তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্না অভিনেত্রী হিসেবেই তার সুনাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ডিগ্রিও সে অর্জন করেছিল ও স্ট্রিন্ডবার্গ ও সেক্সপীয়ারের ওপর গবেষণাও করেছিল। তার ব্যাপারে একটা জিনিষ বড্ড খারাপ লেগেছিল যে, সে একজন স্ত্রীলোক হয়ে একগুয়ে প্রকৃতির ছিল–জনের কাছে যেটা সত্যিই অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল।
ভেরোনিকা নিজের পথেই চলতে অভ্যস্ত এবং মাংসের মসৃণ সুন্দর সীমারেখার মধ্যে তার লৌহসঙ্কল্প জনের কাছে বড়ই কুৎসিত ঠেকে।
ভেরোনিকা বলে ওঠে, আমি তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি, কারণ আমাদের কিছু কথা হওয়ার আছে, বলতে বলতে সে বাক্স-ভরা সিগারেট জনের দিকে এগিয়ে ধরে। সে বলে ওঠে, আমাদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে পরিকল্পনা করার কথা ভেবেই তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি।
জন একটা সিগারেট তুলে ধরায় এবং বেশ ভদ্র ভাবেই তার বক্তব্য শুরু করে, কিন্তু আমাদের সত্যি কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি?
ভেরোনিকা তার প্রতি কটাক্ষ দৃষ্টিতে তাকায়, বলে ওঠে…, তুমি কী বলছ জন? আমাদের নিশ্চয়ই একটা ভবিষ্যৎ আছে। পনেরোটা বছর আমরা হেলায় নষ্ট করেছি, এরপর সময় নষ্ট করা বোধহয় উচিত হবে না।
জন নীরব থাকে।
একটু পরে আবার বলে ওঠে, সত্যি আমি দুঃখিত, ভেরোনিকা তুমি আজ যা কিছু বকে যাচ্ছ আমার মনে হয় তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। তোমাকে দেখার পর আমি খুশী আর চেপে রাখতে পারিনি। তোমাকে দেখার আনন্দে আমি আবার পূর্বের জীবনে ফিরে গেছি, আগের মতো অধীর হয়ে পড়েছি। কিন্তু তোমার আর আমার জীবনের চলার পথ এখন একদম পাল্টে গেছে, কোথাও কোন মিল নেই, তারা পরস্পর বিরোধী।
ভেরোনিকা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, তুমি কী আবোল-তাবোল বকে যাচ্ছে জন। আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং তুমি আমাকে ভালোবাসো। আমরা পরস্পর পরস্পরের কাছ থেকে দুরে সরে গেলেও আমরা উভয়েই এখনও প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ। অতীতে তুমি ভীষণ একগুঁয়ে স্বভাবের ছিলে, কিন্তু সেকথা ভেবে এখন আর লাভ নেই! আমাদের জীবনে সংঘাত হবার কোনো আশঙ্কা নেই, আমি তোমাকে আমেরিকা যাবার জন্য অনুরোধ করছি না, আমি যে ছবিতে কাজ করেছিলাম তা এখন সমাপ্তির পথে, তাই সোজা লন্ডনের মঞ্চে অভিনয় করার জন্য যেতে চাইছি। আমার আশ্চর্যজনক একটা নাটক আছে–এল্ডারটন–আমার কথা ভেবেই এটা রচনা করেছেন। এই নাটকে আমি অতুলনীয় কৃতকার্যতা লাভ করবো–আমার কথা মিলিয়ে নিও।
সে ভদ্রতার সঙ্গে বলে ওঠে, তুমি যে তোমার কাজে সাফল্য পাবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
ভেরোনিকা–তুমিও তোমার ডাক্তারি চালিয়ে যেতে পারো, আমি তো শুনেছি যে নামকরা চিকিৎসক হিসেবে তোমার এখন যথেষ্ট হাঁকডাক।
জন–কিন্তু প্রিয় বান্ধবী, আমি বিবাহিত, ছেলেমেয়েও আছে।
ভেরোনিকা–আমিও বিবাহিত হয়ে যেতে পারি। এসব ব্যাপার খুব সহজেই হয়ে যায় এবং একজন ভালো উকিল সবকিছু ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। বরাবরই তুমি আমার প্রিয়, তোমাকে বিবাহ করার জন্য আমার মন সবসময়ের জন্যই প্রস্তুত ছিল। আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না, তোমার প্রতি আমার এই উগ্র আকর্ষণের কারণটা কি? এখন সব দিক ভেবে এই সত্যটাই উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, একমাত্র বিবাহেই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।
জন–আমি সত্যিই দুঃখিত, ভেরোনিকা, কোনো ভালো উকিল এলেও বোধহয় কিছু করতে পারবে না। আমাদের আবার নতুন করে ঘর বসানো যায় না, কারণ দু’জনের মধ্যে মনের মিলের বড়ই অভাব।
ভেরোনিকা–গত রাতের ঘটনার পরেও না?
জন–তুমি শিশু নও ভেরোনিকা। তোমার কমপক্ষে একজোড়া পতিদেবতা এবং কম করে একাধিক প্রেমিক আছে। গতরাতের ঘটনায় এমন কি আর ঘটেছে? কোনো অঘটন যে ঘটেনি তা তোমার থেকে আর ভালো কে জানবে।
ভেরোনিকা–হে আমার প্রিয় জন, সেই গুমোট ঘরে তুমি যদি নিজের মুখটা স্বচক্ষে একবার দেখতে পেতে। তবে তোমার বুঝতে অসুবিধে হতো না যে, তুমি পুনরায় সান মিগুয়েলে ফিরে গেছ কিনা!
