জু

ইন আ পার্ক অ্যাট টোয়ালাইট, আ লং টাইম এগো

 

আমি যখন ইলিমেন্টারি স্কুলে পড়তাম তখন আমাদের পাড়ার ভেতর একটা পার্ক ছিল। যেহেতু এর আশেপাশে বড় বড় বিল্ডিং ছিল, তাই সন্ধ্যায় গোধলির সময়ে পার্কে ঢুকলে গাড়ির শব্দ আর লোজন এর চিল্লাচিল্লি হইচই পুরোপুরি মিলিয়ে যেত। বলা যায় পার্কটা ছিল বিশাল শহরের মধ্যে ছোট্ট এক নীরব জায়গা।

ডিনারের সময় হলে যে বন্ধুদের সাথে আমি খেলছিলাম তারা বাসায় চলে গেছিল। আমি পার্কে অপেক্ষা করছিলাম, কারন আমার বাবা-মা আমাকে নিতে আসার কথা ছিল।

দোলনায় দুলতে দুলতে বিরক্ত হয়ে গেলে আমি পার্কের কোনায় থাকা স্যান্ড বক্সে খেলতে গেলাম। জানি না কি কারনে আমি সবসময়ই ঐ জায়গাটার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করতাম। বেশিরভাগ বাচ্চারা দোলনায় দুলতে কিংবা স্লাইডে চড়তে পছন্দ করত। স্যান্ডবক্সটা বেশির ভাগ সময়ই খালি পড়ে থাকত।

দুটো বিল্ডিঙের ভেতর দিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলোটা পুরো পৃথিবীটাকে যেন লাল রঙে রঞ্জিত করে তুলেছিল। কথা বলার কেউ ছিল না বলে আমি একাই স্যান্ডবক্সে নিজের সাথে কথা বলছিলাম। আমার মনে আছে, ওখানে আমাদের খেলার জন্য হলুদ রঙের বাতিল একটা বালতি ছিল। আমি আমার জুতো জোড়া খুলে রেখে ঠান্ডা বালিতে পা দিলাম। পায়ের চারপাশে বালির ঘোট দানাগুলোর স্পর্শ আমার কাছে ভাল লাগছিল।

মাঝে মাঝে আমি আমার হাতদুটো বালির গভীরে ঢুকিয়ে দিতাম। দেখতে চাইতাম ওগুলো কত গভীরে ঢুকতে পারে। হাতগুলো সোজা ঢোকালে মোটামুটি আমার কাঁধ সমান গভীর পর্যন্ত যেতে পারতাম। বাবাকে যখন এ কথা বলেছিলাম তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি। এমনকি একটা স্যান্ডবক্সেরও শেষ আছে। এটা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?” তিনি আমাকে বলেছিলেন।

আমি ভাবতাম বাবা ভুল করছেন। বাস্তবে আমার কাছে মনে হত বালুর ঢিবিটা আসলে অতলস্পর্শী। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। অসংখ্যবার পরীক্ষা করে দেখেছিলাম সেটা।

মনে নেই ঠিক কতবার আমি এরকম পরীক্ষা চালিয়েছিলাম কিন্তু একদিন যখন সূর্যাস্তের পর পার্কের কোনার গাছটা ছায়ার মত কালো রূপ ধারন করল, আর আমি স্যান্ডবক্সে বসে আমার ডান হাতটা টানটান করে বালির ভেতর কাঁধ পর্যন্ত ঢোকালাম, তখন অদ্ভুত কিছু একটার স্পর্শ অনুভব করলাম।

মনে হচ্ছিল কিছু একটা যেন বালির ভেতর পোঁতা আছে। জিনিসটা নরম আর ঠান্ডা। আমি জানতে চাইছিলাম জিনিসটা কি, তাই আমি আমার হাত যতটা সম্ভব টানটান করলাম। বালির গভীরতায় আমার মধ্যমা কোনরকমে জিনিসটাকে স্পর্শ করতে পারছিল। নরম আর ফোলাফোলা কিছু একটা। আমি চাইছিলাম জিনিসটা ধরে টেনে বের করে নিয়ে আসতে কিন্তু সেটা বার বার আমার হাত থেকে ছুটে যাচ্ছিল।

বালির ভেতর থেকে হাত বের করে আনার পর দেখলাম আঙুলের সাথে কয়েকটা চুল আটকে আছে। চুলগুলো ময়লা আর বালিতে থেকে নষ্ট হয়ে গেলেও বুঝতে পারছিলাম ওগুলো কোন মেয়ের চুল।

আরো কয়েকবার আমি আমার হাত ঢুকিয়ে ওখানে যে জিনিসটা পোঁতা আছে তা ছোঁয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আর খুঁজে পেলাম না। খুঁজে না পেয়ে আমার মন খারাপ লাগছিল।

সেদিনের সেই গোধূলি বেলায় পৃথিবী যখন লাল রঙ ধারন করেছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল চারপাশের বিল্ডিংগুলো ভুতের মত নড়াচড়া করছে। মনে হচ্ছিল যেন আমি বড় কোন খাঁচার ভেতর রয়েছি, শুধু আমি আর স্যান্ডবক্সটা।

আবারো হাত বালির গভীরে ঢুকিয়ে আমার মনে হল কিছু একটা স্পর্শ করতে পারছি। খুব হালকা, মনে হচ্ছিল যেন একটা ছোট মাছ আমার আঙুলের মধ্যে নড়াচড়া করছে।

হঠাৎ করে বালির ভেতর কিছু একটা শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরল। আমি টেনে আমার হাত বের করে আনার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। মনে হচ্ছিল হাতটা ঐ জায়গায় আটকে গিয়েছে। আশেপাশে কেউ ছিল না যে আমি চিৎকার করে সাহায্য চাইব। এমনিতে চিল্লালেও আমার কণ্ঠ শুধু পার্কের মধ্যে প্রতিধ্বনি তুলত, কেউ শুনতে পেত না।

বালির গভীরে কিছু একটা জোর করে আমার মুঠি করে রাখা হাতটা টেনে খুলল। হাতের তালুতে আমি আঙুলের ডগার মত কিছু একটা অনুভব করলাম। সেটা তালুর উপর একটা নিয়মিত প্যাটার্নে ঘুরতে লাগল, আমি নিশ্চিত ছিলাম কিছু একটা লেখা হচ্ছে। ওটা লিখল:

“আমাকে এখান থেকে বের কর।”

কেউ একজন আমার হাতের তালুতে এই কথাটা লিখেছিল। আমি আমার অন্য হাতটা বালির ভেতর ঢুকিয়ে হাতের তালুর পেছনে লিখলাম, “পারছি না।”

সাথে সাথে আমার হাত আলগা হয়ে গেল। একটা স্রোতের মত বিষণ্ণতা এসে আমার উপর আছড়ে পড়ল। আমি আমার দুহাত বালি থেকে বের করে বাসায় ফিরে গেলাম।

এরপর আমি ঐ স্যান্ডবক্সটা থেকে দূরে থাকতাম। পরে নতুন বিল্ডিং বানানোর জন্য পার্কটা খুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। আমি তখন স্যান্ডবক্সটা দেখার জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। বাবা ঠিকই বলেছিলেন, জায়গাটা মোটেও গভীর ছিল না। ওখানে কোন কিছু পোঁতা থাকা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না।

ইন আ ফলিং এয়ারপ্লেন

“আশা করছি আমার প্রশ্নের জন্য কিছু মনে করবেন না, মিস, কিন্তু আপনি কি নস্ট্রাডামুস এর ভবিষত্বাণীর ব্যাপারে কিছু জানেন?

আমি তখন জানালা দিয়ে বাইরের মেঘ দেখছিলাম। চোখ সরিয়ে এনে আমার পাশে বসে থাকা লোকটার দিকে তাকালাম। তার পরনে ম্যাটম্যাটে ধূসর বর্ণের সুট। আর চেহারাটা একদম বৈশিষ্ট্যহীন। শহরের রাস্তায় বের হলে এরকম লোক প্রচুর দেখা যায়। লোকটার বয়স ত্রিশের মত হবে, তারমানে আমার মতই বয়স।

“ভবিষ্যৎবানী? আপনি বলতে চাইছেন ওই যে ১৯৯৯ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে ওই ধরনের কিছু?”

লোকটা মাথা ঝাঁকাল।

“হ্যাঁ, ওসব জানি,” আমি বললাম। “যখন ছোট ছিলাম তখন এসব নিয়ে অনেক হৈচৈ হত। কিন্তু..মাফ করবেন,” সিট আর মাঝের করিডরের দিকে চোখ বুলিয়ে বললাম আমি, “আপনার কি মনে হচ্ছে না এরকম কিছু নিয়ে কথা বলার জন্য এখন সময়টা আসলে ঠিক নয়?”

“আসলে ঠিক করে বললে এই সময়টার কারনেই আমি বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাইছি।”

আমাদের সারিতে তিনটা সিট। এক জনের জন্য একটা করে। আমি বসেছিলাম জানালার পাশের সিটে। লোকটা বসেছিল মাঝখানের সিটটাতে। করিডরের সাথের সিটটা খালি ছিল।

“এটা কি কোন ধরনের খাতির জমানোর চেষ্টা নাকি?”

“একদমই না। আমি বিবাহিত,..যদিও আমার স্ত্রী আর আমি এখন আর একত্রে বসবাস করছি না,” লোকটা কাঁধ ভাগ করে বলল। “নস্ট্রাডামুসের কথা যেটা বলছিলাম। উনার ভবিষৎবাণীর উপর আমার অনেক বিশ্বাস ছিল। আমি আসলেই বিশ্বাস করতাম যে ১৯৯৯ সালে মানবজাতি ধুয়ে মুছে বিলিন হয়ে যাবে। আমার মনে হয়েছিল আমি নিজেও বাঁচব না।”

“আমারও তাই,” আমি বললাম। “হাইস্কুলে পড়ার সময় নস্ট্রাডামস সম্পর্কে জানতে পারি। উনার ভবিষ্যত্বাণী শুনে এতটা আতংকিত হয়েছিলাম যে রাতে ঘুমাতে পারতাম না। সত্যি সত্যি মনে হয়েছিল যে আমি মারা যাব, আমার বাবা-মা মারা যাবেন। এর আগ পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল মৃত্যু খালি অন্য মানুষদের হয়। কিভাবে ১৯৯৯ সালে আমার বয়স একুশ হবে তা নিয়ে খালি ভাবতাম আমি।”

লোকটা কাঁধ সোজা করে তাকাল। চোখে অবাক দৃষ্টি। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পুরোপুরি কুইজ শো এর হোস্টদের মত।

“তারমানে আপনি আমার বয়সি। একই স্কুল ইয়ার।”

“তাই বুঝি? একুশের পর জীবন নিয়ে আমার কাছে কোন প্ল্যান ছিল না।”

“কিন্তু শেষ তো হয়নি নাকি? পৃথিবীর কথা বলছি। হতে পারে অতিপ্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি কিন্তু তখন থেকে আমার মনে হয় আমাকে হয়ত অতিরিক্ত কিছু সময় দেয়া হয়েছে আরো কয়েক বছর বাঁচার জন্য।” লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, গলা ভারি শোনাল। আমরা প্লেনের সবচেয়ে পেছনের সারিতে বসে আছি। আমার বাম পাশের জানালা দিয়ে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছিল। নিচে ঘন সাদা মেঘ, ভেড়ার লোমের মত ঘন। বেশ শান্তিময় একটা দৃশ্য, স্বর্গের দৃশ্য ঠিক যেমনটা হতে পারে বলে আমি কল্পনা করেছিলাম।

“ব্যাপারটা একটু ক্লান্তিদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে,” লোকটা মলিন হেসে বলল। আমরা সামনের দিকে ঝুঁকে সিটের পেছনে লুকিয়ে ছিলাম। কাঁধের সাথে কাঁধ লাগিয়ে নিচু গলায় কথা বলছিলাম। দেখে মনে হতে পারে কোন বয়স্ক দম্পতি, চাইলেও যাদের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই।

“আমার মনে হয় না এছাড়া আমাদের আর কিছু করার আছে।”

লোকটা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল আর দুই সিটের মাঝখানের ফাঁকে মুখ চেপে ধরল যাতে করিডর দেখা যায়, যেটা আসলে দৃষ্টিকোনের কারনে সম্ভব হচ্ছিল না। এ অবস্থায় সে আমাকে বলল, “আমি অনেক দিন থেকেই আসলে কথাটা ভাবছি, এই প্লেনে ওঠার অনেক আগে থেকেই। নস্ট্রাডামুসের ভবিষ্যত্ববানী মিথ্যা প্রমানিত হওয়ার পর ১৯৯৯ থেকে যেসব নতুন শিশুর জন্ম হয়েছে তারা মৃত্যু নিয়ে কি ভাবে? আমি একদম নিশ্চিত যে মৃত্যুর ব্যাপারে তাদের ধারণা আপনার আমার থেকে আলাদা। যারা ১৯৯৯ এর আগে জনুগ্রহন করেছিল তাদের মাথার উপর ওই ভবিষ্যত্ববানী খড়গের মত ঝুলছিল। আমাদের উপর অভিশাপের ছায়া ফেলছিল। এমনকি যেসব শিশু-কিশোর ব্যাপারটা বিশ্বাস করত না, তাদের মনেও কিছুটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু এখনকার বাচ্চারা একদম আলাদা। দুনিয়া ধ্বংস হয়ে গেল কিনা কিংবা তারা মারা যাবে কিনা এসব নিয়ে তাদের মনে কোন চিন্তা নেই।”

“আপনার তাই মনে হয়?” আমি বললাম। “নস্ট্রাডামুসকে বাদ দিলেও আরো হাজারটা জিনিস আছে যার কারনে ওদের মনে ধ্বংস কিংবা মৃত্যুর চিন্তা আসতে পারে। প্রতিদিনই গাড়ি দুর্ঘটনা হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগও আগের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। আমার অন্তত তাই ধারণা।”

লোকটা বড়জোর এক সেকেন্ডের জন্য আমার দিকে তাকাল।

“আপনার যুক্তি বুঝতে পারছি। হয়ত ঠিকই বলছেন।” সে আবার তার মুখ সিটের ফাঁকে চেপে ধরল সামনে দেখার জন্য। মুখে তখনো মলিন হাসি। প্লেনটা একটু কাত হল। একই সময়ে আমরা একটা ক্যান গড়ানোর শব্দ পেলাম। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই এরকম হচ্ছে। প্রতিবার প্লেনটা কোনদিকে একটু কাত হলেই একটা ক্যান সামনে পেছনে গড়াগড়ি করছে।

“কখনো কল্পনাও করিনি যে কোন প্লেন ক্রাশে আমার মৃত্যু হবে। আপনি করেছেন? আর ঘণ্টা খানেকের মধ্যে এই প্লেনটা কোথাও আছড়ে পড়বে। আপনার কি মত?”

“হ্যাঁ, ভয়ের ব্যাপার। এখনো অনেক কিছু বাকি আছে যা আমি করতে চাই। প্লেন ক্রাশে মৃত্যু…নাহ…এখনো বিশ্বাস ক ব্যাপারটা।”

আমি কাঁধ যাগ করে মাথাটা একটু তুললাম যাতে সিটের উপর দিকে সামনে কি হচ্ছে তা দেখতে পারি। নিউ ইয়ার কিংবা ওবনের (জাপানি বুদ্ধিস্ট অনুষ্ঠান) সময় হলে প্লেন ভর্তি থাকত। কিন্তু বছরের এই সময়ে প্লেনের মাত্র অর্ধেকের মত ভর্তি ছিল। হাতে পিস্তল করিডোরে নিয়ে একজন হাইজ্যাকার দাঁড়িয়ে আছে।

***

আধঘণ্টা আগে প্লেনটাকে হাইজ্যাক করা হয়েছে। টেক অফের কিছুক্ষণ পরই। অল্প বয়সি এক যুবক, দেখে মনে হয় কলেজের ছাত্র, প্লেনের সামনের দিকে বসে ছিল। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে লাগেজ ব্যাক থেকে কিছু একটা বের করতে থাকে। কেবিন ক্রু তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে বসতে বলে। ছেলেটা ব্যাগ থেকে পিস্তলের মত কিছু একটা বের করে মেয়েটার বুকে চেপে ধরে।

তারপর অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকে, যেমন “ব্যাপারটা ভুলে যাও, ভুলে যাও। আমাকে ভুলে যাও। আমাকে ভুলে যাও।”

ছেলেটা রঙ ওঠা পুরনো ময়লা একটা সোয়েটার পরে ছিল। তার উপরে একটা সাদা কোট। চুলগুলো কোঁকড়া। মাঝখানের এক ফালি চুল এন্টেনার মত খাড়া হয়ে ছিল। পিস্তল ধরা হাতটা কাঁপছিল। সত্যি বলতে কি পিস্তলটা দেখে আমার কাছে মনে হচ্ছিল নকল, মনে হচ্ছিল ওয়াটার গান ধরে আছে।

“ভুলে যেতে পারব না, এটাই আমার চাকরি। আমাকে আমার কাজ করতে হবে,” ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট পিস্তলের ব্যারেল উপেক্ষা করে বলল। মনে হয় মেয়েটাও আমার মত পিস্তলটাকে খেলনা ভেবেছিল। ছেলেটা পিছিয়ে গেল। মনে হল সিটে বসতে যাচ্ছে।

ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট সামনে এগিয়ে গেল যেন ছেলেটার সাথে জিতে গিয়েছে। নিজেকে কি মনে করেন আপনি? সিট বেল্ট বেঁধে রাখার সাইন এখনো অন। আপনি কি ভেবেছেন এখন সিট ছেড়ে উঠলে কি আসে যায়? আর এসব কি পোশাক? মাঝে মধ্যে দু-একটা ফ্যাশন ম্যাগাজিন তো খুলে দেখতে পারেন, নাকি? কি জঘন্য অবস্থা!”

বাকি সব যাত্রি ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টকে ছেলেটাকে ঝাড়তে দেখে মজা নিচ্ছিল। ছেলেটা লজ্জায় মাথা নিচু করে নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর পিস্তলটা কেবিন অ্যাটেন্ডেন্টের দিকে তাক করে ট্রিগার টেনে দিল। শুকনা একটা ধপ শব্দ হল আর মেয়েটা কলাগাছের মত করিডোেরে পড়ে গেল। যাত্রিদের হাসি হাসি মুখ মুহূর্তেই হাঁ হয়ে গেল। তাদের কিছুই করার ছিল না হাঁ করে দেখা ছাড়া। অপরিচ্ছন্ন পোশাক পড়া ছেলেটা করিডোর দিয়ে ককপিটের দিকে এগিয়ে গেল।

যাওয়ার সময় সে বলতে লাগল, “কেউ নড়বেন না, প্লিজ। যে নড়বেন তাকে আমি গুলি করব। পাইলটের সাথে আমার কিছু কথা আছে। আপনাদের সাথে এরকম করতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত।”

সে সামনে পেছনে কয়েকবার তার মাথা ঝাঁকাল। আর হাঁটার মধ্যেও কেমন একটা অদ্ভুত নার্ভাস ভঙ্গি ছিল। প্লেনের সামনের দিকে বসা একটা লোক উঠে দাঁড়াল। সুন্দর একটা সুট পড়া সুদর্শন এক যুবক।

“এক মিনিট দাঁড়াও!” লোকটা গম্ভীর গলায় আদেশের সুরে বলল। ছেলেটা থামল, ওকে হতভম্ব দেখাচ্ছিল।

“কি..?”

“এটা মজা করার কোন ব্যাপার না। খেলনা দিয়ে স্টুয়ারডেসকে ভয় দেখাচ্ছিলে আর সেজন্য ক্ষমা চাওনি?”

“যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু কিছু আসে যায় না,” ছেলেটা বলল। “আপনার সুটটা দারুণ। বাজি ধরে বলতে পারি আপনি ভাল কোন কলেজে পড়েছেন। পাশ করার পর ভাল চাকরি করছেন, ওর গলায় ঈর্ষা।

“ঠিকই ধরেছ। আমি টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়।”

ছেলেটা পিস্তল তুলে লোকটাকে গুলি করল। তারপর যাত্রিদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল আর কেউ টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে কিনা। কেউ হাত তুলল না। ছেলেটা ঘুরে ককপিটে ঢুকে গেল। ছেলেটা অদৃশ্য হতেই কেবিনের যাত্রিদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। কিছুক্ষনের মধ্যেই ছেলেটা ফিরে এলে আবার সবাই চুপ হয়ে গেল।

“সবাই শুনুন প্লিজ। আমি জানি আপনারা কেউ কেউ হয়ত বাড়িতে ফিরছেন অথবা কোথাও ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন। কিন্তু দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে আমি এই ফ্লাইটের গন্তব্য বদলে দিয়েছি। হানেদা এয়ারপোর্টের বদলে আমরা এখন যাচ্ছি টি-বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র হলগুলোর দিকে।”

এক মুহূর্তের জন্য থেমে সে সবাইকে কথাগুলো হজম করার সুযোগ দিল। তারপর আবার শুরু করল। “আর দেড় ঘন্টার মধ্যে আমরা ক্যাম্পাসের বিল্ডিংগুলোর উপর ক্রাশ করব। আমি আপনাদেরকে আমার সাথে মৃত্যুবরণ করার জন্য আহবান করছি। প্লিজ। পর পর পাঁচ বার আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছি। মৃত্যুবরণ করা ছাড়া আমার সামনে আর কোন পথ খোলা নেই।”

কলেজের ছাত্রর মত দেখতে ছেলেটা আসলে কলেজের ছাত্র ছিল না। সে ছিল বেকার আর মরিয়া। আর আমরা, যাত্রিরা ওর আত্মহত্যার প্ল্যানে আটকা পড়েছি।

***

আরেকবার গুলির শব্দ হলে আমি আর ধূসর সুটের লোকটা এক সাথে করিডরের দিকে তাকালাম। ছেলেটা বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে। সামনে একটা লাশ পড়ে আছে। আমি বললাম কেউ নড়বেন না! তারপরেও কেন নড়ছেন?!”

গুলির শব্দে হাত দিয়ে কান ঢাকা যাত্রিদের প্রতি ক্ষমা প্রার্থনা করল সে। সযোগ আছে ভেবে কয়েকজন যাত্রি সিট থেকে পেছন থেকে আক্রমণ করার চিন্তা করেছিল। ছেলেটার চেহারার অধৈর্য অভিব্যক্তি যেন বলছিল, “চেষ্টা করেই দেখুন খালি!” দেখে মনে হচ্ছিল ছেলেটাকে কাবু করা সহজ কাজ হবে। এমনকি আমিও, যার শরীরে শক্তি কম, আমারও ইচ্ছা করছিল একবার চেষ্টা করে দেখতে। ছেলেটার মধ্যে কিছু একটা ছিল যা দেখে মনে হচ্ছিল সে জীবনের সব আশা ছেড়ে দিয়েছে।

কিন্তু তারপরেও, ছেলেটাকে ধরার জন্য যে কয়জন চেষ্টা করেছিল তাদের সবাইই কেবিনে গড়াতে থাকা একটা খালি ক্যানে পিছল খেয়ে পড়ল। তারপর ছেলেটা গুলি করে তাদের নড়াচড়া পুরোপুরি থামিয়ে দিল।

ক্যানটা কেবিনের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত গড়াতে থাকল। একবার একজনের পায়ের নিচে পড়লে ছিটকে গিয়ে আবার অন্য কোথাও গিয়ে পড়ত।

“ছেলেটা আসলে বেশ লাকি,” আমার পাশের লোকটা বলল। এখনো সিটের পিছনে লুকিয়ে আছে। প্রায় সব যাত্রিই সিটের পেছনে মাথা নিচু করে রেখেছে। যদি কোনভাবে কোন বুলেট ছিটকে গিয়ে লাগে এই ভয়ে।

“সবার পা গিয়ে কেন ওই শালার খালি ক্যানটার উপরই পড়ছে? সবাই বোধহয় তাদের প্ল্যান নিয়ে এতটাই মগ্ন যে পা কোথায় ফেলছে সেদিকে খেয়াল নেই।”

হাইজ্যাকার যদি এই আলোচনা শুনতে পায় তাহলে আমাদেরকে কি বলতে পারে সে ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই। তবে আমি নিশ্চিত যে যতক্ষণ আমরা সিটের পেছনে আমাদের মাথা নিচু করে রাখছি ততক্ষন তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে না।

“আমার মনে হয় শুধু যাদের পা নেই তারাই খালি ক্যানে পা ফেলবে না,” লোকটা মন্তব্য করল। “যেমন ভুত। কিন্তু তবুও আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, এই ছেলে আমাদেরকে জোর করে ওর সুইসাইড ট্রিপে নিয়ে যাচ্ছে।”

“আপনার কি মনে হয় এই প্লেন সত্যি ধসে পড়তে যাচ্ছে?”

“গল্প-উপন্যাস হলে কোন এক একশন হিরো এসে পরিস্থিতির দখল নিত।”

“আপনি বলতে চাইছেন সে আমাদেরকে রক্ষা করত?”

বলতে গেলে, যদি কোন ছোট গল্পের বইয়ের শেষটা তাড়াহুড়া করে লিখতে হয় তাহলে এরকমই সমাপ্তি হওয়া উচিত। আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে আমরা সবাই ক্রাশ করতে যাচ্ছি। টি-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল্ডিংগুলো আজ ভয়াবহ আতংকের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।”

লোকটা তার তর্জনী কপালে ঠেকিয়ে এদিক ওদিক মাথা নাড়াল যেন শোক প্রকাশ করছে। নাটুকে অঙ্গভঙ্গি। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই প্লেনে চড়ার পেছনে আমার অন্য একটা কারন আছে। আর সেটা হাইজ্যাক হওয়া নয়।

প্লেন ক্রাশ করে মরার আইডিয়াটা আমার পছন্দ হল না। একদম ছোটবেলা থেকে পুরোটা জীবন ভেবে এসেছি শান্তির সাথে মৃত্যুবরণ করব। আকাশে কখনো তারা খসে পড়তে দেখলে আমি কখনো সুখি বৈবাহিক জীবন কিংবা সফল ক্যারিয়ার চাইনি। বরং আমি চেয়েছি আমার মৃত্যু হোক ঘুমের মধ্যে।

“মরতে যাচ্ছি এই চিন্তাটা আমার কোনভাবেই হজম হচ্ছে না, আমাদের কি কিছুই করার নেই?”

“জানি কি বলতে চাইছেন। যে মুহূর্তে আমরা হিট করব, বর্ণনাতীত ব্যথা অনুভূত হবে। আমাদের হাড়গুলো ভেঙে গুঁড়ো গুড়ো হয়ে যাবে। শরীরের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসবে, আগুনের শিখা আমাদেরকে খেয়ে ফেলবে। পুরোটাই জঘন্য ব্যাপার।”

“তরও অন্তত আশা করছি তাড়াতাড়ি মরব…”

“সেটা তো সহজ!” লোকটা উৎসাহের সাথে বললেও গলার স্বর নিচু রাখল যাতে হাইজ্যাকার শুনে না ফেলে। “তাড়াতাড়ি মরতে চাওয়া কোন সমাধান না। কে জানে কপালে কি আছে? ও যদি কোন ভুল করে আমরা হয়ত তাহলে বেঁচে যেতেও পারি। কিংবা হয়ত ডালপালায় ঝুলে থেকে নাড়িভুড়ি বের হয়ে কয়েক ঘন্টা ভুগে ভুগে মরব।”

হঠাৎ আমার চোখের সামনে আমার মৃত্যুদশা ভেসে উঠল মনে হল। কষ্টে মোচড়াচ্ছি, বমি বমি ভাব হচ্ছে, আর বগল ঘামে ভিজে আছে।

“আমার ক্ষমতার মধ্যে থাকলে, আমি অবশ্যই শান্তিময় মৃত্যু বেছে নিতাম।”

আমার অধৈর্য বিড়বিড় শুনে লোকটা আঙুল দিয়ে এমনভাবে ঠকঠক শব্দ করল যেন ছেলেটা শুনতে না পায়।

“এই কথাগুলো শোনার জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম।” সে বলল।

আমি একটু সরে বসলাম।

“কি বলতে চাইছেন? আঙুল দিয়ে তবলা বাজাচ্ছেন যেন খুব ফুর্তিতে আছেন? কমন সেন্স না থাকারও একটা লিমিট আছে!”

“মাফ করবেন। আমি বোধ হয় আপনাকে এখনো বলিনি, আমি একজন সেলসম্যান।”

লোকটা তার সুট এর পকেট থেকে কিছু একটা বের করল। তারপর মুখটা আমার কাছে আনল।

“এটা দেখুন।”

লোকটার হাতে একটা ছোট সাইজের হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ, ভেতর স্বচ্ছ কোন তরল ভরা।

“এটার একটা শট নিলে যে কেউ কষ্টবিহীন মৃত্যুবরণ করবে। আমার কাছে আর এই একটাই আছে। আপনি কি কিনতে চান?”

কেউ একজন সিট থেকে উঠে অল্পবয়সি ছেলেটার থেকে পিস্তলটা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করল। তারপর আমাদের কানে খালি ক্যানটা নড়ার শব্দ এল। তারপর গুলির শব্দ।

“আপনি বলছেন সিরিঞ্জের ভেতরের ডাগটা ইয়থানাসিয়া? যন্ত্রণাবিহীন মৃত্যু দিতে পারবে?”

“ঠিক তাই। আপনি যদি প্লেন ক্রাশ করার আগেই এই ইনজেকশনটা গ্রহণ করেন তাহলে কোন ভয়, কোন অনুভূতি ছাড়াই মৃত্যুবরণ করতে পারবেন। কিন্তু যদি কিনতে চান তাহলে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

“কেন?”

“কারন ডাগটা কাজ করতে আধা ঘন্টার মত সময় লাগে। যদি ধরে নেই প্লেন ক্রাশ করার আগে আমাদের হাতে এক ঘন্টার মত সময় আছে তাহলে আপনার হাতে ত্রিশ মিনিটের মত সময় আছে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। নাহলে ডাগটা ঠিক মত কাজ করবে না, আর আপনিও অন্য জগতে যাওয়ার আগে টি-বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখা পাবেন। সুতরাং সময় নষ্ট করবেন না।”

“আপনি আসলে কে বলুন তো? আজরাইল নাকি?”

“আমি সেফ সাধারণ একজন সেলসম্যান। আপনার নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে ভেবে যে কেন আমার কাছে একটা ইয়থানাসিয়া ডাগ আছে? আচ্ছা, এখন আপনাকে বলতে আমার কোন আপত্তি নেই। আমি আসলে আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা করছিলাম।”

হাইপোডারমিক সিরিঞ্জটা স্যুটের পকেটে রেখে লোকটা দূরে কোথাও তাকিয়ে নিজের গল্প বলা শুরু করল।

“একদম ছোট থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল একজন সেলসম্যান হব। স্বপ্নটা একটু অদ্ভুত, জানি। আমার শিক্ষকরাও আমাকে তাই বলেছিলেন। এর মধ্যে আকর্ষণটা কোথায় তা আপনি জানতে চাইতে পারেন। আমি শুধ বলতে পারি সেটা হল লোকজনের সাথে কথা বলার মধ্যে, তাদের কাছে। দরাদরি করে প্রোডাক্ট বিক্রি করার মধ্যে।”

“আপনার স্বপ্ন তাহলে সত্যি হয়েছে, আপনি তো এখন একজন সেলসম্যান।”

লোকটা মাথা ঝাঁকাল, কিন্তু মুখে হাসি নেই।

“কিন্তু সত্যি কথা হল, এই কাজের জন্য আমার কোন মেধা নেই। দশ বছর হয়ে গেল সেলসম্যান হিসেবে কাজ করছি, কোন উন্নতি দেখছি না। আমার পরে যারা শুরু করেছিল তারাও এখন আমার চেয়ে ভাল অবস্থানে আছে। কোম্পানিতে আমার অবস্থান এখন মাত্র স্কুল থেকে বের হয়ে নতুন চাকরি পাওয়া একজনেরও নিচে। আমার স্ত্রী আমার উপর আশা ছেড়ে দিয়েছে। সে আমাকে ছেড়ে এখন টোকিওতে নিজের বাবা-মা এর সাথে গিয়ে থাকছে।”

“তারমানে আপনার মনে হচ্ছে যে আপনার জীবন ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, যে কারনে আপনার উচিত আত্মহত্যা করা?”

লোকটা মাথা ঝাঁকাল।

“আমাকে বোঝে এমন একজনের সাথে কথা বলেছি। সে একজন ডাক্তার। তার কাছ থেকে অনেক টাকা দিয়ে এই ইয়থানাসিয়া ডাগ কিনেছি।

“কি ধরনের জঘন্য ডাক্তার হলে এমন কাজ করতে পারে?

“খুবই বয়স্ক আর খানিকটা ভ্রু ঢিলা ধরনের ডাক্তার হলে। ভাগটা হাতে পাওয়ার পর আমি এই প্লেনে চড়ে আত্মহত্যা করার জায়গাটায় যাচ্ছিলাম।”

“ও আচ্ছা আপনার প্ল্যান ছিল অন্য কোথাও গিয়ে আত্মহত্যা করার?”

“হ্যাঁ আমার প্ল্যান ছিল আমার শ্বশুরবাড়ির দরজার সামনে বসে আত্মহত্যা করার। আমার স্ত্রী বাসা থেকে বের হয়ে আমার মৃতদেহে পা বেঁধে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এরকম একটা দৃশ্য আমার চোখে ভাসছে। ব্যাপারটা ওর জন্য কঠিন শক হবে। আর ও বিশাল রকমের ঝামেলাতেও পড়বে। ওর প্রতিবেশীরা যে ওকে আর আগের মত পছন্দ করবে না, তা আমি বাজি ধরে বলতে পারি।”

“কি ভয়াবহ!”

“আপনার সমালোচনা বরং আপনার কাছেই রাখুন। এদিকে আমার প্ল্যান মাঠে মারা গেল এই হাইজ্যাকিঙের জন্য। তাই ভাবছিলাম আপনি আমার ইয়ুথানাসিয়া ডাগটা কিনবেন কিনা। সেলসম্যান হিসেবে মৃত্যুর আগে আমার শেষ ইচ্ছা হল কারো কাছে কিছু একটা বিক্রি করতে পারা। আপনি আমার কাছ থেকে ডাগটা কিনলে আমিও শান্তি নিয়ে মরতে পারি।” সে দুঃখী দুঃখী চোখে বলল। বৃষ্টিতে ভেঁজা কুকুরের চোখে যেরকম দৃষ্টি থাকে।

আমি এক মিনিট চিন্তা করলাম। আইডিয়াটা খারাপ না কিন্তু। “কিন্তু ডাগটা নিশ্চয়ই অনেক দামী? কত?”

“আপনার পার্সে কত আছে?”

সিট থেকে মাথা না হলে আমি হ্যান্ডব্যাগ থেকে ওয়ালেটটা বের করলাম। তারপর খুলে লোকটাকে দেখালাম আমার কাছে কত আছে।

“তিনটা দশ হাজার ইয়েনের নোট আর কিছু ভাংতি। একটা ব্যাংক কার্ড দেখতে পাচ্ছি। একাউন্টে কত আছে?”

“প্রায় তিন মিলিয়ন ইয়েনের মত।”

“তারমানে সব মিলিয়ে তিন মিলিয়ন ত্রিশ হাজার ইয়েনের মত দিতে পারবেন।”

“এত্ত দাম! আমার সর্বস্ব চলে যাবে।”

“আপনি তো এসব নিয়ে কবরে যেতে পারবেন না। ভেবে দেখুন। আপনার ব্যাংক কার্ড আর পিন নাম্বারটা দিন।”

“দাঁড়ান দাঁড়ান, এক মিনিট। আপনি আর হাইজ্যাকার একসাথে কাজ করছেন তাই না? আপনাদের ধান্দা হল প্লেন হাইজ্যাক করে এই ডাগ বিক্রি করে টাকা পয়সা কামানো।”

সেলসম্যান নাক টেনে শব্দ করল। “আপনার ধারণা জালিয়াতি করার জন্য আমি এইসব খুনাখুনি করছি?” থুতনি নাড়িয়ে করিডোরে পড়ে থেকে এয়ারহোস্টেসের দিকে ইঙ্গিত করল।

“ঠিক আছে, আপনাকে বিশ্বাস করছি। কিন্তু তারপরেও আমার ধারণা একটা হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ এর জন্য সর্বস্ব দিয়ে দেয়া বেশিই হয়ে যাচ্ছে। আমি আপনাকে দশ হাজার ইয়েন দিব। সেটাও আমার কাছে অনেক বেশি মনে হচ্ছে।”

সত্যি বলতে কি আমি ডাগটা চাই। আমি যদি সত্যি সত্যি মরার মুখে থাকি তাহলে এখন এসব টাকা আমার কাছে স্রেফ কিছু কাগজ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর লোকটাকে ব্যাংক কার্ড দিলেও সে টাকা তুলতে পারছে না, সে-ও তো একসাথেই মরবে। ও আর আমি তো একই প্লেনেই বসে আছি যেটা ক্রাশ করতে যাচ্ছে। এই ভাগ্য এড়ানোর কোন উপায় নেই। কিন্তু আমি জিদ ধরে থাকলাম।

“আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? তিন মিলিয়ন ত্রিশ হাজার ইয়েন! খুবই বাড়াবাড়ি।”

“এরকম একটা সময়ে আপনি দাম নিয়ে মুলোমুলি করছেন? আমি যদি এই জিনিস এখন দশ হাজার ইয়েনে বিক্রি করি তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে? পরের জন্মে আর জেগে উঠতে পারবে?”

“আপনার আত্মার কথা জানি না,” আমি বললাম, “কিন্তু আমার পুরো জীবন চলেছে লোকজনকে দাম কমানোর কথা বলে। দিনের পর দিন আমি সবজির দোকানে কিংবা মাছের দোকানে গিয়ে লোকজনের সাথে দাম কমানো নিয়ে মুলোমুলি করেছি। এখানেই আমার আনন্দ। আমি বলতাম বাঁধাকপিতে পোকা, কিংবা মাছটা একটু নরম হয়ে গিয়েছে। কোন না কোন একটা খুঁত ধরে আমি একটু সস্তায় কেনার চেষ্টা করতাম। পুরো দিনের মধ্যে ওই একটা সময়েই আমার যা একটু মানুষের সাথে যোগাযোগ হত।”

“কি দুঃখজনক জীবন। আপনি যেখানে কাজ করেন সেখানে কারো সাথে কথা বলেন না?”

“না, একদমই না। আমি একটা মাঙ্গা ক্যাফেতে পার্টটাইম কাজ করি। কেউ আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে আমি তাকে উপেক্ষা করি। আমি ওই ধরনের মানুষ যারা সবসময় অন্যদের ভয় পায়। সেজন্যই একা থাকি, বিয়েও করিনি।”

“কি নিদারুন অপচয়! আমার বলা হয়ত ঠিক হচ্ছে না কিন্তু আপনি দেখতে খারাপ নন। আপনার ফিগার…”

“জানি।”

“আমি জানি আমার বলা ঠিক হয়নি।”

“কিন্তু আমি কিছু ট্রমায় ভুগেছি যে কারনে লোকজনের সংস্পর্শে ভয় পাই। স্পষ্ট করে বললে পুরুষদের ক্ষেত্রে। অনেক বছর আগে এক লোক আমার সাথে কিছু খারাপ কাজ করেছিল।”

“খারাপ কাজ?”

“হ্যাঁ, যে রকম খারাপ কাজের কথা কেউ লেখার আগে দুইবার ভাববে।”

লোকটা একথা শুনে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। আমি নিচু গলায় তাকে জানালাম হাইস্কলে থাকতে আমার

লে থাকতে আমার সাথে কি হয়েছিল। যে লোকটা আমার মন আর শরীর দুটোই টুকরো টুকরো করেছিল তার নাম আর চেহারা আমার স্পষ্ট মনে আছে।

সেলসম্যান লোকটা মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনল। তার কপাল আর ভুরু থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ল। হাত দিয়ে মুখ চেপে আছে যেন অসুস্থ বোধ করছে। চোখগুলো লাল দেখাল যেন এখনি কেঁদে ফেলবে।

“কী ভয়ংকর। মনে হল যেন কোন থ্রিলার উপন্যাসের কাহিনী শুনলাম। যেখানে ক্রিমিনাল একজন যুবতী নারী। যার অপরাধের মোটিভ হল অতীতে নির্মমভাবে রেপড হওয়া।”

“বুঝলেন তো?” আমি বললাম। “আসল কাহিনী হল, মাত্র কিছুদিন আগে আমি ওই লোকটার বাসার ঠিকানা আবিষ্কার করেছি, যে আমার সাথে এসব করেছিল। টোকিওর এক প্রাইভেট গোয়েন্দাকে ভাড়া করেছিলাম।”

“আপনি কেন তাকে খুঁজে বের করতে চাইছিলেন?”

