সারাটা রাত বাড়ির বাইরে কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটতে তাকে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে জার্দা কিছু ভাবলেও ভাবতে পারে?
এ ব্যাপারে এ্যাঙ্গক্যাটেলদের মনের ধারণা কী হবে বা হতে পারে? এ্যাঙ্গক্যাটেলদের জন্য জনের তেমন মাথাব্যথা নেই, কারণ গ্রীনউইচ্ টাইম মেনে তারা চলেন। তাছাড়া, লেডি এ্যঙ্গক্যাটেলের কাছে অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার যুক্তিযুক্ত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু জার্দা তো আর লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল নয়। জার্দাকে একটু অন্যরকম ভাবে বোঝাতে হবে এবং যত শীঘ্র জার্দাকে বোঝানো যায় ততই মঙ্গলের।
জাদা স্বয়ং যদি তাকে অনুসরণ করে থাকে?
না, ভালো লোকেরা সাধারণত এমন করে না। একজন চিকিৎসক হিসেবে সে শুধু এটাই জানে যে, উচ্চমনা, ভাবপ্রবণ এবং সম্মানিত ব্যক্তিরা কীভাবে চলে। তারা ডাক্তারের কথাও শোনে আবার পরের চিঠি খোলার ব্যাপারেও অসীম উৎসাহ এবং মাঝেমধ্যে প্রয়োজন পড়লে গোয়েন্দাগিরিও করে থাকে–এই কাজ যে তারা কিছুক্ষণের জন্য মনের দিক থেকে সমর্থন জানায় তা নয়, তীব্র দৈহিক যাতনা বা মনস্তাপও তাদের দুঃসাহসী হয়ে ওঠার ব্যাপারে সাহায্য করে।
শয়তান বেচারা! জন মনে মনে ভাবে যে, শয়তানরূপী মানুষ এরা! ডাক্তার ক্রিস্টো মানুষদের বহু দৈহিক যাতনা ও মানসিক যন্ত্রণার কথা জানে। দুর্বলতার জন্য তার মোটেও দয়ামায়া নেই, মানুষের যন্ত্রণায় সে মোহিত হয়। কারণ সে মনেপ্রাণে এই সত্যে বিশ্বাসী যে, জগতে সবলরাই বেশি যন্ত্রণা ভোগ করে থাকে।
জাদা যদি জেনে থাকে?
মূর্খ! সে নিজেকেই নিজের মুখে তিরস্কার করে। জার্দা কেন জানতে যাবে? গভীর ঘুমে সে এখন আচ্ছন্ন। তার কোনো কল্পনা নেই, কোনো কালে অবশ্য ছিলও না।
ফরাসি জানলা দিয়ে সে আবার ঢুকে পড়ল, একটা আলো জ্বেলে ভালো করে জানলা বন্ধ করে দিল। তারপরে ঘরের আলো নিভিয়ে চলে গেল। হলে তখন আলো জ্বলছে–সে তাড়াতাড়ি করে অথচ ধীর পদক্ষেপে উপরে উঠে এল। দ্বিতীয় একটা বোতাম টিপে হলের আলো নিভিয়ে দিয়ে সে শোবার ঘরের দরজায় হাতলের ওপর হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। পরে হাতল ঘুরিয়ে ঘরে প্রবেশ করে।
সারা ঘর গুমোট অন্ধকার, ঘুমন্ত জার্দার নিশ্বাসের শব্দ তার কানে এসেছিল। জন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই জার্দা নড়েচড়ে ওঠে। ঘুমের মধ্যে তার অস্পষ্ট স্বর শুনতে পেল।–কে জন?
হা।
এত দেরি হলো কেন? এখন ক’টা বাজল?
সহজ ভঙ্গিতেই জন উত্তর দেয়, ক’টা বাজছে ঠিক বলতে পারবো না, তবে তোমার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালাম বলে আন্তরিক ভাবেই আমি দুঃখিত। ঐ স্ত্রীলোকটির সঙ্গে গিয়ে আমাকে মদ ছুঁতে হয়েছে।
সে নিজের স্বরকে নিদ্রাচ্ছন্ন এবং বিরক্তিকর করেই তোলে।
জার্দা বলে ওঠে, শুভরাত্রি জন!
