জাদা–আমি ঠিক সে কথা বলতে চাইনি। তুমি শুধু শুধু এমন ভাবছ কেন যে
একটু থেমে থেমে সে আবার বলতে শুরু করে দিল, লন্ডন শহর থেকে বেরিয়ে পড়া খুবই সুখের এবং দয়াবতী হিসেবে লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের খুব পরিচিতি।
হেনরিয়েটাকে লুসি? তার দয়ার লেশমাত্র নেই।
জার্দা-তা কেন হতে যাবে, সে আমার প্রতি যথেষ্ট দয়াবান, আমার তো বেশ ভালোই লাগে।
হেনরিয়েটা–ভদ্রতা বলতে কোনো জিনিষ লুসির মধ্যে নেই, মহত্ত থাকলেও থাকতে পারে। অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির মহিলা হিসেবে বাজারে তার যথেষ্ট সুনাম। আমার মনে হয় । তিনি কোনোদিন সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠতে পারেননি। সাধারণ লোকের মতো চিন্তাভাবনা করার শক্তি তার নেই। এখানে আসলে তোমার যে বিরক্তির উদ্রেক করে তা আমার বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয় না জার্দা। লুসিকে তুমি ঘৃণার চোখে দেখো এটা আমি জানি। সেই জন্যই আমি তোমাকে বলেছিলাম যে, তুমি যখন আহত হও, মনে দুঃখ পাও তখন তোমার এখানে না আসাই বোধহয় যুক্তিযুক্ত।
জাদা–জন কিন্তু এখানে খুশী মন নিয়ে আসে এবং অবশ্য না এসে পারেও না
হেনরিয়েটা–জনের যখন ভালো লাগবে সে আসবে বৈকি। তুমি তাকে একাই আসতে দেবে।
জার্দা–সে তা পছন্দও করে না, আমাকে না এনে ছুটি উপভোগ করার তার কোনো বাসনা নেই। নিজের স্বার্থের ব্যাপারে সে বরাবরই উদাসীন। সে মনে করে মাঝেমধ্যে শহরের বাইরে পা রাখলে আমার স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।
হেনরিয়েটা-পাড়াগাঁয়ে আস তো ভালোই, কিন্তু এ্যাঙ্গক্যাটেলদের এখানেই যে আসতে হবে এমন কোনো কথা আছে কি?
জার্দা–আমি এ্যাঙ্গক্যাটেলদের ততটা খারাপ ভাবি না। তুমি আবার এই ভেবে বোসো না যে, আমি এতই অকৃতজ্ঞ!
হেনরিয়েটা–আমি জানি এ্যাঙ্গক্যাটেলরা সত্যি বিরক্তিকর লোক তবু এখানে আসি, আমরা একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটু আনন্দ উপভোগ করতে চাই–এই যা! যাকগে এবারে না হয় চলল, খাবারের সময়ও হয়ে গেছে।
যেতে যেতে হেনরিয়েটা একদৃষ্টে জাদার মুখের ভাব লক্ষ্য করেই পথ চলছি। হেনরিয়েটা একমনে ভাবতে থাকে, জর্দার একটা অংশ বোধহয় পৃথক হয়ে পড়েছে। তার মনে হল, জাদার চোখে মুখে শহীদের নিগ্রহ যেন সদাই ভাসমান। দেয়াল পরিবেষ্টিত বাগান পেরিয়ে আসার সময় তাদের কানে এল গুলির আওয়াজ। হেনরিয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, এ্যাঙ্গক্যাটেলদের ধ্বংস কার্য শুরু হয়ে গিয়েছে।
স্যার হেনরি ও এডওয়ার্ডের আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। গুলির শব্দ আলোচনার বাস্তব রূপায়ণ। হেনরি এ্যাঙ্গক্যাটেলদের নেশার জিনিষ ছিল আগ্নেয়াস্ত্র-মনের মতো বন্দুক পিস্তলের ভাণ্ডারও মজুত ছিল।
অনেক গুলিভরা একটা রিভলবার তিনি বার করেছিলেন এবং এডওয়ার্ড মনের সুখে একটার পর একটা গুলিবর্ষণ করে চলছিল। হেনরিয়েটাকে দেখে এডওয়ার্ড বলে উঠেছিল, চেষ্টা করে একবার দেখো না, একটা সিঁধেল চোর মারতে পারো কিনা?