“আবার জিগায় প্রতিশোধ! প্রতিশোধ নেয়ার জন্য! গোয়েন্দার দেয়া তথ্য অনুযায়ী সে এখন বিবাহিত। একটা বাচ্চাও আছে। সে সুখি জীবন কাটাবে আর আমি বসে বসে আঙুল চুষব? না! সেকারনেই আমি এই প্লেনে চড়েছি। আমার ইচ্ছা ছিল হানেদা এয়ারপোর্টে নামার পর সোজা তার বাড়িতে যাব, তারপর তার চোখের সামনে তার বাচ্চাকে নির্যাতন করব।”

“আর আপনি আমাকে মাথা খারাপ বলছেন? আপনি নিজে কি?”

“আমাকে একা থাকতে দিন। এসবের থেকে মুক্তি চাই আমি।”

আবারো আমরা প্লেনের ভিতর খালি ক্যানটাকে গড়াতে শুনলাম। তারপর গুলির শব্দ হল। এবার আর আমরা কষ্ট করে তাকালামও না। দুজনেই পুরোপুরি নিশ্চিত যে আবারও কেউ একজন উঠে ছেলেটাকে ধরার চেষ্টা করেছে আর ক্যানে পা দিয়ে উল্টিয়ে পড়েছে। তারপর গুলি খেয়ে মরেছে।

“যাই হোক, দশ হাজার ইয়েন দিয়ে আমার একদমই পোষাবে না। যদিও আপনার মত কাউকে একথা বলতে আমার দ্বিধা হচ্ছে, যার জীবনের সকল আনন্দ কিনা দামদামি করায় সীমাবদ্ধ।।”

‘শুনুন। আমি যা বলছি শুনুন। আমি একটা ভাল প্রস্তাব পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারব না এখন। আপনি ওই ডাক্তারকে কত দিয়েছেন?”

“এই একটা হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ এর জন্য আমি ডাক্তারকে তিন মিলিয়ন ইয়েন দিয়েছি। গাধার বাচ্চা ডাক্তার। এই জিনিস আমার মত সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। যে কারনে দাম এত বেশি নিয়েছে। কিন্তু দেখুন দামটা একদম আপনার ব্যাংক একাউন্টে যা আছে তার সমান। একদম খাপে খাপ মিলে যাওয়ার মত একটা লেনদেন।”

“আমি বুঝতে পারছি না আপনাকে আসলে কতখানি বিশ্বাস করা যায়। কিভাবে বুঝব আপনি সত্যি বলছেন? আপনি হয়ত তিন মিলিয়ন দিয়ে কিনেননি, এখন বানিয়ে বলছেন।”

সেলসম্যানের চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বোঝার চেষ্টা করলাম আসলেই সে মিথ্যা বলছিল কিনা। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল।

“মূল দাম যত বেশি ততই ভাল, তাই নয় কি?” অন্যদিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল। মনে হল বিরক্ত।

আমি চিন্তা করলাম ওই ইয়থানাসিয়া ডাগের মূল্য আসলে এখন কত হওয়া উচিত। যে লোক প্ল্যান ক্রাশে মৃত্যু নিয়ে যত ভীত হবে, সে নিশ্চয়ই তত বেশি মূল্য দেয়ার জন্য রাজি থাকবে? কিন্তু ডাগটার মূল্য নির্ধারণের জন্য কি সেটাই একমাত্র ভিত্তি?

“আচ্ছা এটা বলুন, আপনি নিজে কেন ডাগটা ব্যবহার করছেন না?”

“আর কেউ না বুঝলেও আপনি বুঝবেন বলে আমার ধারণা। আমি চাই জীবনের একদম শেষ মহুর্তে কাউকে কিছু বিক্রি করে সন্তুষ্টি পেতে।”

আমি এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে সিটের পেছন থেকে মাথা তুলে পিস্তল হাতের অল্পবয়সি ছেলেটার দিকে তাকালাম। সে করিডরের মাঝে দাঁড়িয়ে উদ্ভটভাবে পিস্তলটা রিলোড করছিল। হিরো মুডে থাকা দুজন পুরুষ সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য লাফিয়ে উঠে ওকে ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, একজন খালি ক্যানটায় পা ফেলে উলটে পড়ল। আর দ্বিতীয়জন তার গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আমরা পরপর দুটো গুলির শব্দ পেলাম। তারপর আবার সব চুপচাপ।

“আমি বুঝতে পারছি। এটা আর কোন ব্যবসায়িক লেনদেন নেই। জুয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

সেলসম্যানের দিকে তাকালাম। তার চেহারা দেখে মনে হল শক খেয়েছে।

“আপনি বলেছেন মারা যাওয়ার আগে কাজ করতে ইনজেকশনটার ত্রিশ মিনিট সময় লাগবে। যে কারনে আমার তাড়াতাড়ি মনস্থির করতে হবে। প্লেন ক্রাশে মরতে না চাইলে আমার আসলে প্লেন পড়া শুরু হওয়ার আগেই ডাগটা ইঞ্জেক্ট করতে হবে। এখানেই জুয়া শুরু। কারন ধরুন আমিও ড্রাগ নিলাম আর ওদিকে ছেলেটাও ধরা পড়ল, প্লেনটাও নিরাপদে হানেদা এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল?”

আমার পাশে বসা সেলসম্যানের দিকে তাকালাম। সে মা আছে। নার্ভাস ভঙ্গিতে নিজের গলা পরিস্কার করছে।

আমি বলে চললাম। “সেক্ষেত্রে ইনজেকশন নেয়ার কারনে আমি শান্তির সাথে মৃত্যুবরণ করব ঠিকই কিন্তু জানতে পারব না যে প্লেন ক্রাশ করল নাকি করল না। আমি কখনো জানতে পারব না, জিনিসটা আমি যে কারনে কিনলাম তা কাজ করল নাকি করল না। আর আপনি, বেঁচে যাওয়ার পর প্লেন থেকে নেমে সোজা ব্যাংকে যাবেন আর আমার একাউন্ট সাফ করে দিবেন। আপনার জন্য চমৎকার লাভ। যদি আমরা ধরে নেই আপনি আসলে এই ইনজেকশনের জন্য একশ ইয়েন দিয়েছেন তাহলে আপনার লাভ হবে দুই মিলিয়ন নয় শত নিরানব্বই হাজার নয়শ ইয়েন।”

“স্বীকার করছি, সেরকম একটা সম্ভাবনা অবশ্যই আছে,” সেলসম্যান বলল। “যদিও আপনি বলার আগে আমি বিষয়টা নিয়ে ভাবিনি।”

“আপনি খুবই বাজে ধরনের মিথ্যুক।”

“আসলে হ্যাঁ, আপনি যেরকম বললেন সেরকম সম্ভাবনা আসলেই আছে যে প্লেনটা হয়ত শেষ পর্যন্ত ক্রাশ করল না। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখুন। পিস্তল হাতে কিরকম জবরজং হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে নিজের পায়েই গুলি করে বসতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভাগ্য ওর পক্ষেই খেলছে। কেউ এখন পর্যন্ত ওকে ছুঁতেও পারেনি। সবকিছুর নিয়ন্ত্রন ওর হাতেই রয়েছে। এরকম যদি চলতে থাকে তাহলে আমার কোন সন্দেহ নেই যে আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই আমরা টি-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল্ডিংগুলোর উপর ধসে পড়তে যাচ্ছি।”

“যাই হোক, আমার মনে হচ্ছে আপনি এসব বলছেন যাতে আপনি ডাগটা বিক্রি করতে পারেন। বাজি ধরে বলতে পারি মনে মনে আপনি আশা করছেন কেউ একজন ঠিকই ছেলেটাকে ধরাশায়ী করে ফেলবে।”

“সেরকম কিছু আমি জানি না।”

লোকটার ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখা গেল। ধূর্ত শেয়ালের মত হাসি।

“আমি ওরকম বাজি ধরতাম যদি এতে আমার কোন সুবিধা দেখতে পেতাম,” সে বলল, “কিন্তু এখন এটা স্পষ্ট যে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ডাগটা কিনবেন কি কিনবেন না। যদি আপনার মনে হয় কেউ ছেলেটাকে প্লেনসহ আত্মহত্যা করা থেকে আটকাতে পারবে না তাহলে আপনার উচিত হবে ড্রাগটা কেনা। যদি আপনি মরতেই বসেন তাহলে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মৃত্যুবরণ করা অনেক ভাল। অন্যদিকে আপনি যদি ভাবেন, ছেলেটা যা করতে চাইছে তাতে ব্যর্থ হবে তাহলে আপনার জন্য ড্রাগটা না কেনাই ঠিক হবে। প্লেন যদি ক্রাশ না করে তাহলে শান্তিপূর্ণ মৃত্যুবরণ করাও বোকামি হবে।”

“এসব আপনি বলছেন আমাকে পটানোর জন্য। খুবই বাজে আইডিয়া।”

আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। আগের মতই বাইরে খালি নীল আকাশ আর সাদা মেঘ দেখা যাচ্ছিল।

“ব্যাপারটা আসলে ইন্টারেস্টিং। আমার মনে হয় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ছেলেটাকে আরো কিছুক্ষণ আমার খেয়াল করে দেখা উচিত। দাম নিয়ে আমরা আরো কিছুক্ষণ কথা বলতে পারি?”

“দামাদামি নিয়ে আমরা এর মধ্যেই অনেক কথা বলেছি। আমি এর মধ্যে কোন সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না। আপনি শুধু আমাকে আপনার পিন নাম্বারটা জানাবেন।”

লোকটা কথাগুলো বলতে বলতেই আমি উপলদ্ধি করলাম আমি মারা যাওয়ার পর লোকটা এমনিতেও চাইলে আমার লাগেজ হাতড়াতে পারবে। ত্রিশ হাজার ইয়েন একদম নিশ্চিতভাবে হারাবো। ওকে পিন নাম্বার দিব কি দিব না সেটার উপর নির্ভর করছে সে কতটুকু কি পেতে যাচ্ছে। অন্য কথায় বললে হয় সে হয় ত্রিশ হাজার ইয়েন পাচ্ছে নয়ত তিন মিলিয়ন ত্রিশ হাজার ইয়েন পাচ্ছে।

“আচ্ছা বলুন তো, আপনার পিন নিশ্চয়ই আপনার জন্মতারিখ নয়?”

“হলে কি খুব খারাপ কিছু?”

সে তার কাঁধ তুলল, চেহারা দেখে মনে হল অবাক হয়েছে।

“আপনি জানেন নিশ্চয়ই, আপনার জন্মতারিখ জানা আমার জন্য কঠিন হবে না। আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সেই আছে। এর অর্থ হল আপনি ইতিমধ্যেই মূল্য তিন মিলিয়ন ত্রিশ হাজার ইয়েনে নির্ধারণ করে ফেলেছেন।”

“আপনিই জিতলেন। আমার জীবন এমনিতেও শেষ ওমিতেও শেষ।”

আমার হাসি দেখে লোকটাও হাসল।

“এই যে আপনারা দুজন,” উপর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। “মনে হচ্ছে ওখানে আপনারা দুজন খুব ভাল সময় কাটাচ্ছেন?”

“এক মিনিট দাঁড়ান, আমাদেরকে একটু সময় দিন।” সেলসম্যান বলল। “আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে আলাপ করছি। প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে গিয়েছি। তারপর মাথা তুলে দেখতে গেল কে কথা বলছে। দেখার পর ওর গলার স্বর হাঁসের মত ফসফ্যাসে শোনাতে লাগল।

“ওহ! আমি দুঃখিত…”

“একদমই না। আমি দুঃখিত আপনাদের ডিস্টার্ব করার জন্য। দয়া করে আপনাদের ব্যবসায়িক আলাপ চালিয়ে যান।”

কথাগুলো যে বলছিল সে হল হাইজ্যাকার স্বয়ং। ছেলেটা করিডোরে দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে পিস্তলটা ধরে আছে। আমি পিস্তলটার উপর থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না।

কাছের এক সিট থেকে একজন বিশালদেহী লোক উঠে হাইজ্যাকারের দিকে এগুলো। দেখে মনে হচ্ছিল জুডো প্রশিক্ষক ধরনের কেউ হবে হয়ত। আমি আর সেলসম্যান শক্ত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম জুডো এক্সপার্ট আর পিস্তল হাতের দুর্বল ছেলেটার লড়াই দেখার জন্য, কিন্তু যেরকম ভেবেছিলাম, জুডো ফাইটারটা ক্যানে পা পিছলে সিটের কোনায় বাড়ি খেয়ে মাথা ফাটিয়ে পড়ে থাকল। হাইজ্যাকার ছেলেটা ওর ঘাড়ে আঘাত করে তারপর পরীক্ষা করল লোকটা বেঁচে আছে কিনা।

“অনেকক্ষণ ধরে আপনাদের দুজনকে খেয়াল করছি,” অল্পবয়সি ছেলেটা আমাদের সারির খালি সিটটায় বসল। ডান থেকে বামে, আমি জানালার পাশে বসে ছিলাম, সেলসম্যান মাঝখানের সিটে, আর হাইজ্যাকার করিডোরের সাথের সিটে। হাইজ্যাক হওয়ার পর পৌনে এক ঘন্টা পার হয়ে গিয়েছে।

“আপনারা সিটের পেছনে লুকিয়ে বসে কিছু একটা নিয়ে ফিসফিস করছিলেন। আমার মনে হয় আপনারা পরিকল্পনা করছিলেন কিভাবে আমার থেকে পিস্তলটা কেড়ে নেয়া যায়। কিংবা আপনারা হয়ত আমার চেহারা, আমার পোশাক, আমার স্কুলের নাম নিয়ে বাজে কথা বলছিলেন, হাসাহাসি করছিলেন। প্রথমে আমি তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে আমি উপলদ্ধি করলাম…কিভাবে বলা যায়…আপনারা দুজন অন্য যাত্রিদের থেকে অন্যরকম আচরণ করছিলেন।”

“তাই নাকি?” আমি বললাম, কুঁকে ভাল করে ছেলেটাকে দেখার চেষ্টা করলাম। হাইজ্যাকারকে দেখে মনে হল বিব্রতবোধ করছে। খালি হাতটা দিয়ে মাথার চুল শোয়ানোর চেষ্টা করছে সে। কিন্তু মাঝখানের এক ফালি চুল এন্টেনার মত সোজা হয়েই থাকল।

“অন্য সব যাত্রিরা ভয়ে রীতিমত জমে আছে। এমনকি যারা হিরো হওয়ার চেষ্টা করছে তারাও। কেউ কেউ পাগলের মত কাঁদছে। কেউ কেউ ভুতের মত সাদা মুখ করে রেখেছে। কিন্তু আপনাদের দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে ঘরের লিভিং রুমে বসে খোশ আলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। আপনারা কি আমার পিস্তলটাকে ভয় পাচ্ছেন না? নাকি আপনারা ভেবেছেন আমার মত দেখতে কেউ এই কাজে সফল হবে না তাই ভয়ের কিছু নেই? আপনারা কি ভাবছেন, এই ছেলে যে কিনা টি-বিশ্ববিদ্যালয়েই সুযোগ পায়নি আর সে কিনা প্লেন হাইজ্যাক করবে!”

“না একদমই না,” সেলসম্যান বলতে গেল। “আমরা ভাল ভয় পেয়েছি। যেমন উদাহরনস্বরূপ…”

“..আমি বলতে চাইছি, আপনার কথা আর কাজ দেখে মনে হচ্ছে সবকিছু নিয়েই আপনার জটিলতা আছে। যে কারনে আপনাকে ভারসাম্যহীন মনে হয়। এবং সেটা অবশ্যই ভয়ের ব্যাপার,” আমি বললাম।

“জটিলতা? আমি অতদুর যাব না। কিন্তু আমার সবসময় মনে হয় লোকজন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে, রাস্তায় আমার পাশ দিয়ে যে কুকুর হেঁটে যায়, টিভি শো এর হাইস্কুলের মেয়েরা-আমার মনে হয় সবাই জানে আমি কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছি, আর সবাই আমাকে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে হাসাহাসি করে।”

“হা হা…” সেলসম্যান বলল, আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যাতে মনে হল বলতে চাইছে এই ছেলে সত্যি সত্যি বিপদজনক। “আপনি খুবই সেনসিটিভ,” গলার স্বর কত্রিম শোনাল।– আমি চারপাশে তাকালাম। প্লেনের সবাইকে ভয়ে অসুস্থ দেখাচ্ছিল। কেউ সরাসরি আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল না কিন্তু এটা নিশ্চিত যে সবাই এখানে কি হচ্ছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছিল। কাছাকাছি বসে থাকা লোকজন মনে হচ্ছিল আমাদের কথাবার্তা শোনার জন্য কান পেতে আছে। আমি আবার অল্প বয়সি ছেলেটার দিকে তাকালাম আর বললাম, “আমাদেরকে অন্য যাত্রিদের মত আতংকিত লাগছে না তার কারন হয়ত আমাদের দুজনের আসলে অন্যদের মত হারানোর তেমন কিছু নেই।”

হাইজ্যাকার ছেলেটা এমনভাবে মাথা ঘোরাল যেন আরো বিস্তারিত জানতে চায়।

“হ্যাঁ আমি প্লেন ক্রাশ করে মরা নিয়ে ভীত, কিন্তু অন্যদের সাথে তুলনা করলে আমরা দুজন ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি।”

আমি সেলসম্যানের দিকে ইঙ্গিত করে ব্যাখ্যা করলাম যে লোকটা আগেই আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। আর আমার ক্ষেত্রে আমি বললাম যে হাই স্কুলে থাকতে এক লোক আমাকে রেপ করেছিল, আমি সেটার প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছিলাম। ছেলেটাও সব শুনে সেলসম্যানের মত হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।

“এরপর থেকে আমি আর কোন পুরুষকে কখনো বিশ্বাস করতে পারিনি।”

ছেলেটার চোখগুলো খানিকটা লালচে দেখাল। সে আমার দিকে এক নজরে তাকিয়ে থাকল। কয়েকবার মনে হল সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। শেষ পর্যন্ত বলল, “যে লোকটা আপনার সাথে বাজে কাজ করেছে তাকে কি আপনি খুন করতে চাইছিলেন?”

“সম্ভবত। আমি চাই ওর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হোক। জানি না এছাড়া আর কিভাবে আমার শান্তি হবে। সে যাই হোক, এইসব কারনে এই সেলসম্যান ভদ্রলোক আর আমি নিজেদেরকে যাবতীয় সুখ থেকে মুক্ত করে ফেলতে পেরেছি। এখন যদি আমরা আমাদেরকে কোন সুখহীন বাস্তবতায় আবিষ্কার করি, যেমন জোর করে প্লেনক্রাশে মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করা, তাহলে আমাদের আসলে কিছু যায় আসেনা।

“সেজন্যই আপনারা এত শান্তভাবে বসে কথা বলতে পারছিলেন।” হাইজ্যাকার ছেলেটা বলল।

সে চুপ করে বসে এক মুহূর্ত চিন্তা করল তারপর মাথা নামিয়ে বলল, “আপনার মন শক্ত। আপনার সাথে ভয়াবহ কিছু হয়েছে কিন্তু তারপরেও আপনি থেমে থাকেন নি। আপনি আপনার প্রতিশোধের ছক কেটেছেন, বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন।”

“কিন্তু এখনো মনে হচ্ছে মরতে যাচ্ছি।”

যখন এটা বললাম, পাশে বসা সেলসম্যান আমাকে বলল, “হা হা হা, ভাল বলেছেন।”

আমি আরেকটু সামনে ঝুঁকে অল্পবয়সি ছেলেটার চোখের দিকে তাকালাম। এতে সে একটু অবাক হল আর একটু গুটিয়ে গেল।

“এখন আমাকে বলুন আপনার কেমন লাগছে? এই যে নিরীহ মানুষজন ভর্তি পুরো একটা প্লেন হাইজ্যাক করলেন।”

“ওকে এসব প্রশ্ন করবেন না!” সেলসম্যান বলল। ধাক্কা দিয়ে আমাকে সিটে পাঠিয়ে দিল।

“এক মিনিট দাঁড়ান, এটা জরুরী। প্রশ্নটা আসলে সে কাজটা করতে কতখানি মরিয়া। এরসাথে আমার ড্রাগটা কেনার সিদ্ধান্ত জড়িত।”

“ও আচ্ছা, তাহলে যুক্তি আছে।” সেলসম্যান মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।

“ভাগ? কি নিয়ে কথা বলছেন আপনারা?” ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।

সেলসম্যান আর আমি নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করলাম, ছেলেটাকে ইয়থানাসিয়া ডাগ সম্পর্কে কিছু বলা ঠিক হবে কিনা। শেষে আমরা ওকে সব খুলে বললাম-হাইপোডারমিক, আমার কেনার চিন্তা, হাইজ্যাকিং ব্যর্থ হলে সেলসম্যানে লাভ, সবকিছু।

“তারমানে আপনি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন ইনজেকশনটি কিনবেন কি কিনবেন না?” হাইজ্যাকার প্রশ্ন করল। আমি মাথা ঝাঁকালাম। সেলসম্যান কয়েকবার গলা খাঁকারি দিয়ে পরিস্কার করে হাইজ্যাকারকে বলল, “আপনার কি মনে হয়? আপনি এই কাজে কতখানি অবিচল? আমি বলতে চাইছি আত্মহত্যা করা ঠিক আছে কিন্তু আপনি আমাদের সবাইকে এর মধ্যে টানছেন কেন?”

অল্পবয়সি ছেলেটা শান্ত অভিব্যক্তি নিয়ে সেলসম্যানের দিকে ঘুরল। সেলসম্যান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে একটু পিছিয়ে গেল।

“কারন সবকিছু সহ্যর সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, সে বলল।

***

“আমার মায়ের সবসময়ের বিশ্বাস ছিল টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাড়া আমার সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। অন্য কোন সম্ভাবনা তার চিন্তার বাইরে ছিল। মা বলতেন, কেউ যদি টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হতে পারে তাহলে সে মানুষের জাত না, গরু-ছাগল বা সে-ধরনের কিছু। টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে পারা ছিল আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য কিংবা উদ্দেশ্য যা বলেন।”

“পাশ করার পর কি করতেন?” সেলসম্যান জিজ্ঞেস করল।

“ওই প্রশ্ন কখনো আমার মাথায়ই আসেনি। আমার একমাত্র চিন্তা ছিল শালার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে ভর্তি হওয়া যায়। আর কোন কিছুতেই কিছু আসে যায় না আমার। যে কারনে আমি রাতের বেলা বাসায় থেকে খালি পড়াশুনা করতাম। সবাই যখন মেয়েদের সাথে ডেট করছে কিংবা গেমস খেলছে, আমি তখন শুধুই পড়াশুনায় ব্যস্ত থেকেছি।”

“আর যখন পড়াশুনা করতেন না তখন কি করতেন?” আমি জানতে চাইলাম।

“তখন আমি আচার বানাতাম।”

সেলসম্যান আর আমার মধ্যে চোখাচোখি হল।

“আমার শখ হল জাপানি আচার বানানো,” সে বলল। “এর মধ্যে এত কাজ আছে আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না, তারপর সে বলতে থাকল কিভাবে সঠিকভাবে সবজি কাটতে হবে, কিরকম কচকচে হতে হবে, কোন সময়ে কিরকম আচার হয়, কতটুকু লবণ দিতে হয় ইত্যাদি। কথাগুলো বলার সময় ওর বেশ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।

“যখন বাসায় একা থাকতাম আর সবকিছু নিস্তব্ধ থাকত, তখন আচার বানানো আমাকে শান্তি দিত। প্রাইমারী স্কুলে থাকতে আমি আচার বানানো শুরু করি…”

সেলসম্যান নিচু গলায় আমাকে বলল, “মনে হচ্ছে এই ছেলে প্রাইমারি থেকেই আউলা কিসিমের। আপনার কি মনে হয়?”

“স্কুলের সবাই এই নিয়ে হাসত। ওরা বলত আমার পোশাকগুলো পুরনো আমলের। নতুন কিছু কিনতে আমার ভয় হত। মনে হত দোকানের লোকজন আমাকে দেখে হাসবে। আমার জন্য ফ্যাসনেবল হওয়া একটু

অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? মা আমার জন্য যা কিনে আনতেন আমি তাই পড়তাম। একমাত্র যা আমি নিজে কিনেছি তা হল নোটবুক আর লেখালেখির জিনিসপত্র। অন্য ছেলেমেয়েরা যখন তাদের জমানো টাকা দিয়ে সিডি কিনছে আমি তখন আমার হাত খরচের টাকা দিয়ে কিনেছি ফাউন্টেইন পেন। আমি সবসময় পড়াশুনা করতাম, যে কারনে স্কুলের কেউ আমার সাথে খেলতে চাইত না। তারা সবাই গোপনে গোপনে আমাকে ‘গন্ধমাদন ডাকত। অথচ আমি প্রতিদিনই গোসল করতাম।”

“একদম ভাল নাম না,” আমি বললাম, যদিও আমি টের পাচ্ছিলাম ছেলেটার শরীর থেকে হালকা আচারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

“আমার মা আর সব আত্মীয়স্বজনরা নিশ্চিত ছিল, আমি টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাব। কিন্তু পারিনি।”

“কেন?”

“তারা নেয় নি।”

“সেটা তো বুঝলাম, কিন্তু কেন? প্রতিবছর পরীক্ষার সময় কি আপনি অসুস্থ থাকতেন বা কিছু?”

“না।”

“অন্য কাউকে সাহায্য করছিলেন যে নিজে সময় পাননি?” সেলসম্যান প্রশ্ন করল। “নাকি কোন ডুবতে থাকা বাচ্চাকে উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন? নাকি কোন ব্রেন টিউমারওয়ালা মৃত্যুপথযাত্রি বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে ছিলেন? অল্পবয়সি ছেলেটা দুঃখি মুখ নিয়ে খালি মাথা নেড়ে চলল।

“আমি নিজেও জানি না কেন। আমি আমার টিচারদের জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন আমি ভাল গ্রেড পাচ্ছিনা। তারা বলেছিলেন আমি নাকি টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মত যথেষ্ট ভাল নই। যত চেষ্টা করি না কেন গ্রেড উঠবে না। আমার উচিত হাল ছেড়ে দেয়া।”

ছেলেটা যথেষ্ট স্মার্ট ছিল না। প্লেনের কেউ কোন কথা বলল না কিন্তু সবার চেহারা দেখেই সেটা ভাবছে বোঝা যাচ্ছিল। ছেলেটা নিজেই বলল, “এটা অন্যায়, স্রেফ অন্যায়।” তারপর নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল।

“আমার মা, আমার আত্মীয়রা, সবাই আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। বুঝতে পারছেন আমার তখন কেমন লাগছিল? কিভাবে বোঝাব? সবাই যখন আমাকে প্রথমবার বলল যে আমি কখনো টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারব না, তখন তাদের কথা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এই বছর, পর পর পাঁচ বার ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করার পর, বাধ্য হলাম মেনে নিতে যে আমাকে দিয়ে এই কাজ আর কখনো হবে না- তাহলে আমি কি করব? আমার মা আমাকে সবসময় শিখিয়ে এসেছেন, টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উপর আমার পুরো জীবন নির্ভর করছে। সবাই এখন আমাকে করুনার চোখে দেখে। যেখানেই যাই আমার মনে হয় সবাই আমাকে নিয়ে হাসছে।”

সে মাথা নিচু করে সিট থেকে সামনে ঝুঁকে থাকল। খালি হাতটা দিয়ে মুখ ঢাকা।

“কি জঘন্য ব্যাপার, সে গুঙিয়ে উঠল। কণ্ঠ নিচু আর হাত দিয়ে মুখ ঢাকা থাকায় চেহারা না দেখা গেলেও আমি ওকে বিড়বিড় করতে দেখতে পাচ্ছিলাম।

“আমি ওদের হাসি শুনতে পাই। আমার ক্লাসমেটদের কণ্ঠ শুনতে পাই। সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে…আমার এন্টেনার মত দাঁড়িয়ে থাকা চুল নিয়ে…কোন মেয়ের হাত কখনো ধরিনি কেন সেটা নিয়ে…সবাই মনে মনে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, আহ, পারছি না, আমাকে একা থাকতে দিন…একা থাকতে দিন…পারছি না আমি আর…সবাইকে খুন করে ফেলব, এই দুনিয়ার সবাইকে খুন করে ফেলতে চাই আমি…কিন্তু এটা অন্যায়…কেউ প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন…আমি আর এটা নিতে পারছি না। পালানোর কোন পথ খোলা নেই আমার সামনে…”

এখনই মোক্ষম সময় ছেলেটার থেকে পিস্তলটা কেড়ে নেয়ার, কিন্তু কেউ তা করল না। ছেলেটার দুর্ভাগ্য এতটাই বিচিত্র যে কেউ ওকে আক্রমণ করার কথা ভাবতেও পারল না। ছেলেটার ভেতরের অন্ধকার অংশ তার কথাগুলোর সাথে বেরিয়ে এসেছিল, ওর কণ্ঠের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ব্যথা সবাইকে সচের মত আঘাত হানছিল।

“ঘৃণা…ঘৃণা…সবার প্রতি আমার অনুভূতি শুধু এই একটাই, সবাই…অসহ্য…আমি সবাইকে খুন করতে চাই…আমি চাই আমার মরিয়া ভাব, আমার হতাশা সবাই উপলদ্ধি করুক…দুনিয়ার সবাই…”

ছেলেটা অবশেষে মুখ থেকে হাত সরাল। মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু আমার মনে হল ওর চোখগুলো থেকে আগুন বের হচ্ছে।

“কিন্তু সবাইকে তো আর খুন করা সম্ভব না। তাই এই প্লেনটা হাইজ্যাক করাই আমার কাছে ভাল মনে হল। এতটুকু একজনের পক্ষে করা সম্ভব। প্লেন ক্রাশ করলে প্লেনের যাত্রিরা, টি-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল্ডিংগুলোতে থাকা লোকজন, সবাই মরবে কোন কারন ছাড়া। এরপর এই ভয়ংকর খবর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। এটাই আমার আশা। কিছুদিন আগে আমি অনলাইনে আমার আচার বিক্রি শুরু করেছি। বিক্রি খুব ভাল হচ্ছে। বানানোর সাথে সাথে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। মাত্র এক বছরে আমি তিন মিলিয়ন ইয়েন আয় করে ফেলেছি।”

“সে তো আমার আয়ের চেয়েও বেশি, সেলসম্যান বলল।

“কিন্তু আমার জীবনের লক্ষ্য ছিল টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। বিষয়টা টাকার না, আমি আমার টাকা খরচ করে এই পিস্তলটা কিনেছি।”

“কার থেকে কিনেছেন?”

“পেছনের গলির এক লোকের থেকে। ভাঙা জাপানিজ বলে। সম্ভবত চাইনিজ হবে।”

আমার সন্দেহ হল ওই চাইনিজ লোক সত্যি ছিল কিনা কিন্তু কিছু বললাম না।

“আমি তার থেকে পিস্তল আর গুলি কিনি, তারপর এই প্লেনে চড়ে বসি।”

“কিন্তু পিস্তল নিয়ে প্লেনে উঠলেন কিভাবে? সিকিউরিটি ধরেনি?”

“চেকের সময় হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়েছি, হাসিমুখে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।”

“বলেন কি….”

টাকার ক্ষমতা খুবই বাজে জিনিস।

“আর সেভাবেই আমরা এখন এই পরিস্থিতিতে এসে পড়েছি।”

ছেলেটা ওর ঘড়ি দেখল।

“বাহ, সময়টা দেখুন। টি-বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ধসে পড়তে আর মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট বাকি।”

তারপর সে সরাসরি আমার দিকে তাকাল।

“আমি এই প্লেনটা ক্রাশ করাতে যাচ্ছি। না করলে আমি জানি না কিভাবে এর থেকে মুক্তি পাব। লোকজনকে যত দুঃখ দিয়েছি…আমি সবাইকে দেখাতে চাই মৃত্যু কতখানি অর্থহীন একটা ব্যাপার।”

ছেলেটার মুখ থেকে সমস্ত অপ্রতিভ আর স্নায়বিক দুর্বলতা মুছে গিয়েছে। চোখগুলো তেজের সাথে জ্বলছিল। সে তার মৃত্যুর মিশন নিয়ে বদ্ধপরিকর। আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। সেলসম্যানের দিকে ঘুরলাম।

“আমি ডাগটা কিনব। আমি এই জুয়া খেলতে রাজি। আজকে হোক কালকে হোক আমি এমনিতেও শান্তিতে মরতে চাই।”

“আপনি নিশ্চিত?” সেলসম্যান প্রশ্ন করলেন।

“আমি আর কিছু পরোয়া করি না,” কেবিনের চারদিকে তাকালাম আমি। করিডরের উপর লাশের স্তূপ পড়ে আছে।

“ছেলেটার চোখের দিকে যখন তাকিয়েছি তখন আমি গভীরে লুকানো কিছু একটা দেখতে পেয়েছি। আমি নিশ্চিত এই প্লেন ক্রাশ করবে আর সেই সাথে সবাই জাহান্নামের বাসিন্দা হতে যাচ্ছে।”– “কি বলছেন..? মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি,” সেলসম্যান নিজেকেই নিজে বলল।

“আমি ড্রাগটা কিনব। আমার মত বদলাবে না।”

আমি লোকটাকে আমার ওয়ালেট দিলাম। আমি যে আমার সমস্ত ক্যাশ আর ব্যাংক কার্ড ওর হাতে তুলে দিয়েছি তা নিয়ে আমার কোন আফসোস হল না।

সেলসম্যান নিজের স্যুটের পকেট থেকে হাইপোডারমিক সিরিঞ্জটা বের করল। সরু কাঁচের টিউবটার মধ্যে বর্ণহীন তরল দেখা যাচ্ছিল। আমার দৃষ্টি, হাইজ্যাকারের দৃষ্টি, করিডরের দুই পাশে বসা সমস্ত লোকের দৃষ্টি এই মুহূর্তে এই বস্তুটার উপর নিবদ্ধ।

“একজনের জীবন প্রদীপ নেভানোর জন্য এইটুকু তরল কি যথেষ্ট?” হাইজ্যাকার প্রশ্ন করল।

“হ্যাঁ। এটা হল মিষ্টি, কষ্টহীন মৃত্যু, সেলসম্যান সিরিঞ্জটা আমার হাতে দিতে দিতে বলল। আমি সাবধানে হাতে নিলাম যেন পড়ে না যায়। সিরিঞ্জটা মুঠোয় ধরে রাখলেও এর কোন ওজন টের পাচ্ছিলাম না। চোখের সামনে এনে বর্ণহীন তরলটার দিকে তাকালাম, কাঁচের সিরিঞ্জে কেমন যেন কৌণিকভাবে বাঁকা হয়ে আছে। সিরিঞ্জটা আশেপাশের লোকজনের দৃষ্টি কাড়ল। কেউ কেউ সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ভাল করে দেখার জন্য।

“এভাবে সবাই তাকিয়ে থাকলে মৃত্যুকে বেছে নেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমার জন্য।”

এ কথা শুনে কেউ কেউ কাশি দিল, কেউ কেউ অন্য দিকে তাকাল।

“আপনার হাতে নষ্ট করার মত সময় নেই। ডাগটা কাজ করার জন্য ত্রিশ মিনিটের মত সময় লাগে কিন্তু।”

আমি বাম হাতা কনুইয়ের উপর পর্যন্ত গুটিয়ে নিলাম।

“আগে কখনো নিজে নিজে ইনজেকশন দেইনি। কি করতে হবে?”

“একভাবে পুশ করলেই হল। ডাক্তার বলেছিল যেভাবেই দেয়া হোক না কেন মৃত্যু নিশ্চিত।”

সেলসম্যানের কথাগুলো শুনে আমার আস্থা বাড়ল। আঙুল দিয়ে চেপে সুঁইয়ের কাভারটা সরিয়ে ফেললাম। রুপালি রঙের লম্বা সুইটা মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে এল। এক মুহূর্ত সুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে অল্প বয়সি ছেলেটার দিকে তাকালাম।

“আমি ধরে নিচ্ছি আপনি এই প্লেনটা ক্রাশ করানোর ব্যাপারে সিরিয়াস। আমি আপনার উপর ভরসা করছি যে আপনি এই প্লেনের সবাইকে ভয়ের শেষ মাথায় নিয়ে যাবেন।”

ছেলেটা অস্পষ্টভাবে মাথা ঝাঁকাল।

“আপনার শান্তিময় মৃত্যু বথা যাবে না।”

“এই কথাবার্তা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে…”

আমি মাঝখান দিয়ে বলা সেলসম্যানের কথা উপেক্ষা করলাম। সিরিঞ্জে চাপ দিয়ে কয়েক ফোঁটা তরল বের হতে দিলাম। তারপর সুইটা আমার বাম বাহুতে ঢুকিয়ে চাপ দিলাম। সুঁই ঢোকায় তীক্ষ্ণ একটা ব্যথা বোধ হল। সিরিঞ্জের চাপের সাথে সাথে ঠান্ডা একটা ভাব পুরো হাতে ছড়িয়ে পড়ল মনে হল।

সিরিঞ্জের ভেতর সব ফুরিয়ে গেলে আমি সুইটা বের করে খালি সিরিঞ্জটা সেলসম্যানকে ফিরিয়ে দিলাম। তারপর হাতা নামিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। “শেষ,” বললাম। গভীর অন্ধকার আমার সামনে ছড়িয়ে পড়ল।

***

“দেখুন কত দ্রুত কাজ করছে! সে এখনই নড়াচড়া বন্ধ করে দিয়েছে…”

“আমি মিথ্যা বলেছিলাম যে ত্রিশ মিনিট সময় লাগবে। জিনিসটা আসলে সাথে সাথে কাজ করে। ডাক্তার তাই বলেছিল আমাকে।”

“তাহলে কেন ও কথা বললেন?”

“আমি ওকে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বেশি সময় নিতে দিতে চাইনি। মানে ধরুন যদি আপনি ধরা পড়ে যান, ব্যবসা করার জন্য তখন অনেক দেরি হয়ে যেত না?”

“আপনার কথা বুঝতে পারছি। তারমানে আপনি বলতে চাইছেন আপনি এখনো আশাবাদী যে আমি ধরা পড়তে পারি?”

“ আমার সর্বোচ্চ চাওয়া সেটাই কি হওয়া স্বাভাবিক নয়? সেটা হলে আমি ব্যাঙ্কে গিয়ে ওর সব টাকা তুলে নিতে পারব। সত্যি বলতে কি আমি একদম অল্প টাকায় ডাগটা ডাক্তারের কাছ থেকে কিনেছিলাম। সুতরাং পুরোটাই লাভে লাভ। আমি হয়ত টাকাটা দিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারব। কিংবা অন্তত আরেকবার আত্মহত্যার পরিকল্পনা করার আগে কিছুদিন ভাল সময় কাটাতে পারব…আহ একম আনকোরা নতুন একটা জীবন। সবকিছু বদলে ফেলে জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করার কথা কি আপনি কখনো কল্পনা করেননি?”

“না। আমার ঘণা আমার জন্য এতটাই প্রবল ছিল যে, পজেটিভ কোন চিন্তা আমার মাথায় আসেনি। আপনি যখন নিজেকে মৃতমানুষ হিসেবে চিন্তা করবেন তখন নতুন জীবনের কল্পনা করা অসাধ্যই। অন্তত আমার জন্য অসাধ্য। কিন্তু আপনার কাছে আমার একটা সাহায্য প্রয়োজন। শুধু আপনার কাছে না, যে যে আমাকে শুনতে পারছেন তাদের সবাইকেই বলছি। আমি চাই আপনারা সবাই সিট থেকে উঠে প্লেনের সামনের দিকে যাবেন এখন। সামনের দিকে কিছু সিট খালি আছে। কিছু সিট আগে থেকেই খালি ছিল। সব মিলিয়ে অর্ধেকের মত সিট খালি আছে। আমি চাই আপনারা সবাই একসাথে বসবেন। আমার জন্য লক্ষ্য রাখা সহজ হয় তাহলে।”

“কোন সমস্যা নেই। চলুন সিট অদল বদল করা যাক। কিন্তু আমরা যদি সবাই সামনে গিয়ে বসি তাহলে প্লেনটা ভারসাম্য হারিয়ে আগেই ক্রাশ করে বসবে না?”

“আমরা এমনিতেও ক্রাশ করতেই যাচ্ছি। সুতরাং সে নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।”

“ঠিক আছে। এই মহিলার কি হবে?”

“সে আর করিডরের লাশগুলো যেখানে আছে সেখানেই থাকুক। বাকিরা সবাই সামনে যান। যারা এখনো জীবিত আছেন, সবাই। এইটা আমার নির্দেশ। নাকি আপনারা এমন কারো থেকে নির্দেশ পেতে চান না যে কিনা টি-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি?”

