এডওয়ার্ড তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত, ললিতকলার অনুরাগী বলে সে তাকে বরাবর অবজ্ঞার চোখে দেখে আসছে। অবশিষ্ট চারজন অতিথিকে সে সমালোচনার চোখ দিয়েই দেখে। আত্মীয়তা তার কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলতেও তার মনে ঘৃণার উদ্রেক করে।মিডগে এবং হেনরিয়েটাকে সে কোনোদিন পাত্তা দেয় না। সে মনে করে ওদের মস্তকে কোনো বস্তু আছে বলে মনে হয় না। ডাক্তার ক্রিস্টোও তার কাছে হার্লি স্ট্রিটের হাতুড়ে ডাক্তারদের অন্যতম। তার অবশ্য কেতাদুরস্ত ভাব আছে–কিন্তু তার স্ত্রী সব গণনার বাইরে।
কলারের মধ্যে থেকে ডেভিড ঘাড় নাড়ে এবং সকলকে সে এটাই বোঝাতে চায় যে, সে । কাউকে গ্রাহ্য করে না। তারা সকলেই খুব অকিঞ্চিৎকর।
তিনবার সকলের উদ্দেশ্যে নিজের মনে গালিগালাজ বর্ষণ করে মনটা যেন একটু হালকা হয়। তবু কটাক্ষ চোখে নিয়েই সবার দিকে তাকিয়েছিল। এক এক করে সকলের ব্যাপারেই নানা ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ সমালোচনা সে করে যাচ্ছিল। বহুক্ষণ হয়ে গেল হেনরিয়েটা নীরবে শুনে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষে নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে অসহ্য হয়েই ভিন্ন রাস্তা ধরল।
হেনরিয়েটা জানত যে, সঙ্গীত শিল্পে যথেষ্ট দক্ষতা রাখে ডেভিড। তাই ডেভিডকে অকারণে উত্যক্ত করার লোভেই সে তার সুরকার সম্পর্কে অবান্তর মন্তব্য করে বসে। রঙ্গ করে সে বলার পরই লক্ষ্য করল, ওষুধ ধরেছে। ডেভিড নড়েচড়ে বসে। এবং খাওয়া অর্ধ-সমাপ্ত রেখে খুব দীপ্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, যে, হেনরিয়েটা এ বিষয়ের অগ্র-পশ্চাৎ কিছুই বোঝে না। ডিনার শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে তার বক্তৃতা থামাল না এবং নির্বাক শ্রোতার মতোই হেনরিয়েটা তার আসনে নীরব রইল।
বক্র দৃষ্টিতে লুসি এ্যাঙ্গক্যাটেল ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন, মিডগে নিজেকে আর সামলাতে না পেরে ভ্র-কুঞ্চিত করে বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলল। খাওয়া শেষ হলে বসবার ঘরের দিকে যাবার সময় লেডি এ্যাকাটেল হেনরিয়েটার হাত ধরে বলে ওঠেন, মাথায় কিছু না থাকলে এই হাতে আর কত বেশি কাজ করা যায়! তুমি কী মনে কর হরতন অথবা ব্রিজ পাশবিক জোরের ফল?
