জন কিন্তু কিছুতেই হারতে চায় না। জীবনের সব সুযোগই সে হাত পেতে নিতে চায় এইজন্য সে সব ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। রোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারে সে সব ঝুঁকি নিয়ে এক, পায়ে খাড়া-গবেষণায় কোনো ঝুঁকি নেই, আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও বোধহয় এই ঝুঁকিটা নেই। তবে সে কিন্তু খুব বড় মাপের ঝুঁকি নিতে চায় না–নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয়, আবার সুবিধেও খুব সহজে মিলে যায়–এমন ঝুঁকিরই সে পক্ষপাতিত্ব করে আসছে বরাবর। জাদা যদি কিছু অনুমান করে থাকে? জার্দার যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থেকে থাকে তবে তো সবই জার্দাকে মুখ ফুটে সে কি কিছু বলবে? জার্দাকে সে আর কতটুকু জানে? তার সম্বন্ধে কোন ব্যাপারে সে কি কোনোদিন আগ্রহ প্রকাশ করেছে? সহজ কথাটা জাদা ভালোই বোঝে। জন যদি জার্দাকে বলেও থাকে যে, সাদাকালো হয়ে গিয়েছে–সেটা সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবে, কিন্তু এরকম জিনিষকে সে কী বলে বোঝাবে..সে যখন বিজয়িনীর পেছন পেছন পরাজিতের মতো অনুসরণ করে উপস্থিত। এখন সকলে কী মনে করবে?
ভেরোনিকা তার সুডোল উচ্চ শরীরী গঠন ও সুঠাম দেহসৌন্দর্য নিয়ে জনকে মোহিত করেছিল, পরাস্ত করেছিল, তাকে জয় করে চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণী শক্তির টানে টেনে নিয়ে বসাল। জন ভেবে কোনো কিছুরই কুলকিনারা করতে পারল না। খেলার টেবিলে বসে কে কী মনে করল না করল। তারা কী জনের মধ্যে পনেরো বছরের সেই পূর্বের প্রেমে পাগল হওয়া যুবককে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছে? অথবা এমনও হতে পারে তার মধ্যে তারা এক কর্তব্যপরায়ণ ভদ্রলোকের দর্শন লাভ করেছে। এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা নেই।
জন কিন্তু সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তার ভীতির কারণ হলো তার শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য, অসামাজিক আচরণের জন্য, নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে। সে যেন সম্পূর্ণ রূপে এক পাগল হয়ে উঠেছিল–সমস্ত শালীনতার বেড়াজাল টপকে উন্মাদের মতো ভেরোনিকাকে অনুসরণ করেছিল সে, মন্ত্রচালিতের মতো এখন তার দশা। সে যে এতটা পাগল হয়ে উঠতে পারে তাকে কী বিশ্বাস করতে চাইবে? এই গভীর রাতে সকলেই এখন নিদ্রায় আচ্ছন্ন, বসার ঘরের ফরাসি জানলা তার পথ চেয়েই আধখোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে–জন ফিরে যাবে এই জন্যই ভোলা রাখা হয়েছে। সে আবার মুখ তুলে নিরীহ নিদ্রিত বাড়িটার দিকে একবার তাকাল। বাড়িটাকে দেখে আরও যেন নিরীহ এবং নির্দোষ বলে মনে হতে লাগল।
সে আবার পথ চলতে শুরু করে দেয়। সে শুনতে পেল অথবা কল্পনার জগৎ থেকেই সে শুনতে পেল বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে-দরজা বন্ধ হবার স্পষ্টধ্বনিও তার কানে এসে বাজল।
সে মুখ ঘুরিয়ে সুইমিং পুলের দিকে একবার চেয়ে দেখল, কেউ যদি তাকে অনুসরণ করে সেখানে এসে থাকে। কেউ হয়তো তাকে অনুসরণ করে এসেছিল এবং পরে গিয়ে বাগানের দরজা দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। হয়তো দরজা বন্ধ হবার শব্দটাই তার কানে এসেছে।
সে তাড়াতাড়ি করে জানলার দিকে তাকায়। পর্দার ফাঁক দিয়ে কেউ কি তাকে প্রত্যক্ষ করছিল, পরে হয়তো জানলা বন্ধ করে দিয়েছে। ঐ ঘরটা কি হেনরিয়েটার?
জনের একবার ইচ্ছে হল, কতকগুলো পাথরকুচি জানলায় ছুঁড়ে মারে, তারপর চিৎকার করে হেনরিয়েটাকে ডাক দেয়।
হেনরিয়েটা! জনের প্রাণ হঠাৎ করে কেঁদে ওঠে। কোনো অবস্থাতেই সে হেনরিয়েটাকে হারাতে পারবে না।
তার চিৎকার করে বলতে মন চাইছিল, এসো হেনরিয়েটা, ঘরে না থেকে বেরিয়ে এসো, আমার সঙ্গেই না হয় বেড়াতে চলল! বেড়াতে বেড়াতে শো ভোনডাউন পর্যন্ত চলে যাব। আমার মনের সব কথা তোমার কাছে উজাড় করে দেব–আমার যত কথা তোমাকে আজ ধৈর্য ধরে শুনতে হবে। আমার কথা তোমার বোধগম্য হবে কিনা জানি না, আমার জীবনের কোনো কথা তোমার অজানা নয়–যদি কিছু তোমার অজানা থেকেও থাকে, তবে এসো সব খুলে বলবো।
জন হেনরিয়েটাকে তার মনের না-বলা যে কথা বলতে চেয়েছিল : আমি আবার প্রথম থেকেই শুরু করছি। আজ থেকে আমার নতুন জীবন শুরু হল। সে জিনিষটার আকর্ষণ আমাকে পেছনে টেনে নিয়ে চলছিল, পঙ্গু অবস্থায় আমাকে ফেলে রেখেছিল, বর্তমানে সেটা এখন পড়ে গিয়েছে। আজ বিকেলে তুমি আমায় ঠিক কথাই বলেছিলে। নিজের কাছ থেকেই আমি পালিয়ে বাঁচতে চাই। বছরের পর বছর ধরে আমি সেটাই করে আসছিলাম। আমি এখনও উপলব্ধি করতে পারিনি, যে এটা শক্তি, না দুর্বলতা, যা আমাকে ভেরোনিকার কাছ থেকে সরিয়ে এনেছিল। নিজেকে দেখেই আমি ভয় পেয়ে যেতাম, জীবনকে ভয় পেতাম, তোমাদের কাছ থেকেও ভয় পাবার আশঙ্কা মনে থেকেই যেত।
যদি সে হেনরিয়েটাকে একবার জাগাতে পারতো, তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারতো বনের মধ্যে গিয়ে তাকে নিয়ে যদি কোথাও বসতে পারতো, যেখানে একত্র হয়ে প্রত্যক্ষ করতে পারতো পৃথিবীর বুকে সূর্যের নেমে আসার দৃশ্য।
নিজেকে সে নিজেই পাগল ভাবতে লাগল। থরথর করে কাঁপছিল। সেপ্টেম্বরের শেষের শীত, ভালো ঠান্ডা, তাই সে কাঁপছিল, জন নিজের উদ্দেশ্যেই নিজেকে প্রশ্ন করে, তোমাকে কোনো ভূতে পেয়েছে নাকি? নেহাতই পাগল তুমি! একটা রাত তুমি পাগলের মতোই ব্যবহার করেছ। তুমি যদি অক্ষত থাকতে পার, জানবে তুমি সত্যিই ভাগ্যবান।