***

আমি মরে গিয়েছিলাম কিন্তু আবার চোখ খুললাম, তারপর ঘাড় ডলতে ডলতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। তখনো সেই একই সিটে বসে আছি। মনে হচ্ছিল আমি যেন কোন প্রেতাত্মা যে এখনো প্লেনে বসে আছে।

পাশে তাকালাম কিন্তু সেলসম্যান সেখানে নেই। হাইজ্যাকারকেও দেখা গেল না। চারিদিক অন্ধকার হয়ে মারা যাওয়ার আগে শোনা ওদের কথাগুলো আমার মনে পড়ল। অল্প বয়সি ছেলেটা সবাইকে সামনে গিয়ে বসার নির্দেশ দিচ্ছিল।

আমি, যে কিনা এখন একজন ভুত, উঠে দাঁড়িয়ে সিটের উপর থেকে সামনে তাকালাম। ওই যে, প্লেনের সামনের অর্ধেক লোকজনে গাদাগাদি হয়ে আছে। সবাই আমার দিকে পেছন ফিরে আছে। প্লেনের প্রায় মাঝখান থেকে বাকি সিটগুলোসহ যেখানে আমি বসে ছিলাম, সব খালি।

পেছনের অর্ধেকে কোন জীবিত মানুষ না থাকলেও করিডোরে লাশগুলো পড়ে ছিল। প্লেনের সামনের অংশ মনে হচ্ছিল জীবিত মানুষের এলাকা। আর পেছনের অর্ধেক মৃতদের এলাকা।

সামনে একজায়গায় এন্টেনার মত খাড়া হয়ে থাকা চুল চোখে পড়ল। অল্প বয়সি ছেলেটা প্লেনের পেছনের দিকের এক সিটে বসে আছে। মৃতদের এলাকায় একমাত্র জীবিত মানুষ, এবং নিঃসঙ্গ।

কেউ কোন কথা বলছিল না। একমাত্র শব্দ ছিল ইঞ্জিনের শব্দ। আমি নিঃশব্দে ছেলেটার সিটের দিকে হেঁটে যেতে লাগলাম। করিডোরে পড়ে থাকা লাশগুলোর উপর আমার পা পড়ল। আমি সাবধানতার সাথে আমার পা ফেলছিলাম যাতে খালি কৌটাটা গড়িয়ে এলে পা দিয়ে না বসি। আমি সোজা ছেলেটার সিটের পেছনে এসে দাঁড়ালাম আর ওর মাথায় উঁচু হয়ে থাকা চুলের দিকে তাকালাম। ও গভীর মনোযোগর সাথে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল যেন কোন কিছুই দৃষ্টি এড়িয়ে না যায়। আমি যেন টের পাচ্ছিলাম যে ওর মনোযোগ ওর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

আঙুলের মাথা দিয়ে আমি ছেলেটার উঁচু হয়ে থাকা চুলে স্পর্শ করলাম। উপলদ্ধি করলাম ভূত বা প্রেতাত্মা সম্পর্কে সবাই যা বলে তা সত্যি। কাউকে না জানিয়ে তারা সব কিছু স্পর্শ করতে পারে। আমার ইচ্ছা করল ভুত হয়ে কোন বুড়ো মানুষের টাক মাথায় তবলা বাজাতে। ঈগল যেভাবে শিকার খোঁজে সেভাবে আশেপাশে তাকিয়ে একজন টেকোকে খুঁজে পেলাম।

লোকটার দিকে এগুতে যাব এমন সময় ছেলেটা পিস্তলটা পাশের সিটে নামিয়ে হাত পা টানটান করছিল। আমি আস্তে করে সেটা হাতে নিয়ে দেখলাম কেমন লাগে। আশ্চর্যজনকভাবে জিনিসটা বেশ ভারি ছিল। জিনিসটা শক্ত আর মনে হচ্ছিল যেন সত্যি সত্যি ধাতব কিছু একটা ধরে আছি। ভূতরা সত্যি সত্যি কোন জিনিস তুলতে পারে উপলদ্ধি করে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি পিস্তলটা নিয়ে কিছু অ্যাকশন পোজ দিলাম।

“অ্যাঁ? কি হচ্ছে এসব?” অল্প বয়সি ছেলেটা হতবুদ্ধি হয়ে বলল। হাত-পা টান টান শেষে আমার দিকে ফিরে দেখে আমি একজন নারী পুলিশের মত পোজ দিয়ে আছি। সে সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।

“আপনি কি আমাকে দেখতে পারছেন? আপনি ভুত দেখতে পারেন নাকি?”

সামনে বসা সবার মাথা এদিকে ঘুরে গেল। একজন সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। লোকটা ওই সেলসম্যান। সে হা করে আমাকে বলল, “আপনি এখনো বেঁচে আছেন কেন?” আমি পুলিশের ভান বন্ধ করে বললাম, “আয় হায়, আমি ভেবেছিলাম আমি মরে গিয়েছি…”

“দেখে তো সেরকম কিছু মনে হচ্ছে না আর যাই হোক! নিজের দিকে ভাল করে তাকান! আপনি নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে আছেন, বাতাসে ভাসছেন না।”

আমি নিজের পায়ের দিকে তাকালাম। ওগুলো আসলেই ভাসছে না। তারমানে সেলসম্যানের কথা অনুযায়ী আমি আসলে বেঁচে আছি। আমি নিজে ইনজেকশন পুশ করার পরও মরিনি। আমি পিস্তলটা সেলসম্যানের দিকে তাক করলাম।

“আপনি আমাকে বোকা বানিয়েছেন! ওটার মধ্যে কোন ইয়থানাসিয়া ডাগ ছিল না!”

পিস্তলের লাইন অফ ফায়ার থেকে সরার জন্য সেলসম্যান আবার সিটে বসে পড়ল। ওর সারিতে বসা বাকি লোকজন চিৎকার করে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে কেবিনের মধ্যে বিশাল গন্ডগোল শুরু হল।

“এক মিনিট দাঁড়ান! আমি নিজেও বুঝতে পারছি না এখানে কি হচ্ছে।” সে চিৎকার করে বলল। সিট থেকে মাথা নামিয়ে রেখেছে। এক মুহূর্ত পর সে বড় করে ঢোঁক গিলল।

“ওইটা পরোই ডাক্তারের শয়তানি! সে আমাকে বোকা বানিয়েছে আর আমাকে নকল ডাগ দিয়েছে!”

আমি ওর দিকে পিস্তল ধরে থাকলাম।

“ওর কথা ভুলে যান! আমার কি হবে এখন? আমি আমার শান্তিময় মৃত্যু পাইনি, এখন সবার সাথে আমাকেও ক্রাশ করে মরতে হবে।”

তখনো সিটটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বসে থাকা সেলসম্যান দ্রুত মাথা নাড়ল। “দাঁড়ান দাঁড়ান! শান্ত হন। আপনি কি বুঝতে পারছেন

আপনার হাতে ওটা কি ধরে আছেন?”

“বোকার মত কথা বলবেন না!”

“আপনি যদি জানেন কি ধরে আছেন তাহলে সেটা আমার দিকে তাক করে আছেন কেন? আপনার তো ওটা অন্য কারো দিকে তাক করে থাকা উচিত, তাই নয় কি?” সেলসম্যান আমার পাশে দাঁড়ানো অল্প বয়সি ছেলেটার দিকে ইঙ্গিত করল। “ওর দিকে পিস্তল তাক করে বলুন আত্মসমর্পণ করতে।”

আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম। সে সিট থেকে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

“ওকে কেন আত্মসমর্পণ করতে বলব? আমি বাজি ধরে বলতে পারি ও প্লেন ক্রাশ করাতে চেয়েছিল।”

“আপনি একটা গাধা!”

অন্য যাত্রিরা ধুয়ে দিতে লাগল। আমি আরও পরিস্কারভাবে চিন্তা করার চেষ্টা করলাম, আর ওদের কথার অর্থ বুঝতে পারলাম। বুঝতে পারলাম যে আমি ছেলেটার অস্ত্র দখল করেছি মানে হল প্লেন আর ক্রাশ করতে যাচ্ছে না।

পিস্তলটা সেলসম্যানের দিক থেকে সরিয়ে ছেলেটার দিকে তাক করলাম। সেলসম্যানকে দেখে মনে হল হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

আমি ছেলেটাকে ক্ষমা প্রার্থনার সুরে বললাম। “দুঃখিত, কিছুক্ষণ আগেও আপনার পক্ষে ছিলাম আমি।”

সে স্রেফ তার মাথা ঝাঁকাল, তারদিকে যে পিস্তল তাক করা সেটা খেয়াল করার কোন নমুনা দেখাল না।

“চিন্তার কিছু নেই,” সে কাঁধ যাগ করে বলল আর ডান হাত জ্যাকেটের পকেটে ঢুকালো। আমার কাছে আরেকটা পিস্তল আছে।”

কেবিনের মধ্যে টেনশন আরেক ধাপ বাড়ল। যাত্রিদের কেউ কোন টু শব্দ করল না, এক বিন্দু নড়ল না। শুধু অল্প বয়সি ছেলেটার অভিব্যক্তি দেখে মনে হল সে সবকিছুর নিয়ন্ত্রনে আছে। জ্যাকেটের পকেটে হাত ভরে সে সোজা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

“আমার জ্যাকেটের পকেটে আরেকটা পিস্তল আছে। আমি এখন আপনাকে গুলি করব।”

আমি ওর ডান হাত ভালভাবে দেখতে পারছিলাম না। “একদম নড়বেন না,” আমি বললাম, “হাত যেখানে আছে সেখানেই রাখুন।”

“আপনি যদি গুলি খেতে না চান তাহলে আপনাকেই প্রথমে গুলি করতে হবে, সে শান্তভাবে হাসল। তারপর আবার বলা শুরু করল। “এক শীতের রাতে আমি পড়াশুনা করছিলাম, তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি দিনের আলো ফোঁটা শুরু করেছে। তখন আমি জানালা খুলে রাতের ঠান্ডা বাতাস ঘরের ভেতর ঢুকতে দিলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম নাক থেকে নিশ্বাস বের হয়ে ঠান্ডা ধোঁয়ার মত জমে যাচ্ছিল। পুরোপুরি সকাল হতেই আমি দেখতে পেলাম চারপাশ বরফে সাদা হয়ে আছে। আমার খুব খুশি লাগছিল কারন আমি আসলেই আমার পুরো মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করতে পেরেছিলাম। ওই সকালটাকে আমি ভালবাসি। এখন যেহেতু আমি অনেক মানুষ মেরে ফেলেছি, আমি আর সেই সুন্দর দৃশ্য কখনো দেখতে পাব না।”

বলতে বলতে সে তার ডান হাত জ্যাকেটের ভেতর থেকে বের করে আমার দিকে তাক করল। আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ট্রিগার টেনে দিলাম। হাতের তালুতে পিস্তলের রিকয়েলের ধাক্কাটা মনে হল যেন ভারি কোন বল এসে আঘাত করেছে। বাতাস স্যাঁত করে এসে আমার মুখে লাগল যেন বাতাস নিজেই ফেটে গিয়েছে। প্লেনের সবাই মাথা নিচু করে বসে পড়ল। অল্প বয়সি ছেলেটা করিডরে লুটিয়ে পড়ল। ওর ডান হাতে শুধু একটা ফাউন্টেইন পেন ধরা ছিল।

আকাশের রঙ বিকেল থেকে গোধূলিতে বদলে গেল আর আমি ওর সন্তানকে আমার কোলে নিয়ে ওর বাসায় বসে টিভি দেখছিলাম। ওর সন্তান ছিল একটা মেয়ে, কিন্ডারগারটেনের বয়সি। সে বাসায় একা ছিল। অপরিচিত একজনকে দেখে ওর মধ্যে কোন আড়ষ্টভাব দেখা গেল না, সহজেই আমাকে আপন করে নিল। আমার কোলে এসে বসল। আমরা একসাথে টিভিতে খবর দেখতে লাগলাম। একটু পরই সে ঘুমিয়ে পড়ল।

রুমের কোনায় রাখা টিভিটায় তখন দুপুরে ঘটা হাইজ্যাকিঙের খবরটা দেখাচ্ছিল। একটার পর একটা ছবি ভেসে আসছিল-প্লেন ল্যান্ড করার দশ্য, যাত্রিদের বের করে নেয়ার দৃশ্য, পলিশের প্রবেশের দৃশ্য ইত্যাদি। যাত্রিদের ছবির সময় এক ঝলক আমি আমার আর সেলসম্যানের চেহারা দেখতে পেলাম।

“আমার জীবনের সবচেয়ে জঘন্য ফ্লাইট ছিল এটা,” প্লেন থেকে নামার পর সেলসম্যানকে বলতে শুনেছিলাম কথাটা। সে দু পা দিয়ে মাটিতে বাড়ি দিয়ে নিশ্চিত হতে চাইছিল যে আসলে শক্ত মাটিতে আবার ফিরে এসেছে। “আশা করছি আবার অনেকদিন মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হবে না।”

আমাকে এম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল কারন আমি নিজের বাহুতে অজানা কোন তরল ইনজেক্ট করেছিলাম বলে আমাকে পরীক্ষা করা দরকার ছিল। আমার সাথে আরো অনেক যাত্রিকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল, মূলত বিভিন্ন সময়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার কারনে।

আমি নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছি, ভাবলাম। এমন সময় আমার কোলে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটা একটু নড়ে উঠল। আমার বুকে মুখ চেপে থাকল। দেখে মনে হচ্ছিল সুখি। একটা কন্ডোমিনিয়াম বিল্ডিঙের তিন তলায় এই অ্যাপার্টমেন্ট। জানালাগুলো দক্ষিণমুখি। যে কারনে রুমগুলোতে বেশ আলো ঢোকে। জানালার কাছে ফুলদানিতে কিছু ফুল রাখা। ওটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মূল দরজা খোলার শব্দ কানে এল।

“কই সবাই? আমি চলে এসেছি।” একজন পুরুষের কণ্ঠ, যা আমি স্কুলের পরে আর শুনিনি, কিন্তু এখনো স্পষ্ট মনে আছে। আমি হল দিয়ে তার পায়ের শব্দ ভেসে আসতে শুনলাম। তারপর লিভিং রুমের দরজা খুলে গেল। সে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল আমি ফ্লোরে বসে আছি আর ওর কন্যা আমার কোলে ঘুমাচ্ছে। আমাদের দৃষ্টি মিলিত হল। আমার স্মৃতির সাথে ওর চেহারার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। আমি বলব না অনেক আগে সে আমার সাথে কি কি করেছিল কিন্তু সেই ক্ষতগুলো এখনও আমার শরীরে, আমার মনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে।

“স্বাগতম,” আমি বললাম। এক মুহূর্তের জন্য সে আমাকে সন্দেহের চোখে দেখল। কিন্তু আমাকে মনে পড়তে তার বেশি সময় লাগল না। আর

সে এক পা সামনে এগুলো।

“তু..তুমি এখানে কি করছ…”

“আমি তোমাকে খুঁজে বের করেছি,” আমি বললাম। পাশে রাখা ছুরিটা হাতে নিলাম। এখানে আসার পথটা বেশ এডভেঞ্চারাস ছিল অবশ্য। আমার প্লেন হাইজ্যাক হয়েছিল, গোলাগুলি হয়েছিল…”

“আমার স্ত্রী কোথায়…” আমার হাতে ছুরি দেখে সে থেমে গিয়ে প্রশ্ন করল।

“শপিঙে, সম্ভবত। সে তোমার মেয়েকে এখানে একা রেখে গিয়েছে।” আমি ছুরিটা ঘুমন্ত মেয়েটার গলার কাছে ধরলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার নাম টিভিতে বলল। আমি স্ক্রিনের দিকে তাকাতে দেখলাম আমার চেহারার একটা ক্লোজআপ ছবি স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে। খবর পাঠক বলছিল উদ্ধারকৃত যাত্রিদের একজন আমি, আমাকে কিভাবে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, তারপর আমি নিখোঁজ। আমার মনে পড়ল পুলিশ হাসপাতালের রুমের বাইরে অপেক্ষা করছিল কিছু প্রশ্ন করার জন্য। আমি বলেছিলাম আমাকে টয়লেটে যেতে হবে, তারপর সোজা হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যাই। সে টিভির ছবির সাথে আমার চেহারা মিলিয়ে দেখল।

“তুমি কি পরিকল্পনা করছ?”

“আশ্চর্যজনক সব ঘটনা, আর তার সাথে কিছু দুর্ভাগ্য। তুমি কি কখনো ভেবেছিলে যে এরকম কোন কিছু তোমার সাথেও হতে পারে?”

“প্লিজ, আমার মেয়েকে ছেড়ে দাও।” সে হাঁটু মুড়ে ফ্লোরে বসল। কাঁদতে কাঁদতে সে আর তার বন্ধুরা আমার সাথে হাই স্কুলে যা করেছে তার জন্য মাফ চাইল। রুমের ভেতর একমাত্র শব্দ ছিল ওর ফোঁপানোর শব্দ। তারপর মূল দরজা খুলে গেল আর ওর স্ত্রী অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকল। শপিং ব্যাগ হাতে সে এসে লিভিং রুমে ঢুকল আর দেখল তার স্বামী ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে আছে আর আমার হাতে ছুরি। আর মহিলার চেহারা দেখে আমি পরিস্কার বুঝতে পারছিলাম কি হচ্ছে তা সে বুঝতে পারছে না। পিচ্চি মেয়েটার ঘুমন্ত মুখ আমার বুকে চেপে ছিল। অনেকক্ষণ আমরা কেউ কোন কথা বললাম না। মেয়েটার গলায় ছুরি ধরে রেখে আমি খবর দেখতে থাকলাম।

অবশেষে স্ক্রিনে একজন অল্প বয়সি যুবকের চেহারা দেখা গেল। খবর পাঠক তার অপরাধের বর্ণনা দিল। কিভাবে সে প্লেন হাইজ্যাক করেছে, কিভাবে কেবিন ক্রু আর যাত্রিদের খুন করেছে। আমার মনে পড়ল ও মারা যাওয়ার আগে আমাকে কি বলেছিল, সেই সুন্দর সকালের গল্প, চারিদিক সাদা হয়ে ছিল। আমি মেয়েটার গলা থেকে ছুরি সরিয়ে নিলাম।

“একদিনে দুজনকে খুন করতে পারব না আমি।”

আমি মেয়েটাকে কোল থেকে নামিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজার দিকে যাওয়ার সময় ওকে আর ওর স্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে যেতে হল আমার। ও মাথা নিচু করে ছিল, আমার দিকে তাকাল না, কিন্তু ওর স্ত্রী চেহারায় বিভ্রান্তি নিয়ে আমার দিকে তাকাল।

আমি ওর অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে ওর বিল্ডিং ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল বলে আকাশের রঙ তখন টকটকে লাল। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম, রাস্তায় লোকজনের সাথে ধাক্কা লাগতে লাগল। জানি না আমার গন্তব্য কোথায়, খালি জানি আমাকে দৌড়াতে হবে।

ওয়ারড্রব

রিয়ুজি ওর রুমের দরজাটা খুলে বলে উঠল, “অ্যাই, মিকি, শেষ পর্যন্ত তুমি আসতে পারলে! সুযোগ পেলে একটু আমার রুমে এসে তো? ফোনে তোমার সাথে যে বিষয়ে কথা বলেছিলাম তা নিয়ে আরেকটু কথা বলতে চাইছিলাম।”

রিয়ুজির রুমটা মূল বাড়ি থেকে আলাদা। ওর দরজার ঠিক বাইরেই একটা বাগান। রাতের বেলা ঠাণ্ডা বাতাস এসে রুমের তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলে।

মিকি ঐ দরজা দিয়েই এসে ঢুকল। ওর কাঁধ থেকে একটা হালকা কোট ঝুলছিল। নভেম্বরের শীতল রাতের মধ্যে সে সরাসরি ট্রেন স্টেশন থেকে এখানে এসেছে। মেয়েটার ডান হাতে লাল রঙের একটা বড় সুটকেস ধরা। ও মেঝের উপর বসে পড়ল।

“আমি এখনও বাড়ির ভেতর পা ফেলিনি। একটু বিশ্রাম না নিলেই নয়। তোমাদের বাড়িটা একদম পাহাড়ের মাথায়। এতটুকু হেঁটে আসতে গিয়ে আমি এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে আর পা নাড়াতে পারছি না।”

“সুটকেসটা তো বেশ বড়। তুমি কি এই পুরনো বাড়িতে পাকাপাকিভাবে চলে আসার ধান্দা করছ নাকি? আমার অবশ্য তাতে কোন সমস্যা নেই। আর আমি নিশ্চিত যে বাবা-মা এতে খুশিই হবেন। কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে একসাথে থাকতে তোমার কেমন লাগবে?”

পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে সুটকেসটায় আলতো ধাক্কা দিয়ে মিকি বলল, “তোমার সাথে দেখা করতে আসার আগে আমার এটা ইশিরোর রুমে রেখে আসার কথা।” ও এমনভাবে রিয়ুজির দিকে তাকাল যেন সে কোন নোংরা জন্তু। বাম হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে বুকের সামনে ধরে রাখল। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে ও এরকম করে। রিফুজি হেসে ওকে সোফায় এসে বসার আমন্ত্রণ জানাল।

“বেশি সময় লাগবে না। এখনই তো নয়টা বেজে গিয়েছে।” যেই মাত্র রিয়ুজি কথাটা বলল তখনই ঘড়িতে শব্দ করে নয়টা বাজল। “আমাকে অবশ্য আজকে রাতে এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে যেতে হবে। তুমি তো বোধহয় এই বাড়িতে দ্বিতীয়বারের মত এলে, তাই না?”

“তৃতীয় বার, যদি বিয়ের দিনটা ধর।”

“ভাইয়ার সাথে তোমার সব কেমন যাচ্ছে? ও কি তোমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে?”

রিয়ুজি দরজার দিকে এগুলো। ও সাইজে ছোটখাট একজন মানুষ, হাঁটেও ছোট ছোট পদক্ষেপে।

“দরজা লক করছো কেন?”

“এটা আমার স্বভাব। এই ওয়ারড্রবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রাখা আছে, তাই আমি সবসময় দরজা লক করে রাখার চেষ্টা করি।”

“কিন্তু রুমটা পরিস্কার রাখার ব্যাপারে তোমার যে একদমই কোন চিন্তা নেই তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। দেখে মনে হচ্ছে এখান দিয়ে কোন টাইফুন বয়ে গিয়েছে।”

মিকি রুমের মধ্যে চোখ বুলাল। রুমটা বেশ বড়, কিন্তু সবকিছু এলোমেলো। কাঠের মেঝেতে যেখানে সেখানে জামাকাপড়ের স্তূপ পড়ে আছে। এক কোনায় একটা মরচে ধরা লোহার বিছানা আর একটা কাঠের ডেস্ক-চেয়ার। ডেস্কের উপর একটা পুরোনো টাইপরাইটার। টাইপরাইটারের আশপাশ দিয়ে বইয়ের স্তূপ।

“তুমি কি এখানেই কাজ কর?”

“হ্যাঁ, তাই তো মনে হয়।”

রুমের মাঝামাঝি একটা লেদারের সোফা সেট রাখা। সেটার আশেপাশে আরো জামাকাপড়। যেখানে খোলা হয়েছে সেখানেই ফেলে রাখা হয়েছে। সোফার পাশে একটা নিচু কফি টেবিল। টেবিলের উপর আধ-খালি কফি কাপ রাখা। ধোঁয়া নেই দেখে মনে হচ্ছিল কফিটা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে।

“ঐ দরজাটা দিয়ে কি বাইরের ছাউনিতে যাওয়া যায়?” বিছানার পাশের দরজাটার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে মিকি জানতে চাইল।

“ঠিক ধরেছ। যা যা ব্যবহার করি না সেগুলো ওখানে নিয়ে রাখি। সবকিছু। আমার বই, ভাইয়ার পেইন্টিংগুলো। দেখতে চাও? ছাউনিটা একজনের থাকার জন্য যথেষ্ট বড়।”

মিকি মাথা নাড়ল। “অন্য কোন সময় দেখব নে।”

রুমটায় একটাই জানালা ছিল, বন্ধ করা। পর্দাগুলো পুরো সরিয়ে দেয়া ছিল যেকারনে রাতের অন্ধকারে জানালাটাকে আয়নার মত দেখাচ্ছে। মিকি ওর নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছে।

“কাঠের ওয়ারড্রবটা। ওটাকে চেনা চেনা লাগছে-ইশিরোর রুমেরটার মত একদম দেখতে, তাই না? দরজার উপর একই রকম কাঠের কাজ করা।”

“আমার বড় দাদি ওগুলো আমার জন্য একটা আর ভাইয়ার জন্য একটা কিনেছিলেন। এই ওয়ারড্রবগুলো লক করা যায়। মাঝে মাঝে অবশ্য লক ঠিকমত কাজ করে না।”

“ওগুলো দেখতে খানিকটা ভুতুড়ে মনে হয় না? বিশাল একটা কালো রঙের বাক্সর মত লাগে। ফুয়ুমির রুমেও কি একটা আছে?”

“না, ফুয়ুমির জন্মের আগেই বড় দাদি মারা গিয়েছিলেন।”

এই পরিবারে দুই ছেলে এক মেয়ে। তিনজনের মধ্যে শুধু ছোট ছেলে, রিয়ুজি এখানে বাবা-মায়ের সাথে থাকে। ও একজন ঔপন্যাসিক।

“ইশিরো কোথায়? ওর তো গতকাল আসার কথা।”

“ও তো বলল একটু হাঁটতে যাচ্ছে। খারাপ হল। এক ঘন্টা আগে পর্যন্ত ও আমার রুমেই ছিল। একটুর জন্য তোমাদের দেখা হল না। ও যখন বেরিয়ে যায় তখন আমি ছাউনিতে ছিলাম। ঐ জায়গাটা এই রুমের চেয়ে একটু বেশি গোছানো। যে কারনে ওখানে বসে পড়াশুনায় মনোযোগ বসাতে আমার কাছে সহজ মনে হয়। ইশিরো ঠিক কখন বেরিয়েছে তা বলতে পারব না, কয়েক মিনিট আগে ছাড়া আমার দরজা লক করার কথা মনে ছিল না।”

নার্ভাসভঙ্গিতে নিজের নখ কামড়াতে কামড়াতে রিয়ুজি লকটা আবার চেক করল ঠিক দিকে মুখ করে আছে কিনা। স্টেরিওটা তুলে সেটায় একটা সিডি ভরল। তারপর সোজাসুজি মিকির সামনে বসে পড়ল। মিউজিকটা একটু বেশিই জোরে বাজছিল কিন্তু রিয়ুজির সেটা নিয়ে কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হল না। ওর রুমটা মূল বাড়ি থেকে যথেষ্ট দূরে হওয়ায় অন্য কারোরও বিরক্ত হওয়ার কথা না। মিকি কথাটা বলার আগে এক মুহূর্ত ইতস্তত করল, ওর দৃষ্টি স্থিরভাবে কোন কিছুর উপর ছিল না।

“তো রিয়ুজি, ফোনে যা যা বলেছিলে তা কি আসলেই সত্যি? তোমার সাথে সিয়োরির দেখা হয়েছিল?”

“এক মাস আগে। একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কিছু কাজের ব্যাপারে আমার একটা ইন্টারভিউ ছিল। ও ছিল ওখানের লেখিকা যাকে কাজটা। করার জন্য নেয়া হয়েছিল। প্রথমে আমি বুঝিনি যে ও তোমার পুরোনো বন্ধু ছিল। পরিচয় হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর গিয়ে আমি জানতে পারি যে কলেজে ও তোমার সাথে একই ক্লাসে ছিল। তখন তোমরা বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলে তাই না? যাই হোক, সে যখন এইসব জানতে পারল তখন ওর মুখ শুকিয়ে গেল।”

রিযুজি গভীর দৃষ্টিতে মিকির চেহারার দিকে তাকাল যেন চেহারার রঙের কোন পরিবর্তন হলে তা ধরতে পারে। কিন্তু মেয়েটা চুপ করে ছিল।

“আমি ওকে কারনটা জিজ্ঞেস করতে চাইছিলাম। কিন্তু সে কিছু বলেনি। তবে একদিন আমি জেনে গেলাম। আমরা বারে বসে ড্রিঙ্ক করছিলাম।”

“মাতাল অবস্থায় ও তোমাকে কিছু বলেছে?”

“ও চিত হয়ে বারের টেবিলে পড়ে ছিল। আর গোঙাতে গোঙাতে কোন একটা এক্সিডেন্টের কথা বলছিল।”

মিকি একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

“ও একবার বলেছিল যে তোমরা দুজন একবার একটা গাড়িতে ছিলে আর তুমি সাইকেলে থাকা একটা জুনিয়র হাইয়ের ছাত্রকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলে। তোমরা একে অপরকে বলেছিলে ঘটনাটা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করতে। আর অন্য কাউকে যেন না বলা হয়। তারপর তুমি গাড়ি চালিয়ে বাড়ি চলে যাও।”

“আমাদের জানা ছিল না যে ছেলেটা মারা গিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম ও হয়ত একটু আহত হয়েছিল।”

“পরদিন যখন খবরটা কাগজে এল, দেখে তোমার কেমন লেগেছিল? তোমার কি অপরাধবোধ হয়েছিল? ভয় হয়েছিল? নাকি স্রেফ দুঃখবোধ করছিলে? আর এরপর থেকে বাকি জীবনটা কি তুমি পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয় পেয়ে এসেছ? অনুভুতিটা ঠিক কি রকম ছিল?”

নিয়জি সোফা থেকে উঠে মিকির দিকে তাকাল। ওর চোখগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোন বাচ্চা ছেলে লুকোনো গুপ্তধন পেয়েছে। “আমি চাই তুমি আমাকে সব খুলে বল, প্লিজ।”

“যাতে তুমি ইশিরোকে বলতে পার?”

“বোকার মত কথা বোলনা! তুমি কি এখনো বুঝতে পারোনি? আমি একজন লেখক! আমি তোমার গোপন সব বের করে নিয়ে, তোমার দুর্দশা নিয়ে সেগুলোকে শিল্পে রুপান্তরিত করতে চাই!”

ও ওর হাতগুলোকে ঈগলের নখরের মত বাঁকিয়ে উঁচু কর্কশ কন্ঠে চেঁচিয়ে বলল। ওর কাঁধ ফুলে উঠল, তারপর পিছিয়ে গিয়ে কাউচে ধপ করে পড়ল, যেন ক্লান্ত।

“অবশ্য, আমাকে তোমার এখনই বলতে হবে না।”

মিকি স্টেরিওর কাছে গিয়ে ভলিউমটা ঠিক করার চেষ্টা করল। মিউজিক আরো বেড়ে গেল।

“তুমি নিশ্চয়ই আর কাউকে বলোনি, নাকি?”

“আমি সবাইকে বলার জন্য মারা যাচ্ছি।”

“আমি চাই তুমি কোনদিন কাউকে কথাগুলো বলবে না।”

মিকি শেলফের কাছে গিয়ে পাথরের তৈরি একটা অ্যাষ্ট্রে তুলে নিল। বাড়ি দিয়ে ঔপন্যাসিককে মৃত্যুমুখে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য জিনিসটা একটা নিখুঁত অস্ত্র হতে পারে।

রিয়ুজি মিকির দিকে পেছন ফিরে সোফায় বসে ছিল।

“ইশিরো এসবের কিছুই জানে না তো তাই না?”

“তুমি মনে হয় জানো না, ও যদি জানেও তাহলেও তোমাকে ডিভোর্স দেয়ার মত লোক ও না। তুমি কি দেখে আমার ভাইয়ের প্রেমে পড়েছিলে বল তো? ও একটু পাগলাটে ধরনের।”

মিকি অ্যাস্ট্রেটা নামিয়ে রাখল।

“পাগলাটে মানে কি বলতে চাইছ?”

“ও একটু উচ্ছন্নে যাওয়া ধরনের। যে কারনে ওর পেইন্টিংগুলো এত ভাল বিক্রি হয়। আমার কাছে ওগুলোকে ভীতিকর মনে হয়। ছাউনিতে যেটা রাখা আছে ওটা গিয়ে দেখ একবার।”

মিকি ছাউনির দরজার দিকে ঘুরল। রিয়ুজি হাসল।

“কিরকম দম্পতি! একজন পাগল আরেকজন খুনি! একদম ক্লাসিক!”

“তা যদি বলতে চাও…”

***

তিন মিনিট পর।

রক্তাক্ত অ্যাস্ট্রেটা মিকির হাত থেকে পিছলে মেঝেতে পড়ার সময় ভারি শব্দ তুলল। রিয়ুজি, যাকে পেছন থেকে আঘাত করা হয়েছিল, তখনো সোফায় বসে আছে। শরীরের উপরের অংশ সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। পেছন থেকে মিকি ওর কাঁধ ধরে পিছনে টেনে আনল যাতে ওর ভারটা সোফার উপর এসে পড়ে। মিকি নিজের শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য গভীরভাবে কয়েকবার নিশ্বাস নিল। তারপর নিজের দুহাত মুখের সামনে এনে দেখল। আঙুল দশটা থরথর করে কাঁপছিল।

হঠাৎ করে দরজায় ঠকঠক শব্দ হল। হালকা ধরনের শব্দ, সসপ্যানের উপর ডিম ভাঙার সময় যেরকম শব্দ হয়। মিকি শক্ত হয়ে গেল, দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল।

“রিয়ুজি, ভেতরে আছে তুমি?” রিয়ুজির মায়ের গলা। “ভেতরেই আছ, তাই না? আমি মিউজিক শুনতে পাচ্ছি এখান থেকে। তোমার সম্পাদকের কাছ থেকে ফোন এসেছে।”

মিকি কিছু বলল না, স্টেরিওর দিকে ঘুরে তাকাল। মিউজিক তখন চলছিল।

“সব ঠিক আছে তো? আমি ভেতরে আসছি।”

দরজার নব ঘুরে গেল আর দরজাটাও কেঁপে উঠল। কিন্তু রুমের মৃত মালিক দরজাটা লক করে রেখে ছিল, তাই সেটা খুলল না। রিয়ুজির মা হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেলেন। মিকি এতক্ষন ধরে আটকে রাখা দমটা ছাড়ল। কিন্তু ওর অভিব্যক্তি আগের মতই কঠিন হয়ে ছিল। ও গিয়ে স্টেরিওটা বন্ধ হাত কপালের উপর রেখে মাথা ঝাঁকাল।

“এসব কি করে হল?”

লাশটার দিকে তাকাল ও।

“এখানে কি ঘটেছে?”

ও নিজের স্বর নিচু রাখল। চিল্লাচিল্লি করে কোন লাভ নেই।

“আমার ওকে এখান থেকে সরাতে হবে।”

কিন্তু লাশটা কোথায় সরাবে ও?

“ছাতার কোথায় লুকাবো এটা?”

বিশৃঙ্খল রুমটায় এদিক ওদিক তাকাল ও। সবখানে কাপড়-চোপড় পড়ে আছে, পা ফেলার জায়গা পর্যন্ত নেই। ও তাড়াতাড়ি কাপড় সব একত্র করে এক কোণায় নিয়ে জমা করল।

তারপর ওয়ারড্রবটার উপর চোখ পড়ল ওর।

“কাঠের তৈরি কালো একটা ওয়ারড্রব…একজন ঔপন্যাসিকের লাশ রাখার জন্য নিখুঁত একটা সাইজ।”

ও ঠিক করল ওয়ারড্রবটা পরীক্ষা করে দেখবে, কিন্তু দরজাটা খুলতে পারল না। রিয়ুজি বলেছিল, ও রুমের দরজার সাথে সাথে ওয়ারড্রবের দরজাও লক করে রাখে। ওয়ারড্রবের দরজার হাতলের সাথেই একটা সোনালী রঙের চাবির ফুটো।

ও রিফুজির পকেট হাতড়াল। কয়েকটা চাবি পেল। এর মধ্যে একটা ছিল পরনো ধরনের দেখতে, সোনালী রঙের।

“বাজি ধরে বলতে পারি এটাই সেই চাবি,” লকের ভেতর চাবিটা ঢুকিয়ে ঘোরাল সে।

***

দশ মিনিট পর।

মিকি রিয়ুজির লাশটা লুকিয়ে ফেলেছে। ছেলেটা ছোটখাট সাইজের হওয়ায় খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি। কিন্তু অনেক কাপড় চোপড় ছিল। রিয়ুজির জন্য জায়গা করতে ওকে কিছু কাপড় সরাতে হল। একগাদা কাপড় তুলে নিয়ে ও রুমের কোণায় বাকি কাপড়গুলোর সাথে নিয়ে রাখল।

বেরিয়ে যাওয়ার সময় ও শেষ বারের জন্য একবার কাপড়ের স্তূপের দিকে তাকাল। নিচের ঠোঁট কামড়ে ও বাম হাতটাকে মুঠি করে রাখল।

দরজাটা বন্ধ করে দিল। লকের ভেতর চাবির শব্দটা স্বাভাবিকের চেয়ে জোরে শোনাল। মিকি রিয়ুজির পকেটে পাওয়া সবগুলো চাবি, বেডরুমের চাবিসহ নিজের সাথে নিয়ে নিল। রুমের মধ্যে শুধু রয়ে গেল একটা ওয়ারড্রব আর তার ভেতরে থাকা মানুষটা।

পরদিন ব্রেকফাস্টের সময়।

মিকি টেবিলে এল। জানালার বাইরে আকাশটা গাঢ় মেঘে অন্ধকার হয়ে ছিল। হয়তো সে কারনেই মনে হচ্ছিল তখনো ঠিক মত ভোর হয়নি। এমন কি লাইটগুলো সব জ্বলে থাকার পরেও রুমের কোণাগুলোতে আলোর অভাব মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন পোকার ঝাঁকের মত অন্ধকার ঝুলে রয়েছে, হাত নাড়ালেও সরছে না।

অন্যদিনের চেয়ে তাপমাত্রার পার্থক্যও চোখে পড়ার মত ছিল। মিকি ওর কাঁধ কুঁচকে কেঁপে উঠল। বাড়িটা পুরাতন হওয়ার কারনে এখানে সেখানে ফাঁক ফোঁকর ছিল। যখনই কেউ হেঁটে যেত, মেঝের বোর্ডগুলো একটা আরেকটার সাথে লেগে যে শব্দটা হচ্ছিল তা কানে যন্ত্রণাদায়ক শোনাচ্ছিল।

“মা আমি কি কোন সাহায্য করতে পারি?”

“ওসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, মিকি, শুধু চেয়ার টেনে বসে পর

মিকি কথা মতই কাজ করল, একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়ল। ওর জন্য খাবার নিয়ে আসতে দেখল।

“মিকি!”

মিকি মাথা ঘুরিয়ে ওর পাশে বসা ফুয়ুমির দিকে তাকাল।

“গতরাতে কখন এসেছ তুমি? আমি তো খেয়ালই করিনি। রাতের বেলা রাস্তাঘাট একদম অন্ধকার হয়ে থাকে। হারিয়ে যাওনি নিশ্চয়ই? জঙ্গলটা বেশ বড়, আর বলার মত কোন স্ট্রিটলাইটও নেই। তোমার কি নিজেকে লিটল রেড রাইডিং হুডের মত মনে হচ্ছিল না?”

কথাগুলো বলার সময় হাসছিল ফুয়ুমি। ওর ত্বকের রঙ কিরকম অস্বাভাবিক নীলচে সাদা দেখাচ্ছিল, অথচ ঠোঁটগুলো গাঢ় লাল।

“হ্যাঁ, আমি ভয় পাচ্ছিলাম কখন একটা নেকড়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আমাকে আক্রমণ করে বসে।”

“কিন্তু মিকির নেকড়ে তো লিটল রেড রাইডিং হুডকে আক্রমণ করেছিল যখন সে ওর নানির বাড়িতে গিয়েছিল! তার অর্থ হল, আসল ভয়ের জায়গাটা জঙ্গলে ছিল না, ছিল বাড়িটায়!”

“সেটা তুমি ভালই বলেছ কিন্তু।”

ফুয়ুমি ওর আঙুলের ডগা দিয়ে প্লেটের খাবারটা খুঁচিয়ে দেখল। আঙুলটা এতটাই সাদা যে বিশ্বাস হচ্ছিল না আসলেই ওটার ভেতর দিয়ে রক্ত চলাচল করে কিনা।

“মিকি। তুমি কি কোন কারডিগান বা কিছু পরতে চাও? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে অনেক শীত লাগছে তোমার।”

মিকি পাতলা কাপড় পড়ে ছিল।

“না ঠিক আছে। আমার সাথে গরম কাপড় আছে। আমি শুধু পরার কথা চিন্তা করিনি।”

“কে ভেবেছিল রাতারাতি এরকম ঠাণ্ডা পড়ে যাবে?”

