হেনরিয়েটা একটা জিনিষ লক্ষ্য রেখে চলেছে যে, এডওয়ার্ডকে হারানো মোটেই সহজ ব্যাপার নয়।
ভুল ডাক ফেলেও কেমন সুন্দরভাবে এডওয়ার্ড গেইম করে নেয়। অনেক সময় লিড দিতে গিয়ে ভুল কিছু হয়ে গেলেও খেলা ঠিক করে নেয়। এই ব্যাপারে হেনরিয়েটা সত্যিই বিব্রত বোধ করে। নিয়মমতো খেলা খেলে না এডওয়ার্ড। এলোমেলো ভুল পন্থা অনুসরণ করে হেনরিয়েটাকে হারিয়ে দিচ্ছে। হেনরিয়েটা এটা ভেবেই নিশ্চিত হয় যে, জন ক্রিস্টোর এটা আর এক কিস্তি সাফল্য ডেকে আনল। লুসির খেলাও তার পছন্দ হয় না।
হঠাই নাটকীয়ভাবে জানলা দিয়ে ভেরোনিকার মঞ্চে আবির্ভাব ঘটল। জানালা ফরাসি কায়দাতেই ভেজানো ছিল, তবে আটকানো ছিল না, কারণ সন্ধ্যের দিকটা বড্ড গরম পড়েছিল। জানালা ঠেলে ভেতরে এল ভেরোনিকা এবং গরাদে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে আপন মনে হাসতে থাকে। কোনো কথা না বলে নীরবে শুধু ঘরের পারিপার্শ্বিক আবহাওয়াটা নিরীক্ষণ করছিল।
আমাকে ক্ষমা করবেন। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল–আমি আপনার প্রতিবেশী ডাভকোট বাড়ির অধিবাসী–মহা বিপদে পড়েই আপনার শরণাপন্ন হতে হয়েছে!–ভেরোনিকা বলে চলে।
তার হাসি এখন যেন আরও জোরে কানে আসতে লাগল, কৌতুক করেই সে বলে উঠল, একটা দেশলাই পর্যন্ত নেই–আমার ঘরে এখন অভাব পড়েছে দেশলাইয়ের। আপনার কাছে একটা দেশলাই ধার নিতেই হাজির হয়েছি। একমাইলের মধ্যে আমার প্রতিবেশী বলতে এক আপনারাই তো আছেন।
মুহূর্তের জন্য হলেও কারো মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না, সকলেই যেন অভিভূত, বধির শ্রোতার দল, ভেরোনিকা নিঃসন্দেহে সুন্দরী, তবে অপরূপা নয়, তাছাড়া চোখ ধাঁধানো রূপের ছটাও ভেরোনিকার ছিল না। তবে সব মিলিয়ে তাকে সুন্দরী বলা চলে। চুলের ঢেউ, মুখের বক্রতা, কাঁধের গড়ন এবং নিতম্বের সৌষ্ঠব তাকে সুন্দরী রমণীর তালিকায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সকলেই তাকে দেখে একবাক্যে বলে উঠবে, হ্যাঁ, চমৎকার রূপ বটে।
একটু চুপ থাকার পর ভেরোনিকা আবার বলে ওঠে, আমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধূমপান করি–চিমনীর মতো করে ধোঁয়া ছাড়ি, তবে আমার লাইটারটাও এখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে–কাজে আসছে না। তাছাড়া স্টোভ জ্বালার ব্যাপার আছে–আমার এমন নীরেট মাথা যে, দেশলাইয়ের কথা আগে মনেই হয়নি, আমার ঘরে বলতে গেলে যে একটি দেশলাইও নেই একথা আগে জানতে পর্যন্ত পারিনি।
আভিজাত্যের ভঙ্গিমায় লুসি এগিয়ে এলেন, চোখেমুখে মৃদু হাসির ছাপ।
-কেন, অবশ্য–দেশলাই দিয়ে লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সবে মুখ খুলেছে, কিন্তু মাঝপথে ভেরোনিকা বাধা দেওয়ায় তিনি নীরব থাকলেন।
জন ক্রিস্টোকে দেখা মাত্র ভেরোনিকা অবাক হয়ে যায় এবং তার নিকট এগিয়ে এসে আলাপ জমিয়ে দেয়। মুখে তার অটুট রয়েছে অবিশ্বাস্য খুশীর ছাপ।
করমর্দনের জন্য এগিয়ে এসে সে হাত বাড়িয়ে দেয়।
জন ক্রিস্টো যে! কতদিন হল তোমার দেখা মেলেনি! তোমাকে হঠাৎ করে এখানে দেখতে পেয়ে কী যে আনন্দ হচ্ছে তা বলে বোঝাতে পারছি না!
