“কেবিনেট?”
মাথা নাড়লো সুমিদা। “দেয়ালটা লুকোনোর জন্যে আমি কেবিনেটটা আনি এখানে। শিওজাকি জানতোও না যে একটা তলকুঠুরি আছে এই বাড়িতে। কিন্তু ভূমিকম্পের কারণে দেয়ালটায় ফাটল ধরে। ইউকির গানের আওয়াজ শুনতে পায় সে। শিওজাকি নিজেই কথাটা বলেছিল আমাকে। ইউকির সাথে কথা হয়েছে তোমার?”
ঘরের পেছন দিকটায় নির্দেশ করলো সে।
“শিওজাকি তাহলে দেখে ফেলেছিল তলকুঠুরিটা?”
সুমিদা বললো যে দেয়ালটা ভেঙে ফেলার ইচ্ছে ছিল শিওজাকির। সেজন্যেই নতুন হাতুড়িটা কিনেছিল।
“সে যেহেতু সবকিছু জেনে ফেলে, তাই ঐ অবস্থা করেছেন…” ঘরের পেছন দিকে তাকালাম আবারো। কিছু দেখতে পাচ্ছি না ঠিকই, কিন্তু শিওজাকি যে সেখানে আছে, এটা জানি।
“শিওজাকি কে?” নিষ্পাপ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো হিতোমি।
“আমি চলে যাবার পর এই বাসাটায় ওঠে যে,” সুমিদা বললো। “যাকে কয়েকদিন আগে এখানে নিয়ে এসেছি।”
“ওহ শিক কাবাব লোকটা,” যেন মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বললো হিতোমি।
তলকুঠুরির সব নিয়ম কানুনই যেন ওপরের পৃথিবী থেকে ভিন্ন। জানি এখনও অজ্ঞান হয়ে যাইনি কেন। নিচু সিলিং আর গুমোট অন্ধকারের কারণে মাথা ঘুরাচ্ছে।
“তিন দিন আগে নিজের হাতে এক বছর আগে গড়া দেয়ালটা ভাঙ্গি আমি। ভাবিনি যে তুমি এখানে নিজ থেকেই আসবে।”
এটুকু বলে আমার দিকে এক পা এগোয় সুমিদা।
“কাছে আসবেন না!” চেঁচিয়ে উঠলাম বদ্ধ ঘরটায়।
থেমে গেল সে। “
আপনি এখানে থাকতেন?”
মাথা নেড়ে সুমিদা বললো যে এক বছর আগ অবধি এখানেই থাকতো সে। এই ঘরটাতেই হিতোমির হাত পা কেটে আলাদা করা হয়।
“চলে যাবার আগে ইট দিয়ে তলকুঠুরির জানালাটাও ঢেকে দেই।”
তলকুঠুরির জানালা।
“বাইরের প্ল্যান্টারটা আপনার তৈরি করা, তাই না?”
“অনেকগুলো আগে থেকেই ছিল। আমি কেবল একটা যোগ করেছি।”
আমি যে মরা গাছগুলো দেখেছি বাইরে ওগুলো অন্য কোথাও থেকে এনে ওখানে গেড়েছিল সুমিদা। এক বছরের ব্যবধানে মরে গেছে। সবগুলো।
কিন্তু বাঁ চোখের স্মৃতিতে তো দু’মাস আগে এই বাড়িতে উঁকি দিতে দেখি আমি কাজুয়াকে। তখন শিওজাকি এখানে থাকতো? হিসেব মিলছে না।
“আপনি বলেছিলেন যে এক বছর আগে কাজুয়ার সাথে পরিচয় হয়েছিল। সেটা সত্যি?।”
“ও একজন আগন্তুক ছিল।”
“আগন্তুক?”
“যারা আমার ব্যাপারে নাক গলাতে আসে তাদের এই নামেই ডাকি আমি। মিঃ হিসামোতোও আমার পুরনো বাড়িটার আশেপাশে ছোঁকছোঁক করতো।”
“কাজুয়াকে তলকুঠুরির জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিতে দেখেন আপনি?”