ফুয়ুমি ঘুরে শখানেক বছর বয়সি স্টোভটার দিকে তাকাল। স্টোভটা বিশাল, একজনের পক্ষে তোলা অসম্ভব, আর জং ধরা। স্টোভের উপর একটা চায়ের কেটলি রাখা যেটার মুখ থেকে হালকা ধোঁয়া বের হচ্ছিল। জানালাটা পানির ফোঁটায় ঢেকে আছে। ফুয়ুমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

“রিয়ুজি নাস্তার জন্য দেরি করে ফেলছে। বাকি সবাই এখানে উপস্থিত। আমি গিয়ে ওকে জাগাচ্ছি।”

সে উঠতে শুরু করলে মিকি ওকে থামাল।

“এখানে আসার সময় আমি ওর দরজায় নক করেছিলাম। কিন্তু দরজা বন্ধ ছিল। ও সম্ভবত ঘুমাচ্ছে। আমার মনে হয় ওকে ঘুমাতে দেয়াই উচিত। ও নিশ্চয়ই অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিল।”

একটার পর একটা মিথ্যা কথা।

“তা ঠিক। ও বলেছিল, রাতে ওর এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাবে। সে-কারনেই হয়ত এতক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছে কিংবা এমনও হতে পারে যে ও হয়ত রাতে বাসায়ই ফেরেনি। যেহেতু ওর দরজা সবসময় লক করা থাকে, তাই ও যে কখন রুমে থাকে আর কখন থাকে না তা আমি বুঝতেই পারি না।”

অতঃপর রিজিকে ছাড়াই নাশতা চলল। নীরবে নাশতা করার সময় সবাই শুনতে পাচ্ছিল যে লিভিং রুমে টেলিফোন বাজছে। মা উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরলেন। কয়েক মুহূর্ত পর ফিরে এলেন।

“কে ফোন করেছিল, মা?” ফুয়ুমি জিজ্ঞেস করল।

“রিয়ুজির বন্ধু। সে জানতে চাইছিল গতরাতে কেন রিয়ুজি যায়নি। ও দুশ্চিন্তা করছিল। আমি ওকে বললাম রিয়ুজি ঘুমাচ্ছে, উঠলে ওকে ফোন করবে।”

“তার মানে মনে হচ্ছে রিয়ুজি কালকে রাতে বাইরে যায়নি। আমার ভয় হচ্ছে ওর কোন অ্যাক্সিডেন্ট হল কিনা,” ফুয়ুমি বলল, নাশতা খাওয়া চালিয়ে গেল। ওকে দেখে মনে হল না তেমন কোন আগ্রহ আছে এ ব্যাপারে, “হয়ত ও আর বেঁচে নেই। কোন ধরনের ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট বা সেরকম কিছু হয়ত।”

“এভাবে বলছ কেন?” মিকি বলল, ওর চপস্টিকগুলো শূন্যে থেমে আছে। ফুয়ুমি মাথা কাত করে মিকির দিকে তাকাল।

“কোন সমস্যা?”

“না…”

“আমি ওর রুমে গিয়ে চেক করে দেখছি।” বাবা বললেন।

“বাবা, এরকম ছোটখাট সবকিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।” বাবাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে ফুয়ুমি বলল, কিন্তু ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়েছেন তিনি।

“উনি বললেন উনি গিয়ে দেখতে চান, কিন্তু দরজার লকের কি করবেন?” মিকি জিজ্ঞেস করল। ফুয়ুমি উত্তর দিল, “বাবার কাছে অতিরিক্ত চাবি থাকার কথা। তার কাছে ঘরের সবকিছুর অতিরিক্ত চাবি থাকে।”

“তাই নাকি?”

“ঐ দেখ, বাবা ফিরে এসেছে, রিয়ুজিকে কেমন দেখলে? ছিল ওর রুমে?”

“না। আমি ছাউনিটাও ঘুরে এসেছি, পুরোপুরি খালি। অবশ্যই ওর রুমটা বরাবরের মত আস্তাকুড় হয়ে আছে। কাপড়গুলো এক কোনায় স্তূপ করে রাখা। রুমের ভেতর তাহলে ওয়ারড্রবটা রাখার মানে কি? ওর যদি ওটা কাজেই না লাগে, সরিয়ে ফেললেই হয়।”

***

দুই ঘন্টা পর।

মিকি রিয়ুজির রুমে ঢুকে দরজাটা লাগাল। তারপর চারপাশে চোখ বোলাল। আগের রাতের থেকে কোন পার্থক্য চোখে পড়ল না। রুমটা এখনো আগের মত নোংরা।

ও সোফাটার দিকে এগিয়ে গেল, যেখানে বসে রিয়ুজি তার শেষ নিশ্বাস ফেলেছিল। ও চোখ বন্ধ করে হাতের আঙুলগুলো দিয়ে কপালটা চেপে ধরল, নিজেকে শোনাল এসব নিশ্চয়ই কোন দুঃস্বপ্ন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ খুলল আর সোফার উপর সাবধানে সূত্র খুঁজতে লাগল।

টেবিলের উপর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের কয়েকটা ফোঁটা দেখা গেল। রিয়ুজির বাবা যখন এসেছিলেন তখন ওগুলো খেয়াল করেননি নিশ্চয়ই। আর কোথাও কোন রক্তের চিহ্ন ওর চোখে পড়ল না। আশ্চর্যজনকভাবে রিয়ুজির খুব কমই রক্তপাত হয়েছিল। ও নখের ঘষায় শুকনো রক্তের একটা বিন্দু তুলে ফেলল। পরেরটা তুলতে যাবে এমন সময় ঠকঠক শব্দ হল দরজায়।

“মিকি, তুমি কি ভেতরে আছ? আমি তোমাকে ঢুকতে দেখেছি। আমাকে ঢুকতে দাও।” ফুয়ুমির গলা। মিকি এক মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করল, তারপর রিয়ুজির একটা শার্ট তুলে এনে টেবিলের উপর রাখল দাগটা ঢাকার জন্য। তারপর দরজার লক খুলে ফুয়ুমিকে ঢুকতে দিল। ফুয়ুমি ঢুকে রুমের ভেতর চোখ বোলাল।

“ওহ তুমি একা। আমি ভেবেছি রিয়ুজি হয়ত এতক্ষনে ফিরে এসেছে। তুমি এখানে কি করছ মিকি?”

“ইশিরো রিয়ুজির একটা বই চাচ্ছিল। তাই আমি এসেছিলাম সেটা নিতে।”

“ওহ? ভাল কথা ভাইয়া কোথায়?”

“ও একটু বেরিয়েছে। বলল লাঞ্চের আগে ফিরে আসবে।”

মিকি ছাউনির দরজার দিকে এগিয়ে গেল যেখানে রিয়ুজি ওর বইগুলো রাখে। ফুয়ুমিকে দেখে মনে হল না মিকির মিথ্যা বলা ধরতে পেরেছে।

“ভাইয়া আমাকে তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু বলেছে। এতকিছু যে যতদিনে তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছে, মানে বিয়ের দিনে, ততদিনে আমার মনে হচ্ছিল আমি তোমাকে ভাল করে চিনি।”

“ব্যাপারটা খানিকটা বিব্রতকর।”

“ও আমাকে বলেছে যে তোমার পরিবার অনেক ধনী। ইশ! আমার বাপটাও যদি ডাক্তার হত।”

“আরে বাজে কথা। আমার বাবা খুবই সাধারণ একজন গ্রামের ডাক্তার। আমাদের বাড়িটাও একদম সাধারণ ধরণের।”

“ভাইয়ার সবসময় সবকিছু গুছিয়ে রাখার অভ্যাস, ঘরের কাজে অনেক কষ্ট হওয়ার কথা তোমার। রিয়ুজি একদম উল্টো। ওর রুমের চেহারাটা দেখ! ওর বিয়ে হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। আমরা যখন এখানে আছি, আসো একটু গোছগাছ করার চেষ্টা করি।”

ফুয়ুমি সোজা কাপড়ের স্তূপের দিকে গেল আর একবারে যতটা সম্ভব কাপড় তুলে ওয়ারড্রবের দিকে নিয়ে গেল।

“ফুয়ুমি দাঁড়াও!” মিকি ছাউনি থেকে বেরিয়ে বলল। ও ফুয়ুমির দিকে দৌড়ে গিয়ে ওর হাত থেকে কাপড়গুলো কেড়ে নিল।

“মিকি, কি করছ তুমি? আমরা কাপড়গুলো ওয়ারড্রবে ভরে রাখলে জায়গাটা একটু ভাল দেখাত..।”– “কিন্তু ওটা খোলা যাবে না। ওয়ারড্রবের লকটা নষ্ট। আসলে ওটা মনে হয় লক করা, খুলবে না।” মিকির গলার স্বর বেড়ে গিয়েছিল। ফুয়ুমি ভু কুঁচকে ওর সাদা আঙুলগুলো দিয়ে ওয়ারড্রবের হাতলটা স্পর্শ করল।

“ঠিকই বলেছ। আটকানো। রিয়ুজি নিশ্চয়ই বের হওয়ার সময় চাবিটা সাথে নিয়ে গিয়েছে। আমার মনে হল আমরা যদি একটু পরিস্কার করতে পারতাম তাহলে ও খুশি হত।”

বলতে বলতে ফুয়ুমি টেবিলের উপর থাকা রিয়ুজির শার্টটা তুলে নিয়ে গোল করে পাকিয়ে রুমের কোনায় ছুঁড়ে ফেলল।

“ও যেখানে পারে সেখানেই ওর নোংরা জামা কাপড়গুলো ফেলে রাখে! ছাগল একটা!”

রক্তের দাগগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল।

“মিকি, কি হল? তোমাকে ভয়াবহ দেখাচ্ছে!”

ফুয়ুমি রক্তের দাগগুলো খেয়াল করেনি। মিকির হাতে ফুয়ুমির থেকে নেয়া কাপড়গুলো ছিল।

“কিছু না, আমরা কি যেতে পারি?”

ফুয়ুমি টেবিলে রক্তের দাগ দেখার আগেই ওরা বেরিয়ে গেল। দশ মিনিট পর ফিরে এসে মিকি দাগগুলোর ব্যবস্থা করল। তারপর ছাউনিতে গিয়ে একটা বই তুলে নিল।

***

ঘড়িতে দুপুর বারোটা বাজতেই মিকি ডাইনিং টেবিলে ফিরে এল। রিয়ুজি বাদে সবাই ওখানে উপস্থিত ছিল।

মিকি হঠাৎ থেমে গেল। ফুয়ুমি আর ওর মা মুখ কাছে নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছিল।

“সবকিছু ঠিক তো?”

“মিকি, দেখ! চিঠির বাক্সে এই অদ্ভুত চিঠিটা পেয়েছি।”

মিকি টেবিলের দিকে এগিয়ে ফুয়ুমির বাড়িয়ে দেয়া সাদা কাগজটা হাতে নিল। কাগজটা পড়ে ওর মুখ সাদা হয়ে গেল।

কাগজটায় টাইপ করে লেখা ছিল-”রিয়ুজি ওজিসিম খুন হয়েছে। ওকে ওর রুমের মধ্যেই আঘাত করে খুন করা হয়েছে।”

ফুয়ুমি উঠে দাঁড়িয়ে নিজের বুকের উপর হাত দুটো ভাঁজ করে রাখল।

“এরকম কিছু কে লিখতে পারে? মা, তুমি কি বাড়ির বাইরে কাউকে বলেছ যে রিয়ুজি উধাও? যে লোক এই চিঠিটা বাক্সে ফেলে গিয়েছে সে নিশ্চয়ই আমাদের বাড়ির উপর নজর রাখছে। আর এই ‘খুন’ এর ব্যাপারটাই বা কি? এই কথা সে কেন বলল?”

কাগজটা ফিরিয়ে দেয়ার সময় মিকি অসুস্থ বোধ করছিল।

“আমার শরীরটা খারাপ লাগছে।”

ফুয়ুমি ওর মরার মত সাদা হাত মিকির কাঁধে রাখল। মিকির মনে হল কেউ যেন ওর গলার কাছে বরফ দিয়ে স্পর্শ করেছে। কেঁপে উঠল ও।

“চিঠিটায় কোন ডাকটিকেট লাগানো নেই। কেউ নিশ্চয়ই এটা হাতে হাতে ফেলে গিয়েছে। রিফুজি ওর রুমে খুন হয়েছে…ওর রুমটা নিচ তলায় আর বাড়ির থেকে আলাদা। আমাদের চোখে না পড়ে একজন ক্রিমিনালের পক্ষে ওর রুমে ঢোকা খুবই সম্ভব। মিকি, লাঞ্চের পর তোমার সাথে একটু কথা আছে। একা কথা বলব। যেখানে তোমার খুশি। তোমার রুমে হলেই বোধহয় ভাল, মানে ইশিরোর রুমে আরকি। এই ধর আর এক ঘন্টার মধ্যে?”

এক ঘন্টা পর।

ফুয়ুমি রুমের ভেতর ঢুকে চোখ বোলাল।

“অনেকদিন পর ইশিরোর রুমে এলাম। এই ওয়ারড্রবটা একদম রিয়ুজির রুমেরটার মত দেখতে। যখন ছোট ছিলাম তখন মনে হত আমার কেন একটা নেই। অনেক হিংসা হত তখন।”

“দুঃখিত, রুমটা একটু অগোছালো হয়ে আছে।”

কাপড়চোপড় আর লাগেজগুলো রুমের এক কোণায় স্তূপ করে রাখা ছিল।

“রিয়ুজির রুমের সাথে তুলনা করলে এটা অনেক গোছানো। চিন্তা কোর না।”

ফুয়ুমি কিছুক্ষণ দেয়ালে ঝুলানো পেইন্টিংগুলো দেখল, তারপর ডেস্কের সামনে থেকে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল। পকেট থেকে সাদা কাগজটা বের করল।

“তোমার কি মনে হয় এই লোক সত্যি বলছে? রিয়ুজি, খুন হয়েছে..?”

“চিঠিটা…ওটাকি আসলেই চিঠির বাক্সে পাওয়া গিয়েছিল?”

“তুমি কি বলতে চাইছ এটা আমি লিখেছি?”

“না না তা বলিনি।”

“এটা আসলেই চিঠির বাক্সে ছিল। আমি ওখানেই পেয়েছি। কিন্তু আমার তোমাকে আরো ইন্টারেস্টিং কিছু বলার আছে। গতরাতে রিয়ুজির সম্পাদক ওকে ফোন করেছিল। মা বলল, মা নাকি নয়টার দিকে ওর দরজায় গিয়ে নক করেছিল। দরজা লক করা থাকলেও ভেতরে মিউজিক চলছিল তখন। তোমার কি মনে হয়?”

“আমার কি মনে হয় মানে…?”

“চিঠিতে লেখা আছে ও ওর নিজের রুমে খুন হয়েছে। শোনো আমার কি মনে হয় তোমাকে বলি। আমার মনে হচ্ছে মা যখন ওর রুমে গিয়েছিল, রিয়ুজি তখন ওখানেই ছিল। আমি অবশ্য নিশ্চিত হতে পারছি না। কিন্তু

আমার মনে হয় না ও মিউজিক চালিয়ে রেখে বাইরে চলে যাবে।”

ফুয়ুমি চেয়ার ছেড়ে উঠে রুমের মধ্যে পায়চারি করল।

“যদি এই চিঠির দাবি সত্য হয়, হয়ত খুনি খুন করার পর রিয়ুজির লাশ রুমের বাইরে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল, মিউজিক ছেড়ে রেখে। ইশিরো বলেছে ও কাল রাতে আটটা পর্যন্ত রিয়ুজির রুমে ছিল। ওরা কিছুক্ষণ গল্প করে, তারপর ইশিরো বেরিয়ে যায়। যতদূর মনে হচ্ছে রিজিকে শেষ দেখা ব্যক্তিটি হল ইশিরো।”

“তুমি কি বলতে চাইছ ইশিরো একজন ক্রিমিনাল?”

“না, একদমই না কিন্তু আমি জানি যে রিয়ুজির দরজা লক করে রাখার অভ্যাস আছে, আর এই ব্যাপারটাই আমাকে খোঁচাচ্ছে। কারো পক্ষে সোজা ওর রুমে ঢুকে ওকে খুন করা সম্ভব না। প্রথমে তাকে দরজার লক ভাঙতে হবে নয়তো দরজা ভাঙতে হবে। কিন্তু ইশিরো বলল ও যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন রিয়ুজির খেয়াল ছিল না। ও নিশ্চিত না ওর বের হওয়ার পর রিয়ুজি দরজা লক করেছিল কিনা। সুতরাং এমন হতে পারে যে ইশিরো বেরিয়ে যাওয়ার পর রাত আটটা থেকে কিছুক্ষণ দরজাটা লক করা ছিল না। মা নয়টার পরে গিয়ে দরজা নক করে। এর অর্থও হল কেউ একজন ভেতরে ঢুকতে আর বের হতে পেরেছিল। মিকি, তুমি সকালে রিয়ুজির রুমে ছিলে। তুমি বলেছিলে ইশিরো একটা বই চেয়েছিল আর তুমি সেটা নিতে গিয়েছিলে। তুমি আর আমি একসাথেই বের হয়েছিলাম রুম থেকে। দশ মিনিট পর তোমার বইটার কথা মনে পরে আর তুমি ফিরে গিয়ে সেটা নিয়ে আসো, তাই না?”

মিকি মাথা ঝাঁকাল। ঐ সময়ই ও টেবিলের রক্তের দাগগুলো মুছেছিল।

“যে বইটা তুমি এনেছিলে ছাউনি থেকে, সেটা এখন কোথায়? বইটার নাম কি? রিজির লাইব্রেরিটা খুবই ইন্টারেস্টিং, কিন্তু ওখানের কিছু বই নয়….”

“ওহ হ্যাঁ বইটা…কোথায় যেন রাখলাম সেটা?”

“কি হল? অন্য কোথাও রেখেছ?”

“না, আমি নিশ্চিত যে বইটা এখানে নিয়ে এসেছিলাম। আমি নিশ্চিত যে ওটা ওয়ারড্রবে রেখেছিলাম…”

কেবিনেটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মিকি নিজের পকেট হাতড়াল। ইশিয়োর ওয়ারড্রবটাও রিয়ুজিরটার মতই, লক লাগানো। মিকি একটা পুরাতন সোনালী রঙের চাবি বেছে নিয়ে সেটা চাবির ফুটোয় ঢুকালো তারপর মোচড় দিল।

“কোন সমস্যা?” ফুয়ুমি জিজ্ঞেস করল। মিকিকে দেখে মনে হচ্ছিল ওয়ারড্রবের দরজা খুলতে সারাজীবন লাগাচ্ছে।

“কাজ করছে না। মনে হচ্ছে লকটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। চাবি ঘুরল, লকটা খোলার কথা কিন্তু দরজাটা আটকে আছে।”

ও হাতলে আঙুল দিয়ে চেপে ধরে টান দিল, কিন্তু কিছুই হল না।

“হতে পারে…” ফুয়ুমি বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু তারপরেই মুখ বন্ধ করে ফেলল। ওর চোখগুলো বেরিয়ে আসছিল আর ওর অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোন ভয়াবহ খুনের দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে।

“কি হয়েছে?”

“কিছু না।” ফুয়ুমি উঠে দাঁড়িয়ে মিকিকে উপেক্ষা করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সে রাতেও মিকি রিয়ুজির লাশ সরানোর কোন সুযোগ পেল না।

***

রিয়ুজির মৃত্যুর পর দ্বিতীয় দিন সকালে বাড়ির প্রায় সবাই ব্রেকফাস্টের সময় জড়ো হল। মিকি শুনতে পাচ্ছিল যে ফুয়ুমি চিঠির বাক্সে দ্বিতীয় আরেকটা চিঠি পাওয়ার খবর সবাইকে জানাচ্ছে। প্রথম চিঠিটার মতই দ্বিতীয়টাও হাতে হাতে করে চিঠির বাক্সে রাখা হয়েছিল। প্রেরকের নাম লেখা নেই।

চিঠিটায় টাইপ করে লেখা ছিল-”রিয়ুজিকে খুন করা হয়েছে একটা অ্যাস্ট্রে দিয়ে।”

ব্রেকফাস্টের পর মিকি ওর রুমে ফিরে গেল যাতে ও আর ইশিরো হলের ভেতর হাঁটাহাঁটি করতে পারে। ওরা দেখল ফুয়ুমি দোতালার হলওয়েতে একটা বাইনোকুলার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হল জানালা দিয়ে কিছু একটা দেখছে।

“কি দেখছ?” মিকি জানতে চাইল। ফুয়ুমি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারা করল চুপ থাকার জন্য।

“আমি ধরার চেষ্টা করছি কে ঐ চিঠিগুলো রেখে যায়। আমি নিশ্চিত যে সে আশেপাশে কোথাও থেকে এই বাড়ির উপর নজর রাখছে।”

কথাগুলো বলার সময় ওর মুখ দেখে বোঝা যাচিল ও খুবই সিরিয়াস। চোখে বাইনোকুলার চেপে দেখছিল।

জানালার বাইরে এক সারি মলিন রঙের গাছ ছিল। মেঘগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। ঠাণ্ডা বাতাসের একটা ঝাপ্টা এসে মিকির মুখে লাগলো, ওর লম্বা চুলগুলো নড়ে উঠল। ওর নাকের নিচের ত্বক ঠান্ডায় লাল হয়ে ছিল, চোখগুলো দেখে মনে হচ্ছিল ওগুলো যে কোন সময় কান্নায় ফেটে পড়বে।

“তুমি চিঠিগুলোকে অনেক সিরিয়াসলি নিচ্ছ দেখা যাচ্ছে।”

“এমন না যে আমি লেখাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করছি। আমার কৌতূহলের যদি একটা পাই চার্ট বানাই তাহলে আমি একে ১২০ ডিগ্রী এর মত দিব।”

“কিন্তু যে ব্যক্তি চিঠিগুলো লিখেছে, সে কেন ভাবছে রিয়ুজি ওর রুমেই খুন হয়েছে? সে কি করে জানল যে একটা অ্যাস্ট্রে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে?”

“রিয়জুর রুমে একটা জানালা আছে না? যে কেউ বাইরে থেকে দেখতে পারে। যদি চিঠির লেখক ব্যক্তিটি জঙ্গলের ভেতর থেকে থাকে, তাহলে পাহাড়ের চূড়া থেকে বাড়ির আলোকিত জানালা দেখতে পাবে। তার পক্ষে দেখা কঠিন হবে না, একজন মানুষকে অ্যাস্টে দিয়ে খুন করা হচ্ছে। আমার পক্ষে দৃশ্যটা কল্পনা করতে একদমই কোন সমস্যা হচ্ছে না। যাই হোক, মিকি, তোমার কি কখনো এমন অনুভূতি হয় যে কেউ হয়ত তোমার দিকে তাকিয়ে আছে? মানে তোমাকে লক্ষ্য করছে বা দুর থেকে খেয়াল করছে ধরণের?।”

“তাকিয়ে আছে?” মিকি মাথা নাড়ল।

“তাই বুঝি? তাহলে এটা স্রেফ আমার কল্পনা।”

“ফুয়ুমি, আমার যা মনে হয় সেটা বলি। আমার মনে হয় যে চিঠিগুলো লিখেছে সে এই বাড়িরই কেউ।”

“এই বাড়ির কেউ?”

“হ্যাঁ। আর সেই সাথে, আমার ধারণা যে চিঠিটা লিখেছে সে নিজেই রিজিকে খুন করেছে। অবশ্য যদি ধরে নেই যে রিয়ুজি আসলেই খুন হয়েছে।”

ফুয়ুমি হাসল। “আমি তোমার বক্তব্য বুঝতে পারছি, মিকি। কিন্তু কেন একজন ক্রিমিনাল নিজের অপরাধের কথা চিঠি লিখে জানাতে যাবে? আর তোমার কি আসলেই মনে হয় যে এই পরিবারের কেউ রিজিকে খুন করতে পারে?”

মিকি চুপ করে থাকল। যে কোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, কোন যুক্তিরই কোন কারন দেখা যাচ্ছে না। যুক্তিগুলো একটা আরেকটার সাথে খাপ খাচ্ছে না। ওর সাদা কপালে এক বিন্দু ঘাম জমল।

“মিকি, আমার কোন ধারণা নেই কে চিঠিগুলো পাঠিয়েছে, কিন্তু একটা সন্দেহ আছে যে কে রিয়ুজিকে খুন করে থাকতে পারে,” ফুয়ুমি বলল, এবং হাসল। তারপর মুখটা মিকির কাছে এনে বলল, “আর আমার ধারণা তুমিও

সেটা জানো, ঠিক বলেছি না?”

***

লাঞ্চের সময়।

সবাই ডাইনিং টেবিলে এসে জড়ো হলে চিঠির কথাটা উঠল।

“আমার মনে কূ-ডাক দিচ্ছে। আমাদের মনে হয় পুলিশকে জানানো উচিত।”

“কিন্তু কে বিশ্বাস করে যে রিয়ুজি খুন হয়েছে? কাল সকাল পর্যন্ত দেখা যাক আর কোন চিঠি আসে কিনা। তারপর না হয় পুলিশকে জানানো যাবে।”

“বাবা তোমার কাছে এই বাড়ির সব চাবির কপি আছে তাই না? রিয়ুজির রুমের ওয়ারড্রবটার চাবি আছে?”

কথাগুলো বলতে বলতে ফুয়ুমি আড়চোখে মিকির দিকে তাকাল যে, কথাগুলো শুনে ঠোঁট কামড়ে আছে।

“না, আমার মনে হয় না ওয়ারড্রবের কোন অতিরিক্ত চাবি আছে। ও একটা কথা তোমাকে বলতে চাচ্ছিলাম, ফুয়ুমি, কিন্তু তুমি বাড়িতে না থাকায় আর বলা হয়নি। সব চাবির কপি আমি ছয় মাস আগে হারিয়ে ফেলেছি।”

মিকির চেহারা দেখে মনে হল অবাক হওয়াটা লুকানোর চেষ্টা করছে। “আপনি বলতে চাইছেন রিয়ুজির রুমের চাবিও?”

“হ্যাঁ। কোন অতিরিক্ত চাবি নেই। আমার উদাসীনতার কারনে ওগুলো হারিয়েছি। দোষটা আমারই।”

“আপনার কাছে যদি অতিরিক্ত চাবি নাই থাকে তাহলে গতকাল সকালে আপনি কি করে জানলেন যে রিয়ুজি ওর রুমে ছিল না?”

“রুম লক করা ছিল না। আমি ভেতরে গিয়ে দেখেছি।”

এরপর কিছুক্ষণ মিকি চুপচাপ খেল। খাওয়া শেষ হলে ও ফুয়ুমিকে বলল, “তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। দুটোর সময় রিয়ুজির রুমে এসো, শুধু আমরা দুজন। ঠিক আছে?”

ও যেমনটা আশা করেছিল, ফুয়ুমি মাথা নেড়ে সায় দিল।

“চমৎকার। আমারও তোমাকে জরুরি কিছু কথা বলার আছে।”

দুপুর ১টা ৫৮ মিনিট।

নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট আগে মিকি রিয়ুজির রুমে এসে ঢুকল, যেটা মূল বাড়ির থেকে আলাদা। খুনের রাতের মতই সোফায় গিয়ে বসল। একটু পরপর ওয়ারড্রবের দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল। নভেম্বর মাস, ঠান্ডার সময়। হিটার জ্বালানো ছিল না। ওর নিশ্বাস বেরিয়ে সাদা ধোঁয়ার মত দেখাচ্ছিল।

ফুয়ুমি দুটোর সময় হাজির হল। ওর পেছনে সবুজ ইউনিফর্ম পরা দুজনকে দেখা গেল। ওদের দেখে মিকি গুটিয়ে গেল।

“এরা কারা?”

“ওরা আমার কলিগ। ওরা আবার একটা জিনিসপত্র সরানোর কোম্পানিতে পার্টটাইম কাজ করে। আমি ওদেরকে বলেছিলাম কিছু বিশাল সাইজের বাতিল জিনিসপত্র সরাতে হবে, তাই ওরা এসেছে আমাকে সাহায্য করতে।”

“বিশাল সাইজের বাতিল জিনিসপত্র?”

ফুয়ুমি মাথা ঝাঁকাল, লোক দুজনের একজন কেবিনেটটার দিকে এগিয়ে গেল। সে তার হাতগুলো ছড়িয়ে ওটার প্রস্থ মাপল। অন্য লোকটা আঙুল দিয়ে ওয়ারড্রবটার দিকে ইঙ্গিত করে ফুয়ুমিকে কোন একটা প্রশ্ন করল।

“হ্যাঁ, এটাই। তোমরা কি এটা বের করে ট্রাকে নিয়ে রাখতে পারবে?”

“কি করছ তুমি?”

ফুয়ুমির ফ্যাকাসে চেহারাটায় হালকা একটা হাসি ফুটল যা ঠিক মত মানাল না।

“বাড়ির সামনে একটা ট্রাক রাখা আছে, ধার করে এনেছি। ওরা দুজন আমার জন্য ওয়ারড্রবটা বয়ে বাইরে নিয়ে যাবে।”

লোক দুটো ওয়ারড্রবের দুপ্রান্তে ধরে সেটাকে তুলল। একজন ফুয়ুমিকে কিছু একটা বলল।

“কি বল? অস্বাভাবিক রকমের ভারি? যেন ভেতরে কোন মানুষের দেহ ভরা আছে? হ্যাঁ ঠিক বলেছ। আমি নিশ্চিত সেটা সঠিক। সাবধানে নিও। ঝাঁকি লাগিও না। আর দয়া করে কোনভাবে এটা ফেলে দিও না যেন, কিংবা উপর নিচ করে ফেলল না।”

লোক দুটো ওয়ারড্রবটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। মেয়ে দুজন পেছন পেছন গেল।

“তো মিকি, তোমাকে এই কথাটাই বলার ছিল। তুমিই কাজটা করেছ। আমার মনে হয় তুমি বুঝতে পারছ কিসের কথা বলছি আমি।”

“তুমি ভুল করছ।”

“তাহলে আমাকে পুরো সত্যটা কি সেটা বল।”

রিয়ুজির রুমটা মূল বাড়ি থেকে আলাদা। তাই ওয়ারড্রবটা নিয়ে যাওয়ার পর ওরা দরজা দিয়ে বাইরের বাগানটা দেখতে পাচ্ছিল। ট্রাকটা ঠিক বাইরেই পার্ক করা ছিল।

“ট্রাকে ভোলার পর তুমি ওটা নিয়ে কি করবে?”

“আমি ভাবছিলাম পুলিশ স্টেশনের সামনে ফেলে আসব। আইডিয়াটা কেমন?”

ওয়ারড্রবটা একবার ফসকে যাচ্ছিল। “সাবধান!” মিকি চিল্লিয়ে বলল।

“মিকি তোমার কি মনে আছে, গতরাতে যখন আমরা ইশিরার রুমে কথা বলছিলাম? তুমি ওয়ারড্রবটা খুলতে গিয়েছিলে কিন্তু খোলেনি। তুমি জানো কারনটা কি?”

“তুমি মনে হচ্ছে কারনটা জানো?”

“গতরাতে তুমি বলেছিলে যে লকটা নষ্ট, তাই খুলছে না।”

“হ্যাঁ, আমি আজকে সকালেও চেক করেছি, নষ্ট ছিল। জোর দেয়ার স্কুগুলো নেই।” মিকি এমনভাবে বলল যেন অজুহাত দিচ্ছিল, ফুয়ুমি ওর কথা শুনে হাসল।

“কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি ওটা মোটেও নষ্ট ছিল না। তুমি শুধু তোমার ভুল ধরতে পেরেছিলে আর পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য বলেছ যে নষ্ট ছিল।”

“আমার ভুল?”

“আহ, বাদ দাও না। আর অভিনয় কোর না যে তুমি কিছু জানো না। গতরাতে ইশিয়োর ওয়ারড্রবে তুমি যে চাবিটা ঢুকিয়েছিলে সেটা ছিল ভুল চাবি। ওটা আসলে ছিল রিয়ুজির ওয়ারড্রবের চাবি, ঠিক বলেছি কিনা? দুটো ওয়ারড্রব দেখতে হুবহু একই রকম, চাবিও দেখতে একই রকম: পুরাতন আর সোনালী রঙের। আমি এটা জানি কারন ছোট থাকতে আমার ভাইয়েরা ওগুলো আমাকে দেখিয়েছিল। কিন্তু দেখতে এক রকম হলেও ওগুলো এক না। চাবিগুলো শুধু যার যার নির্দিষ্ট ওয়ারড্রবই খুলতে পারে।”

লোক দুটো ওয়ারড্রবটা ট্রাকের উপর উঠাচ্ছিল। মিকি আর ফুয়ুমি এক পাশে মুখোমুখি দাঁড়াল।

“গতরাতে তুমি বুঝতে পারানি যে চাবি দুটো মিলিয়ে ফেলেছ। তুমি রিয়ুজির চাবি দিয়ে ইশিয়োর ওয়ারড্রব খোলার চেষ্টা করছিলে। যখন ব্যর্থ হলে, তখন আমি বুঝতে পারলাম কি ঘটেছে। আমার মনে হয় চিঠিগুলো পড়ার পর আমার কিছু ধারণাও হয়েছিল। এরপর আমি চিন্তা করলাম তোমার কাছে কিভাবে রিয়ুজির ওয়ারড্রবের চাবি এলো। আর সেটাই আমাকে ওর ভয়ংকরতম পরিনতির কথা জানিয়ে দিল।”

লোক দুজন একটা দড়ি দিয়ে ওয়ারড্রবটাকে ট্রাকের উপর শক্ত করে বাঁধছিল যাতে নড়াচড়া না করে।

“এই ওয়ারড্রবে যাই লুকানো থাকুক না কেন, তুমিই তা সেখানে ভরেছিলে। এরপর লক করে রেখেছিলে যাতে কেউ জানতে না পারে। তারপর ওয়ারড্রবের চাবি আর রিয়ুজির রুমের চাবি তোমার পকেটে ঢুকিয়ে রাখো।”

ফুয়ুমি লোক দুজনের দিকে ঘুরল। “ধন্যবাদ, অনেক সাহায্য করলে। বাকি কাজ আমিই করতে পারব।”

ফুয়ুমি ধন্যবাদ জানানোর পর তোক দুজন তাদের মাথা বো করে নীরবে চলে গেল। শুধু মিকি আর ফুয়ুমি ওয়ারড্রবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল।

“এখন শুধু তুমি আর আমি আছি, মিকি,” ফুয়ুমি ওর হাতদুটো সামনের দিকে ভাঁজ করে বলল। মিকি মাথা নাড়ল।

“না, আমরা তিনজন আছি।”

ফুয়ুমি এক মুহূর্তের জন্য ওর কথাটা ধরতে পারেনি। তারপরই ওর মুখে ধূর্ত হাসিটা ফিরে এল। “আমি জানতাম। আমি জানতাম যে তুমিই রিয়ুজিকে খুন করেছ, আর ওর লাশটা ওটার ভেতর লুকিয়ে রেখেছ। তুমি লাশটা ওর রুমেই রেখে দিতে চেয়েছিলে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটা সরানোর কোন ব্যবস্থা করতে পার।”

“তুমি ভুল করছ! তুমি ভুল বুঝছ! আমি স্বীকার করছি যে দুই রাত আগে আমি রিয়ুজির রুমে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি ওকে খুন করিনি।”

“আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না।”

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করাবোটাই বা কিভাবে? আমি নিজেই জানি ব্যাপারটা এপর্যন্ত গড়াল কি করে? ঐ রাতে আসল ক্রিমিনাল সবার দৃষ্টি এড়িয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিল। আর আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম, আমার উপর সব সন্দেহ তো পড়বেই। যে কারনে আমি রিয়ুজির লাশটা লুকিয়েছিলাম। আমার সামনে আর কোন উপায় ছিল না!” এই পর্যায়ে এসে মিকি প্রায় চিল্লাচ্ছিল।

“ঐ রাতে, রিয়ুজি আমাকে ওর রুমে ডেকেছিল কিছু পুরাতন ঘটনা নিয়ে কথা বলার জন্য। মিউজিক জোরে জোরে বাজছিল, আর প্রায় তিন মিনিটের জন্য আমি ছাউনিতে ছিলাম। ও আমাকে বলেছিল যে ইশিয়োর কিছু পেইন্টিং ওখানে রাখা আছে। ছাউনি থেকে যখন আমি রুমে ফিরে আসি তখন ওকে আমি মৃত দেখতে পাই, মাথাটা ফাটা।”

“একটা অ্যাস্ট্রে দিয়ে, যেভাবে চিঠিতে লেখা ছিল?”

“হ্যাঁ ঠিক তাই। একটা রক্তাক্ত অ্যাস্টে টেবিলের উপর পড়েছিল। আমি ওটা হাতে নিয়েছিলাম-যে কারনে আমার হাতের ছাপ ওটার উপর পড়ে গিয়েছিল। অ্যাস্ট্রেটা আমার হাত থেকে পিছলে মেঝেতে পড়ে যায়।”

“তুমি বলছ ও যখন খুন হয়েছে তুমি তখন ছাউনিতে ছিলে?”

“আমি কিছুই শুনতে পাইনি কারন জোরে জোরে মিউজিক বাজছিল। তাই বুঝতে পারিনি কি হচ্ছিল। আমি ওর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কি করব, এমন সময় তোমার মা এসে দরজায় নক করেন এবং দরজাটা খোলার চেষ্টা করেন। তুমি জানো যে দরজাটা লক করা ছিল, তাই তিনি ঢুকতে পারেননি।”

“কেউ রুমের ভেতর ঢুকতে বা বের হতে পারেনি? তোমার কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে-আমি বলছি না তোমাকে আমি এখনই বিশ্বাস করছি বা সেরকম কিছু-তোমার কাহিনী যদি সত্যি হয় তাহলে ক্রিমিনাল এমন কেউ যার কাছে রিয়ুজির রুমে ঢোকার চাবি ছিল। তুমি যে সময়টা ছাউনিতে ছিলে, ঐ ব্যক্তি তখন চুপিসারে দরজার লক খুলে ভেতরে ঢোকে, অ্যাস্ট্রে দিয়ে রিয়ুজির মাথায় বাড়ি মারে, আবারও রুম থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর বাইরে থেকে আবার দরজা লক করে দেয়। ক্রিমিনালকে করতে হলে এসব কিছু করতে হবে।”

“কিন্তু রুমের চাবি তো রিয়ুজির পকেটে ছিল। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম যে ক্রিমিনালের কাছে নিশ্চয়ই অতিরিক্ত চাবি ছিল। মৃত লাশের সাথে একা থাকা অবস্থায় আমি যে দায়ী তাকে অভিশাপ দিচ্ছিলাম। কিন্তু পুলিশের কাছে যেতে চাইনি…”

মিকি থামল। ফুয়ুমি ওর মাথা কাত করে প্রশ্ন করল।

“কেন না? তুমি যা বলছ তা যদি সত্যি বলে থাকো, তোমার উচিত ছিল পুলিশকে সব খুলে বলা।”

মিকি দুহাতে ওর মুখ ঢাকল।

“এটাই আমার শাস্তি। এখন আমি আর পুলিশকে বলতে পারব না। আমাকে এই যন্ত্রণা নিয়ে সারাজীবন চলতে হবে…ঈশ্বর আমাকে এই শাস্তি দিয়েছেন, ঈশ্বর রিজিকে খুন করেছেন, আর যন্ত্রণায় ফেলেছেন আমাকে,

আর তিনি ঐ জঘন্য চিঠিগুলো পাঠিয়েছেন…”

“মিকি তুমি ঠিক আছে তো?”

