হেনরিয়েটার মুখে ম্যারাথন দৌড়ের নাম শোনা মাত্র জন হেসে ফেলে এবং হঠাৎ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। জন সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, তোমার কী কষ্ট হচ্ছে?
হেনরিয়েটা–না, আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না বটে, তবে এত দ্রুতবেগে হাঁটার প্রয়োজনটাই বা কী? আমাদের তো গাড়ি ধরতে হচ্ছে না। তোমার মনে এত উৎসাহ আসছে কোথা থেকে? তুমি কি তোমার সব শক্তি ক্ষয়ের প্রচেষ্টায় উঠে পড়ে লেগেছ নাকি?
জন একদম থেমে যায়, এবং বলে ওঠে, তুমি এরকমভাবে কথা বলছ কেন?
উৎসুক নেত্রে হেনরিয়েটা তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
হেনরিয়েটা বলে ওঠে, কিছু ভেবে আমি এ কথা বলিনি।
জন আবার চলতে শুরু করে দেয় তবে তার গতিবেগ অনেক ধীর। জন বলে ওঠে, সত্যি আমি বড় ক্লান্ত, ভীষণই ক্লান্তি অনুভব করছি। জনের কণ্ঠে ক্লান্তির আভাস পেয়েই হেনরিয়েটা জিজ্ঞাসা করে ওঠে, ক্যাবট্রি এখন কেমন আছে?
এই সবেমাত্র কাজে হাত দিয়েছি, এখনও অনেকদিন লাগবে, শুধু কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, আমাদের পথ যদি নির্দিষ্ট থাকে এবং আমরা যদি কৃতকার্যের শিখরে পৌঁছতে পারি তবে নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী পরিবর্তন সংঘটিত হবে–
হেনরিয়েটা বলে, তবে তো রিজওয়ে ব্যাধিমুক্ত হয়ে উঠবে? তাহলে তো জগতে আর লোক মরবে না?
জন বলে ওঠে, অনেকটা প্রায় সেইরকমই।
হেনরিয়েটা নিজের মনে ভাবতে থাকে, এরা কী বলতে চাইছে।
বিজ্ঞানসম্মত পথ ধরেই আমরা এগিয়ে চলেছি, কৃতকার্য যদি হই তবে সুযোগের সকল দরজাই খুলে যাবে।
এসো, আমরা এখানে এসে একটু বসি, বসে বসে মুক্ত বাতাস সেবন করা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ভাল–সেই সঙ্গে বসে থেকে–তোমার দর্শন মেলা আরও উত্তম–বলা শেষ হতেই জন আবার হাসতে শুরু করে দেয়, কিছুক্ষণ বাদে আপনমনেই বলতে থাকে, এমন মুক্ত হাওয়া সেবন করলে জার্দার বরং উপকারই হবে, হোতে আসার জার্দার বেশ প্রবণতাও আছে, কিন্তু বেড়াতে তার মন একদম চায় না।
জন বলে ওঠে, আসতে আসতে এ্যাঙ্গক্যাটেলের দিকে আমার একবার দৃষ্টি চলে গিয়েছিল।
হেনরিয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, না, তুমি তাকে বার দুই দেখেছ।
জন–আমি ঠিক মনে করতে পারছি না।
হেনরিয়েটা–এডওয়ার্ডকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। এডওয়ার্ড বরাবরই আমার খুব প্রিয়।
জন–যাকগে, এডওয়ার্ডের গল্প করে আমাদের সময় নষ্ট করা একেবারেই উচিত নয়। এরা আমাদের গণনার মধ্যে পড়ে না।
হেনরিয়েটা–জন, অনেক সময় তোমার জন্য আমার ভয় হয়।
জন–আমার জন্য ভয়? তুমি কী বলতে চাইছ?
হেনরিয়েটা–তুমি যেন সত্যি বিস্মৃতিপরায়ণ–অত্যন্ত–হ্যাঁ, অন্ধ।
জন–অন্ধ?