হেনরিয়েটা তার হাত থেকে রিভলবার তুলে নিল এবং গুলি ছুঁড়ে বসল।
স্যার হেনরি বলে উঠলেন, জাদা, তুমি না হয় করে দেখো।
মিসেস ক্রিস্টো, এগিয়ে আসুন, এটা খুবই সোজা ব্যাপার।
চোখ বুজে গুলি ছোঁড়ে জার্দা, গুলি হেনরিয়েটাকে ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে যায়।
মিডগে বলে ওঠে, আমি একবার চেষ্টা করে দেখি।
পরপর বেশ কয়েকটা গুলি ছোঁড়ে, তারপর মুখ খোলে, তোমরা যা ভাবছ গুলি ছোঁড়া মোটেই সহজ কাজ নয়, তবে কৌতুক করার অভিপ্রায়ে এরকম এলোমেলো গুলিবর্ষণ চলতে থাকে।
লুসি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, তার পেছনে পেছনে লম্বা দেহের একজন লোক। লুসি বলে ওঠেন, এই ডেভিড।
মিডগের হাত থেকে রিভলবার তুলে নেন তিনি, এবং গুলি ভর্তি করে লক্ষ্যস্থলের পাশে ঠিক তিনটি ছিদ্র মুহূর্তের মধ্যে করে ফেললেন। উচ্ছ্বসিত প্রশংসার সুরে মিডগেবলে ওঠে, সত্যি খুব ভালো হয়েছে লুসি, আমি জানতাম না যে, গুলি ছোঁড়ার ব্যাপারে তুমি একেবারে সিদ্ধহস্ত।
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে স্যার হেনরি বলে ওঠেন, লুসি তার নিজের লোককেই মেরে বসে।
মিডগে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, কেন লুসি কী করেছিল?
ঝাকের মধ্যে দুটো গুলি ছুঁড়ে বসেছিল। আমার জানা ছিল না যে, তার কাছেও একটা পিস্তল আছে, খারাপ-স্বভাবের একটা লোক পায়ে আঘাত পেয়েছিল এবং আর একজন কাঁধে, অল্পের জন্য আমি সে-যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলাম। ভাবতেই অবাক লাগে আমি কী ভাবে মুক্তি পেয়ে গেলাম–স্যার হেনরি বলে চলেন।
লেডি এ্যঙ্গক্যাটেল মুচকি হাসি হেসে ওঠেন এবং বলেন, আমার মনে হয় সকলকেই একবার করে বিপদের ঝুঁকি নিতে হয় এবং যা কিছু করণীয় ভাবনা-চিন্তা না করেই চটপট সেরে ফেলাই ভালো।
স্যার হেনরি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, সত্যিই প্রশংসনীয় মনোবৃত্তি। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারই আলাদা। কারণ ক্ষোভ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আমার আছে, সেবারে অনায়াসেই গুলিবিদ্ধ হয়ে তোমার পাগলামির শিকার হতে পারতাম।
.
০৮.
চা পানের পর জন হেনরিয়েটার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, এসো, একটু না হয় কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসি। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন যে, জার্দাকে নিয়ে তিনি রক-গার্ডেন দেখাতে যাবেন, রক্-গার্ডেন দেখার উপযুক্ত সময় এটা নয়।
জনের সঙ্গে পথ চলতে চলতে হেনরিয়েটা ভেবে নেয় যে, জনের সঙ্গে বেড়ানো আর এডওয়ার্ডের সঙ্গে বেড়ানো মোটেই এক কথা নয়। জন্মের সময় থেকেই সে কুমোর, এডওয়ার্ডের সঙ্গে বেড়ানো কুমোরের সঙ্গে বেড়ানোরই সামিল। কিন্তু জনের সঙ্গে বেড়ানো সত্যিই ভীষণ কষ্টসাধ্য, যে-কোনো লোক খুব সহজেই হাঁফিয়ে উঠবে। জন যেন মারাথন দৌড়ে নাম লিখিয়েছে!