“আমি দুঃখিত। আমার কিছু হয়নি…কোন একদিন হয়ত আমি তোমাকে আসল কারনটা বলতে পারব,” মিকি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল। ওর চোখগুলো লাল হয়ে ছিল। যদিও ও ফুয়ুমির দিকে সরাসরি তাকাচ্ছিল না।

“চল মূল বিষয়ে ফিরে যাওয়া যাক। প্রথমে আমি অতিরিক্ত চাবিগুলোর কথা চিন্তা করেছিলাম, যে কারনে তোমার বাবাকে সন্দেহ হয়েছিল।”

“বাবাকে? হুম ঠিক আছে, কারনটা বুঝতে পারছি। আমি তোমাকে বলেছিলাম যে তার কাছে সব চাবির কপি আছে। কিন্তু তিনি তো বলেছেন দেড় বছর আগে ওগুলো তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। হ্যাঁ, এমন হতে পারে, তিনি নিজেকে সন্দেহ থেকে দূরে রাখতে সেটা বানিয়ে বলতে পারেন। যেটাই হোক না কেন, খুনির কাছে অবশ্যই অতিরিক্ত একটা চাবি রয়েছে।”

“কিন্তু একটা বিষয় আমি বুঝতে পারছি না। গতকাল সকালে, রিয়ুজি যখন ব্রেকফাস্টে এল না, তোমার বাবা ওর রুমে গেলেন দেখতে। আগের রাতে আমি যখন রিয়ুজির রুম থেকে বের হয়েছিলাম তখন আমি ওর চাবি দিয়ে ওর রুম লক করে এসেছিলাম। সুতরাং তোমার বাবার পক্ষে দরজা খুলে ভেতরে দেখা সম্ভব নয় যদি না তার কাছে অতিরিক্ত একটা চাবি থাকে। সকাল পর্যন্ত আমার ধারণা সেটাই ছিল। কিন্তু তার কাছে অতিরিক্ত কোন চাবি নেই। গতকাল সকালে তিনি বলেছেন রিয়ুজির রুমের দরজা লক করা ছিল না। আমি একশত ভাগ নিশ্চিত যে রুম থেকে বের হওয়ার সময় আমি দরজা লক করে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু পরদিন সকালে দরজাটার লক খোলা ছিল।”

“আমরা যদি ধরে নেই যে বাবার কাছে এখনো অতিরিক্ত চাবি আছে তাহলে…আসলে, লোকটা বাবা নাকি অন্য কেউ সেটা অন্য বিষয়, গভীর রাতে কেন একজনের দরজার লক খোলার প্রয়োজন পড়ল? এমন কি হতে পারে যে তাকে রুমে যেতে হয়েছিল খুনের কোন প্রমাণ সরানোর জন্য? তারপর ফেরার সময় দরজা লক করতে ভুলে গিয়েছিল…”

“আরও সরল একটা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। হয়ত অতিরিক্ত চাবির দরকার ছিল না। তোমার বাবা আসলেই হয়ত সেগুলো হারিয়ে ফেলেছিলেন। এমন তো হতে পারে যে খুনির অতিরিক্ত চাবির কোন প্রয়োজনই পড়েনি।”

“অ্যাঁ?”

“রিয়ুজি যখন আমাকে ওর রুমে ডেকেছিল, খুনি হয়ত ইতিমধ্যেই ওখানে ছিল। রুমের ভেতর। সে আমার ছাউনিতে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে, তারপর ঐ সুযোগে রিয়ুজিকে খুন করেছে। তারপর রুমের মধ্যেই আবার লুকিয়ে পড়েছে। এটাই হয়েছে। একদম সহজ ব্যাখ্যা।”

“তারমানে, তুমি বলতে চাইছ তুমি রুমে থেকে অপেক্ষা করছিল কখন তুমি বেরিয়ে যাও?”

“হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমি যখন রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম, রিয়ুজির চাবি দিয়ে দরজা লক করে দিলাম, খুনির পক্ষে আর সম্ভব হয়নি বের হওয়ার

সময় দরজা লক করে যাওয়ার। যে কারনে দরজার লক খোলা ছিল।”

“কিন্তু রিয়ুজির রুমে জায়গা কোথায় খুনির লুকানোর জন্য?”

মিকি চুপ করে ওয়ারড্রবের দিকে তাকিয়ে থাকল। ফুয়ুমির চেহারা দেখে মনে হল প্রথমে সে ব্যাপারটা ধরতে পারেনি। কিন্তু যখন ও বুঝল তখন অস্ফুটে বলে উঠল, “অ্যাঁ? তুমি বলতে চাইছ..?!”

“পুরো রুমের মধ্যে ওটাই একমাত্র জায়গা যেখানে কেউ লুকাতে পারে। সে ওখানে লুকিয়ে ছিল আর আমি ছাউনিতে যাওয়ার পর বেরিয়ে এসেছিল। তারপর অ্যাস্ট্রেটা নিয়ে রিয়ুজির মাথায় বাড়ি মারে। তারপর আবার ওয়ারড্রবে লুকিয়ে পড়ে। এটাই হয়েছে বলে আমার ধারণা।”

“আমি তো ভেবেছি রিয়ুজির লাশ ওয়ারড্রবে লুকানো হয়েছে।”

“আমিও প্রথমে সেটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু অনেকবার চেষ্টা করেও আমি দরজাটা খুলতে পারিনি। লকের ভেতর চাবি ঢুকিয়ে আমি এদিক ওদিক ঘুরিয়ে চেষ্টা করেছি, কিন্তু মনে হচ্ছিল সেটা কোথাও আটকে যাচ্ছে, তাই আমি ভেবেছিলাম লকটা নষ্ট। রিয়ুজি বলেছিল যে লকটা মাঝে মাঝে ঝামেলা করে। আমি ভুল করে ভেবেছিলাম যে ও বুঝিয়েছে চাবিটা হয়ত একটু বেঁকে যাওয়ার কারনে মাঝে মাঝে কাজ করে না। কিন্তু আসলে ঐ রাতে হয়ত কেউ একজন ওয়ারড্রবের ভেতর থেকে কিছু একটা করেছিল যে কারনে লকটা কাজ করছিল না। যেহেতু আমি ওটার দরজাটা খুলতে পারিনি তাই আমি ওটার ভেতর লাশটা লুকাতে পারিনি। আশেপাশে তাকানোর পর আমার চোখ পড়ে আমার আনা সুটকেসটার উপর। রিয়ুজি ছোটখাট মানুষ ছিল। তাই আমার মনে হল ওকে সুটকেসে ভরে ফেলা যাক।”

“তাহলে তুমি ওকে খুনের অস্ত্রটাসহ সুটকেসে ভরে ফেলেছিলে?”

“হ্যাঁ, অ্যাস্ট্রেটায় আমার হাতের ছাপ ছিল। অবশ্য সুটকেসে আমার জামাকাপড় ছিল। লাশটা ভরার কোন জায়গা ছিল না। আমি সব কাপড় চোপড় বের করে লাশটা ঢুকাই। কাপড়গুলো রুমে ফেলে যাই।”

“তাহলে ঐ কাপড়গুলো তোমার ছিল? মেয়েদের কাপড়?”

“হ্যাঁ। আমি চাইনি ওগুলো কারো চোখে পড়ক। তাহলে সন্দেহ হত। রুমের কোণায় ইতিমধ্যে কাপড়ের একটা স্তূপ ছিল। আমি আমার কাপড়গুলো নিচে লুকিয়ে ফেলি। সবাই ঘুমানোর পর এসে নিয়ে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়নি।”

“সেকারনেই পরদিন সকালে তুমি শুধু পাতলা কাপড় চোপড় পরে ছিলে। বদলানোর মত কোন পোশাক তোমার কাছে ছিল না। এরপর তুমি রিয়ুজির রুমে গেলে তোমার কাপড় চোপড় আনতে, বই ধার করতে নয়। আমি যখন পড়ে থাকা কাপড়চোপড়গুলো ওয়ারড্রবে রাখার জন্য গেলাম তখন তুমি উতলা হয়ে পড়লে। আমার কাছ থেকে ওগুলো কেড়ে নিলে। তোমার এই অদ্ভুত আচরণ নিয়ে অবাক হয়েছিলাম আমি। তুমি ভয় পেয়েছিলে যে কাপড়ের স্তূপের মধ্যে আমি একজন নারীর পোশাকও দেখে ফেলতে পারি। অন্য কথায় বললে, তোমার পোশাক।”

“ঠিক তাই। আমার ব্রা তোমার হাতের কাছ থেকে ঝুলছিল।”

“তাহলে আবারও সেই প্রশ্ন। খুনটা কে করেছে?”

“জানি না। ঐ রাতে, রিয়ুজির রুম থেকে ইশিয়োর বেরিয়ে যাওয়া আর আমার ঢোকার মধ্যবর্তী সময়টায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও দরজাটা লক করা ছিল না। সে সময়ে যে কেউ ঢুকে থাকতে পারে।”

“দাঁড়াও দাঁড়াও। এক মিনিট। তুমি আমি যখন ইশিয়োর রুমে কথা বলছিলাম, তখন তুমি দুই ওয়ারড্রবের চাবির মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিলে না?”

মিকি মাথা ঝাঁকাল। “সেজন্যই আমি ভেবেছিলাম লকটা নষ্ট। আসলেই ওটা খুলছিল না। খুনের রাতে খুনি ওয়ারড্রবে লুকিয়ে ছিল আর দরজা লাগিয়ে রেখেছিল। আমি চাবির ফুটোয় ঠিক চাবিটাই ঢুকিয়ে ঘুরিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম আমি সেটা খোলার চেষ্টা করছি, কিন্তু আসলে সেটা লক করে দিয়েছিলাম। ভেতরে যে ছিল সে সেখানে আটকা পড়ে গিয়েছিল। ওকে লকটা ভেঙে বের হতে হয়েছিল। আর ইশিরোর ওয়ারড্রবের লকটাও যখন নষ্ট দেখা গেল, সেটাও সম্ভবত এই কারনেই হয়েছিল। খুনি পুরোটা সময় ওয়ারড্রবে লুকিয়ে ছিল, আমাদের কথাবার্তা শুনছিল। খেয়াল করলে দেখবে দুটো দরজার মাঝখানে ছোট একটা ফাঁক আছে। সে হয়ত ফাঁকটায় মুখ চেপে সবকিছু দেখতে পাচ্ছিল।”

ফুয়ুমির কিছু একটা মাথায় এল। “ঠিক তাই! এটাই ঠিক…লোকটার জানার কোন উপায় ছিল না যে তুমি তার পেছনে লেগেছ কিনা। আর আজকে সবার সামনে তুমি যখন বললে তুমি আমার সাথে কথা বলতে চাও, আর সময় আর জায়গাটাও বললে,..”

“আমি ধরে নিয়েছিলাম লোকটা ওয়ারড্রবে এসে লকাবে।” মিকি হাতের মুঠি দিয়ে ওয়ারড্রবের পাল্লার উপর কিল দিল।

“তারমানে এর ভেতর এখন কোন লাশ নেই, যে আছে সে হল খুনিটা। যে দেখতে এসেছিল তুমি আর আমি কি নিয়ে কথা বলি।”

ফুয়ুমি ওয়ারড্রবের উপর কিল দিল। “কেউ কি ভেতরে আছে? থেকে থাকলে উত্তর দাও। পাল্লায় শব্দ করলেই হবে।”

ফুয়ুমি আর মিকি তাদের হাত ভাঁজ করে ট্রাকের উপর রাখা ওয়ারড্রবের দিকে তাকিয়ে থাকল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবকিছু নীরব হয়ে থাকল।

তারপর কেবিনেটের ভেতর থেকে একটা টোকার শব্দ ভেসে এল। মেয়ে দুজন একে অপরের দিকে তাকাল।

“কেউ একজন আসলেই ভেতরে আছে!” ফুয়ুমি অবাক হয়ে বলল।

“তুমি কি রিয়ুজিকে খুন করেছ? করলে দুবার টোকা দাও। না করে থাকলে একবার,” মিকি বলল।

দু বার টোকার শব্দ হল। হ্যাঁ।

“তুমি কি চিঠিগুলো পাঠিয়েছ?” ফুয়ুমি জানতে চাইল। হ্যাঁ।

“তুমি কি চিঠিগুলো একারনে পাঠিয়েছ যাতে লাশটা পাওয়া যায় আর সবাই আমাকে খুনি মনে করে?” মিকি জানতে চাইল।

না।

“এসব কি আগে থেকে পরিকল্পনা করা ছিল?” ফুয়ুমি প্রশ্ন করল।

না।

“…এর কারন কি আমার অতীত?” মিকি যন্ত্রণাগ্রস্থ মখে জানতে চাইল।

হ্যাঁ। “রিয়ুজি তোমাকে বলেছিল?” মিকি জানতে চাইল। হ্যাঁ।

“তুমি রিজিকে খুন করতে চেয়েছিলে কারন ও আমার গোপন ব্যাপারটা জানত, আর তুমি আমাকে এর জন্য আরো শাস্তি দিতে চেয়েছিলে?” মিকি প্রশ্ন করল।

হ্যাঁ। “চল দেখা যাক ভেতরে কে আছে।”

ও কথাটা বলার পর ফুয়ুমি আস্তে করে পাল্লাগুলো খুলল। ওয়ারড্রবের ফাঁক দিয়ে ওর সাথে আমার চোখাচোখি হল। আমার স্ত্রী আর আমার বোনের মুখ থেকে সমস্ত রক্ত সরে গিয়েছিল। ওদেরকে একদম মৃত লাশের মত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল।

ওয়ার্ডস অফ গড

আমার মা ছিলেন খুবই বুদ্ধিমতি। তিনি যখন ছোট ছিলেন, তখন কঠিন কঠিন সব বই পড়তেন এবং এক সময় নামকরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। তিনি ছিলেন খুবই সুন্দরি আর স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে নিজ থেকে যোগদান করতেন। তার এলাকার সবাই তাকে ভালবাসত। তিনি যখন মেরুদন্ড টানটান করে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন তখন তাকে শীতকালে লেকে দাঁড়ানো আভিজাত্যপূর্ণ বকের মত দেখাত। তার ছিল বুদ্ধিপূর্ণ এক জোড়া চোখ, যা ধুলোহীন চশমার ভেতর দিয়ে পুরো দুনিয়া চেয়ে চেয়ে দেখত।

আমার মায়ের যদি একটা অসঙ্গতি থেকে থাকে তাহলে সেটা ছিল তিনি তার পোষা বিড়াল আর ক্যাক্টাসের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারতেন না। যে কারনে, একবার আমাদের বাড়ির বিড়ালটাকে চেপে ধরে মাটিতে পুঁতে তার উপর পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। আবার আরেকবার একটা ক্যাক্টাস গাছকে বিড়াল ভেবে মুখের সাথে ঘষতে শুরু করেছিলেন। ফলাফল যা হয়েছিল তা হল তার মুখ ছিলে কেটে রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল।

আমার বাবা আর ভাই আমার মায়ের এরকম রহস্যজনক কর্মকাণ্ড দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করত কেন তিনি এমন করতেন। অন্য সব ক্ষেত্রে বুদ্ধিমতি আমার মা তাদের প্রশ্ন উপেক্ষা করে বিড়ালের খাবারের একটা ক্যান খুলে অনড় ক্যাক্টাস গাছের উপর ঢেলে দিতেন।

এর সব কিছুই হয়েছিল আমার দোষে। আমি একটা ভুল করে ফেলেছিলাম আর সেজন্য আমি দুঃখিত।

***

যখন আমি অনেক ছোট ছিলাম, আমাকে প্রায়ই বলা হত যে আমার কণ্ঠ খুবই সুমধুর। নিউ ইয়ার্স কিংবা গ্রীষ্মের বুদ্ধিস্ট সোল ফেস্টিভ্যালের সময় আমরা যখন নানু বাড়ি যেতাম, তখন আমাদের সব আত্মীয়, যাদের সাথে বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া দেখা হত না, তারা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। আমি খুব একটা সামাজিক ধরনের ছিলাম না কিন্তু তারা কয়েকটা ড্রিঙ্ক নিতেন, আমি তাদের কৌতুকে হাসতাম আর তাদের কথায় মনোযোগ দিচ্ছি প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কথা বলতাম। এমনকি ভাব নিতাম যে তাদের বুঝতে কষ্ট হওয়া গ্রাম্য উচ্চারন বুঝতে কোন কষ্টই হচ্ছে না।

“তুমি আসলেই একটা ভাল ছেলে,” আমার খালা আমাকে বললেন, আমি উত্তরে মলিন একটা হাসি হাসলাম। সত্যি কথা হচ্ছে আমি মোটেও কোন ভাল ছেলে ছিলাম না। আমার হৃদয় ছিল পঁচন ধরে কুঁচকে যাওয়া। আমি সেফ অভিনয় করতাম।

আমার আত্মীয়রা আমাকে যত ভাল ভাল কথাই বলতেন না কেন আমি কখনো খুশি হতে পারতাম না। সবসময় বিরক্ত বোধ করতাম, আমার শুধু ইচ্ছে করত কোথাও পালিয়ে যাই। কিন্তু আমার ভয় ছিল যদি আমি আমার আত্মীয়দের থেকে পালিয়ে যাই তাহলে তাদের সাথে আমার সব সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। যদিও তারা কি বলতেন তাতে আমার কোন আগ্রহ ছিল না কিন্তু তারা আমার কাছ থেকে যে উষ্ণ প্রতিক্রিয়া আশা করতেন তা দেয়া ছাড়া আমার কাছে কোন উপায় ছিল না। ‘

সে সময়ে নিজের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা ছিল। সেফ চাইতাম, লোকজন আমাকে ভাল মনে করুক তাই অর্থহীন একটা হাসি মুখের সাথে ঝুলিয়ে রাখতাম। কিন্তু আসলে আমি ছিলাম ঘৃণ্য।

“তোমার কণ্ঠ যেন সঙ্গীতের মত, একদম স্ফটিকের মত স্বচ্ছ,” একজন কমবয়সি যুবতী আত্মীয় আমাকে বলেছিল। আমার নিজের কানে আমার কণ্ঠ বিকৃত আর জঘন্য শোনাত, মনে হত কোন জানোয়ার মানুষের অনুকরন করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

আমার কণ্ঠের শক্তি ব্যবহার করার প্রথম স্মৃতি যেটা আমার মনে আছে, তখন আমি প্রথম গ্রেডে পড়ি। ক্লাসের শিক্ষা কার্যক্রম অনুযায়ী আমাদেরকে মর্নিং গ্লোরি চাষ করতে হচ্ছিল। আমাদের রোপণ করা চারাগুলো স্কুলের বাইরের দেয়ালের সাথে সারি করে রাখা থাকত। আমার মর্নিং গ্লোরিটা ছিল বেশ বড়-সেটার সবুজ লতা পাতাগুলো আলতো করে ঠেক দেয়া কাঠিটাকে জড়িয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছিল। এর চওড়া পাতায় জমে থাকা শিশির বিন্দু সকালের সূর্যের আলোকে আকর্ষণ করত। আর এর নরম, পাতলা, অর্ধস্বচ্ছ পাপড়িগুলোর রঙ ছিল লালচে বেগুনী বর্ণের।

কিন্তু আমার মর্নিং গ্লোরিটা ক্লাসের মধ্যে সেরা ছিল না। আরেকটা ছিল আমারটার চেয়েও বড় আর আরো বেশি সুন্দর। আমার তিন সিট সামনে একটা ছেলে বসততা যে ছিল একজন দ্রুত দৌড়বাজ। নাম ছিল ইয়ুচি। ও ছিল অনেক প্রাণবন্ত, সারাক্ষণ বকবক করেই যেত, থামত না। আমি মাঝে মাঝে ওর সাথে কথা বলতাম, তবে আমার আগ্রহ ওর কথার চেয়ে ওর অভিব্যক্তির কিভাবে পরিবর্তন হয় তার উপর বেশি ছিল। ও ক্লাসে বেশ জনপ্রিয় ছিল, আর আমার মনে হত সেটার কারন সুকানো ছিল ওর অভিব্যক্তির মধ্যে। যখনই আমি ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম, ভাল করে ওর চেহারা খেয়াল করতাম। আমিও ওর মত একই রকম প্রতি মুহূর্তে অভিব্যক্তি বদলাতে চাইতাম, যেটা মনে হত ওর ভেতর থেকে বুদবুদের মত ফুটত।’

যাইহোক, আমার মনে হয়েছিল ওর এই অভিব্যক্তির পরিবর্তন ইচ্ছাকৃত ছিল না। কিংবা আমার মত চমৎকার ছেলে হওয়ার মত কোন ইচ্ছা থেকেও ওগুলোর উৎপত্তি ছিল না। তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু মনের ভেতর আমি নিজেকে ইয়ুচির চেয়ে ছোট বোধ করতাম।

আমার ক্লাসমেটরা সবাই ইয়ুচি আর আমার কথায় মজা পেত। সে হয়ত বন্ধুত্বপূর্ণ কোন একটা বিষয় নিয়ে কথা শুরু করল আর আমি এর সাথে সরস কিছু একটা যোগ করলাম। ও আমাদের এই ছোট খেলাটা উপভোগ করত, আর প্রতিবার এক গাল হেসে “হেই হেই!” বলে উঠত। কিন্তু আমার কখনো মনে হয়নি ও আমার একজন সত্যিকারের বন্ধু। আমি শুধু নকল একটা হাসি মুখে ধরে রেখে ওর সম্ভাষণের সাথে তাল মিলিয়ে মজার কিছু একটা উত্তর দিতাম।

তো ইয়ুচির মর্নিং গ্লোরিটা ছিল ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে সুন্দর। টিচার যখনই ওর ফুলের প্রশংসা করতেন, আমার খুবই খারাপ লাগত। আমার মনে হত যেন আমার ভেতর থেকে একটা নোংরা প্রাণী চামড়া কুঁড়ে বেরিয়ে এসে চিৎকার করতে চাইছে। বলাবাহুল্য ঐ নোংরা প্রাণীটা ছিল আমার আসল রূপ।

একদিন সকালে আমি অন্যদিনের চেয়ে একটু আগে স্কুলে পৌঁছেছিলাম। ক্লাস রুমে তখন কেউই ছিল না। চারদিক নিস্তব্ধ। নিজের মুখোশটা কিছুক্ষণের জন্য খুলে রেখে সহজ হলাম।

ইয়ুচির টব কোনটা তা সহজেই বুঝতে পারছিলাম। অন্য সব চারাগুলোর থেকে সেটা মাথা উঁচু করে ছিল। আমি টবটার দিকে উবু হয়ে ফুলটার দিকে তাকালাম, পাপড়িগুলো মাত্র মেলতে শুরু করেছে। আমি আমার পেটের নিম্নংশে জমে থাকা অন্ধকারের শক্তির উপর মনোনিবেশ করলাম।

“তুই খসে পড়বি…তুই মরে যাবি আর পঁ-চে…”

আমি দুহাত একসাথে করে শরীরের সমস্ত পেশির সব শক্তি আমার কণ্ঠের উপর নিবদ্ধ করলাম। মাথার ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল আর টের পেলাম আমার নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। রক্তের ফোঁটাগুলো কংক্রিটের মেঝের উপর রঙের মত লাল গোল গোল দাগ সৃষ্টি করছিল।

আর অমনি চারা গাছটার কান্ড আর মাথা ঝুলে পড়ল।যেন মাথাটা এক কোপে কেটে ফেলা হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা পর, ইয়ুচির মর্নিং গ্লোরি কুঁচকে গিয়ে নোংরা বাদামি বর্ণ ধারণ করল। কিন্তু তাতেও ইয়ুচি গাছটা ফেলল না, ওখানেই রেখে দিয়েছিল। খুব শিগগিরি ফুলটা থেকে বিচ্ছিরি গন্ধ ছড়াতে লাগল। বাজে গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে আজবাজে পোকা এসে ওখানে হাজির হল। নোরা টবটার মধ্যে খুঁয়োপোকার মত কিলবিল করতে লাগল। টিচার ঠিক করলেন মরা গাছটা ছুঁড়ে ফেলে দেবেন, আর ইয়ুচি কাঁদতে শুরু করল। আর আমার মর্নিং গ্লোরি ক্লাসের মধ্যে সেরা স্থান দখল করল।

আমার ভাল মুডটা আধা ঘন্টার জন্য বজায় ছিল। এর পর আমি আর সেটা নিতে পারছিলাম না। কেউ আমার ফুল সম্পর্কে ভাল কিছু বললে আমার মনে হচ্ছিল কান চেপে বসে থাকি।

যে মুহূর্তে আমি ইয়ুচির ফুলের টবের জাদু করেছিলাম সে মুহূর্ত থেকে আমার নিজের মর্নিং গ্লোরিটা একটা আয়নার রূপ ধারন করেছিল। আমার ভেতরে থাকা নোংরা প্রানিটাকে প্রতিফলিত করছিল, যা দেখতে আমার সহ্য হচ্ছিল না।

***

আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না কেন ইয়ুচির ফুলটা আমার ইচ্ছা মেনে নিয়ে মৃত্যুবরণ করল। ঐ সময়ে আমি প্রথম গ্রেডে পড়তাম কিন্তু আমার কণ্ঠের ক্ষমতা আবছাভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। যদি বাচ্চাদের কেউ আমার উপর ভয়ানক রেগে যেত তাহলে তাদেরকে শান্ত করার ক্ষমতা আমার ছিল। মতের অমিল ধরণের কিছু ঘটলে, আমি তখন ছোট একটা বাচ্চা ছিলাম যদিও কিন্তু আমি অন্যদেরকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে পারতাম। এমনকি বড়রাও আমার সামনে মাথা নত করে বো করত।

ধরা যাক একটা ফড়িং, বেড়ার রেলিঙের উপর বিশ্রাম করছে, সাধারণত আপনি যদি হাত বাড়িয়ে ওটাকে ধরতে যান তাহলে সে দ্রুত পাতলা ডানাগুলো নেড়ে উড়াল দেবে। কিন্তু আমি যদি ওটাকে হুকুম করি

নড়ার জন্য, তাহলে ফড়িংটা একদম শক্ত হয়ে জমে যাবে-এমনকি আমি যদি ওর পা কিংবা ডানা টেনে ছিঁড়ে ফেলি তবুও।

ঐ সময়ে, প্রথম গ্রেডে থাকতে, আমার মনে আছে যে, আমি প্রায়ই আমার কণ্ঠের ক্ষমতা ব্যবহার করতাম। তখন থেকে আমি আমার এই ক্ষমতা অনেক মানুষের উপর বহুবার ব্যবহার করেছি, এমন অনেকের উপর যাদেরকে আমি কিনা চিনতামও না।

ইলিমেন্টারি স্কুলের শেষ বর্ষে একটা বিশাল আকারের কুকুর আমাদের এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। কুকুরটা তার বাড়ির গেটের পেছনে লুকিয়ে থাকত আর সামনে দিয়ে কোন পথচারী গেলেই ঘেউ ঘেউ করে উঠত। সে লাফ দিয়ে শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করত যতক্ষণ না গলার সাথে লাগানো ভারি চেইনটা তাকে টেনে ধরত। চেইনের টানে কলারটা গভীরভাবে গলার উপর বসে পড়ত। জন্তুটা নিজের শ্বদন্তগুলো বেচারা পথচারীদের উপর বসানোর জন্য মরিয়া হয়ে ছিল। কুকুরটার সম্ভবত কোন ধরনের চর্মরোগ ছিল, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লোম উঠে চামড়া বের হয়ে থাকত। আর এর চোখগুলো ক্রোধে আগুনের মত জ্বলতে থাকত। কুকুরটা এলাকার মধ্যে বেশ পরিচিত ছিল, আর আমরা একজন আরেকজনের সাহস পরীক্ষা করতাম ওর কত কাছে যেতে পারে সেটার বাজি দিয়ে।

একদিন আমি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কুকুরটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমাকে দেখে সে এমনভাবে গর্জন ছাড়ল মনে হল যেন ভুমিকম্প হচ্ছে। ঐদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করার।

“তুই আমার উপর চিল্লা-বি না…”

বিস্ময়ে কুকুরটার কানগুলো কেঁপে উঠল, চোখগুলো বড় বড় করে সে চুপ করে গেল।

“তুই আমার হুকুম মান্য করবি। তুই আ-মা-র কথামত চলবি…আ-নু-গ-ত্য…”

আমার মনে হচ্ছিল মাথার ভেতর যেন আতশবাজি ফুটছিল। একই সাথে নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে ফুটপাথের উপর পড়তে লাগল। স্বীকার করছি আমি আমার বন্ধুদের কাছে নিজেকে জাহির করতে চাইছিলাম। আমি দেখাতে চাইছিলাম যে আমি এই ভীতিকর কুকুরটাকে একটা নিরীহ খেলার সামগ্রীতে পরিণত করতে পারি।

ছেলেমানুষি ব্যাপার হলেও পরিকল্পনাটা ঠিকমতই কাজ করেছিল। আমি যা চাইছিলাম, কুকুরটা তাই করছিল। থাবা তুলে আমার হাতের উপর দেয়া, ডিগবাজি দেয়া, ইত্যাদি। আর ক্লাসমেটদের মধ্যে আমি দলের নেতা বনে গেলাম।

প্রথম প্রথম ব্যাপারটা আমাকে আনন্দিত করেছিল। আস্তে আস্তে আমার অনুশোচনা হতে লাগল। এসব কি করছি আমি? একজন সুপারহিরো সাজার চেষ্টা করছি? বাস্তবে তো আমি একটা গোল্ডফিস শান্ত করার সাহসও রাখিনা। অন্য লোককে ঘোল খাওয়ানোর জন্য আমার অপরাধবোধ হচ্ছিল।

সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার ছিল কুকুরটার চোখগুলো। আমার ক্ষমতা ব্যবহারের আগে কুকুরটার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলত। এখন ওকে নিরীহ দেখায়। কুকুরটার লড়াকু আত্মাটা আমি ছিঁড়ে ফেলেছি। ওর চোখের দিকে তাকালে, যেগুলো, একসময় ছিল হিংস্র আর এখন কাঁদোকাঁদো কোন ছোট কুকুর শাবকের মত, দেখার পর আমার নিজেকে নিজেই গালি দিতে ইচ্ছা হয়।

এমনিতে আমার কণ্ঠের ক্ষমতা মনে হয় অসীম, কিন্তু কিছু ব্যাপার আমি খেয়াল করলাম। প্রথমত, শুধুমাত্র জীবিত বস্তুর উপর আমার কণ্ঠ কাজ করে। গাছ আর পোকাও ঠিক আছে। কিন্তু পাথর কিংবা প্লাস্টিকের কোন কিছু আমি চিৎকার করে বাঁকাতে চাইলেও কাজ হয় না।

দ্বিতীয়ত, একবার আমি আমার কণ্ঠ ব্যবহার করে কোন নির্দেশ দিলে তা ফিরিয়ে নেয়া যায় না। একদিন আমার মায়ের সাথে আমার খানিকটা মতের অমিল হয়েছিল। কোন কিছু না ভাবেই আমি ফিসফিস করে বললাম, “তুমি আর বিড়াল আর ক্যা-ক্টা-সের মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারবে না!”

আবাগের বসে কথাটা বলা, এর ফলাফল কি হতে পারে তা আমি তখন বুঝতে পারিনি। মা আমার অনুমতি না নিয়ে আমার রুমে ঢুকেছিলেন, আর সবকিছু গোছগাছ করার সময় ধাক্কা মেরে আমার প্রিয় ক্যাক্টাসটা ফেলে দিয়েছিলেন। কথাটা বলে আমি তাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে তার কাছে তার বিড়াল যতটা পছন্দের, আমার কাছে আমার ক্যাক্টাসটাও ততখানি মূল্যবান।

পরে যখন মাকে তার বিড়ালটাকে ক্যাক্টাসের মত মাটিতে পুঁততে দেখলাম তখন অনুশোচনা হতে শুরু করল। একি করেছি আমি! আমার ব্যাপারটা আগেই বোঝা উচিত ছিল। আমার পছন্দ মত কিছু না হলে আমার কষ্ঠ ব্যবহার করে মানুষের মাথা আউলিয়ে দেয়া অবশ্যই অপরাধের মধ্যে পড়ে।

তাই আমি মায়ের উপর আবার আমার ক্ষমতা ব্যবহার করার চেষ্টা করলাম যাতে তিনি বিড়াল আর ক্যাক্টাসের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন। কিন্তু তিনি আর কখনোই তা পারলেন না।

আমার কণ্ঠ শুধু যে মানুষের মনে পরিবর্তন আনতে পারত তাই নয়, তাদের শরীরের উপরও প্রভাব ফেলতে পারত। আমি পশুপাখির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতাম, যেভাবে অনেক বছর আগে মর্নিং গ্লোরির উপর ফেলেছিলাম।

হাই স্কুলে ওঠার পরেও আমি আমার বড়দের মাথা খাওয়ার স্বভাব গেল না। আমি আমার এই বদঅভ্যাসটা কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। আর আমার কাছে এটা ছিল আমার কাপরুষতার প্রমাণ। আমি সবসময় মানুষের সাথের মিথস্ক্রিয়াকে ভয় পেতাম, যেন ডিমের খোসার উপর হাঁটছিলাম, ভয় পেতাম যে আমার কোন কাজ তাদের চোখে আমার মূল্য ধূলিসাৎ করে দিবে। কখনো কারো সাথে কথা হলে মনে হত লোকটা মনে হয় আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আমার মনে হত তারা বোধহয় অন্য কোথাও গিয়ে অন্যদের সাথে আমার খুঁত নিয়ে হাসাহাসি করছে। আমি দুনিয়ার ব্যাপারে এতটা ভীত সন্ত্রস্ত ছিলাম যে এর সামনে দাঁড়াতে পারছিলাম না। এ কারনে মনের সত্যিকারের অনুভূতিগুলোকে ঢাকার জন্য আমি মুখের উপর নকল হাসির মুখোশ পরে থাকতাম। এর পেছনে যে শ্রম খরচ হত সেটাও আমাকে বিপর্যস্ত করে তুলত।

আমার বাবা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। তিনি ছিলেন ঐ ধরনের মানুষ যার চেহারা দেখলে খাড়া গিরিখাতের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে, যেখানে কিনা কোন গাছপালা শেকড় বসাতে পারে না। তিনি তার দুই পুত্রের দিকে উপর থেকে এমনভাবে নিচের দিকে তাকাতেন যে আমার মনে হত স্বর্গীয় কিছুর দিকে তাকাচ্ছি। সবকিছুর ব্যাপারে তার ছিল কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি আর যা তার পছন্দ হত না তার পেছনে এক বিন্দু সময় খরচ করার ধৈর্য তার ছিল না। একবার তিনি যদি কোন কিছুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে জিনিসটা মূল্যহীন, তাহলে তিনি সেটার প্রতি পুরোপুরি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন। তার কাছে তখন সেটার মূল্য কোন কীটপতঙ্গের থেকে ভিন্ন কিছু মনে হত না।

বাবাকে না জানিয়ে আমি একটা ইলেক্ট্রনিক গেম কিনেছিলাম। ছোট সস্তা একটা জিনিস। এরকম খেলনা যে কোন ইলিমেন্টারির স্কুলে পড়া বাচ্চার কাছেই থাকে। জিনিসটা আমার হাতের তালুর সমান বড় ছিল খুব বেশি হলে। আমার বাবার কম্পিউটার গেমস সম্পর্কে উঁচু ধারণা ছিল না। এবং তিনি যখন জিনিসটার খোঁজ পাবেন, তখন অবশ্যই আমার উপর খুব অসন্তুষ্ট হবেন। আমি শুধু দৃশ্যটা কল্পনা করেই অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

আমার ছোট ভাই বাবার কথামত চলত। তার গেম খেলার প্রয়োজন হলে গেম সেন্টারে যেত। ওর যদি পড়াশুনা করার ইচ্ছা হত তাহলে এক বসাতে পেন্সিল ফুরিয়ে ফেলার মত পড়াশুনা করতে পারত। বাবা-মায়ের অসন্তুষ্টি ঘটালে ও এভাবে তার মূল্য চুকাতে পারত। অবশ্য ওকে কখনো কোন অসন্তুষ্টির সামনে পড়তে হয়নি যদিও। কিন্তু আমি অমন ছিলাম না। আমি আমার বাবার থেকে মনোযোগ আর একটুখানি ভালবাসা পাওয়ার জন্য জানপ্রান দিয়ে পড়াশুনা করতাম। কার কাছে আপনি জানতে চাইছেন তার উপর নির্ভর করে, লোকজন আমাকে সাধারণত আমাকে দেখে হাসি খশি প্রাণবন্ত একটা বালক মনে করত। অবশ্যই সেটা বাইরের রূপ ছিল।

একদিন আমি আমার রুমে বসে গোপনে আমার গেম খেলছিলাম। কোন আওয়াজ না দিয়ে হঠাৎ করে বাবা দরজা খুলে রুমে ঢুকলেন। একদম কোন পুলিশ অফিসার যেভাবে দরজায় লাথি দিয়ে ক্রাইম সিনে প্রবেশ করে সেরকম। তিনি আমার হাত থেকে গেমটা কেড়ে নিয়ে ঠাণ্ডা চোখে তাকালেন।

“আচ্ছা তাহলে তুমি এই কাজ করছিলে!” তিনি রাগী কণ্ঠে আমাকে বললেন।

কাজুয়া যদি গেমটা খেলত তাহলে বাবা কিছু বলতেন না। দ্বিতীয় সন্তান তার আদর্শে বড় হবে এরকম ধ্যান ধারণা আমার বাবার ছিল না। যে কারনে তার বড় সন্তানের প্রতি, আমার প্রতি তার প্রত্যাশা ছিল বেশি, সেই সাথে রাগটাও ছিল বেশি।

সাধারণত আমি হয়ত কেঁদে ফেলতাম আর তার কাছে মাফ চাইতাম। কিন্তু ঐ মুহূর্তে আমি হয়ত তার প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করেছিলাম, কিংবা হয়ত মনে হয়েছে আমি আক্রমণের মধ্যে পড়েছি। যেটাই হোক, আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম যে আমার সাথে অন্যায় করা হচ্ছে। আমার ভাই যা খুশি করতে পারে অথচ আমার ক্ষেত্রেই যত সব নিষেধাজ্ঞা। আমার মনে হচ্ছিল এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র আমি একটা গেম খেলতে চাইছিলাম সেজন্য। কোন কিছু চিন্তা না করেই আমি বাবার বাম হাত আঁকড়ে ধরলাম। মরিয়াভাবে আমি আমার গেমটা ফেরত পেতে চাইছিলাম। এমনিতে আমি হয়ত আমার আনুগত্যর মুখোশ পরে চুপ করে বসে থাকতাম, জীবনে এই প্রথম বার আমি বাবার বিরুদ্ধে লড়াই করলাম। তিনি বাম হাতে শক্ত করে গেমটা ধরে থাকলেন, ছাড়লেন না। আমি আমার কণ্ঠের শক্তি ব্যবহার করে বললাম : “ঐ আ-ঙু-ল-গুলো! খসে পড়বে!”

কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাদের মধ্যের দূরত্বটা আমার কণ্ঠের কম্পনে ভরে গিয়েছিল। আমার মাথার ভেতরে রক্তনালিগুলোর টানটান অবস্থা অনুভব করতে পারছিলাম। গেমটা ঠাস করে মেঝেতে পড়ে গেল। তারপর এক এক করে আমার বাবার হাতের আঙুলগুলো মেঝেতে খসে পড়ে গড়িয়ে আমার পায়ের কাছে এসে থামল। পুরো পাঁচটাই, একদম নিখুঁতভাবে তার হাতের জয়েন্ট থেকে খুলে গিয়েছিল। আঙুলহীন হাতটা থেকে রক্ত ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পুরো মেঝে উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করেছিল। আমার নাক থেকেও রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল।

বাবা চিৎকার করতে শুরু করলেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি তাকে নির্দেশ দিলাম যে যথেষ্ট হয়েছে, মুখ বন্ধ কর। এবং তিনি থামলেন। কণ্ঠ থেমে যাওয়ায় তার চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল, ব্যথায় এবং আতংকে। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তিনি তার আঙুলহীন বাম হাতের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

আমার বমি বমি লাগছিল। একগাদা রক্ত বের হল আমার নাক থেকে। মাথা ঘোরাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল অজ্ঞান হয়ে যাব। বুঝতে পারছিলাম না আমার কি করা উচিত। আঙুলগুলোকে জায়গামত ফিরিয়ে আনার আর কোন উপায় ছিল না। একবার কথা বলে ফেললে তা আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না।

বাবাকে অজ্ঞান করে ফেলা ছাড়া আমার সামনে আর কোন উপায় ছিল না, যতক্ষণ না কিছু একটা ভেবে বের করতে পারছি। “ঘুমাও!” তাকে নির্দেশ দিলাম। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানতাম যে আমার কণ্ঠের ক্ষমতা লোজন সংজ্ঞাহীন থাকলেও তার উপর কাজ করে। জেগে থাকা অবস্থায় আমার ক্ষমতা ব্যবহার করার ব্যাপারটা আমাকে আরো নার্ভাস করে তুলত, তাই তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়াটাই আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল।

বাবা মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় আমি তার কানে ফিসফিস করে বললাম, “বাম হাতের ক্ষতগুলো ঠিক হয়ে যাবে,” আর “তুমি যখন জেগে উঠবে তখন আমার রুমে যা যা ঘটেছে সব কিছু ভুলে যাবে।” প্রায় সাথে সাথেই তার বাম হাতের ক্ষতের উপর যেখানে আঙুল ছিল, সেখানে পাতলা নতুন চামড়া গজাল। সাথে সাথে রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেল।

আমাকে আমার বাবাকে বিশ্বাস করাতে হবে যে তার বাম হাতে আঙুল থাকার বিষয়টা পুরোপরি স্বাভাবিক। আমাকে এর চেয়ে বেশিই করতে হবে যাতে অন্য কেউ তার বাম হাত দেখে অস্বাভাবিক কিছু মনে না করে।

এটা কিভাবে করব তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম। সামনে থাকা কাউকে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে পরিবর্তন আনতে পারি আমি, কিন্তু দুনিয়ার বাকি সবাইকে কি করে বোঝাব?

