স্যার হেনরি অমায়িকভাবে বলে ওঠেন, ডাভকোটে থাকতে আপনার এখন কেমন লাগছে?
ভেরোনিকা–আমার বেশ ভালোই লাগছে। লন্ডন শহর থেকে এত নিকটে এমন সুন্দর নিঝুম নিরিবিলি জায়গা। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেছে।
ভেরোনিকা, প্ল্যাটিনাম ফক্সেস শরীরের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে শক্ত করে এঁটে নেওয়া হলে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিল।
ভেরোনিকা বলে ওঠে, আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ, আপনারা আমার অনেক উপকার করেছেন। স্যার হেনরি ও লেডি এ্যঙ্গক্যাটেলের মধ্যে কথাগুলো যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। এডওয়ার্ড চুপচাপ কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল। ভেরোনিকা বিদায় নিয়ে যাবার সময় জনকে একবার লক্ষ্য করে বলে উঠল, জন, তুমি কিন্তু আমার সাথে অবশ্যই একবার দেখা করবে। আমাদের সেই শেষ সাক্ষাতের পর তুমি এতদিন ধরে কী করছিলে, আমার সব জানতে ইচ্ছে করছে। যদিও সেগুলো এখন অনেক বাসি হয়ে গেছে, তবু আমি শুনতে চাই।
সে জানালার দিকে এগিয়ে গেল এবং জন তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলল। ভেরোনিকা সকলের দিকে তাকিয়ে এবার বিদায়ের হাসি হেসে ওঠে। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব, এমন বোকার মতো অসময়ে আপনাকে উত্ত্যক্ত করার জন্য সত্যি আমি দুঃখিত।
জনের সঙ্গে ভেরোনিকাও বেরিয়ে যায়। জানালায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টে তাদের দিকেই তাকিয়ে রইলেন স্যার।
তিনি বলে ওঠেন, চমৎকার এক উষ্ণরাত্রি!
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল হাই তোলেন। তিনি বলেন, ওগো, আমাদের এখন শুতে যাবার সময়। হেনরি, আমরা ওর একটা ছবি দেখতে যাব, আমার মনে হয় আজ থেকেই ওর অভিনয় শুরু। তারা উপরে চলে আসেন। তাদের বিদায় জানাতে এসে মিডগে, লুসিকে জিজ্ঞাসা করলেন, খুব ভালো অভিনয় করে বুঝি।
লুসি–তুমি কী তা মনে করো না, প্রিয় বোন?
মিডগে–তোমার কী মনে হয় লুসি, যে, প্রায়ই তার দেশলাইয়ের অভাব দেখা দেবে এবং নিরুপায় হয়েই সে এখানে উপস্থিত হবে?
লুসি–তা কেন হতে যাবে? তবে আধডজন দেশলাই কিছু কম নয় বোনটি। বদান্যতা না দেখিয়েও তো পারি না। তাছাড়া, শুনে এসেছি চমৎকার অভিনয় গুণও তার আছে।
নিচের এবং অলিন্দের সবকটা দরজা একসাথে বন্ধ হওয়ার শব্দ কানে এলো। স্যার হেনরি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, জানলাটা আমি ক্রিস্টোর কথা ভেবেই খুলে রেখেছিলাম। বলা শেষ হলে নিজের ঘর বন্ধ করলেন। হেনরিয়েটা জার্দার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, অভিনেত্রীরা কত রঙ্গই না জানেন। তাদের প্রবেশ এবং প্রস্থান দুটোই ভীষণ চমৎকার।
জার্দা হাই তুলে বলে ওঠে, ঘুমে আমার চোখ জুড়িয়ে আসছে।
বাদামগাছের বনের মধ্যে দিয়ে সরু পথ ধরে ধীর পদক্ষেপে চলছিল ভেরোনিকা ক্রে। সাঁতারের জলাশয়ের ধার দিয়ে সে ভোলা জায়গাটাতে এসে দাঁড়াল। এই জায়গাটায় ছোট একটা তাবু। দিনে সূর্যের আলোয় ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হতে থাকলে এ্যাঙ্গক্যাটেলগণ এখানে বাস করতেন।
ভেরোনিকা ক্রে নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘাড় ঘোরাতেই চোখ গেল জনের ওপর, কিছু পরেই সে হাসিমুখে ঝরাপাতায় পরিপূর্ণ সুইমিং পুলের দিকে ইঙ্গিত করে বলে, দেখো, ঠিক ভূমধ্যসাগরের মতো নয়, কি বল জন?