“হ্যাঁ, এক বছর আগে,” মাথা নেড়ে বলে সুমিদা।
মুখে হাত চাপা দিয়ে গুঙিয়ে উঠলাম। আমার বাঁ চোখে দেখা স্মৃতিটা তাহলে দুমাস না, এক বছর আগের।
স্মৃতিটায় দেখেছিলাম কাজুয়াকে একটা গাড়ি ধাক্কা দিয়েছে। আসলে তখনই মারা যায়নি সে। কিন্তু ড্রাইভার হয়তো ভাবে যে মারা গেছে, তাই পালিয়ে যায় সেখান থেকে। স্বপ্নগুলোয় কোন শব্দ শুনতে পাই না আমি, তাই বুঝতে পারিনি।
এ কারণেই ঐ দেয়ালের ব্যাপারটা আমাকে বিভ্রান্ত করে তুলেছিল। আসলে দু’টো সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা।
আমার দিকে আরেক পা এগিয়ে এলো সুমিদা। মাথা ঝাঁকিয়ে পিছিয়ে গেলাম আমি।
“এক বছর আগে কাজুয়াকে জানালাটা দিয়ে উঁকি দিতে দেখি আমি। এর এক সপ্তাহ আগে থেকে আমার মনে হচ্ছিল যে কেউ একজন নজর রাখছে বাড়িটার ওপর। তুমি এখানে হিতোমির খোঁজে এসেছো কারণ কাজুয়া তোমাকে ওর কথা বলেছিল, তাই না?”
দু’চোখ হাত দিয়ে ঢেকে ফেললাম। তবুও তার কথাগুলো শুনতে পাচ্ছি।
“একটুর জন্যে আমার হাত ফসকে বেড়িয়ে যায় কাজুয়া। কিন্তু পালানোর সময় একটা গাড়ি গুতো দেয় তাকে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কাপুরুষ ড্রাইভারটা সে মরে গেছে ভেবে পালিয়ে যায়।”
আরেক পা এগোলো সে।
“এরপরেই সমস্যার শুরু। তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না। জ্ঞান ফিরে পাবার পর সব ভুলে যায় কাজুয়া। আমাকে বা এই বাড়িটাকে চিনতে পারছিল না। আসলে কয়েক সপ্তাহের স্মৃতি মুছে গিয়েছিল তার মাথা থেকে।”
অ্যামনেশিয়া। এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা। প্রচণ্ড ভয়ের কারণে ঠিকমতো কিছু ভাবতে পারছি না, কিন্তু এটুকু বুঝতে অসুবিধে হলো না।
“ওকে মারিনি আমি। এখানেও আনিনি।”
“কেন?”
“জানি না কেন, কিছুক্ষণ ভাবার পর বললো সুমিদা। “ঝুঁকি নিয়েছিলাম বলতে পারো।”
“এরপর আগন্তুককে ক্যাফেতে নিয়ে যান তিনি,” হিতোমি বললো প্রফুল্ল কণ্ঠে।
সাওরির সাথে সুমিদার দেখা হয় এক বছর আগে। সে ভেবেছিল মাতাল কাজুয়াকে মেলানকলি গ্রোভে নিয়ে এসেছে সুমিদা। কাজুয়ার আসলে হুশ ছিল না তখন। গোটা ব্যাপারটাই সাজানো।
এরপর কাজুয়ার সাথে বন্ধুর মত সময় কাটাতে শুরু করে সুমিদা।
আমার একদম কাছে চলে এসেছে সে। তার রোগাটে শরীরে খুব বেশি শক্তি ধরে বলে মনে হয় না। কিন্তু আমার মুখ বন্ধ করার জন্যে সেই শক্তিটুকুই যথেষ্ট।
দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা নেমে এলো তলকুঠুরিতে। শ্বাস নিতেও ভয় পাচ্ছি। সুমিদাকে ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে এখন। তার চেহারা কিন্তু ঠিকই আছে। তবে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন বিশ্লেষণ করছে কোন কিছু।
“ঐ ঘটনার পরেই এই বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে স্টেশনের পাশের ঐ অ্যাপার্টমেন্টটায় গিয়ে উঠি। এর আগে তলকুঠুরিটার ব্যবস্থা করে ফেলি অবশ্য।”