মাথায় একটা বুদ্ধি এল, আমি এই কথাগুলো বললাম:

“পরবর্তীবার যখন তুমি চোখ খুলবে, তুমি তোমার হাতের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করবে যে হাতটা আগে থেকে এরকমই ছিল। আর সবাইকে বোঝাৰে যে হাতের এই বিকলাঙ্গতা একদম স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।”

. এভাবে আমি বাবার হাতের প্রতি অন্য লোকজনের প্রতিক্রিয়া। সামলাতে পারব। আমি হাতটাকে নির্দেশ দিলাম, “স্বাভাবিক হাতের মত আচরণ কর।”

তারপর রুমের রক্ত পরিস্কার করলাম। খসে পড়া আঙুলগুলো টিস্যু পেপারে মুড়ে ডেস্কের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলাম। আবার জামাকাপড়েও রক্ত লেগে ছিল। আমার পরিবারের সদস্যদের নির্দেশ দিলাম যেন রক্ত খেয়াল না করে।

বাবাকে রুম থেকে বের হতে সাহায্য করলাম। হলওয়ে থেকে কাজুয়ার সাথে দেখা হল। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল ওর চোখে বিস্ময় দেখতে পেলাম। বাবাকে এভাবে সাহায্য করা আমার জন্য বিরল ঘটনা বটে। খোলা দরজা দিয়ে কাজুয়া আমার রুমের মধ্যে উঁকি দিল। গেমটা মেঝের উপর পড়ে ছিল। ও হাসি চেপে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল।

ডিনারের সময় খেতে গিয়ে বাবার কিছু সমস্যা হচ্ছিল। আঙুলহীন বাম হাত দিয়ে তিনি ভাতের বাটি ঠিক মত ধরতে পারছিলেন না। কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে তাকে কাজটা করার সময় একদম স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। আঙুল ছাড়া তার হাতটা একদম মসৃণ আর গোল দেখাচ্ছিল। বাজি ধরে বলতে পারি আমার পরিবারের আর কেউ বাবার এই বিকলাঙ্গতা সম্পর্কে জানতও না।

আমি খেয়াল করলাম আমার ভাই কাজুয়া ঘৃণার দৃষ্টিতে আমাকে লক্ষ্য করছিল। ও হচ্ছে ঐ ধরণের যারা মনে করে পৃথিবীটা বখে যাওয়া ছেলেপেলে দিয়ে ভর্তি। ও আর আমি একই হাই স্কুলে পড়তাম, আমি শুধু এক ক্লাস, উপরে ছিলাম। ওর জীবন যেরকম ছিল সেরকম জীবন আমার পক্ষে সম্ভবই ছিল না।’

স্কুলে আমার ভাই তার বন্ধুদের সাথে হাসি ঠাট্টা করতে করতে করিডোর দিয়ে হাঁটত। আসল বন্ধুরা এভাবে চলাফেরা করে। আর এসব দেখে আমার নিজেকে আরো একাকী মনে হত। আমার টিচাররা মনে করতেন যে আমি খুবই হাসিখুশি একজন মানুষ যে কিনা ক্লাসে যে কোন রকম মজা করতে পারে। কিন্তু সত্যি কথা হল, এমন কেউ ছিল না যাকে আমি সত্যিকারের বন্ধু বলতে পারতাম। অনেকেই আমাকে পছন্দ করত, হয়ত। কেউ কেউ হয়ত আমাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুও মনে করত। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় না, এরকম কেউ ছিল, যার কাছে আমি যা তা চাইতে পারতাম। আমার ক্লাসমেটদের মধ্যে যারা দাবি করত, তারা আমাকে অনেক কাছ থেকে চেনে, তারাও আমার দিকে এমনভাবে তাকাত যেন কোন অদ্ভুত কিছু দেখছে।

আমার ভাই আসলেই একটা ভাল ছেলে ছিল। আমার মত না। মিথ্যা হাসি দিয়ে নিজেকে লুকানোর প্রয়োজন ছিল না ওর। নিজে যা তাতেই ও সন্তুষ্ট ছিল। বন্ধুদের সাথে সহজভাবে চলতে পারত। সহজভাবে বললে ও অনেক বেশি সুস্থ আর পূর্ণ মানুষ ছিল যা আমি কোনদিনই হতে পারতাম না।

অদ্ভুত ব্যাপার হল, সবাই কেন জানি আমাকে প্রতিভাবান একজন শিশু বলেই মনে করত। খুব সম্ভবত তাদের এই ধারণা হয়েছিল আমার এই ফালতু খোশামদি মুখোশটা সবসময় পরে থাকার জন্য। এর কারনে যদি আমার ভাই নিজেকে আমার থেকে নিম্নতর মনে করে তার মানে হল আমি ওকে বাজেভাবে নিয়েছিলাম। আমি ওর কাছে এজন্য ক্ষমা চাইতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ওর আমার মধ্যকার সম্পর্কটা এমন ছিল না যে ভোলাখুলি মনের কথা বলা যাবে। স্কুলে যদি কোন কারনে আমাদের চোখাচোখি হত তাহলে আমরা দ্রুত নিজেদের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে এমন ভান করতাম যেন কেউ কাউকে দেখিনি। ব্যাপারটা দুঃখজনক ছিল।

দোষটা আমার ছিল। আমার ধারণা ছিল, ও কোন না কোনভাবে আমার ভেতরের কুৎসিত চেহারাটা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল। ও আমার সবকিছু জানত, আমি কতটা কুৎসিত, আমি আমার বাবা-মা আর টিচারদের কথামত চলতে কতটা আগ্রহী ছিলাম, আমার চারপাশের মানুষের কাছ থেকে পয়েন্ট সংগ্রহ করতে যাতে তারা আমাকে তাদের একজন হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এ নিয়ে কোন কথা বলাটা বেশ জঘন্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। ও শুধু যা করতে পারত তা হল কোন কথা না বলে শুধু চোখে ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে থাকতে।

নিজেকে কারো অনগ্রহভাজন করতে পারলে আমার মনে হত নিজের চারপাশে একটা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ জায়গা সৃষ্টি করতে পেরেছি। আর ঠিক ঐ মুহূর্তেই আমাকে ওর ঐ দৃষ্টির সামনে পড়তে হত। আমাকে ওর কাছে উপহাসাম্পদ মনে হত। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে আমার দুনিয়ায় একটা ফাটল দেখা দিয়েছে আর একটা ব্যান্ডএইড লাগিয়ে সেটা মেরামত করার চেষ্টা করছি।

একবার স্কুলের ভেন্ডিং মেশিনগুলোর কাছে শিক্ষার্থীদের একটা দল জড়ো হয়ে হাউকাউ করছিল। ওদের কারোরই কোন ড্রিঙ্ক কেনার ইচ্ছা ছিল না। আমি মেশিন থেকে কিছু একটা কিনতে চাইছিলাম, কিন্তু ভিড় ঠেলে যেতে ইচ্ছা করছিল না। তাই কাছেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম কখন একটু খালি হবে। আমার মনে হয় আমি তাদেরকে একটু সরে জায়গা দিতে বললেই পারতাম, কিন্তু আমার মাথার ভেতর কিছু একটা ভয় পাচ্ছিল যা তারা না বলবে আর অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাবে। তাই আমি শুধু ভেন্ডিং মেশিনের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে কিছু পোস্টার দেখার ভান করছিলাম যেগুলোতে আসলে আমার কোন আগ্রহ ছিল না।

এমন সময় কাজুয়া হাজির হল। বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে ও ভিড় ঠেলে পথ করে মেশিনের কাছে গিয়ে কয়েন ঢালল। সোডার ক্যান হাতে নেয়ার পর ও খেয়াল করল যে আমি দাঁড়িয়ে আছি। ওর হাসি দেখে মনে হল ও চোখের পলকে পুরো পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরেছে, কেন আমি পোস্টারগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

কাজুয়া জানত। ও জানত যে ওর বড় ভাই, যাকে সবাই বন্ধুত্বপূর্ণ আর জনপ্রিয় বলে জানে, পড়াশুনায় মনোযোগী বলে জানে, সেটা আসলে সাজানো বিভ্রম মাত্র। কাজুয়া আমার সম্পর্কে সবকিছু জানত, আমার ক্ষুদ্র হৃদয় আর এর মিথ্যে হাসি, যার একটাই উদ্দেশ্য ছিল-আর তা হল সবাই যাতে আমাকে পছন্দ করে। আর ও আমার সব বিকারগ্রস্থ কাপুরুষতার কথা জানত, যে আমার এইটুকু সাহসও নেই যে কিছু ছেলেমেয়েকে “এক্সকিউজ মি বলে ভেন্ডিং মেশিন পর্যন্ত যাব।

এক সময় এমন হল যে বাসায় হোক বা স্কুলে, আমার ছোট ভাইয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ও আমি ঘামতে থাকতাম। আমি কাজুয়াকে নিয়ে প্রচন্ড আতংকে ভুগতাম কারন ও আমার আসল রূপ জেনে বসে আছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে ওর চোখে আমি ওর বড় ভাই ছিলাম না, বরং মাটির তৈরি কোন নোংরা মূর্তির মত কিছু একটা,ছিলাম যার উপর খালি থুথু ছিটানো যায় আর ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকানো যায়।

কাজুয়ার সাথে কথা বলার কিছু সুযোগ এসেছিল, কিন্তু যখনই আমরা একসাথে টেবিলে বসে নাশতা করতে বসতাম তখনই আমার পাকস্থলীর ভেতর মোচড় দিয়ে উঠত। আমার মনে হত ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে পুড়ে যাচ্ছি, আমার হাতগুলো ঘামতে থাকত, চপস্টিক হাত থেকে পিছলে যেতে চাইত। এরপরেও কমেডি সিনেমার কোন অভিনেতার মত আমি হেসে আমার বাবা-মাকে সম্ভাষণ জানাতাম, প্রবল উদ্যমে নিজের নাশতা শেষ করতাম। অনেক দিন ধরে এরকম.চলছে তবুও এখনো আমি প্রায় যা খাই সবই বমি করে উগড়ে দেই।

আমার রাতগুলো নিঘুম কাটে, খিচুনি হয়। শান্তি হয় এরকম কোন স্বপ্ন আমি দেখি না। চোখের পাতা বন্ধ করলে অনেক মানুষের চেহারা দেখতে পাই। আমার ভাইয়ের মত তারা সবাই আমার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আমি কান্নাকাটি করি, বুদ্ধিস্ট মন্ত্র জপ করি, আমার পাপ মোচনের জন্য। মাঝে মাঝে যখন আমি চোখ খুলে দিবাস্বপ্ন দেখি তখন হাজার হাজার চোখ আমার রুমের মধ্যে ভেসে ভেসে আমাকে অভিযুক্ত করে। তখন আমার ইচ্ছা হয় মরে যেতে।

কিংবা আরো ভালো হত যদি সারা পৃথিবীতে একা আমি বেঁচে থাকি, তাহলে এই যন্ত্রণা আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে না। প্রত্যেকটা মানুষ আমার কাছে ভীতিকর। যে কারনে আমাকে এইসব নোংরা কাজ করতে হয়েছে, মানুষ যাতে আমাকে পছন্দ করে। আমার প্রতি লোকজনের ঘৃণা, আমার দিকে নিচু দৃষ্টিতে তাকানো এসবই অনেক কষ্টদায়ক ছিল, আর এর থেকে পালানোর জন্য আমি আমার এই কুৎসিত ক্ষুদ্র পশুটাকে হৃদয়ের মাঝে বন্দি করে রেখেছিলাম। পৃথিবীতে যদি কোন মানুষ না থাকত, শুধু যদি আমিই থাকতাম, তাহলে জীবন আমার জন্য অনেক সহজ হত।

আমার উচিত কাউকে আমাকে দেখতে না দেয়া। কেউ যেন আমার দিকে কষ্টদায়ক হাসি না হাসে বা অসম্ভষ্টি নিয়ে তাকায়। তাই আমি চিন্তা করছিলাম কি করে আমি পৃথিবীর সবার মন থেকে আমার চেহারা মুছে ফেলতে পারি।

এই আইডিয়াটা কেমন?

“এখন থেকে এক মিনিট পর, তোমার চোখে আমার কোন প্রতিফলন হবে না!’ আমি এই কথাটা প্রথমে কাউকে একজনকে বলব। তারপর এই কথাটা বলব : “তোমার চোখগুলো, যেগুলো আমাকে আর দেখতে পায় না, অন্য কারো সাথে যখন চোখাচোখি করবে তখন এই কথাগুলো তাকে হস্তান্তর করবে।”

সহজ ভাষায় বললে, যে লোক আমার কণ্ঠ শুনে প্রথম আমাকে দেখার শক্তি হারিয়ে ফেলবে, সে যখন অন্য কারো সাথে দৃষ্টি বিনিময় করবে তখন সেই দ্বিতীয় ব্যক্তিটিও আর আমাকে দেখতে পাবে না। ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তিটি যখন অন্য আরেকজনের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করবে তখন তৃতীয় ব্যক্তিটিও আমাকে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এরকম চলতে চলতে একসময় পুরো দুনিয়ার সামনে আমি অদৃশ্য হয়ে যাব। কেউ আমাকে দেখতে পাবে না। আর তখন আমি চিরকালের জন্য শান্তি অর্জন করতে সক্ষম হব।

এই পরিকল্পনাটা শুরু করার আগে আমাকে অবশ্য নিজেকে এর থেকে বাইরে রাখার জন্য কোন একটা উপায় বের করতে হবে। নাহলে আমি আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখতে পাবো না।

যখন আমি অনুভব করলাম কিসব জিনিস আমাকে সুখি করে তুলছে, তখন নিজের উপর ঘৃণা হতে লাগল।

তারপর এক রাতে কুকুরটা মারা গেল। মানে বলতে চাইছি, ঐ কুকুরটা, যেটার উপর ইলিমেন্টারি স্কুলে থাকতে বন্ধুদের সামনে জাহির করার জন্য আমার কণ্ঠের জাদু দেখিয়েছিলাম। কুকুরটার কথা আমি কখনো ভুলতে পারিনি, আমাকে দেখলেই ওটার চোখে যাবতীয় ভীতি এসে ভর করত।

যখন আমার বাবা-মা আমাকে কুকুরটার মৃত্যুসংবাদ জানাল, আমি ঐ বাসাটায় গিয়েছিলাম যেখানে কুকুরটা থাকত। কুকুরটার মালিক আমাকে চিনতেন, ওর মৃতদেহটা আমাকে দেখিয়েছিলেন। একসময় যেটাকে বিশাল আর ভয়ংকর মনে হত সেটা তখন নিশ্চল হয়ে পেভমেন্টের উপর পড়ে ছিল। আমি কুকুরটাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম। আমাকে কাঁদতে দেখে কুকুরের মালিক একা সময় কাটানোর জন্য কিছুক্ষণের জন্য ছেড়ে গিয়েছিলেন।– “ আমি আমার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে, আমার গভীর থেকে উঠে আসা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে, কুকুরটাকে নির্দেশ দিলাম বেঁচে উঠতে। কিন্তু কুকুরটার জীবন ফিরে এল না। রাতের বাতাসে শুধু ওর পিঠের পশমগুলো এদিক ওদিক উড়ছিল। আর কিছুই হল না। যদিও আমার কথাগুলো কোন একটা সংকেতের আশায় আমার মনের গহীনের বাসনাকে সন্তুষ্ট করেছিল কিন্তু কুকুরটার জীবনটা ফিরিয়ে আনতে পারেনি।

আর শুধু সেটাই নয়। কুকুরটার জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টাটা আমার হৃদয় বিদারক কষ্ট থেকে সৃষ্ট ছিল তা নয়। আমার মনে হয়, অবচেতনভাবে আমি চাইছিলাম নিজের পাপের বোঝাটাকে হালকা করতে, সামান্য একটু হলেও।

***

এক রাতে আমি আমার বেডরুমের মাঝামাঝি একটা ছেনি হাতে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম। আমার পুরো শরীর ঘেমে গোসল হয়ে গিয়েছিল আর আমি ক্রমাগত বকে যাচ্ছিলাম, “আমি দুঃখিত। আমি দুঃখিত।” আমি হয়ত ছেনিটা দিয়ে কবজি কেটে ফেলতাম, কিন্তু শেষ সময়ে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমার কাঠের ডেস্কটার উপর তাকিয়ে দেখি ছেনির খোঁচায় একটা আঁচড় পড়েছে। ডেস্কের একটা অংশ আমার চোখের পানি দিয়ে ভিজে ছিল। মুখ আরো নামিয়ে আনতেই একটা বাজে গন্ধ নাকে এল, পঁচন ধরা মাংসের মত গন্ধ।

ডেস্কের ডয়ার খুলে দেখি ভেতরে টিসুতে পেঁচিয়ে রাখা আঙুলগুলো। ওগুলোর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। অনেকদিন ফেলে রাখায় ওগুলোর রঙ কালচে হতে শুরু করেছিল। আঙুলগুলোর গিঁটগুলোতে গাঢ় লোম দেখে মনে পড়ল যে ওগুলো আমার বাবার আঙুল। আমার কণ্ঠের ক্ষমতা আমাকেই ভুলিয়ে দিচ্ছিল যে আমি কি করেছি।

পঁচতে থাকা আঙুলগুলো বাইরে নিয়ে উঠোনে একটা গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেললাম। কিন্তু তারপরেও ডেস্ক থেকে বাজে গন্ধটা গেল না। বরং যত দিন যেতে লাগল গন্ধটা মনে হল বাড়তেই থাকল। মনে হচ্ছিল ভয়ারের ভেতরে কোথাও যেন অন্য জগতের সাথে কোন সংযোগ আছে, আর ঐ মাংস পঁচা গন্ধটা সেই অন্ধকার থেকে ক্রমাগত উদিারিত হচ্ছিল।

আমি খেয়াল না করলেও সময়ের সাথে ডেস্কের উপর আঁচড়ের চিহ্নও। বাড়তে থাকল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দশটারও বেশি ছেনি দিয়ে আঁচড় কাটার দাগ দেখা গেল। এসবের কোন স্মৃতি আমার জানা ছিল না।

***

সকাল। চোখ খুলে দৈনন্দিন যন্ত্রণায় ফিরে এলাম।

যে মানুষটা পরিবার আর ক্যাক্টাসের জন্য নাশতা বানাচ্ছে, যে মানুষটা আঙুলহীন হাত দিয়ে খবরের কাগজ চেপে ধরে আছে যাতে বাতাসে পাতাগুলো উড়ে না যায়, তাদেরকে আমার মানুষ মনে হত না। মনে হত কোন পুতুল যেগুলো নড়াচড়া করতে পারে। যে মানুষটা ট্রেনে করে স্কুলে যাওয়ার সময় আমার টিকেট চেক করে, যে মানুষটা আমার পাশের সিটে বসে থাকে, যে মানুষগুলো স্কুলের হলওয়েতে আমাকে পাশ কাটিয়ে যায়, তাদের কাউকেই আমার জীবিত প্রাণী মনে হয় না। তারা স্রেফ কোন বস্তু, চিন্তাশক্তিহীন, অনেকটা ধাক্কাধাক্কি করা বিলিয়ার্ড বলের মত। শুধু এদের তৃকগুলো যত্ন করে বানানো, আর ভেতরের বাকি সব কিছু বানানো যন্ত্রপাতির জঙ্গল।

কিন্তু তারপরেও, আমার একটাই কাজ ছিল আর তা হল ক্রমাগত হেসে যাওয়া আর আমার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া যাতে তারা আমাকে ছেড়ে না যায়। যে মানুষটা আমার নাশতা বানিয়েছে, তাকে তা করার জন্য কতটা ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে সেটা যে আমি বুঝেছি তা পুরোটা খেয়ে। খাওয়ার সময় তার সাথে ব্যাখ্যা করতে হবে, বলতে হবে কতটা মজার ছিল খাবারটা, আর এমনভাবে বলতে হবে যেন কণ্ঠে সন্তুষ্টির ছোঁয়া থাকে। যখন ট্রেনে চড়ি, পুরো যাত্রাপথের টিকেট যেন অবশ্যই কাটা হয় তা ভুললে চলবে না আর কন্ডাক্টর যখন আমার কমিউটার পাশ দেখতে চাইবেন তখন একজন আদর্শ যাত্রির মত তা বের করে দেখাতে হবে। ক্লাসেও আমাকে পরিবর্তিত হতেই হবে, আমি যে ক্লাসেরই একজন সে বিষয়ে কোন অজুহাত চলবে না। তাই কেউ দয়া করে সবার শেষে আমাকে বাছাই কোর না, বরং আমি চাই ফুলদানিতে যত্ন করে রাখা ফুলের মত হতে। আর আমি ফুল দিয়ে এত চতুরভাবে সাজাব যে, সবাই ধরে নেবে এসব আমার ব্যক্তিত্বরই স্বাভাবিক অংশ। কেউ চিন্তাও করবে না, এসব কোন পরিকল্পনার অংশ।

আমার হৃদয় এতটাই শূন্য হয়ে গিয়েছিল যে মুখে সবসময় একটা উজ্জ্বল হাসি ধরে রাখা আমার জন্য বেশ সহজই ছিল। আর এই পুরোটা সময় আমার ভাইয়ের প্রতি আমার ভীতি শুধু বাড়ছিলই। এমন কি আমি যদি নাও কল্পনা করি যে সারা পৃথিবীর সব মানুষ এসে ঐ ছোট খুলিটার ভেতর বসে আছে আর দুনিয়ার সব চিন্তা করছে, তারপরও কাজুয়াকে ভয় লাগত আমার, শুধু ওকে। অন্য মানুষদের নিশ্বাসের শব্দ আর আমার কানে এসে পৌঁছাত না কিন্তু ওর ছায়া গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছিল।

কাজুয়া কখনো সরাসরি কিছু বলেনি, কিন্তু আমার মধ্যে কোন সন্দেহ ছিল না যে ওর মুখের ঠাণ্ডা হাসিটা আমার নির্বুদ্ধিতাকে উৎসর্গ করে হাসা। ওইটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আতংকিত করে তুলত। ভুতের মত আমার পিছু পিছু অনুসরণ করত, আমাকে নির্যাতন করত। এরকম সময়ে আমি এমনকি স্কুলের সিঁড়িতে ওঠার সময়ও আশেপাশে তাকিয়ে দেখতাম কেউ নেই অথচ তারপরও আমার মনের ভেতর আমি নিজের চুল ছিড়তাম আর দেয়ালের একটার পর একটা লাথি মেরে যেতাম। আমার ভাইকে এতটা ঘৃণা করার পরও আমি আমার নিজের সামনে দাঁড়াতে পারতাম না।

এখন পর্যন্ত আমার মনে হয় কাজুয়াই আসলে আমার সমস্ত যন্ত্রণার মূল। এইসব অনুভূতিগুলো ওকে খুন করার ইচ্ছাটাকে প্রবল করে তুলছিল।

***

ক্যাসেট প্লেয়ারের স্টপ বাটন চেপে থামিয়ে আবার রিওয়াইন্ড করে শুরুতে নিলাম। এই গল্পটা বারবার শুনতে গিয়ে আমি আমার কাঁপুনি থামাতে পারি না। কান্নায় চোখ ঘোলা হয়ে আসে। শরীরের সব শক্তি ছেনিটার উপর একত্র করে ডেস্কের উপর আরেকটা আঁচড় কাটি।

আমি ঘামছিলাম, ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলাম। জানালার বাইরে অসীমে প্রসারিত হতে থাকা নিরব দুনিয়ার কথা কল্পনা করি। ঝড়ো হাওয়ার মাঝে পুতিময় গন্ধ নাকে এসে লাগে। ব্যাক্টেরিয়া মাংস পচাচ্ছে, বাতাসে ছড়াচ্ছে অশুভ গন্ধ।

নিজের ভেতরে গোল পাকাতে থাকা আবেগুগুলোকে দমাতে না পেরে বিছানার কিনারায় এসে বসি, ছেনিটাকে দুহাতে সজোরে আঁকড়ে ধরে বাহু দুটোর মধ্যে নিজের মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠি।

***

অবশেষে যখন মাথার ভেতরটা পরিস্কার হল, আমি দেখলাম তখনও বিছানার কিনারায় বসে আছি, ছেনিটা পড়ে আছে কোলের উপর। ঝটকা দিয়ে ওটা মেঝেতে ফেলে দিলাম, যেন কোন পুঁয়োপোকা আমার জিন্সে উঠেছিল। ডেস্কের দিকে তাকিয়ে দেখি আঁচড়ের দাগের সংখ্যা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন বিশের কম হবে না।

আমার মনে হল ওগুলো সম্ভবত আমি নিজেই করেছি, কিন্তু আমার সেরকম কোন কিছু করার কথা মনে নেই।

আমার মনে হচ্ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা আমি ভুলে যাচ্ছি, আর সেকারনে অস্বস্তি লাগছিল। কেউ কি আমার স্মৃতি ওলটপালট করেছে? পড়ে থাকা ছেনিটার দিকে তাকালাম, ওটার তীক্ষ্ণ ফলাটার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা মনে আসি আসি করার চেষ্টা করছিল, এমন কিছু যা কিনা লোকজনকে তাদের শেষ সীমায় নিয়ে যেতে পারে।

ডিনারের ঠিক পরের কথা। লিভিং রুমের কার্পেটে শুয়ে কাজুয়া টিভিতে বেজবল খেলা দেখছিল। এক হাত মাথার পেছনে দিয়ে উঁচু করা, আরেক হাত দিয়ে স্ন্যাক্স নিয়ে খাচ্ছিল। পা দুটো বিভিন্ন দিকে ছড়ানো। কয়েক মিনিট পর পর সে ওগুলোকে ভাঁজ করে আবার সোজা করে, এরকম বার বার চলছে। নিশ্বাসে সাথে বুক উঠা নামা করছে।

ওকে খুন করতে হবে। এই চিন্তাটাই আমার মাথায় এসেছিল। আমি আমার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চেয়ারে বসলাম আর অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলাম। বরাবরের মত ডেস্কের থেকে বাজে গন্ধ। ভেসে আসছিল। আমার হাত দুটো ভয়াবহ কাঁপছিল। উত্তেজনা নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছিলাম কিন্তু কাজ হচ্ছিল না।

নিজেকে বার বার বলছিলাম যে ওকে খুন করতে আমার এক সেকেন্ডের জন্যও ইতস্তত করা উচিত নয়। এটা যদি আমাকে দিয়ে না হয় তাহলে আমার কোন মূল্য নেই। ওর ইস্পাতের মত দৃষ্টি একদম আমার মাংস ভেদ করে ভেতরটা দেখতে পায়, আর আমি যতই চেষ্টা করি না কেন ওর ঐ উপহাসের হাসি আমার মন থেকে সরাতে পারি না। আমি আমার চোখগুলো টেনে বন্ধ করে হাত দিয়ে কান চেপে রাখলাম। কিন্তু ঐ যে ও আছেই, আঙুল উঁচিয়ে আমার কুৎসিত হৃদয়টাকে ঘাঁটছে।

শান্তি অর্জনের জন্য আমার সামনে দুটো পথ খোলা ছিল নিজেকে এমন এক দুনিয়াতে সরিয়ে নেয়া যেখানে আর কারো অস্তিত্ব নেই। অথবা ওকে আমার দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া।

কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত হল। রুম থেকে বেরিয়ে কাঁচকোঁচ শব্দ করা হলওয়ে দিয়ে নিচে নামার সময় আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। ভাইয়ের রুমের দিকে যাচ্ছিলাম। ওর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। হলের লাইট আমার সামনে আমার ছায়া ফেলছিল। ছায়াটা যে এখনো মানুষের মত দেখতে তা খেয়াল করে একটু অবাকই লাগল।

দরজায় কান লাগিয়ে নিশ্চিত হলাম যে ও ঘুমাচ্ছে। ঠাণ্ডা ভোর নবটা চেপে ধরে কোন শব্দ না করে দরজাটা খুললাম। দম চেপে ফাঁক দিয়ে পিছলে রুমের ভেতর ঢুকে পড়লাম, পেছনে দরজাটা খোলা থাকল। ভেতরটা অন্ধকার ছিল কিন্তু তাতে সমস্যা নেই। হল থেকে আসা আলো আমার দেখতে পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

ও একদম মরার মত ঘুমাতে পারে। কম্বলগুলোকে সব একসাথে বড় একটা বলের মত লাগছিল দেখতে। আরো কাছে গিয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হলাম যে ওর চোখগুলো বন্ধ আছে আর ও ঘুমিয়ে আছে। রুমের মধ্যে আলো ঢুকলেও আমার শরীরে বাধা পেয়ে ওর মুখের উপর ছায়া ফেলছিল। আমি আমার মুখ ওর কানের কাছে নিয়ে মৃত্যু সম্পর্কিত কিছু কথা ফিসফিস করে বলতে যাচ্ছিলাম।

ঠিক সেই মুহূর্তে ও নড়ে উঠল আর বিছানাটা কড়কড় শব্দ করল। আস্তে করে জেগে উঠে ও হালকা গোঙানির মত শব্দ করল আর চোখ জোড়া খুলল। প্রথমে খোলা দরজার দিকে তাকাল তারপর ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার উপর চোখ পড়ল।

“কি করছ তুমি এখানে?” মুখে নিরীহ একটা হাসি নিয়ে সে প্রশ্ন করল। আমি আমার দু হাত দিয়ে ওর গলা চেপে ধরলাম। ওর কাঁধগুলো অনেকটা মেয়েদের মত সরু। ও অবাক হয়ে উঠে বসল। আমি আমার সমস্ত শক্তি আমার কণ্ঠে জমা করে বললাম, “তুমি ম-র-বে-এ-এ!”

ওর চোখগুলো ভয়ে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসছিল, ওর সরু আঙুলগুলো সাহায্যর জন্য বাতাসে হাত নাড়াল কিন্তু কিছুই পেল না। এই আগে আমি যখনই আমার শক্তি ব্যবহার করেছি, সবসময় মাথার মধ্যে বিস্ফোরনের মত অনুভূতি হয়েছে। এইবার কিছুই হল না। এমনকি আমার নাক দিয়ে রক্তও গড়িয়ে পড়ল না।

ওর গলা থেকে আমার হাত দুটো সরিয়ে নিলাম। অদ্ভুত কোন কারনে ও কাশলও না, ঢোঁক গিলল না। ও আমার দিকে এগিয়েও এলো না। শুধু চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল, যেন সবকিছু কোন ধরনের স্বপ্ন ছিল। আমি ওর এই আচরণ কোন কিছুর সাথে মেলাতে পারলাম না। রুম থেকে বের হওয়ার সময় ফিরে দেখি ও গভীর, শান্তিময় ঘুম ডুবে আছে।

যে কোন মুহূর্তে আমার মাথাটা ফেটে পড়বে বলে মনে হচ্ছিল। আমি এমনভাবে ছুটে আমার রুমে ফিরে এলাম যেন আমার ভেতরে কোন সুইচ উলটে গিয়েছে। ডেস্কের উপর তাকিয়ে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার দেখতে পেলাম, যেটা আমি আগে ওখানে খেয়াল করিনি। ছোট আর সস্তা ধরনের একটা ক্যাসেট প্লেয়ার। পাশে একগাদা ব্যাটারি রাখা। ক্যাসেট প্লেয়ারটা ঐ ধরনের ছিল যেগুলো কিনা শুধুই ব্যাটারিতে চলে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন ওটা এখানে আগে দেখিনি, ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই অদ্ভুত মনে হচ্ছিল।

প্লেয়ারে একটা টেপ ভরে রাখা ছিল। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল টেপে যাই রেকর্ড করা থাকুক না কেন, আমার সেটা শোনা ঠিক হবে না। অনেকটা যেন কোন গোপন নির্দেশ আমার ব্রেনের গভীরে ঢুকিয়ে রাখা ছিল। কিন্তু আমার আঙুল সোজা প্লে বাটনে চাপ দিল। নিজেকে সামলাতে পারিনি।

প্লাস্টিকের স্বচ্ছ অংশটা দিয়ে টেপটাকে ঘুরতে দেখতে পাচ্ছিলাম। স্পিকারগুলো দিয়ে আমার নিজের কষ্ঠ ভেসে এল। উত্তেজিত আর কাঁপাকাপা কণ্ঠ।

***

ব্যাপারগুলো জটিল রূপ ধারন করেছে।

ঠিক কত বার আমি এই টেপ প্লে করে শুনেছি? এমনকি, এখন যখন আমি এই কথাগুলো রেকর্ড করছিলাম, তখনো অবাক হয়ে ভাবছিলাম।

তুমি নিশ্চয়ই কয়েকদিন পরের কিংবা কে জানে হয়ত কয়েক বছর পরের আমি, যে আমাকে শুনছ।

তাতে কিছু আসে যায় না। এই টেপ যখন শুনছ, তখন সম্ভবত তোমার কিছুই মনে নেই তোমার সাথে কি ঘটেছে। কারন হল আমি এই টেপে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা রেকর্ড করে রাখছি যাতে তুমি সবকিছু ভুলে যাও, আর আমি চাইছি এমন একটা জীবন শুরু করতে যেখানে আমি অনেক বিষয় এড়িয়ে যেতে চাই।

সে কারনে এই টেপটা প্রস্তুত করেছি। যাতে ভবিষ্যতের আমি, যে সবকিছু ভুলে একটা সাধারণ জীবন কাটাচ্ছে, জানতে পারে যে, সে অতীতে কী কী করেছে।

হঠাৎ করে এই টেপটা চালাতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছা কেন হল সেটার পেছনেও একটা কারন আছে। কারন আমি এই মেসেজের শেষে কথাগুলো রেকর্ড করে রেখেছিঃ “তোমার যদি কখনো কাউকে খুন করার ইচ্ছা হয়, অথবা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে, তাহলে তুমি তোমার ডেস্কের উপর ক্যাসেট প্লেয়ারটা দেখতে পাবে, আর এর ভেতরে রাখা টেপটা শুনতে চাইবে।”

তুমি যখন এই টেপটা শুনছ, তখন আমি জানি না তুমি কাকে খুন করতে চাইছিলে না নিজেকে নিজে খুন করতে চাইছিলে কিনা।

কিন্তু আসল কথা হল, তুমি যেহেতু এই টেপ শুনছ তারমানে এ দুটোর কোন একটা অবশ্যই ঘটেছে। আর এর দ্বারা প্রমানিত হয় যে তুমি একটা শান্তিপূর্ণ, সুখি জীবন কাটাতে পারছ না, যার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে।

কিন্তু কিছু কথা আছে যা তোমাকে আমার বলা দরকার। কাউকে খুন করতে হবে বা নিজেকে খুন করতে হবে এরকম মনে হওয়ার একদমই কোন প্রয়োজন তোমার নেই। কারনটা একদমই সরল, অনেক দিন আগেই, বস্তুত সবাই চলাফেরা বন্ধ করে দিয়েছে। তোমার বাবা, তোমার মা, তোমার ভাই, তোমার সব ক্লাসমেট আর টিচারেরা, যাদের সাথে তোমার কখনো দেখাই হয়নি তারাও, কেউই আর জীবিত নেই। পুরো পৃথিবীতে সব মিলিয়ে হয়ত হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ বেঁচে আছে।

তোমার কি মনে আছে, একবার চিন্তা করেছিলে কিভাবে দুনিয়ার সবার সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায়? মনে আছে তাই না?