সে জানত যে, কেন সে তার প্রতীক্ষায় বসে আছে–সে জানত যে, একটা দুটো বছর নয়, দীর্ঘ পনেরোটা বছর। ভেরোনিকার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও সে তার সঙ্গেই আছে–এখনও আছে। নীল সবুজ, মিমোত্মার গন্ধ, উত্তপ্ত ধূলিকণাচলে গিয়েছে, কোন্ দূরে সরে গেছে, দৃষ্টির অন্তরালে চলে গিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে–তবু মন থেকে যায়, অন্তরের কোনো এক স্থানে রয়ে গেছে। প্রাকৃতিক দৃষ্টি, ফুলের গন্ধ, আবহাওয়ার মাদকতা–সবকিছুর মূলেই ঐ ভেরোনিকা, সবকিছুর লক্ষ্য কিন্তু একমাত্র সেই। জন চব্বিশ বছরের তখন এক যুবা, কোনো এক সময় ভেরোনিকাকে সে তার মন দিয়েছিল, তার প্রেমের জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিল, সমস্ত মন-প্রাণ দিয়েই তাকে ভালোবেসেছিল, কিন্তু তাদের ভালোবাসার ঘর বেশিদিন টিকল না, তাই বিচ্ছেদ হয়ে গেল, জন পালিয়ে বেঁচেছিল।
কিন্তু আজ আবার এতদিন পরে তাকে সে ফিরে পেয়েছে, তাকে ছেড়ে যেতে মনের দিক থেকে কিছুতেই সাড়া পাচ্ছে না–আজ আর জন পালিয়ে যাবে না।
.
০৯.
জন ক্রিস্টো বাদামগাছের বন থেকে সবুজ ঘাসের মুক্ত প্রাঙ্গণে ঘরের ঠিক পাশটাতে এসে উপস্থিত হল। আকাশজুড়ে তখন চাঁদের আলো। জ্যোৎস্না-সাত বাড়িটাকে তখন অদ্ভুত লাগছিল। জানলায় পর্দা ঝোলানো ছোট বাড়িটার রূপমুগ্ধকর অপূর্ব সৌন্দর্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর! হাত ঘড়ির দিকে জন সময়টা দেখে নিল।
ঘড়িতে তখন ঠিক তিনটে। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে জন ক্রিস্টো। তখন দেখে মনে হচ্ছিল ভেতর ভেতর সে বড় উদ্বিগ্ন। সে এখন আর প্রেমে অন্ধ চব্বিশ বছরের যুবক নয়। এখন সে একজন বিচক্ষণ বিষয়ী লোক, তার বয়স এখন চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই। তার মনে এখন জলের মতো স্বচ্ছ এবং শান্ত স্থির।
জনের মনের হলল, সে খুব বোকা, সত্যি খুব বোকা ছিল। এই জন্য তার কোনো অনুতাপ নেই। অতীতে ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটে গেছে তার কোনো সমাধান বোধহয় হয়নি, জন নিজের কাছে হেরে গিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে–তাই ভেরোনিকাকে মন থেকে সম্পূর্ণ ভাবে মুছে ফেলতে পারেনি। ভেরোনিকা আজ এসে উপস্থিত হয়েছিল যেন স্বপ্নের মতোইজন কিন্তু সেই স্বপ্নকে মেনে নিয়ে তাকে অনুসরণ করেই পথ চলতে শুরু করেছে। এখন কি রাত তিনটে, ভেরোনিকার সঙ্গে সে তিনঘন্টা কাটিয়ে এসেছে। সে যেন তার দল থেকে পালিয়ে এসেছে, ভেরোনিকাই যেন তার সম্পূর্ণ মূল্য আদায় করে নিল। জন সম্বন্ধে সকলের ধারণা কোথায় নেমে গেল! জার্দা কী ভাবল? আর হেনরিয়েটা? হেনরিয়েটাকে সে কোনোদিন গ্রাহ্য করেনি। একনিমিষে তাকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতে বোধহয় অসুবিধা হবে না। কিন্তু জাদা? জার্দাকে বোঝনোর ক্ষমতা তার নেই।