ক্রিস্টো এবং ভেরোনিকা গভীর আনন্দের সঙ্গে করমর্দন করে ফেলে। আর লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের দিকে চোখ যেতেই বলে ওঠে, এখানে আসার পর জীবনের সবচাইতে বড় আশ্চর্যের জিনিষটা দেখলাম, জন আমার বহুদিনের পুরোনো বন্ধু অথচ তাকে কতদিন হলো চোখের দেখা পর্যন্ত দেখিনি! শুধু পুরোনো বন্ধু বললে বোধহয় ভুল বলা হবে, আমার জীবনে সেই প্রথম ব্যক্তি যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, প্রেমে আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি জনকে এখনও মনে মনে ভালোবাসি।
ভেরোনিকার মুখে মৃদুমন্দ হাসি লেগেই ছিল–একজন স্ত্রীলোক তার জীবনের প্রথম প্রেমিককে পেয়ে যেমন সুখী হয় তেমন রূপের ছটাও তার চোখেমুখে।
পরে বলে উঠল, আমি ভাবতাম, জন সত্যিই অত্যাশ্চর্য!
স্যার হেনরি যেমন ভদ্র তেমন মার্জিত স্বভাবের। ভেরোনিকার দিকে তিনি গুটিগুটি পদক্ষেপে এগিয়ে এসেছিলেন। মদের গ্লাস বাড়িয়ে ধরলেন, গ্লাসে চুমুক দেবার জন্য আহ্বান করলেন। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলকে মিডগে বলে ওঠেন, বোনটি, ঘন্টা বাজাও।
গাজন আসতেই লুসি বলে উঠলেন, এক বাক্স দেশলাই নিয়ে এসো, পাঁচকের কাছে চাইলে অনেকগুলো পেয়ে যাবে।
–আজ নতুন একডজন এসেছে মহাশয়া,-গাজন বলে ওঠে।
–তাহলে বরং নতুনগুলোর মধ্যে থেকে আধডজন নিয়ে এসো।
ভেরোনিকা মৃদু হেসে প্রতিবাদ জানাতে চায়, না না, লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল, আর তো মাত্র একটা দিন। ভেরোনিকা মদ্যপান করতে করতে হাসিমাখা মুখ নিয়ে প্রত্যেকের দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে হেসে সকলকে সম্ভাষণ জানাচ্ছিল।
জন ক্রিস্টো জাদাকে দেখিয়ে একবার বলে ওঠে, এই আমার স্ত্রী, ভেরোনিকা। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ভেরোনিকা বলে ওঠে, ও, তোমাকে দেখে কী যে ভালো লাগছে! হতবুদ্ধির ন্যায় বধির হয়ে নীরবে রইল জার্দা। গাজন দেশলাইটা এনে একটা রুপোর ডিসের ওপর রাখল। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল দেশলাইয়ের ডিসটা এনে এবার ভেরোনিকার সামনে রেখে দিল।
ভেরোনিকা বলে ওঠে, প্রিয় লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল, এতগুলো দেশলাই আমার কোন প্রয়োজনে আসবে না।
রাজকীয় ভঙ্গিতে লুসি জবাব দেয়, শুধু একটা কেমন অস্বস্তি হয়, আপনি ইচ্ছে করলে সবগুলোই নিয়ে যেতে পারেন, আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না। ছটা দেশলাই দেওয়া আমাদের কাছে কোনো ব্যাপার নয়।
