“আমাদের সার্জারি করা হয়েছে।”
“সার্জারি?”
“এখানকার সবাইকে ছোটখাটো সার্জারির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। ভালো সার্জারি। এরপর চিরতরে বন্দী করে রাখা হয়। তবে জেনে অবাক হবেন, কোন ব্যথা অনুভব করি না আমরা,” এটুকু বলে কিছুক্ষণ চুপ থাকলো ইউকি। “আপনিও কি তলকুঠুরির নতুন বাসিন্দা?”
তলকুঠুরির নতুন বাসিন্দা বলতে কি বোঝাচ্ছে? জানতে চাইছে যে আমাকেও অপহরণ করে আনা হয়েছে কিনা?
“আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি আমি,” অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললাম। “হিতোমি কোথায়?”
আগে এখান থেকে বেড়াতে হবে আমাকে-এখনই। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকলে পাগল হয়ে যাবো। এখানকার অস্ফুট আঁধারে দম বন্ধ হয়ে যাবে। ওপরে আলোর স্পর্শে হয়তো কিছুটা স্বস্তি ফিরে পাবো। তখন সাহায্য নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ফিরে আসবো। শিনিচি আর ইউকির শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
“হিতোমি বাচ্চাদের ক্যারিজটায় আছে। ওটাই ওর বিছানা,” শিনিচি বললো।
অন্ধকারের দিক থেকে মনোযোগ না সরিয়ে ক্যারিজটার দিকে এগোলাম। পুরনো, ছোট্ট একটা ক্যারিজ। কাপড়গুলো মলিন হয়ে গেছে। হাতলে ঝুল। ওপরে একটা কম্বল দিয়ে ঢাকা দেয়ায় ভেতরে কি আছে দেখতে পাচ্ছি না।
কান্নার দমকে কেঁপে উঠলো আমার শরীর। হিতোমিকে যখন অপহরণ করা হয় তখন তার বয়স ছিল চৌদ্দ। এখন তার বয়স পনেরো। কোন দক্ষ অ্যাক্রোব্যাটের পক্ষেও এটুকু জায়গায় পা ভাজ করে থাকা সম্ভব না।
কাঁপা কাঁপা হাতে কম্বলটা সরালাম।
ভেতরে একটা মেয়ে ঘুমোচ্ছে। তার শরীরটা এতই ঘোট যে একহাতে ভোলা যাবে। গাল দুটো ভয়ানক রকমের ফ্যাকাসে। শিরাগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। লম্বা চুলগুলো অনেকদিন ধোয়া হয়নি।
চেহারায় আলো পড়ায় ঘুম ভেঙে গেল তার। ধীরে ধীরে চোখ খুললো। আমাকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক একটা চাহনি ভর করলো চেহারায়। যেন স্বপ্ন দেখছে এমন ভঙ্গিতে হেসে উঠলো পরমুহূর্তে।
“হ্যালো,” বললো সে।
কেঁদে ফেললাম। একটা কাপড়ের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে তার গলা থেকে শরীরের নিচের অংশটুকু।
“কে…” মিষ্টি কণ্ঠে বললো হিতোমি। “কে আপনি? আপনাকেও কি এখানে নিয়ে আসা হয়েছে?”
না। মাথা ঝাঁকালাম। বলতে ইচ্ছে করছে যে ওকে উদ্ধার করতে এসেছি, কিন্তু শব্দ বেরুচ্ছে না গলা দিয়ে।
“আপনাকেও কি গাড়িতে করে এখানে আনা হয়েছে? কালো পাখিটা দেখেছেন? এখনও স্বপ্নে মাঝে মাঝে দেখি ওটাকে।”
“হ্যাঁ, দেখেছি কাকটাকে। ছাদে বসে ছিল।”
“কি? আরে নাহ। আমি চাবির রিংয়ের কথা বলছি। গাড়ি চলার সময় দোল খায় ওটা।”
দোল খায়?