হেনরিয়েটা-তুমি জান না, চেয়ে দেখতে পাও না–ভাবপ্রবণতার লেশমাত্র তোমার মধ্যে নেই! তুমি বোধহয় জানো না, অন্য লোকে কী অনুভব করে এবং ভাবতে পারে।
জন–আমি ঠিক বিপরীত।
হেনরিয়েটা–তুমি যার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাক শুধু তাকেই তুমি দু’চোখ ভরে দেখো, একটা অনুসন্ধানী আলো ঠিক পেছনের দিকে, এপাশ-ওপাশ সবই অন্ধকারে ঘেরা সেখানে তোমার চোখে কিছুই পড়ে না।
জন–প্রিয় বান্ধবী আমার, হেনরিয়েটা, তুমি কী বলে চলেছ?
হেনরিয়েটা–সত্যিই এটা বিপজ্জনক, জন! তুমি ভাব সকলে তোমাকে ভালবাসে। লুসির কথাই নাও, তুমি কী মনে কর লুসি তোমাকে ভালো চোখে দেখে?
জন-লুসি আমাকে পছন্দ করে না? আমি তো তাকে একটু বেশি বোধহয় পছন্দ করি।
হেনরিয়েটা–তুমি পছন্দ করা বলে এটাই ভেবে নিয়েছ যে সেও তোমাকে পছন্দ করে। তবে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত নই, তবে জিজ্ঞাসা না করে পারি না জার্দাকে, এডওয়ার্ড, মিডগে এবং হেনরি তোমার সম্পর্কে কী ভাবে একবার বলতে পার?
জন–আর হেনরিয়েটা? সে কী ভাবে তাই কী আমার অজানা? কথা বলতে বলতে জন হেনরিয়েটার হাত চেপে ধরে এবং বলে ওঠে, তোমার সম্পর্কে আমি একেবারে নিশ্চিত।
হাত সরিয়ে নিয়ে হেনরিয়েটা বলে ওঠে, পৃথিবীতে কারো সম্বন্ধেই পুরোপুরি ভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় কী?
জনের মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। পরে বলে ওঠে, না তা একেবারেই বিশ্বাস করি না, আমি তোমার সম্পর্কে নিশ্চিত এবং নিজের সম্বন্ধেও নিশ্চিত। অন্তত–তার মুখের চেহারা, রঙ মুহূর্তের মধ্যে পরিবর্তন হয়ে যায়।
–কি হল জন?–হেনরিয়েটা জিজ্ঞাসা করে। জন বলে, তুমি জান, আমি নিজের সম্পর্কে কী বলি? সত্যি এটা একটা হাস্যকর উক্তি–আমি বাড়ি যেতে চাই। হ্যাঁ, এই কথার পুনরাবৃত্তি আমি আজও করছি। কিন্তু আমি নিজে হয়তো জানি না, যা বলছি তার মানে কী?
হেনরিয়েটা এবারে খুব ধীর-শান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, তোমার মনে হয়তো কোনো ছবি আছে?
সে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, কিছুই না, একদম সব শূন্য।
সেদিন রাতে ডিনার টেবিলে হেনরিয়েটাকে ডেভিডের পরের আসনে বসানো হয়েছিল, টেবিলপ্রান্ত থেকে লুসির যেন টেলিগ্রাফ পাঠাল–আদেশ নয়–অনুরোধ। হেনরি জার্দার সঙ্গে বসে তার না-বলা কথা বলেই চলেছে। লুসির ছাড়া-ছাড়া মনের সঙ্গে যতটা সম্ভব পাল্লা দিয়ে হাসিমাখা মুখে হাসি নিয়ে জন এগিয়ে চলেছে। মিডগের বলার ভঙ্গী ঠিক স্বাভাবিক নয়। এডওয়ার্ডকে অন্যদিনের চাইতে আজকে যেন একটু বেশি অন্যমনস্ক লাগছিল। কম্পিত হাতে রুটি নিয়ে মুখে তুলে ধরছিল ডেভিড।
ডেভিড অনিচ্ছাসত্ত্বেও হলোতে এসে হাজির হয়েছিল। হেনরি এবং লুসির সঙ্গে ভালো করে কথা পর্যন্ত সে বলেনি। এ্যাঙ্গক্যাটেল-সাম্রাজ্যকে যেমন অস্বীকার করে তেমনিভাবে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্বন্ধও সে স্বীকৃতি দিতে মানসিক দিক থেকে একদম প্রস্তুত থাকে না।