কুকুরটা যেদিন মারা গেল তার পরের দিন সকালে আমি আমার জঘন্য হাসিটা মখে টেনে নাশতা করতে নিচে গিয়েছিলাম। কাজুয়া, বরাবরের মত ওর চোখ ডলছিল, কিন্তু সেখানে ছিল। মা ওর সামনে এক প্লেট ডিম ভাজা এনে রেখেছিল। বাবা ভুরু কুঁচকে পত্রিকার পাতায় ডুবে ছিল। পাতা উল্টানোর সময় পত্রিকাটা আমার হাতের সাথে ঘষা খাচ্ছিল। টিভিতে একটা পরিস্কারকের বিজ্ঞাপন হচ্ছিল যেটা দিয়ে সবকিছু নাকি সহজেই পরিস্কার করা যায়। হঠাৎ করে আমি এর কোন কিছু আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি তাদের সবাইকে মেরে ফেলার সদ্ধান্ত নিলাম।

আমি এই কথাগুলো ব্যবহার করেছিলাম: “এক ঘণ্টার মধ্যে তোমাদের ঘাড়ের উপরের সব কিছু খসে পড়বে।”

এর সাথে পরবর্তী নির্দেশটা যোগ করলাম : “যখন তোমাদের মাথাগুলো মাটিতে খসে পড়বে, সেটা সবার জন্য সংকেত হবে একই নির্দেশ মেনে নেয়ার।”

অবশ্যই আমি এর সাথে আরো কথা যোগ করেছিলাম যাতে আমি নিজেকে এর থেকে রক্ষা করতে পারি। আমি আরো কিছু কথা বললাম ওদের স্মৃতি বদলানোর জন্য। আমি তাদেরকে বললাম আমার কণ্ঠ যে শুনেছে তা ভুলে যেতে আর তাদেরকে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করলাম।

ওদেরকে কথাগুলো বলার এক ঘণ্টা পরে আমি স্কুলে ছিলাম। হঠাৎ কাজুয়ার রুমে হৈচৈ শোনা গেল। কি হচ্ছে দেখার জন্য আমি সেখানে গেলাম আর দেখতে পেলাম আমার ভাইয়ের মাথা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, রক্তের ছোটখাট একটা পুকুর সৃষ্টি হয়েছে। সব শিক্ষার্থী আর টিচার সবাই ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল।

জাদুর মাথাটার যা করার কথা, যারা যারা দৃশ্যটা দেখেছিল তারা সবাই এক ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবে। চিৎকার করতে থাকা ছেলেপেলেদের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আমি আমার বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম, তাদের একই পরিণতি হয়েছে, যেখানেই থেকে থাকুক কেন তারা।

এক ঘণ্টা পর যারা কাজুয়ার মাখা মাটিতে পড়া অবস্থায় দেখেছিল তারা সবাই একসাথে নিজেদের মাথা হারাল। ধুপ ধুপ করে পুলিশ আর আশেপাশের লোকজনের সামনে সেগুলো খসে পড়ল। এবার কোন চিৎকার হয়নি, শুধু কিছু ভারি জিনিস হাত থেকে পড়ে যাওয়ার শব্দ পাওয়া গেল। মাথা খসে পড়ার দৃশ্য আরো লোকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল।

ভয় আর বিভ্রান্তি মহামারির মত ছড়িয়ে পড়ল। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে টিভি ক্যামেরা এসে মুন্ডুহীন দেহগুলোর ছবি দুনিয়া জুড়ে ব্রডকাস্ট করল। আর আমার কথাগুলো ইলেক্ট্রিক্যাল সাতের মাধ্যমে প্রায় পুরো মানব জাতির মাথা কেটে ফেলল।

সেই সন্ধ্যায় শহরটা একদম নীরব হয়ে ছিল। নীরবতার মধ্যে অস্ত যাওয়া সৰ্যটা লম্বা ছায়া ফেলছিল। আশেপাশের এলাকার মধ্যে দিয়ে আমি হাঁটছিলাম। সবকিছু থেকে লাল আর কাঁচা গন্ধ ভেসে আসছিল। অনেক মানুষ সোজা হয়ে চুপচাপ শুয়ে ছিল। অবাক ব্যাপার হল, পশুপাখি আর কীটপতঙ্গও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। মুন্ডুহীন অনেক কুকুর-বিড়াল, গুবরে পোকা আর মাছিও মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলাম।

শহরের মধ্যে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছিল, বিভিন্ন জায়গা থেকে কালো ধোঁয়া উড়ছিল। টিভিতে প্রায় কিছুই দেখাচ্ছিল না। কয়েকটা দৃশ্য দেখেছিলাম যেখান সংবাদ পাঠকদের মাথা তাদের ডেস্কের উপর পড়েছিল।

এক পর্যায়ে সমস্ত শহরের সমস্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল। পাওয়ার প্লান্টগুলো চালানোর মত লোকজন না থাকায় অতিরিক্ত লোড নিতে পারে ওগুলো সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি কল্পনায় দেখতে পেলাম সারা পৃথিবীতে একই অবস্থা চলছে।

শহরের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে পুরো দুনিয়াতে আমিই একমাত্র মানুষ যে বেঁচে আছে। চিন্তাটা আমাকে বিষণ্ণ করে তুলছিল। এমন কোন জায়গা ছিল না যেখানে কেউ না কেউ পা ছড়িয়ে পড়ে ছিল।

একজন নিথর ডাইভারকে দেখলাম যার শরীরে মাথা আছে, ক্রাশ করা একটা গাড়ির হুইলে উপর মাথা দেয়া। গাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। এই কেসে, আমি ভাবলাম, এক্সিডেন্টটা নিশ্চয়ই লোকটা কোন খসে পড়া মাথা দেখার আগে ঘটেছিল।

রাতের শান্তিপূর্ণ আকাশে তারা ফুটতে লাগল। একটা পথচারী ব্রিজের উপর বসে আমি উপরে তাকিয়ে ছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হল মেয়েটাকে দেখার আগ পর্যন্ত চিন্তায় এমনভাবে ডুবে গিয়েছিলাম যে কোন কিছু টেরই পাইনি।

তারার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছোট ছোট পায়ের শব্দ কানে আসছিল। আর সেই সাথে কোনখান থেকে কেউ একজন সাহায্য চাইছিল। ব্রিজের উপর থেকে একটা জ্বলন্ত গাড়ির আগুনের আলোতে আমি দেখলাম একটা বাচ্চা মেয়ে আগুনের বিপদজনক রকমের কাছে চলে গিয়েছে। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে আমি ওকে ডাকলাম। সে যখন আমার দিকে তাকাল তখন ওর মুখে স্বস্তির অভিব্যক্তি দেখতে পেলাম। মনে হচ্ছিল যেন অনেক দিন সে কোন মানুষের কণ্ঠ শুনতে পায়নি।

ঐ মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম কেন মেয়েটার ধরে এখনো মাথাটা ছিল। কারন সে অন্ধ ছিল।

আমার কাছে এই মেয়েটাকে মনে হচ্ছিল যেন কোন দুর্ভাগ্য। আমি উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। লজ্জা একটা সোত আমার পুরো হৃদয়টা ছেয়ে ফেলল। আর পুরো দুনিয়াটা আগের মত হল না।

অনেকদিন পর্যন্ত আমি ভুগেছিলাম। পুরো পৃথিবী মৃত আর পঁচতে থাকা লাশে ভরে ছিল। আমার তীব্র অনুভূতি হচ্ছিল যে আমি আর এই পৃথিবীটাকে সহ্য করতে পারছি না।

আমি ঠিক করলাম আমাকে সবকিছু ভুলে যেতে হবে। আমি ঠিক করলাম বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি আমাকে অন্ধ হয়ে যেতে হবে। আমাকে এমন একটা বিভ্রমের মধ্যে ঢুকে যেতে হবে যেখানে দুনিয়াটা স্বাভাবিকভাবে চলছে, ঠিক আগের মত। টেপের শেষে আমি এই কথাগুলো রেকর্ড করলাম।

“প্রতিবার তুমি ছেনি দিয়ে ডেস্কের উপর একটা আঁচড় কাটার পর সেই অবস্থায় ফিরে যাবে যেখানে তুমি স্বাভাবিক একটা পৃথিবীতে বাস করছিলে। তুমি তোমার মত খেয়ে যাবে, ঘুমাবে, বাঁচার জন্য যা যা করতে হয় করবে, কিন্তু এসব সম্পর্কে কিছুই মনে থাকবে না। তোমার মনে হবে যেন তোমার জীবন যেমন ছিল বরাবর সেরকমই চলছে।”

আমার রুমের ডেস্কটা শুধ এর বাইরে ছিল। “তোমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় ডেস্কের ব্যাপারটা ধরতে পারবে না।” অন্যভাবে বললে, আমি ভাবছি আমি একটা সাধারণ জীবন কাটাচ্ছি, কিন্তু বাস্তবের সাথে আমার একমাত্র সংযোগ থাকবে আমার ডেস্কটার মাধ্যমে।

এই টেপটা শোনার পর তোমার হয়ত প্রবল অনুতাপ হবে। তুমি হয়ত ভাবছ তুমি যদি সবকিছু ভুলে যেতে পারতে আর এই টেপ শোনার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারতে। যদি সেটাই মনে হয়ে থাকে তাহলে ছেনিটা দিয়ে ডেস্কের উপর আরেকটা আঁচড় কাটো, তাহলে হয়ত তোমার ভাল লাগতে পারে।

ডেস্কটা তোমার স্বপ্নের অংশ নয়। ডেস্কের উপরের আঁচড়ের সংখ্যার অর্থ তুমি এর আগে কতবার এই টেপটা শুনেছ আর তোমার স্মৃতি মুছে ফেলেছ।

***

এরপর ঐ জাদুর কথাগুলো চলল। যা বুঝলাম, তা হলো অতীতের আমি টেপটা ব্যবহার করে আমার নিজের স্মৃতি বদলে দিয়েছে। আমি ডেস্কের সামনে বসে মাথা নিচু করে ফোঁপাতে থাকলাম। ছেনির আঁচড়গুলো থেকে কিংবা হয়ত ড্রয়ারের ভেতর থেকে, যেখানে আলো পৌঁছাতে পারে না, একটা অদ্ভুত ভ্যাপসা বাজে গন্ধ ভেসে আসছিল। বাইরের সত্যিকারের দুনিয়া থেকে শুধু এই গন্ধটাই আমার দুনিয়ায় এসে পৌঁছাতে পারছিল, ডেস্কের এই ড্রয়ার দিয়ে।

আমি বিছানার কিনারায় গিয়ে বসলাম আর অসংখ্য চিন্তার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। এমন একটা পৃথিবী যার উপরিভাগ পঁচতে থাকা লাশে ভারি হয়ে আছে, সেখানে আমি একমাত্র মানুষ যে এখনো স্কুলে যাচ্ছে, আসছে, এখনো স্কুলের ইউনিফর্ম পরছে। রেল গেটে আমি এখনো আমার কমিউটার পাশ দেখাই, পুরো ট্রিপের ভাড়া দেয়ার প্রমাণ। অবাক হয়ে ভাবলাম স্কুলের দিকে হেঁটে যাওয়া, ট্রেনে চড়ার ভান করা, স্কুলের গেটের দিকে যাওয়া, সব জায়গায় নিশ্চয়ই আমাকে মাটির উপর পড়ে থাকা নরম দেহগুলো মাড়াতে হয়েছে। আমি নিশ্চয়ই সেই অপরিস্কার ক্লাসরুমে ঢুকেছি, মুখে নকল হাসি নিয়ে যা কিনা আমাকে অন্যদের ঘৃণা থেকে দূরে রাখত। আমি নিশ্চয়ই কল্পনা করছি টিচার এখনো আমার বখাটে ক্লাসমেটদের দিকে চিল্লিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকে থামানোর জন্য। আসলে সত্য হল আমি আমার স্কুল ডেস্কে বসে ছিলাম যেখানে অন্য সবাই মরে গিয়েছে। আমার চুল বড় হয়ে গিয়েছে, চোখের দৃষ্টি শূন্য, মুখে তখনো নকল হাসি, আমাকে দেখতে মানুষের চেয়ে বেশি বন্য কোন জন্তুর মতই লাগছে।

দরজায় একটা টোকা পড়ল। আমি উত্তর দিলাম। মা দরজা খুললেন, হাতে একটা ক্যাক্টাস।

“তুমি এখনো জেগে আছ? তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পর,” তিনি বললেন, মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই। তাকে দেখে জীবিত মনে হলেও আমি জানি যে তার লাশ অন্য কোথাও পড়ে আছে।

পুরো দুনিয়ায় আমিই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। এ কথা চিন্তা করতেই কিছু নাম না জানা অনুভূতি আমার ভেতরে বুদবুদের মত ফুটতে থাকল, থামাতে পারছিলাম না।

“তুমি কাপছ কেন? তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?”

আমি মাথা নাড়লাম, বিড়বিড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। আমি যদি কেঁদে থাকি তাহলে সেটা অসুস্থতার জন্য নয়। বরং আমার শান্তির জন্য। অবশেষে আমি এমন একটা দুনিয়ায় পৌঁছাতে পেরেছি যা আমি অনেকদিন থেকে চাইছিলাম। যেখানে আমি একদম একা। এটা উপলদ্ধি করতে পেরে আমার শান্তি লাগল।

কাজারি অ্যান্ড ইয়োকো

মা যদি আমাকে কখনো খুন করতে চায়, তাহলে সেটা কিভাবে করবেন? হয়তো কিছু একটা দিয়ে মাথায় সজোরে আঘাত করে, যেমনটা তিনি সবসময়ই করেন। কিংবা গলা চিপে ধরে যেটা তিনি মাঝে মাঝেই করেন। কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের বারান্দা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারেন, আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর জন্য।

শেষেরটাই ভাল হবে। তার জন্য সবচেয়ে ভাল হয় যদি আমি আত্মহত্যা করেছি এরকম কিছু দেখানো যায়। কেউ যখন আমার ক্লাসমেট কিংবা টিচারদের কাছে আমার ব্যাপারে জানতে চাইবে, তারা তখন বলবে :

“ইয়োকো এনদো কোন একটা সমস্যা নিয়ে সবসময় অন্যমনস্ক থাকত। ওর সমস্যা নিশ্চয়ই ওর মাথায় চড়ে বসেছিল। যে কারনে ও নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।”

কেউ সন্দেহ করবে না আমার আত্মহত্যা করা নিয়ে।

ইদানিং মা আমার উপর প্রত্যক্ষ নির্যাতন করা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর অনেক সময়ই শারীরিকভাবে আঘাত করেন। যখন ছোট ছিলাম তখন ব্যাপারটা ছিল পরোক্ষ ধরণের। আমার বোনের জন্য কেক রাখা হত, আমার জন্য রাখা হত না। আমার বোনের জন্য কাপড় কেনা হত, আমার জন্য কেনা হত না। মা যতভাবে সম্ভব আমার উপর মানসিক অত্যাচার চালিয়ে গিয়েছেন।

“ইয়োকো তুমি তো বড়, তাই না? মানিয়ে চলতে শিখো,” তার কথা ছিল এরকম।

কাজারি আর আমি জমজ। কাজারি দেখতে সুন্দর আর হাসিখুশি। ও হাসলে মনে হত ফুল ফুটলো। স্কুলের সব ছেলেমেয়েরা, সব টিচাররা ওকে পছন্দ করত। আমিও ওকে পছন্দ করতাম কারন মাঝে মাঝে ও ওর রাতের খাবার থেকে বেঁচে যাওয়া খাবার আমাকে দিত।

মা কখনো আমার জন্য রাতের খাবার বানাতেন না, তাই আমি সবসময় ক্ষুধার্ত থাকতাম। আমি যদি কখনো ভুলেও রেফ্রিজারেটরের দরজা খুলতাম তাহলে মা একটা অ্যাস্ট্রে হাতে ছুটে আসতেন। আমি তাকে এতটাই ভয় পেতাম যে এমনকি স্ন্যাক্সও খেতে পারতাম না। মাঝে মাঝে এত ক্ষুধার্ত লাগত যে মনে হত মরে যাব। আমি খাবি খেতে শুরু করতাম, কাজারি একটা প্লেটে করে ওর বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে আসত তখন। সত্যি বলতে কি, আমার কাছে ওকে তখন স্বর্গদূত মনে হত। এক প্লেট আধ খাওয়া ম্যাকারনি আর চিজ কিংবা কয়েক টুকরা গাজর হাতে ওকে মনে হত সাদা ডানা ওয়ালা স্বর্গদূত।

মা যদি দেখতেন কাজারি আমাকে খাবার দিচ্ছে তাহলে কিছু বলতেন, রাগতেনও না। তিনি কখনো কাজারিকে বকতেন না। সবসময় কাজারির যত্ন নিতেন।

কাজারির ঝুটো খেয়ে আমি ওকে ধন্যবাদ দিতাম আর ভাবতাম আমার বোন আমার কাছে কতটা মূল্যবান ছিল। ওকে রক্ষা করার জন্য কাউকে খুন করতে হলে আমি সেটাও করতে এক পায়ে খাড়া ছিলাম।

***

আমাদের পরিবারে কোন বাবা ছিল না। যতদিনে আমি এটা বুঝতে সক্ষম হয়েছি ততদিনে শুধু আমরা তিনজন ছিলাম-মা, কাজারি আর আমি। এভাবেই আমরা চলেছি, আমি জুনিয়র হাইয়ের দ্বিতীয় বর্ষে উঠা পর্যন্ত।

বাবা না থাকার কারনে আমার জীবনে কি কি প্রভাব পড়েছে তা আমার জানা ছিল না। যদি বাবা থাকতেন তাহলে মা হয়ত আমার দাঁত ভাংতেন না কিংবা সিগারেট দিয়ে ছ্যাকা দিতে না। কিংবা হয়ত তখনো করতেন। কে জানে। হয়তো আমিও কাজারির মত হাসিখুশি কেউ হতাম। সকাল বেলা মাকে যখন এক প্লেট টোস্ট আর ডিম ভাজা হাতে নিয়ে হাসতে দেখতাম, তখন এসব চিন্তা আমার মাথায় আসত। তিনি প্লেটটা অবশ্যই কাজারির সামনে নিয়ে রাখতেন। আমার জন্য কিছু থাকত না। আমি জানতাম যে আমার তাকানো ঠিক নয়। কিন্তু আমি জেগে আছি, কিচেনে দাঁড়িয়ে আছি, কিভাবে না তাকিয়ে থাকা যায়?

মা আর কাজারির আলাদা আলাদা রুম ছিল। আমার ছিল না। আমার জিনিসপত্রগুলো ভ্যাকুয়াম ক্লিনার আর অনেক হাবিজাবি জিনিসপত্রের সাথে একই সাথে ক্লজিটে রাখা হত। কপাল ভাল যে আমার এমনিতেও বলার মত কিছু ছিল না। থাকার জন্য আমার খুব বেশি জায়গার প্রয়োজনও ছিল না। স্কুলের বই আর স্কুল ড্রেস ছাড়া কিছু ছিলই না বলা যায়। আমার অন্য কাপড়গুলো ছিল কাজারির দেয়া পুরোনো কাপড়। কখনো যদি আমি পড়ার জন্য কোন বই বা ম্যাগাজিন হাতে নিতাম তাহলে মা এসে ছোঁ মেরে কেড়ে নিতেন। নিজের বলতে একমাত্র যা ছিল সেটা হল একটা যাবতোন বালিশ (চেয়ারে রাখার বালিশ)। কিচেনের ময়লার ঝুড়ির পাশে বালিশটা বিছিয়ে তার উপর বসে আমি পড়াশুনা করতাম, কিংবা চিন্তা করতাম, অথবা গুনগুন করে কোন গান গাইতাম। মা কিংবা কাজারির দিকে যেন চোখ না পড়ে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার চেষ্টা করতাম। মায়ের সাথে চোখাচোখি হলে তিনি হয়ত আমার দিকে ছুরি ছুঁড়ে মারতে পারেন। আমার যাবুতোনটা আমার ফুটোন (জাপানি বিছানা) হিসেবেও কাজ করত। আমি বিড়ালের মত গুটিসুটি মেরে ওটার উপর ঘুমাতাম আর সব কষ্ট ভুলে যেতাম।

প্রতিদিন সকালে নাশতা না করে বের হতাম। বাসা থেকে কখনোই দ্রুত না বের হয়ে পারতাম না কারন আমাকে দেখলেই মা চোখ গরম করে বলতেন, “এই মেয়ে এখনো কি করছে এখানে?” দরজা দিয়ে বের হতে কয়েক সেকেন্ড এদিক ওদিক হলেই শরীরে নতুন একটা কালশিটে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেত। আমি কিছু না করলেও মা কোন একটা ছুতো বের করে আমাকে পেটাতে যেতেন।

হেঁটে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে কাজারি আমার পাশ কাটিয়ে যেত আর আমি হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ও যখন হাঁটত ওর চুল সামনে পেছনে দুলত। আমি, মা, কাজারি যখন একসাথে থাকতাম তখন আমাদের মধ্যে প্রায় কোন কথাই হত না। এমনকি মা আমাদের সাথে না থাকলেও দুই বোনের মধ্যে যেরকম কথা হওয়ার কথা তাও হত না।

স্কুলে কাজারি খুব জনপ্রিয় ছিল। ওর অনেক বন্ধু-বান্ধব ছিল। তারা একত্রে অনেক ভাল সময় কাটাত। আমার হিংসা হত, কিন্তু কখনো ঐ সার্কেলে ঢোকার মত সাহস আমার হয়নি।

কোন টিভি প্রোগ্রাম বা কোন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী সম্পর্কে আমার কিছু জানা ছিল না। টিভি দেখতে গেলে মা আমার উপর ক্ষেপে যেত, যে কারনে টিভির জীবন সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিল না। আর তাই সবাই যে বিষয়ে আগ্রহ নিয়ে কথা বলত, সে সম্পর্কে আলাপ করার মত কোন প্রত্যয় আমার মধ্যে ছিল না। আমার কোন বন্ধু ছিল না। বিরতির সময় আমি ডেস্কের উপর মাথা নামিয়ে ঘুমানোর ভান করতাম।

কাজারির উপস্থিতি আমার কাছে বিশাল স্বস্তির বিষয় ছিল। সবাই কাজারিকে ভালবাসত, ওর বোন হতে পেরে, একই রক্ত বহন করতে পেরে আমার গর্ববোধ হত।

আমার সাথে কাজারির চেহারার অনেকটাই মিল ছিল। কেউ হয়ত শুনলে বলবে যে তোমরা তো জমজ, মিল তো থাকবেই। কিন্তু কেউ আমাদেরকে চিনতে ভুল করত না। কাজারি ছিল প্রাণখোলা, হাসিখুশি। আমি গোমড়ামুখি, চুপচাপ। এমনকি আমাদের স্কুলের ইউনিফর্ম এক হলেও আমারটা ছিল নোংরা আর দুর্গন্ধযুক্ত।

একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে টেলিফোনের খাম্বায় একটা হারানো কুকুরের বিজ্ঞাপন দেখলাম। একটা মেয়ে টেরিয়ার, নাম আসো। সাধারণ একটা হাতে আঁকা ছবি, সাথে সুন্দর হাতের লেখায় লেখা ছিল, “কুকুরটা পেয়ে থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করুন, সুজুকি।”

আমি পোস্টারটা পড়লেও সেটা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামালাম না। সত্যি কথা হল আমার হাত আগেরদিনের মারের কারনে ভয়াবহ রকমের ব্যথা করছিল। ঐদিন ক্লাসে এতটা ব্যথা করছিল যে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। বাধ্য হয়ে স্কুল নার্সের সাথে দেখা করতে গেলাম। সে আমার হাতের কালশিটে দেখে চমকে গেল।

“কিভাবে হল এসব?” সে জানতে চাইল।

“সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলাম।”

ডাহা মিথ্যা কথা যদিও। সত্যি হল, মা দেরি করে বাসায় ফিরেছিলেন। গোসল করতে গিয়ে টাবে একটা বড় চুল পান আর ক্ষেপে গিয়ে আমাকে মারেন। সেভাবে হাতে দাগটা পড়েছিল। আমি ছিটকে পড়ে টেবিলের এক কোণায় গুঁতো খাই। মনে মনে নিজেকে লাথি মারছিলাম এরকম কপালের জন্য।

“টাবের মধ্যে ওটা তোর চুল ছিল। আমার শরীরে এসে লাগল, কি ঘেন্নার বিষয়! ছিঃ! তুই কেন তোর মাকে এত ঘৃণা করিস? কাজ করে বাসায় ফিরেছি, আমি একদমই ক্লান্ত। কেন আমার সাথে এমন করিস?”

আগেও এমন ঘটেছে। সমস্যার সমাধানের জন্য আমি মা গোসল করার আগে কখনো গোসল করি না। তাই আমি জানতাম মা যেই চুল নিয়ে অভিযোগ করছিল সেটা আমার না কাজারির ছিল। কিন্তু আমার আর কাজারির চুল একই সমান, আর আমি সেটা বোঝাতে গেলে মা আরো রেগে যাবে। তাই কিছুই বললাম না চুপ করে থাকলাম।

“দেখে মনে হচ্ছে না কোন হাড় ভেঙেছে, কিন্তু তোমার যদি এখনো ব্যথা থাকে তাহলে হাসপাতালে যাওয়া উচিত, নার্স বলল। “মিস এনদো, তুমি কি নিশ্চিত যে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলে? তুমি আগেও এসে বলেছ সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছ, বলনি?”

হাতের ক্ষতে ব্যান্ডেজ প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে নার্স আমাকে এই প্রশ্নগুলো করল। আমি কিছুই বললাম না। মাথা নিচু করে বের হয়ে গেলাম। পরেরবার আসলে আমাকে অন্য কোন অজুহাত বানিয়ে তারপর আসতে হবে।

মায়ের নির্যাতনের কথা লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে আমি খুবই সিরিয়াস ছিলাম। মা আমাকে বলেছেন কেউ যেন এসব কথা না জানে। আমি যদি কাউকে কখনো বলি তাহলে মা আমাকে খুন করবেন।

“তুই কি বুঝতে পারছিস না? আমি তোকে মারি কারন তুই খারাপ। এখানে আমার কিছুই করার নেই। কিন্তু তুই কিন্তু কাউকে বলবি না। বুঝেছিস? কথাটা শুনলে আমি তোর একটা উপকার করব, আর সেটা হল এই ব্লেন্ডারের সুইচ অন করব না।”

আমি সে সময় ইলিমেন্টারি স্কুলে পড়তাম। চোখে পানি নিয়ে কোনরকমে শুধু মাথা ঝাঁকালাম। মা সুইচ থেকে আঙুল সরিয়ে আমার হাতটা ছেড়ে দিলেন। আমি তাড়াতাড়ি ব্লেন্ডারের ভেতর থেকে হাত বের করে নিলাম।

“ছোট্ট একটা চাপ দিলে আর তোর হাতটা জুস হয়ে যেত।”

মা হাসলেন, তার মুখ থেকে চকলেট আইসক্রিমের গন্ধ আসছিল। এত মিষ্টি গন্ধ যে আমার বমি পাচ্ছিল।

মা নিজে লোকজনের সাথে ভালভাবে মিশতে পারতেন না। কিন্তু আমার সামনে তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ শয়তান। বাড়ির বাইরে বলার মত তার কিছু ছিল না। দুই সন্তানকে পালার জন্য তাকে কাজ করতে হত কিন্তু অন্য লোকজনের সামনে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারতেন না। ভেতরে ভেতরে আমি আর মা একই রকম ছিলাম। একটা ব্যাপারে আমাদের মধ্যে মিল ছিল, সেটা হল আমরা দুজনই সদা হাসিখুশি কাজারিকে ভালবাসতাম। কাজে যখন কোন কিছু ঠিকমত হত না তখন মা ভয়াবহ খারাপ মেজাজ নিয়ে বাসায় ফিরতেন। বাসায় ফিরে আমাকে খুঁজে বের করে লাখি ঘুষি মারতেন।

“আমি তোর জন্ম দিয়েছি। তোর জীবন, তোর মৃত্যু আমার হাতে। কেউ এর কিছুই বদলাতে পারবে না!”

অন্তত আমি তার সন্তান না বলার চেয়ে ভাল। মা যখন আমার চুল মুঠি করে ধরতেন তখন আমি এরকমটাই ভাবতাম।

ক্লাস রুম পরিস্কার করার সময় একজন ক্লাসমেট আমার সাথে কথা বলল। গত তিন দিন ছয় ঘন্টার মধ্যে এই প্রথম কোন ক্লাসমেট আমার সাথে কথা বলল। আসল কথা হল, তিন দিন আগের কথাবার্তা যেটা হয়েছিল সেটা ছিল এরকম: “অ্যাই এনদো, তোমার ইরেজারটা একটু ধার দাও,” “দুঃখিত, আমার কোন ইরেজার নেই।” “ধ্যাত।” ব্যাস ওইটুকুই। আজকের কথাবার্তা খানিকটা লম্বা ছিল।

“ইয়োকো এনদো, তুমি কি জানো তুমি ক্লাস ১ এর কাজারি এনদোর হুবহু কপি? তাই না? কিন্তু কোন কারনে তোমাদের দুজনকে দেখে দুই বোন মনে হয় না।”

ঝাড়ু হাতে আমার ক্লাসমেটটা বলল। আশেপাশের অন্য মেয়েরা হেসে উঠল। ওর কথাগুলো আমার কাছে নতুন কিছু না, তাই আমি তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। কিন্তু অন্য মেয়েদের হাসির ব্যাপারটায় আমার অদ্ভুত লাগছিল।

“এরকম কোরনা, তুমি ওর মনে আঘাত দেবে।”

“আমি দুঃখিত। আমি নিষ্ঠুর হতে চাইনি।”

“ঠিক আছে।”

অন্তত আমি এরকম বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অনেকদিন কোন কথা না বলায় আমার গলা কাজ করছিল না। আমি ঝাড়ু দিতে থাকলাম, আশা করছিলাম তারা চলে যাবে। ক্লাসরুম পরিস্কার করার কাজ সবার কিন্তু সত্যিকার অর্থে শুধু আমি একাই ফ্লোর ঝাড়ু দিচ্ছিলাম।

“আচ্ছা এনদো, তুমি তো আজকে নার্সের অফিসে গিয়েছিলে তাই না? আরেকটা কালশিটে পড়েছে নাকি? তোমার পুরো শরীরটাই কি একটা বড় কালশিটে না এখন? হু আমি সব জানি। জিমে, সাঁতার ক্লাসে তোমাকে বেদিং স্যট পরার সময় আমি সব দেখেছি। কিন্তু ওরা কেউ আমাকে বিশ্বাস করছে না। তোমার পোশাক খুলে ওদেরকে দেখাও তো।”

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত। এমন সময় দরজা খুলে টিচার ভেতর ঢুকলেন। যে মেয়েগুলো আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল, সরে গিয়ে ঝাড়ু দেয়ার ভান করতে লাগল। বাঁচা গেল, আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবলাম।

স্কুল থেকে বাসায় ফেরার সময় পার্কের একটা বেঞ্চে বসে ঐ মেয়েদের হাসাহাসি করার ব্যাপারটা চিন্তা করছিলাম। লোকজনের এমন কিছু বলা উচিত না যাতে করে অন্য কেউ কষ্ট পায়। চিন্তা করতে গিয়ে আমার বমি বমি লাগছিল। ওদের ব্যাপারটা আজব লাগছিল। সবাই কাজারির সাথে যেমন ব্যবহার করে, তেমন ব্যবহার আমার সাথে করানোর জন্য আমাকে কি করতে হবে? আমি অন্য সবার মত হতে চাই। আমি চাই পরিস্কারের কাজে ফাঁকি দিতে, কিছু কাগজ একসাথে দলামচা করে বল বানিয়ে ঝাড়ু দিয়ে হকি খেলতে।

যখন মুখ তুললাম দেখি একটা কুকুর আমার পাশে বসে আছে। গলায় একটা কলার ছিল। তাই প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এর মালিক হয়ত আশেপাশেই কোথাও আছে, কুকুরটাকে খুঁজছে।

পাঁচ মিনিটের মত পার হওয়ার পর আমি বুঝতে পারলাম কাহিনী ভিন্ন। কুকুরটা আমার জুতো কছিল। আর আমি সাবধানে ওটার পিঠ চুলকে দেয়ার চেষ্টা করছিলাম। কুকুরটা আঁতকে উঠেনি, তার মানে বোঝা যাচ্ছিল লোকজনের সাথে থেকে অভ্যস্ত। তারপর আমি খেয়াল করলাম যে কুকুরটা একটা মেয়ে টেরিয়ার। আমার মনে হল এটাই হয়ত আসো, যেই কুকুরটার পোস্টার সকালে দেখেছিলাম।

আমি কুকুরটা নিয়ে পোস্টারে লেখা সুজুকির ঠিকানায় গেলাম। ছোট একটা বাড়ি। সূর্যাস্তের আলোয় আকাশ তখন লালচে হয়ে ছিল। আমি বেল চাপলাম, আর সাদা চুলের একজন ছোটখাট বুড়ি দরজা খুললেন।

“ওহ আসো! আমার আসো! এটা তো দেখি আসলেই আমার আসো!”

তিনি কুকুরটাকে জাপটে ধরলেন। আনন্দে বুড়ির চোখগুলো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছিল। আমার মনে কোন সন্দেহ ছিল না যে ইনিই সেই সুজুকি যিনি পোস্টারটা লিখেছেন।

“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি কুকুরটার জন্য অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমি তোমাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। কিছুক্ষণের জন্য ভেতরে আসবে?”

আমি সায় জানিয়ে ভেতরে গেলাম। স্বীকার করতে লজ্জা লাগছে কিন্তু আমি আশা করছিলাম কোন ধরনের পুরষ্কার হয়ত পাব। হয়ত খানিকটা মিষ্টি, অল্প কিছু টাকা, যে কোন কিছুতেই আমি খুশি। আমি সবসময়ই ক্ষুধার্ত, তাই কোন কিছুতেই সমস্যা নেই। কিছু একটা হলেই আমি খুশি।

আমরা দুজন লিভিং রুমে গিয়ে দুটো যাবুতোনে বসলাম।

“তো তোমার নাম ইয়োকো। আমি মিসেস সুজুকি। আমি মাত্র কালকেই পোস্টারগুলো লাগিয়েছি আর এখনই আসোকে ফেরত পেয়ে গেলাম। একদম বিশ্বাস হচ্ছে না।”

মিসেস সুজুকি আসোর গালের সাথে নিজের গাল ঘষলেন, তারপর উঠে লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। দেখে মনে হচ্ছিল এই বাড়িতে তিনি একাই থাকেন।

ট্রেতে কিছু কুকিজ আর কফি নিয়ে ফিরে এলেন। আসো তার পায়ের সাথে লেগে ছিল। ট্রেটা নিচু টেবিলটায় রেখে আবার আমার পাশে এসে বসলেন। তিনি জানতে চাইছিলেন কুকুরটাকে ঠিক কোথায় পেয়েছি। বলার মত নাটকীয় কোন কাহিনী তো ছিল না, কিন্তু আমি যখন বলছিলাম তখন তিনি হাসি মুখে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন।

আমি কয়েকটা চিনির ছোট প্যাকেট আর দুধের কন্টেইনার খলে সব কফিতে ঢেলে ঢকঢক করে গিলে ফেললাম। দুই কামড়ে সব কুকিজ উধাও। কফি আর কুকিজ দুটোই খুব মজার ছিল। আমার খাবারের মধ্যে সাধারণত মিষ্টি কিছু পড়ে না, যদিনা স্কুলের লাঞ্চে মাঝেমধ্যে কোন ডেজার্ট দেয়। বাসায় আমি খুবই কম খাওয়ার মত কিছু পাই, যদি কাজারি না খায় শুধু তখনই। আমাকে যদি এমন কোন হাই স্কুলে যেতে হয় যেখানে কোন লাঞ্চ দেয় না, তাহলে জানি না কিভাবে বাঁচব। হ্যাঁ, আমার এখনই সেটা নিয়ে। দুশ্চিন্তা হয়।

মুখে দয়ালু একটা অভিব্যক্তি নিয়ে মিসেস সুজুকি আমাকে আরেক কাপ কফি ঢেলে দিলেন। এবার আমি কফি গেলার সময় একটু সময় নিলাম। “আমি খুশি হব যদি তুমি ডিনার পর্যন্ত থাক,” তিনি বললেন।

এক সেকেন্ড চিন্তা করে আমি রাজি হলাম। কিন্তু মনের ভেতর কোথাও ছোট একটা কণ্ঠ গজগজ করে আমাকে বলল, এর আগে কখনো এই মহিলার সাথে আমার দেখা হয়নি, একে আমার এত চাপ দেয়া ঠিক হচ্ছে না।

“সত্যি বলতে কি ডিনার বানানোর জন্য আমি কিছুই এখনো করিনি। আসোকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম।”

তিনি কুকুরটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। কুকুরটার সুখে আমার রীতিমত হিংসা হচ্ছিল।

“ওহ, আমার তোমাকে পুরষ্কার ধরণের কিছু একটা দেয়া উচিত। কি দেয়া যেতে পারে। দাঁড়াও আমি একটু দেখে আসি। একটু অপেক্ষা কর।”

মিসেস সুজুকি কুকুরটাকে রেখে লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার জন্য কি নিয়ে আসতে পারেন ভেবে আমার উত্তেজনা হচ্ছিল যার সাথে আমি অভ্যস্ত নই। আমি অনেক সময় ছটফট করি কিন্তু উত্তেজনা হয় না। আমার মনে হল আমাকে হয়ত আরো কয়েকটা কুকিজ দেয়া হবে যেগুলো চাবাতে চাবাতে আমি বাড়ি যেতে পারব। বাড়িতে নিয়ে গেলে ওগুলো আমার থেকে কেড়ে নেয়া হতে পারে।

আসো আমাকে শুকছিল। আমার মনে পড়ল আগের রাতে গোসল করা হয়নি, বাজি ধরে বলতে পারি আমার শরীর থেকে দুর্গন্ধ আসছিল। রুমের মধ্যে চোখ বোলালাম। একটা টিভি আছে, কিন্তু কোন ভিসিআর ছিল না। মিসেস সুজুকির মত একজন বয়স্ক মহিলা সম্ভবত জানেনও না ভিসিআর কি করে ব্যবহার করতে হয়। আমি শুনেছি ভিসিআর চালানো নাকি বেশ কঠিন। আমি নিজে কখনো কোন টিভি কিংবা ভিসিআর ছুঁয়ে দেখিনি।

লিভিং রুমে একটা পুরো দেয়াল জুড়ে বিশাল একটা বুক কেস ছিল। আমি বইগুলোর নাম দেখছিলাম এমন সময় সমস্যাগ্রস্থ চেহারা নিয়ে মিসেস সুজুকি ফিরে এলেন।

“আমি দুঃখিত। আমি তোমাকে আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোথায় রেখেছি ভুলে গিয়েছি। খুঁজতে হবে। তুমি কালকে আবার আসতে পারবে না? আমি তোমার জন্য ডিনার তৈরি করে রাখব।”

আসব কথা দিয়ে আমি বাসায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাইরে তখন অন্ধকার নেমে গিয়েছে। মিসেস সুজুকি আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। আমার মাথায় নতুন একটা চিন্তা এল: আহ এটাকেই কি তাহলে ‘সি অফ’ করা বলে? আগে কখনো আমার জীবনে কেউ কখনও আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়নি।

***

পরদিন স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে আবার মিসেস সুজুকির বাড়িতে গেলাম। বেল চাপার আগেই বাসার ভেতর থেকে খাবারের সুগন্ধ ভেসে এসে আমার নাকে লাগছিল। আমাকে দেখে মিসেস সুজুকি খুশি হলেন। আমিও যেতে পেরে খুশি ছিলাম। আগের দিনের মতই তিনি আমাকে লিভিং রুমে নিয়ে গেলেন আর আমি যাবতনের উপর বসলাম। আসো আমাকে চিনতে পারল। সবকিছু আগের দিনের মতই লাগছিল।

“ইয়োকো, আমি দুঃখিত। যে মূল্যবান জিনিসটা আমি তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম তা এখনো খুঁজে পাইনি। সব জায়গায় খুঁজলাম, বুঝতে পারছি না কোথায় গেল। আশা করছি তুমি রাগ করবে না যদি এখনো একসাথে ডিনার করি? তুমি কি হ্যামবার্গার পছন্দ কর?”

উনি কি আমার সাথে মজা করছেন? আমি হ্যামবার্গারের জন্য পাগল ছিলাম। অন্য কিছু চিন্তা করার কোন সুযোগ নেই। হ্যামবার্গারের জন্য আমি আমার একটা কিডনি বেচতেও রাজি। আমি তাকে বললাম যে হ্যামবার্গার অনেক পছন্দ করি। তিনি এত জোরে হাসলেন যে তার ভাঁজ পড়া মুখটায় দয়াল অভিব্যক্তি ছড়িয়ে পড়ল।

খাওয়ার সময় আমি চিন্তা করছিলাম হ্যামবার্গার কেন? মিসেস সুজুকি কি হ্যামবার্গার অনেক পছন্দ করেন? আমার মনে হল না। হয়ত তিনি ধরে নিয়েছেন আমি পছন্দ করি। একটা বাচ্চাকে খুশি দেখার জন্য হ্যামবার্গার বানানোটা মানা যায়।

“তো ইয়োকো, তোমার সম্পর্কে কিছু বল,” আমরা খেতে খেতে তিনি বললেন।

উমম কি বলব উনাকে?

“তোমার পরিবার সম্পর্কে বল।”

“আমার পরিবারে মা আর একটা জমজ ছোট বোন আছে।”

“সত্যি? জমজ?”

তার চেহারা দেখে বুঝতে পারছিলাম তিনি কাজারি সম্পর্কে আরো প্রশ্ন করতে চাইছিলেন কিন্তু সত্য এতটা নিষ্ঠুর আর অন্ধকারচ্ছন্ন যে আমি তার চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না, এবং মিথ্যা বললাম।

আমি তাকে বললাম যে আমার বাবা না থাকলেও আমরা তিনজন সুখে শান্তিতে বসবাস করছি। আমি বললাম আমার মা খুবই চমৎকার একজন মহিলা। প্রতি বছর আমাদের জন্মদিনে তিনি আমার আর আমার বোনের জন্য নতুন কাপড় চোপড় কিনে আনেন। সবসময় একই রঙ। কটকটে রঙ না, সুন্দর হালকা রঙ, বড়রা যেরকম পড়ে। ছুটির দিনে আমরা তিনজন একসাথে চিড়িয়াখানায় যাই কাছ থেকে পেঙ্গুইন দেখার জন্য। আমি তাকে বললাম, আমি আর আমার বোন একই রুম শেয়ার করে থাকি, কিন্তু এখন আমি নিজের একটা রুম চাচ্ছি। আমি বললাম আমি আর কাজারি যখন ছোট ছিলাম তখন টিভিতে একটা ভয়ের শো দেখে রাতে ঘুমাতে পারিনি, মা আমাদের হাত ধরে ছিলেন। আমি নিজেকে থামাতে পারছিলাম না। তাকে অনেক কিছু বললাম যা কখনো হয়নি, হওয়া সম্ভব নয়।

“শুনে মনে হচ্ছে তোমার মা খুবই চমৎকার একজন মানুষ,” তিনি বললেন।

মিসেস সুজুকি খানিকটা বিড়বিড় করলেন, মনে হচ্ছে হচ্ছে, মুগ্ধ হয়েছেন। আমি উনার কথা শুনলাম আর ভাবলাম আমার সব মিথ্যাগুলো যদি সত্যি হত।

তিনি আমার স্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলে, সুতরাং আমি আরো কিছু মিথ্যা কথা বললাম। তাকে বললাম যে আমার স্কুলের কিছু বন্ধুদের নিয়ে সাগর তীরে গিয়েছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে তার হাসি দেখে আমি নিজেকে মনে মনে বললাম উনি যেন কখনো সত্যিটা জানতে না পারেন। কিন্তু আমার ব্রেন এত সব মিথ্যা তৈরি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, আমার কণ্ঠ মাঝে মাঝে একটু চড়ে যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম টপিকটা বদলানো দরকার।

“আহ, আপনার তো দেখি প্রচুর বই!”

হ্যামবার্গারের যে টুকরাটা মুখের ভেতর চাবাচ্ছিলাম সেটা গিলে ফেলে দেয়ালের সাথে রাখা বুক কেসের দিকে তাকালাম। মিসেস সুজুকিকে খুব আনন্দিত দেখাল।

“আমি আসলেই বই অনেক পছন্দ করি। আমার সংগ্রহের অল্প কিছু এখানে। অন্য রুমগুলোতে আরো অনেক বই আছে। আমরা কমিকস পড়তেও ভাল লাগে। ইয়োকো, তুমি কি ধরনের মাঙ্গা (জাপানি কমি) পছন্দ কর?”

“আসলে, বলতে কি…আমি…আমি জানি না, আসলে…”

“ওহ?”

মিসেস সুজুকি দুঃখি চেহারা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন, তাই আমার কিছু করা উচিত। জানি না কেন, কিন্তু এই বয়স্ক মহিলা আমাকে অপছন্দ করুক তা আমি চাইছিলাম না।

“আচ্ছা, আপনার কাছে যদি কোন ইন্টারেস্টিং বই থাকে, তাহলে সেটা সম্পর্কে আমাকে বলবেন?”