জন বিছানাটা পাতার সঙ্গে সঙ্গেই স্প্রিং-এর শব্দটা কানে বাজল।
সব ঠিকঠাক আছে। বরাবরই তার ভাগ্য তাকে সব ব্যাপারে সহযোগিতা করে আসছে। মাঝেমধ্যে সে খুব বিপদে পড়ে যায়। এবং প্রতিবারই তার মনে হয়, খারাপ যদি কিছু ঘটে যায়? কিন্তু প্রতিবারই সে বেঁচে গেছে, কোনোবারই কিছু খারাপ হয়নি। ভাগ্যই সবসময় তার পাশে থেকে তাকে রক্ষা করে এসেছে।
তাড়াতাড়ি করে পোষাক পাল্টে নিজেকে বিছানায় এলিয়ে দিল। মনে মনে ভাবে, কী ভাগ্য! এটা তারই করুণা, যিনি তোমার মাথার ওপর অবস্থান করছেন…আর ভেরোনিকা! আমার ওপরে তার প্রভাব ক্রমেই বিস্তার করে চলেছে, একথা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই।
কিন্তু আর নয়, বালিকা! একটা অন্ধ আবেগে অভিভূত হয়ে সে যেন বলেই চলে, সব শেষ হয়ে গেল, আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম।
.
১০.
পরের দিন সকাল দশটা নাগাদ জন নিচে নেমে আসে। পাশের টেবিলে তখন প্রাতঃরাশ পর্ব চলছে। জার্দা বিছানাতেই ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছে–তাকে সেখানেই তার খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সে নিচে আসেনি, কারণ তার ব্যবহার কাউকে যদি অপ্রস্তুত করে তোলে এই ভয়েই সে আরো ভেতরে ভেতরে বিব্রত বোধ করছিল।
জন ভাবে, এ্যাঙ্গক্যাটেলদের মতো লোকের দল যারা এখনও খানসামা, পাঁচক, চাকর প্রভৃতি পুষে চলেছে তারা ইচ্ছে করলেই তাদের কিছু কাজ দিতে পারেন।
আজ সকাল থেকে জার্দার জন্য জনের খুব মায়া হচ্ছিল। মনে যে দুর্বলতা এতক্ষণ ধরে তাকে পীড়া দিচ্ছিল, এখন তা মরে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
স্যার হেনরি এবং এডওয়ার্ড কেনাকাটা করার উদ্দেশ্যে বাইরে গেছেন, লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের মুখ থেকেই তিনি প্রথম শোনেন। তিনি নিজে বাগানের বাস্কেট এবং গাছ নিয়ে ব্যস্ত। জন তার সঙ্গে কথা বলে কিছুক্ষণ কাটিয়ে দিল, এই সময়ে গাজন একটা রেকাবে করে একটা চিঠি এনে হাজির হলো, সে বলে ওঠে, স্যার লোক মারফত এই চিঠিটা এসে পৌঁছেছে।
জন তাকিয়ে দেখে, চিঠিটা খোলে, ভেরোনিকার কাছ থেকেই এসেছে। জ্ব যুগল ঈষৎ কুঞ্চিত করে লাইব্রেরির মধ্যে এসে চিঠিটা খোলে, ভেরোনিকা লিখেছে : আজ সকালের দিকে একবার এসো, তোমার সঙ্গে বিশেষ প্রয়োজন। ভেরোনিকা।
সে ভাবে, প্রভুত্বব্যাঞ্জক এই চিঠি। তার যাওয়ার একদম ইচ্ছে নেই, কিন্তু চিন্তা করে দেখেছে যে এই ব্যাপারের নিষ্পত্তি হওয়া দরকার, এক্ষুনি তাকে যেতে হবে।
লাইব্রেরির জানলার ঠিক বিপরীতমুখী রাস্তা ধরে সুইমিং পুলের পাশ দিয়ে সে এগিয়ে চলল, সুইমিং পুলটা ঠিক যেন একটা শাঁস, এর থেকে অসংখ্য রাস্তা বের হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে, একটা পাহাড়ের ওপর বনের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে, একটা ঘরের ওপর দিককার ফুলের বাগান থেকে, একটা গোলা থেকে, একটা এসে সরাসরি লনের সঙ্গে মিশেছে–এই রাস্তা ধরেই সে এগিয়ে চলেছে। এই লন ধরে কয়েক গজ এগোলেই ‘ডাভকোট’। ‘ডাভকোট’ নামের বাড়িটা।