হেনরিয়েটা–আমার কিন্তু মনে হয় পাশবিক জোরের সঙ্গে তুলনা করলে অপমানটা ডেভিডকেই করা হবে।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল–তুমি বোধহয় ঠিকই বলেছ, তাহলে ব্রিজের সঙ্গে তুলনা করা চলতে পারে কারণ ডেভিড মনে মনে এটাই ভেবে বসবে যে, ব্রিজের মধ্যে বাজে জিনিষ আর নেই, তাহলে ওটার দ্বারাই তাকে অবজ্ঞা করা চলে।
তারা দুটো টেবিল অধিকার করে নিল এবং টেবিলে বসে তাস খেলতে শুরু করে দিল। জার্দার সঙ্গে খেলার সঙ্গী হল হেনরিয়েটা এবং তাদের প্রতিপক্ষ হন জন ও এডওয়ার্ড। গ্রুপিংটা যদিও ভালো হলো না তবে হেনরিয়েটা একান্ত মনেই চেয়েছিল জার্দাকে লুসির কবল থেকে রক্ষা করতে এবং সম্ভব হলে জনের হাত থেকেও। জন কিন্তু ছাড়ার পাত্র নয়, সেই সঙ্গে এডওয়ার্ডও এসে যোগ দেয়। হেনরিয়েটার মতো আবহাওয়াটা যে তেমন সুখপ্রদ ছিল না এটা সে জানতে পারেনি, কোনদিক থেকে শান্তিভঙ্গের কারণ এসে হাজির হবে। যাইহোক, এইসব ভেবে আর কী লাভ, তাস যদি সাহায্য করে তবে জাদা জিতে যেতে পারে। কারণ জাদাকে খুব খারাপ ব্রিজ খেলোয়াড় বলা যায় না। তবে জাদার দোষ এটাই সে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে খেলে। জন কোনো রকমে খেলাটা চালিয়ে যেতে পারে, ভালো খেলোয়াড় সেও নয়, মনে সাহস আছে এবং নিজের ওপর আস্থা আছে, তবে ভালো খেলোয়াড় হিসাবে যথেষ্ট সুনামের অধিকারী এডওয়ার্ড।
কোথা থেকে সময় এগিয়ে চলে, হেনরিয়েটার টেবিলে তারা সেই রাবারই খেলে যাচ্ছে। স্কোর লিখে লিখে দুই দিক বেশ ভারী হয়েছে। জোর তালে প্রতিযোগিতা চলছে, কিন্তু একজন লোক এ সম্বন্ধে একেবারেই অজ্ঞ।
জাদারা এইমাত্র রাবার করল, এইজন্য সে মনের দিক থেকে অত্যন্ত খুশী এবং ভেতরে একটা উত্তেজনা অনুভব করছে।
জাদার ডাকের ওপর জার্দার রঙেরই হেনরিয়েটা ডাক বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমস্যার সমাধান একনিমেষে হয়ে যায়।
জন তেমন সুবিধা করতে না পেরে জার্দার মনোবল ভেঙে দেওয়ার অভিপ্রায় নিয়েই চিৎকার করে। বলে ওঠে, জাদা তুমি হঠাৎ করে ক্লাব লিড দিতে গেলে কেন?
হেনরিয়েটা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, বাজে বকা বন্ধ করো জন। ক্লাব ছাড়া লিড দেওয়ার মতো জাদার কাছে আর কিছুই নেই, সে ঠিকঠাক ভাবে তার খেলা খেলে চলেছে।
অবশেষে হেনরিয়েটা তার দিক করে স্কোর করে এবং জার্দাকে বলে, গেইম এ্যান্ড রাবার হলো, আমরা বোধহয় খুব বেশি লাভবান হলাম না।
জন হাসিমুখে বলে ওঠে, লাকি গ্রুপ।
হেনরিয়েটা চট করে জনের দিকে তাকায়, কারণ একমাত্র সেই পারতো জনের ভাষা বুঝতে। জন আর কথা বাড়াল না।
হেনরিয়েটা ধীর কণ্ঠে বলে ওঠে, দেখো, খেলাতে দিয়ে লাভ করার পেছনে তেমন কোনো বাহাদুরি নেই।
জন বলে, জার্দাকে জেতাবার জন্য তুমি উঠে পড়ে লেগেছ, লোককে আনন্দ দেবার পরিবর্তে তোক ঠকানোর পথটাই তুমি বেছে নিয়েছ।
হেনরিয়েটা আর চুপ থাকতে পারে না, তুমি তোককে এরকম বাজে কথা বলে ক্ষেপিয়ে তোল কেন? তুমি কি একেবারে সাধু?
জন বলে, তোমাকে পার্টনার করা বোধহয় সার্থক হয়েছে, পার্টনারের মতোই তুমি বুলি আওড়াচ্ছ।