“তিনি অবশ্য নতুন একটা গাড়ি কেনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু চাবির রিংটা তো খুবই পছন্দের ছিল তার। তাই ভেবেছি নতুন গাড়িতেও একই রিং ব্যবহার করবেন।”
হিতোমিকে রেখেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার জন্যে ঘুরলাম। কিন্তু কেউ একজন নেমে আসছে সেদিক দিয়ে। সুমিদা।
“তুমি এইখানে!” বললো সে। তার সামনে গিয়ে জোরে গাল বরাবর সর্বশক্তিতে থাপ্পড় কষিয়ে দিলাম।
“এসব আপনার কীর্তি!”
একবারের জন্যেও চোখের পলক পড়লো না তার। হিতোমি যে চাবির রিংটার কথা বলছে সেটা আমিও দেখেছি। সুমিদার গাড়িতে।
.
১০
রূপকথার গল্পকার
বনের ভেতর দিয়ে আগন্তুকের পেছন পেছন ছুটছে মিকি। কিছুদূর সামনে যেতেই দেবদারু গাছগুলো চোখে পড়লো।
হঠাৎই দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল আগন্তুক। পরক্ষণে তাকে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে দেখলো সে। সামনেই একটা রাস্তা।
গাড়ির টায়ারের শব্দ কানে এলো। আগন্তুককে গুঁতো দিয়েছে গাড়িটা। একটা গাছের পেছন থেকে দৃশ্যটা দেখছে মিকি।
গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো ড্রাইভার। একজন মাঝবয়সী লোক। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলে যে কেউ আছে কিনা। এরপর গাড়িতে উঠে চলে গেল।
নিথর পড়ে আছে আগন্তুকের দেহটা।
.
১১
আমার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে হিতোমির দিকে এগোলো সুমিদা। ধীরে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে নড়ছে সে। যেন একটা বিড়াল।
পাশে সরে দাঁড়ালাম আমি।
ক্যারিজটা একবার হাত দিয়ে দোলালো সুমিদা। “কেমন আছো?” হিতোমিকে জিজ্ঞেস করলো সে।
“মোটামুটি,” চোখ বন্ধ করে জবাব দিল মেয়েটা।
“শিওজাকি তাহলে অপহরণকারী না,” বললাম আমি।
বারবার মনে হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সুমিদা। এখনও গোটা পরিস্থিতিটা পরিষ্কার না আমার কাছে। এসময় একটা কথা মনে হলো।
“আপনি জানতেন লাইটের সুইচটা কোথায়।”
অন্ধকারে অচেনা একটা বাড়িতে ঢুকেই সুইচ খুঁজে পেয়েছিল সুমিদা। এখন আর ব্যাপারটা কাকতালীয় মনে হচ্ছে না। বাড়িটা খুব ভালোমতন চেনা তার।
“কয়েকদিন আগে এখানে এসেছিলাম আমি, গত কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতন,” ক্যারিজ থেকে হাত না সরিয়েই বললো সুমিদা। ক্যাফেতে আমার সাথে যে স্বরে কথা বলে, এখনও সেভাবেই কথা বলছে সে। “তার আগে শিওজাকির কোটটা ফেরত দিতে এসেছিলাম আমরা দু’জন। ফেরার পথে কি বলেছিলে, মনে আছে?”
বলেছিলাম যে শিওজাকি দেয়াল ঠিক করার জিনিসপত্র কিনেছে। কিন্তু বাড়িটায় কোন ভাঙা দেয়াল চোখে পড়েনি আমার।
“আমিও সেটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু একটা দেয়ালে আসলেই ফাটল ধরেছিল। তলকুঠুরিটা লুকোনোর জন্যে আমার তৈরি করা দেয়ালটা। সেটা শিওজাকির চোখে পড়েছিল, কিন্তু সেটার সামনে কেবিনেট থাকায় খুব একটা মাথা ঘামায়নি।”