“নিশ্চয়ই, তোমার যা খুশি। তোমাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বই ধার দিতেও আমার ভাল লাগবে। সেটাই করা যাক। তুমি যখন আবার আসবে তখন ফেরত দিও।”

মিসেস সুজুকি আমার সামনে বসে ইন্টারেস্টিং দেখতে নভেল আর মাঙ্গার একটা স্তূপ বানালেন। আমি একটা কমিক বুক নিয়ে বেরিয়ে এলাম। একটা নিয়েছি যাতে আমি তাড়াতাড়ি সেটা শেষ করে কালকে আবার আসতে পারি। আমি যদি সেটা করি, তাহলে একজন লোভী রাজকন্যার মত হিসাব করলাম, যে তিনি হয়ত আমাকে আবারও মজার কিছু খেতে দিতে পারেন। আর আমিও মিসেস সুজুকি আর আসোকে আবার দেখতে পাব। অনেক কিছু আছে যা নিয়ে আমি তার সাথে আলাপ করতে চাই। কল্পনায় দেখতে পেলাম আমি আসো আর মিসেস সুজুকির সাথে এত বেশি সময় কাটাচ্ছি যে আমার পিঠ মেঝের যাবুতোনের সাথে পাকাপাকিভাবে জোড়া লেগে গিয়েছে।

***

এভাবে আমি বারবার মিসেস সুজুকির বাসায় যেতে থাকলাম, যদিও এর মধ্যে যন্ত্রণাদায়ক অনেক কিছু ঘটেছিল। প্রতিবার, চলে আসার সময় আমি একটা বই ধার নিতাম, যাতে করে ফেরত দেয়ার অজুহাতে আবার ফিরে আসতে পারি। আর যতই খোঁজাখুঁজি চলুক না কেন, মিসেস সুজুকি মনে হচ্ছিল না তার সেই মূল্যবান সম্পদটা আমাকে দেয়ার জন্য আর খুঁজে পাবেন।

যদিও বই ফেরত দেয়ার বিষয়টা তার সাথে আবার দেখা করার জন্য একটা অজুহাত ছিল কিন্তু অজুহাতটা না থাকলে নিজেকে আমার স্রেফ একজন আগন্তুক মনে হত, যার দেখা করতে যাওয়ার সত্যিকারের কোন কারন ছিল না। আমার জীবনে মিসেস সুজুকিই প্রথম মানুষ যার পাশে আমি নিজের মত থাকতে পারি। আমি চাইনি কোন কারন ছাড়া বার বার আসার কারনে তিনি আমাকে অপছন্দ করুন।

যতবারই আমি গিয়েছি, মিসেস সুজুকি প্রতিবারই আমার জন্য ডিনার বানিয়ে রেখে অপেক্ষা করতেন। প্রতিদিন আমি ধার নেয়া বই কিংবা মাঙ্গাটা পড়ে আমার মতামত তাকে শুনাতাম। তিনি, আসো আর আমি অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম। যেদিন স্কুল তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত সেদিন আমি আসোকে নিয়ে হাঁটতে বের হতাম। আলু ছিলতে কিংবা পুড়ে যাওয়া বা বদলানোর মত টুকটাক কাজে আমি মিসেস সুজুকিকে সাহায্য করতাম।

“এরপর যেদিন তোমার স্কুল ছুটি থাকবে, সেদিন কি আমরা একটা মুভি দেখতে যেতে পারি?”

কথাটা শুনে আমি আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলাম।

“কিন্তু আমি ভাবছিলাম তোমার মা আবার এতে কিছু মনে করবেন না তো? ইদানিং মনে হচ্ছে আমি তোমাকে আমার কাছে অনেক বেশি সময় আটকে রাখছি। পরেরবার, তোমার সাথে কাজারিকেও নিয়ে এসো কেমন?”

হুমম। আমি মাথা ঝাঁকালাম, কিন্তু মনে মনে বুঝতে পারছিলাম না কি করব। মিসেস সুজুকি আমার সমস্ত মিথ্যা কথা বিশ্বাস করে বসে আছেন।

মুভির পর মিসেস সুজুকি আর আমি ঐ কনভেয়ার বেল্ট সুশি রেস্টুরেন্টগুলোর একটায় গেলাম। আমি না যাওয়ার জন্য কিছু অজুহাত দাঁড় করাতে চাইছিলাম, কিন্তু উনি জোর করলেন। আমি আমার জীবনে সুশি খেয়েছি না খাওয়ার মতই। আমি এমনকি ঐ বিভিন্ন ধরনের মাছগুলোর নামটা পর্যন্ত জানতাম না। কনভেয়ার বেল্ট সুশি রেস্টুরেন্টগুলো কিভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে কিছুটা ধারণা আমার ছিল, আর আমি বেছে বেছে কম দামি খাবারগুলো তুলে নিতে চাইছিলাম, কিন্তু সত্যি কথা হল আমি আসলে জানতাম না কোনটা দামী আর কোনটা কম দামী। খাবারের প্লেটগুলো আমাদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল, মিসেস সুজুকি তার পরিবার নিয়ে কথা বলছিলেন।

“জানো, প্রায় তোমার বয়সি আমার একটা নাতনি আছে।” তাকে হঠাৎ নিঃসঙ্গ দেখাল।

“তোমার চেয়ে এক বছরের ছোট হবে হয়ত। ও খুব বেশি দুরে থাকে না কিন্তু তিন বছর বা তারও বেশি হবে ওর সাথে আমার দেখা হয়নি।”

“আপনি কি আপনার পরিবারের সাথে একসাথে থাকতে পারেন না?”

মিসেস সুজুকি কোন উত্তর দিলেন না। নিশ্চয়ই কোন কারন ছিল।

“আপনি যদি ওকে চিঠি পাঠান? আমি তোমাকে দেখতে চাই। আমি তোমার জন্য রান্না করতে চাই। তুমি যা খেতে চাও তাই তৈরি করব। এরকম কিছু লিখলে আমি নিশ্চিত ও আপনাকে দেখতে অবশ্যই আসবে।”

এক পর্যায়ে আমি সিরিয়াসলি চিন্তা করতে শুরু করলাম যে কেউ যদি আমাকে বলে তুমি কি খেতে চাও তাই খাওয়াবো, তাহলে আমার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে। মানে বলতে চাইছি ঐটা হয়ত ‘জীবনে একবারই আসে। ধরনের প্রশ্ন হতে পারে। যদি এরকম প্রশ্ন কখনো আসে তবে তার জন্য আমার এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া উচিত। এসব যখন ভাবছিলাম তখন সুশিগুলো আমার সামনে দিয়ে ঘুরে যাচ্ছিল।

“তুমি খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে, ঠিক কিনা,” মিসেস সুজুকি দম আটকে বললেন। “আসলে তোমাকে আমার একটা জিনিস বলবার আছে। আসোকে ফিরিয়ে আনার জন্য যে জিনিসটা তোমাকে দেব বলেছিলাম, সেটার ব্যাপারে। সত্যি কথা হল এরকম কোন জিনিস আসলে নেই। আমি বানিয়ে বলেছিলাম। আমি তোমাকে আবারও দেখতে চাইছিলাম, তাই একটা অজুহাত বানিয়েছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আর সেটার প্রতিদান হিসেবে তোমাকে এটা দিতে চাই।”

তিনি আমার হাতে একটা চাবি দিয়ে মুঠে বন্ধ করলেন।

“আমার ঘরের চাবি। আমাদের আর কোন অজুহাতের প্রয়োজন নেই। তোমার যখন ইচ্ছা হবে তখনই আসতে পারবে। কারন তোমার সঙ্গ আমি খুবই উপভোগ করি।”

আমি বার বার নড করলাম। সুন্দর একটা চিন্তা আমার মাথায় এলো। জীবনে কতবার আমি আফসোস করেছি জন্ম নেয়ার জন্য, কতবার চিন্তা করেছি কোন উঁচু বিল্ডিঙের মাথায় গিয়ে ছাদের কোনার বেড়ায় উঠে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু যতবারই সেরকম মনে হোক না কেন আজকের মত একটা দিন আমি বারবার পেতে চাই।

সেদিন থেকে প্রতিদিন, যখনই আমার সাথে কষ্টদায়ক কিছু হয়েছে, মিসেস সুজুকির দেয়া চাবিটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরেছি। আর সেটা আমাকে মাটির উপর আমার পা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে, চাবিটা যেন ছিল কোন ‘ডাবল এ এলকালাইন ব্যাটারির মত, ঝাঁকুনি দিয়ে আমাকে শক্তি সরবরাহ করত আর দুনিয়াতে ফিরিয়ে আনত।

চাবিটা আমি যখন যে বইটা ধার করতাম, সেটার মধ্যে লুকিয়ে রাখতাম, একটা বুকমার্কের মত।

মিসেস সুজুকি চাবিটা দেয়ার দুই সপ্তাহ পর এক শুক্রবার দিন স্কুলে একটা ঘটনা হল। বিরতির সময়ে কাজারি আমার ক্লাসরুমে এল। ও ওর অংকের বই আনতে ভুলে গিয়েছিল তাই আমারটা ধার নিতে এসেছিল।

“প্লিজ। আমি তোমার জন্য ভাল কিছু একটা করব।।”

অনেকদিন পর কাজারি আমার সাথে কথা বলল, তাই আমি আনন্দিত বোধ করছিলাম। ঐ দুপুরে আমারও অংকের ক্লাস ছিল, কিন্তু ও কথা দিয়েছিল আমার ক্লাসের আগেই এসে বইটা ফেরত দিয়ে যাবে, তাই আমিও ওর হাতে বইটা তুলে দিয়েছিলাম।

লাঞ্চের সময় কাজারির ক্লাসরুমে গেলাম বইটা আনতে কিন্তু ও সেখানে ছিল না। আমাকে আমার বই ছাড়াই অংক ক্লাস করতে হল।

আমাদের অংকের টিচার চমৎকার একজন মানুষ ছিলেন। আমি যদিও খুব কমই তার সাথে কথা বলেছি, তবে প্রায়ই তাকে দেখেছি করিডোরে দাঁড়িয়ে কাজারির সাথে হাসতে হাসতে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে কথা বলতে। তাই আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি যদি তাকে বুঝিয়ে বলি কেন আমার বই সাথে নেই তাহলে কোন সমস্যা হবে না।

ক্লাসের একদম শুরুতে তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, “কেন তোমার সাথে বই নেই?” তারপর আমাকে ডেস্কের পাশে দাঁড় করালেন।

“আ..আমি বইটা আমার বোনকে ধার দিয়েছিলাম।”

“আমি আমার কান দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছি না! নিজের সমস্যার জন্য আরেকজনের উপর দোষ চাপাচ্ছ। তুমি কি আসলেই ক্লাস ১-এর কাজারির জমজ বোন? আর তোমার কি মনে হয় না তোমার উচিত নিজের চেহারা-সুরত, পোশাক-আশাকের উপর একটু নজর দেয়া?”

টিচার যখন এসব বলছিলেন তখন ক্লাসের ভেতর থেকে চাপা হাসির শব্দ আসছিল। টের পেলাম আমার মুখ গরম হয়ে যাচ্ছে, আমার ইচ্ছা করছিল ছুটে পালিয়ে যাই। আমি জানি আমার চুলগুলো অগোছালো আর পোশাক-আসাক নোংরা। কিন্তু যে মানুষটা কিচেনে ঘুমায় তার পক্ষে এ ব্যাপারে কি করার ছিল?

সেদিন ক্লাস শেষে রুম থেকে বের হয়ে কাজারির সামনে পড়লাম।

“আমি দুঃখিত যে তোমার বই ফেরত দিতে দেরি হয়ে গেল। আমি সেটার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে চাই। আমি আর আমার বন্ধুরা ম্যাকডোনাল্ডস-এ যাচ্ছি। তুমিও আমাদের সাথে চল? আমি তোমাকে হ্যামবার্গার খাওয়াবো।”

কাজারি সুন্দর একটা হাসি দিল। আগে কখনো ও আমাকে এরকম কোন কিছুতে ডাকেনি। শুনে আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম, আর অবশ্যই রাজি হয়েছিলাম। কাজারি আর ওর বন্ধুদের সাথে কোথাও যাওয়া মানে আমার কাছে স্বপ্নের মত। ভুলে নিজের বাম পায়েই এত জোরে পাড়া দিয়ে বসলাম যে অনেক ব্যথা করছিল।

তো আমরা চার জন মিলে ম্যাকডোনাল্ডস-এ গেলাম : কাজারি, ওর দুই বন্ধু, আর আমি। কাজারি সবার জন্য একসাথে অর্ডার দিল। আমি ওর বন্ধুদেরকে চিনতাম না। তারা আমার সাথে তেমন একটা কথাও বলেনি। তবে ওরা কাজারির সাথে অনেক কথা বলল আর অনেক হাসল।

“এটা কি সত্যি যে তোমার কাছে কখনোই টাকা থাকে না? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কাজারি হাত খরচ পায় আর তুমি কিভাবে পাও না?” ক্যাশ রেজিস্টারের সামনে আমরা যখন লাইন ধরে দাঁড়িয়েছিলাম তখন কাজারির একজন বন্ধু আমাকে প্রশ্ন করল। কাজারি আমার হয়ে উত্তর দিল।

“এটা আমাদের মায়ের সিদ্ধান্ত। তিনি আমার বোনকে কোন টাকা দিলে ও সাথে সাথে সব খরচ করে ফেলে।”

আমাদের অর্ডার রেডি হলে আমরা সেগুলো নিয়ে দোতালায় গিয়ে একটা টেবিলে বসলাম। কাজারি যথেষ্ট পরিমাণ জুস, ফ্রেঞ্চ ফাইজ আর হ্যামবার্গার নিয়ে এসেছিল, তবে সেটা তিনজনের জন্য। কাজারি আর ওর বন্ধুরা খেতে শুরু করল আর আমি শুধু ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সাহস করে প্রশ্ন করতে পারলাম না, “আমারটা কোথায়?” ব্যাপারটা চিন্তার বাইরে যে আমি কখনো সরাসরি মা কিংবা কাজারিকে নিজে থেকে কোন কথা বলব।

“আমার খাওয়া শেষ।”

কাজারির একজন বন্ধু তার আধ খাওয়া হ্যামবার্গারটা আমার সামনে ছুঁড়ে রাখল।

“ইয়োকো, আমি শুনেছি তুমি নাকি অন্যদের ফেলে দেয়া খাবার খাও? সত্যি নাকি?”

কাজারি আনন্দের সাথে ওর বন্ধুর প্রশ্নের উত্তর দিল।

“সত্যি কথা। ইয়োকো সবসময় আমার স্কুটো খাবার গপগপ করে খায়। কাজারি আমার দিকে ঘুরল। “তাই না ইয়োকো? এই দুইজন আমার কথা বিশ্বাসই করে না। চল ওদেরকে দেখিয়ে দাও। নাও, এটা খাও।”

কাজারি ওর আধ খাওয়া হ্যামবার্গারটা আমার দিকে ঠেলে দিল। ও আর ওর বন্ধুরা চোখে আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি লোভীর মত সব খাবার গপাগপ করে খেলাম, একটা শুকর যেভাবে করে। আমার খাওয়া শেষ হলে ওরা তিনজন হাততালি দিয়ে উঠল।

ওখান থেকে বের হয়ে ওরা তিনজন আমাকে বিদায় জানিয়ে কাছের ট্রেন স্টেশনের দিকে চলে গেল। একা হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ভেতরে ভেতরে আমি চিৎকার করে উঠলাম, “হায় খোদা!”

মিসেস সুজুকির বাসায় পৌঁছানোর পর আমার মাথা যেন ফেটে যাচ্ছিল। কিভাবে কাজারি পারল ওর বন্ধুদের একত্রিত করে আমার সাথে এরকম করতে? আসলে কাজারি সবসময়ই আমার সাথে এরকম করে এসেছে। পার্থক্যটা শুধু হল, আগে করত বাসার ভেতর, আর এখন করল বাইরে। আমি এটা ভেবে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমার শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছিল। হয়ত আমি স্কার্ফ বেশি পেঁচিয়ে ফেলেছিলাম।

মিসেস সুজুকি আমার জন্য এক কাপ কফি ঢালতে গিয়ে একটু কাশলেন।

“আমি মনে হয় একটু ঠাণ্ডা লাগিয়ে ফেলেছি,” আরেকটু কেশে তিনি বললেন। “কি হয়েছে ইয়োকো? তোমার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে। সবকিছু ঠিক আছে তো?”

“উম, আসলে, আমার মনে হয় একটু বেশি…”

“একটু বেশি?”

তিনি সরাসরি আমার চোখের ভেতর তাকালেন। বয়স্ক মানুষদের চোখ কেন এত স্পষ্ট হয়? আমি বুকে হাত রেখে মনে মনে ভাবছিলাম।

“আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ব্যথা হচ্ছে….এখানে।”

কোন রকমে শব্দগুলো মুখ থেকে বের করতে পারলাম। আমার মাথার ভেতর আবারও কাজারি আর ওর বন্ধুদের চিন্তা ঘুরছিল। মিসেস সুজুকি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, কিছু বললেন না।

“নিশ্চয়ই তোমার সাথে খারাপ কিছু ঘটেছে।” তিনি আমাকে বেডরুমের দিকে নিয়ে গেলেন এবং আয়নার সামনে বসালেন।

“আমার জন্য হাসো। তুমি কি জানো, তুমি আসলে খুবই সুন্দর দেখতে।” তিনি আমার গালে হাত বুলিয়ে আলতো করে চিমটি কাটলেন। আমাকে হাসানোর অনেক চেষ্টা করছিলেন।

“থামুন,” আমি বললাম। “প্লিজ, থামুন! আমি শুধু আয়নায় একটা ভাঁড়কে দেখতে পাচ্ছি। আমার বুকে একটু ভাল বোধ হচ্ছে অবশ্য, আপনি এখন আমার গাল টানা বন্ধ করতে পারেন।”

“একটু ভাল? তাহলে তো ভালই,” তিনি বললেন, আবার কাশতে লাগলেন। আর সেটা গলা পরিস্কার করার মত কাশি ছিল না। বাজে রকমের খসখসে কাশি যা আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল।

“আপনি কি ঠিক আছেন?”

“আমি ঠিক আছি। হ্যাঁ, ঠিক আছি। আমি চিন্তা করছিলাম আমাদের কোথাও ঘুরতে যাওয়া উচিত। একটা টিপ। জানো তো, ইয়োকো, তুমি আমার কাছে পরিবারের একজনের মতই, অন্য যে কারো চেয়ে অনেক কাছের মানুষ তুমি।”

“আমরা কি এমন কোথাও যেতে পারি যেখান থেকে আর ফিরে আসতে হবে না?”

“নিশ্চয়ই। আমরা দুনিয়ার যে কোন জায়গায় গিয়ে থাকতে পারি। আমরা তোমাকে আমার নিজের নাতনি বলে চালাতে পারি।”

আমি জানতাম আমি যাতে ভাল বোধ করি সেজন্য শুধু মিসেস সুজুকি এই কথাগুলো বলছিলেন। কিন্তু তারপরেও আইডিয়াটা আমার কাছে খুব ভাল লাগল। আমি শুধু কল্পনা করছিলাম, তিনি যদি আমার আপন নানি হতেন তাহলে কতই না ভাল হত।

মিসেস সুজুকি আয়নার দিকে ইশারা করলেন। ওখানে আমার ছায়াটা হাসছিল। আমাকে দেখতে লাগছিল ঠিক কাজারির মত।

বাসায় ফেরার সময় আমি কাজারির মত করে হাঁটার চেষ্টা করলাম। মাথা উঁচু করে হাসিখুশি মুখ করে রাখলাম। উপলদ্ধি করলাম যে আমি এতদিন সবসময় মাথা নিচু করে হাঁটতাম।

***

কিচেনের ময়লার ঝুড়ির পাশে দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম আর মিসেস সুজুকির বাড়িতে যা যা হল সেটা নিয়ে ভাবছিলাম। মা ল্যাপটপ হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। অফিসের কাজের জন্য তার ল্যাপটপের প্রয়োজন হয়। তিনি সবসময় জিনিসটার ভাল যত্ন নিতেন। একবার তিনি ওটা কিচেনের টেবিলে রেখে গিয়েছিলেন আর আমি আঙুল দিয়ে আলতো ছুঁয়ে দেখেছিলাম।

“তোর নোরা হাতগুলো ওটার থেকে দুরে রাখ!” তিনি চিৎকার করে পাতিল দিয়ে আমার মুখে বাড়ি মেরেছিলেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার চেয়ে ল্যাপটপটার গুরুত্ব অনেক বেশি।

মাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। একবার আমার দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় মুখ সরিয়ে নিলেন। লিভিং রুম থেকে কাজারি মাকে ডাক দিলে তার চেহারায় স্বস্তির ছাপ দেখা গেল। কাজারি আমার আগে বাড়িতে ফিরেছিল আর লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছিল। আমার ঐ রুমে ঢোকা মানা আছে তাই আমাদের আর কোন কথা হয়নি। আমি যদি মায়ের নিষেধ ভেঙে লিভিং রুমে ঢুকে টিভি দেখি তাহলে তিনি আমাকে নিশ্চিতভাবে ন্যাংটো করে পুরো শহর ঘোরাতেন।

মা লিভিং রুমের দিকে গেলেন আর আমি আমার ব্লাউজের ভাঁজ ডলে সমান করতে করতে খুশি মনে ভাবলাম আজকে রাতে হয়ত মার খাওয়া থেকে বেঁচে যাব। লিভিং রুম থেকে মা আর কাজারির কথাবার্তা ভেসে আসছিল। আমি একটা অংকের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, এক কান ওদিকে দিয়ে রেখেছিলাম।

“আচ্ছা মা, তুমি কি খেয়াল করেছ যে ইয়োকো আজকাল দেরি করে বাসায় ফেরে?” কাজারিকে কথাটা বলতে শুনে আমি পেন্সিল নামিয়ে রাখলাম। “মনে হচ্ছে ওর একটা বন্ধু হয়েছে। ওর ক্লজিটের মধ্যে ও অনেকগুলো বই লুকিয়ে রেখেছে। আমি ভাবছিলাম ওগুলো কেনার টাকা ও কোথায় পেল।”

আমার মনে হল নিমেষেই যেন শরীরের সব রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। লিভিং রুম থেকে মা কিচেনে রীতিমত উড়ে এলেন। আমাকে পেরিয়ে গিয়ে ক্লজিটের দরজা খুললেন। আমার দিকে তাকালেনও না, যেন আমার কোন অস্তিত্ব ছিল না। ক্লজিট থেকে আমার স্কুলের বইগুলো বের করে ছুঁড়ে ফেললেন, তারপর নিচে লুকানো তিনটা বই আবিষ্কার করলেন যেগুলো আমি মিসেস সুজুকির কাছ থেকে ধার এনেছিলাম।

“এই বইগুলো তুই কোথায় পেয়েছিস?” তিনি সরু গলায় উত্তর দাবি করলেন। আমি ভয়ে কাঁপছিলাম, কিন্তু কোন রকমে কথা বলতে পেরেছিলাম। উত্তর না দিলে মার খেতে হত তাতে কোন সন্দেহ নেই।

“ওগুলো ধার করেছি…”

তিনি বইগুলো ছুঁড়ে নিচে ফেললেন।

“তোর কোন বন্ধু নেই যে তোকে এরকম বই ধার দিতে পারে। আমি জানি কি করেছিস তুই। তুই ওগুলো চুরি করেছিস, তাই না? প্রতিদিন আমি তোর জন্য কষ্ট করি, আর তুই আমার জন্য খালি শুধু সমস্যার উপর সমস্যা তৈরি করিস!” তিনি হিসহিস করে কথাগুলো বললেন আর চেয়ার দিয়ে আমাকে আঘাত করলেন। “তুই সবসময় এমন ছিলি। সবসময় অকাজের কাজী। কাজারি আর আমার জন্য সমস্যা তৈরি করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই তোর।”

কাজারি লিভিং রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মুখে সমবেদনা টেনে বলল, “মা, মাফ করে দাও ওকে। আমার মনে হয় ও না বুঝে করে ফেলেছে।”

মা কাজারির দিকে তাকিয়ে হাসলেন। “তুমি একটা লক্ষ্মী মেয়ে কাজারি,” তারপর আমার দিকে ঘুরলেন। “আর অন্যদিকে এটা, ভেতর থেকে পঁচন ধরা। আমি জানি না আর কী বলব। কাজারি যাও তো, লিভিং রুমে ফিরে যাও।”

কাজারি আমার দিকে শব্দ না করে মুখ নাড়িয়ে বলল “ভাল থেকো,” তার পর বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে থাম্বস আপ দিল। রুমে ফিরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। আমি টিভির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

মা এসে আমার পেছনে দাঁড়ালেন। হাতগুলো আমার কাঁধে রাখলেন। আমি শক্ত হয়ে বসে ছিলাম, কারন জানি একটু নড়লেই তিনি আবারও মারবেন।

“আমি কি কখনো তোর জন্য কোন সমস্যা সৃষ্টি করেছি? হয়তো মাঝে মধ্যে দুই-একটা চড় থাপ্পড় দিয়েছি, কিন্তু সেটা তো তোর ভালোর জন্যই।”

তিনি আস্তে করে কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে আমার গলার উপর উঠিয়ে আনলেন।

“থা-থামো!” আমি গুঙিয়ে উঠলাম।

“তুই যখন ওভাবে কথা বলিস তখন আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়। আমি তোকে বড় করছি। তোর কি মনে হয় না আমার খানিকটা সম্মান পাওনা আছে?”

আমি টের পাচ্ছিলাম তার হাতের চাপ বাড়ছে। আমি আর কোন শব্দ করতে পারছিলাম না। নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না। বলতে পারছিলাম না, “থামো, মা, আমাকে মাফ করে দাও। তুমি যা বলবে তার সবকিছু করতে আমি রাজি আছি। আমি ক্ষমা চাইছি।”

আমার মনে হয় এক সেকেন্ডের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। জ্ঞান ফিরতে দেখলাম মেঝেতে পড়ে আছি, মুখ থেকে লালা ঝরছে। মা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, প্রাচীন কোন মন্দিরের প্রহরীর মত আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

“তোর মরে যাওয়াই ভাল। একদিন আমি তোকে ঠিকই খুন করে ফেলব। আমি কোনভাবেই বুঝতে পারি না দুজন জমজের মধ্যে এত পার্থক্য কি করে হয়। তোর সবকিছু আমার মাথা গরম করে তোলে, তোর কথা বলা থেকে শুরু করে হাঁটা পর্যন্ত সবকিছু।”

মা বই তিনটা তুলে নিয়ে তার রুমে চলে গেলেন। আমার হৃদপিণ্ড তুমুল গতিতে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত আমার মাথার ভেতর পাঠাচ্ছিল।

মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই। এখানে থাকলে আমার জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ছোট কোন জিনিসেও মা রাগে ফেটে পড়েন, আর আমি নিশ্চিত তিনি আমাকে খুন করে ফেলবেন।

আমি মিসেস সুজুকিকে দেখতে চাইছিলাম। আমি চাইছিলাম আমরা তিনজন মিসেস সুজুকি, আসো আর আমি, দূরে কোথাও চলে যেতে।

মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার আমার মনে পড়ল। মিসেস সুজুকির বাসায় ঢোকার যে চাবিটা তিনি আমাকে দিয়েছিলেন, সেটা ঐ বইগুলোর একটায় লুকানো ছিল, যেগুলো মা তার রুমে নিয়ে গিয়েছেন।

পরদিন ছিল শনিবার। স্কুল ছিল না। মা বাইরে গিয়েছিল, বলে গিয়েছিলেন তার কিছু কাজ আছে, ছয়টার আগে ফিরবেন না। দুপুরের দিকে কাজারি ওর বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হল। একা বাসায়, আমি মায়ের রুমে গেলাম।

মায়ের রুমে আমি প্রায় কখনোই যাইনি। এমনিতে ঐ রুমে পা দেয়ার মত সাহস নেই আমার। তিনি যদি টের পান তাহলে কঠিন মার খেতে হবে। সবচেয়ে খারাপ যেটা হতে পারে মৃত্যু। বিপদ জেনেও আমি সেখানে গিয়েছিলাম শুধু একটা কারনে, মিসেস সুজুকির বাসার চাবিটা উদ্ধারের জন্য। ঐ চাবিটা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারন ওটা মিসেস সুজুকি আর আমার মধ্যের সম্পর্কের একটা চিহ্ন। বইগুলো না পাওয়া গেলে আমি জানি মিসেস সুজুকি আমাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু চাবিটা না পেলে আমি নিজেকে নিজে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।

মায়ের রুমটা একদম নিখুঁতভাবে গোছানো। কোথাও এক বিন্দু ধুলোও পড়ে নেই। ডেস্কের উপর ফুলদানিতে ফুল রাখা, পাশেই তার ল্যাপটপ। একটা বড় বিছানার, এক মিনিটের জন্য আমার অস্বাভাবিক একটা অনুভূতি হচ্ছিল যে তিনি ওখানেই আছেন, বিছানা থেকে উঠছেন মাত্র। বিছানার পাশে একটা পোর্টেবল সিডি/রেডিও ক্যাসেট প্লেয়ার আর বুককেসে একটা তাকে সিডির সারি। মিউজিক শোনার অভ্যাস আমার ছিল না, তবে মা আর কাজারি প্রায়ই মিউজিক নিয়ে কথা বলত যে সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না।

মিসেস সুজুকির বইগুলো এক কোণায় অযত্নে ফেলে রাখা ছিল। আমি শুধু চাবিটা নিয়ে হাতের মুঠিতে আলতো করে চেপে ধরে রাখলাম। আমার শুধু এখন দরকার যত দ্রুত সম্ভব রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়া। বইগুলো ওখানেই ফেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ওগুলো নিলে মা বুঝে যাবেন যে আমি তার রুমে ঢুকেছিলাম।

দরজার নবটা মাত্র ঘুরিয়েছি এমন সময় আমি মূল দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম। একদম কাঠের মত শক্ত হয়ে গেলাম, শব্দ করতে ভয় পাচ্ছিলাম। রুম থেকে বের হতে গেলে ধরা পড়ে যাব। দরজায় কান লাগালাম। শুনতে পারছিলাম কেউ একজন এদিকে আসছে।

এদিক ওদিক তাকালাম কানোর জায়গার জন্য। বিছানাটা দেয়ালের সাথে লাগানো তবে একটা ফাঁক মতন আছে যেখানে আমার জায়গা হয়ে যাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফাঁকটার মধ্যে ঢুকে পড়লাম। আমাকে এভাবে দেখলে মনে হবে যেন ঘুমের মধ্যে নিচে পড়ে গিয়েছি। কিন্তু ফাঁকটা আমার জন্য একদম ঠিক সাইজের ছিল, যেন কেউ আমার জন্যই ওখানে ওটুকু ফাঁক আগে থেকে পরিকল্পনা করে রেখেছিল।

দরজা খোলার শব্দে আমার পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। আমার বুক এত জোরে ধকপক করছিল যে আমি চাইছিলাম ওটা থেমে যাক। আমি মাথাটা একটু বাঁকালাম যাতে বিছানার নিচ থেকে দেখতে পাই। রুমের অন্য পাশে একটা ফুল সাইজ আয়না ছিল। আয়নাতে কাজারির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল। কাজারি এসেছে। আমার জানা নেই ও মায়ের রুমে কি করছে কিন্তু যেটার জন্যই এসে থাকুক না কেন, আমি চাইছিলাম ও যেন তাড়াতাড়ি সেটা করে বেরিয়ে যায়। কাজারি বুককেসের সামনে দাঁড়িয়ে সিডিগুলো দেখছিল। গুনগুন করতে করতে কয়েকটা সিঁড়ি বের করল। অবহেলার সাথে ওগুলো ডেস্কের উপর রাখছিল। আবারও বুক কেসের দিকে ঘুরে কয়েকটা সিডি বের করল, আবারও নিয়ে ডেস্কের উপর রাখল।

বিছানার নিচ থেকে আমি আয়নায় দেখতে পেলাম ওর হাত ফুলদানির সাথে গিয়ে লাগছে। মুহূর্তেই আমার মুখ থেকে, “আহ!” বেরিয়ে এল। ফুলদানিটা উলটে গিয়ে সব পানি গড়িয়ে মায়ের ল্যাপটপের উপর পড়ল। কাজারি মনে হয় না আমার গলা শুনতে পেয়েছে কারন ও নিজেও একই সময়ে “আহ!” করে উঠেছিল। দ্রুত ও ফুলদানি সোজা করে ফেললেও যা ক্ষতি হওয়ার ততক্ষণে হয়ে গিয়েছে। ভেঁজা চুপচুপে ল্যাপটপটার দিকে তাকিয়ে ওর মুখ যে ভুতের মত সাদা হয়ে গিয়েছে তা আমি আয়নাতে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম।

ও পাগলের মত রুমের মধ্যে এদিক ওদিক তাকাল তারপর আবার ওর মুখে হাসি ফিরে এল। ও রুমের মধ্যে এমন একটা জায়গায় গেল যেটা আমি আয়নায় দেখতে পারছিলাম না কিন্তু বিছানার নিচ থেকে ওর গোড়ালি আর মোজা চোখে পড়ছিল। ওর পাগুলো রুমের মধ্যে ঘুরে বেড়াল, কোণায় ফেলে রাখা তিনটা বইয়ের সামনে গিয়ে থামল। মিসেস সজকির বাড়ি থেকে যেই বইগুলো এনেছিলাম, মা যেগুলো আমার থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন। কাজারির হাতগুলো ওগুলো তুলে নিল।

তারপর ও গিয়ে ডেস্ক থেকে সিডিগুলো তুলে আমার বুককেসে ঢুকিয়ে রাখল। দেখে মনে হচ্ছিল ওগুলো নেয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে। বরং মিসেস সুজুকির বইগুলো হাতে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলে। ওর রুমে কিছুক্ষণ থাকার পর আমি ওর পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম, লিভিং রুমে গেল। কয়েক মিনিট পর আবার ওর রুমে ফিরে গেল। এরপর আর আমি কোন পায়ের শব্দ পেলাম না।

আমার বুঝতে বেশি সময় লাগেনি কেন কাজারি বইগুলো নিয়েছিল। মা যখন ফিরে এসে দেখবে তার কম্পিউটার পানিতে ভেঁজা, তখন নিশ্চয়ই চিন্তা করবে আমি কিংবা কাজারির কেউ একজন কাজটা করেছে। কিন্তু যদি তার রুম থেকে বইগুলো উধাও হয়ে যায় তাহলে মা ধরে নেবে যে আমি তার রুমে বইগুলো আনতে গিয়েছিলাম, আর আমিই ফুলদানিটা ফেলে দিয়েছি।

আমি যতখানি দেখেছি মা তারচেয়েও কতখানি রেগে যেতে পারে তা আমি কল্পনা করতে পারছিলাম। এরকম ভয়াবহ কিছু আগে কখনো ঘটেনি। আমার মনে কোন সন্দেহ নেই যে এর মুল্য আমাকে আমার জীবন দিয়ে চুকাতে হবে। গতরাতে দেখা মায়ের চেহারাটা মনে পড়ল। তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাতগুলো ঈষৎ পেছনের দিকে বাঁকিয়ে কোমরের উপর রাখা। মন্দিরের গেটে থাকা নিও (বুদ্ধর রক্ষী)-এর মূর্তির মত নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার অভিব্যক্তি ছিল কঠোর এবং ক্ষমাহীন।

খুব সাবধানে আমি বিছানার ফাঁক থেকে বের হয়ে এমনভাবে রুম থেকে বের হলাম যেন কাজারি আমার পায়ের শব্দ শুনতে না পায়। মূল দরজা খুলে দৌড়ে মিসেস সুজুকির বাড়িতে চলে গেলাম। মিসেস সুজুকির আশ্রয়ই আমাকে একমাত্র জীবিত রাখতে পারে এখন। কিন্তু দরজার বেল বাজালে মিসেস সুজুকি নন, বরং মুখে মেকআপ দেয়া একটা কমবয়সি মেয়ে দরজা খুলল।

মেয়েটা আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নজর বুলিয়ে বলল, “কে তুমি?”

আমি মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারলাম যে এই মেয়েটা মিসেস সুজুকির সেই নাতনি।

“আঃ…আমি মানে…মিসেস সুজুকি কোথায়?”

“তুমি বলতে চাইছ আমার নানি? তিনি মারা গিয়েছেন। আজ সকালে তার প্রতিবেশী এসে আমাদেরকে জানান যে কুকুরটা অসম্ভব চিৎকার করছে। আমরা এসে তাকে সামনের দরজার কাছে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতে পাই। বাজে ঠাণ্ডা থেকে সৃষ্ট জটিলতায় মৃত্যু। আজকে আমার স্কুলও বন্ধ ছিল। এখন এসব সামলাতে হবে। ঝামেলা ছাড়া কিছু না।”

***

আমার মনে আছে মিসেস সুজুকি মাত্র আগের দিনই বলেছিলেন যে তার মনে হয় ঠাণ্ডা লেগেছে। দরজার ফাঁক দিয়ে মেয়েটার পেছনে আমি কিছু লোকজনকে ভেতরে নড়াচড়া করতে দেখতে পাচ্ছিলাম।

“এরি! কে এসেছে?” ভেতর থেকে একজন নারীর কষ্ঠ ভেসে এল।

মেয়েটা ঘুরে বলল, “চিনি না। একটা মেয়ে, আগে কখনো দেখিনি।” তারপর আমার দিকে ঘুরল। “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না তিনি এভাবে মারা গিয়ে আমাদের ঘাড়ে ঝামেলা চাপিয়ে দিলেন। কী যন্ত্রণা বল তো। এখন এই কুকুরটাকে নিয়ে কি করব? ভাবছি বাসায় নিয়ে যাব নাকি কোন এনিম্যাল সেন্টারে পাঠিয়ে দেব?”

এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হল, খোদা, এই মেয়ের গলা টিপে ধরলে কি কোন ভুল হবে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি যা করলাম তা হল মাথা নিচু করে মিসেস সুজুকির বাসার সামনে থেকে চলে এলাম।

পার্কে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসলাম। ঐ একই বেঞ্চ যেখানে আসোকে খুঁজে পেয়েছিলাম। পার্কে অনেক বাচ্চা-কাচ্চা খেলাধুলা করছিল, স্লাইড বেয়ে নামছিল, দোলনায় দোল খাচ্ছিল, খেয়াল খুশি মত হাসছিল। আমি বলের মত গুটিসুটি মেরে চোখ বন্ধ করলাম। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে মিসেস সুজুকি দুনিয়াতে আর নেই। ব্যাপারটা আমার জন্য সহ্য ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

পার্কের ঘড়িতে ছয়টা বাজছে। শিগগিরি মা বাসায় ফিরবে। আন্দাজ করলাম প্রায় তিন ঘন্টার মত হবে পার্কে বসে আছি। ঐ সময় আমার পায়ের কাছে কাদার মত দেখতে পেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম আমার অশ্রু থেকে সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু পরে খেয়াল করলাম কাছের একটা ফোয়ারা থেকে পানি বয়ে এসে কাদা হয়েছে।

উঠে দাঁড়ালাম। ঠিক করলাম পালিয়ে পৃথিবীর শেষ সীমানায় চলে যাব। কিন্তু সেই মুহূর্তে চোখের কোণা দিয়ে কাজারিকে চোখে পড়ল। প্রথমে ভেবেছিলাম ভুল দেখেছি, কিন্তু না, পার্কের পাশের ফুটপাথ দিয়ে কাজারিই হেঁটে যাচ্ছিল, হাতে স্থানীয় কনভিনিয়েন্স স্টোর থেকে কেনাকাটার ব্যাগ ঝুলছে। আমি ওর দিকে দৌড়ে গেলাম।

“কাজারি! দাঁড়াও!”

ও থেমে ঘুরে দেখল আমি দৌড়ে আসছি। ওর চোখগুলো গোল হয়ে কোটর থেকে বের হয়ে আসছিল মনে হল।

“কাজারি, আমি চাই তুমি মায়ের রুমে যা করেছ তার সত্যিটা মাকে বলে দাও আর ক্ষমা চাও।”

“তুমি ওটার সম্পর্কে জানো?”

“আমি ওটার সম্পর্কে সবকিছু জানি। তাই তুমি মাকে সত্যিটা বলে। দাও, যে তুমিই কাজটা করেছ।”

“অসম্ভব। আমি চাই না মা আমার উপরে রেগে যাক!” কাজারি জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাচ্ছিল। “তুমি কেন দোষটা তোমার ঘাড়ে নিচ্ছ না? তোমার তো এর অভ্যাস আছে। মা আমার উপর রাগ করলে আমি সহ্য করতে পারব না। এটা লজ্জাজনক। আমার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব না।”

আবারও আমার বুক চেপে আসছিল মনে হল। আমার কাছে যদি একটা ছুরি থাকত তাহলে খুশি মনে নিজের হৃদপিণ্ডে একটা ছিদ্র করে দিতাম। তাহলে শান্তি হত।

“…কিন্তু তুমি, তুমি নিজে পানিটা ফেলেছিলে, তাই না?” আমি অনুনয় করলাম।

“তুমি কি কানে শুনো না? আমি কি মাত্রই বললাম না যে তুমি বলবে কাজটা তুমি করেছ? মা যখন বাসায় ফিরবেন, তুমি গিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইবে, বুঝেছ?”

“কিন্তু আমি…” আমি আমার হাতগুলো পকেটে ঢুকালাম।

“হ্যাঁ?” ও তাড়া দিয়ে বলল।

পকেটে রাখা চাবিটা এত জোরে চেপে ধরেছিলাম যে মনে হচ্ছিল রক্ত বেরিয়ে আসবে।

“আমি…”

হৃদয়ের গভীর থেকে আমি ওকে ভালবাসতাম, কিন্তু সেটা দশ সেকেন্ড আগের কথা। আর আমার বুকের উপর থেকে চাপটা সরে গিয়েছিল। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস আবার নিয়মিত হয়ে এল।

“আচ্ছা ঠিক আছে। ব্যাপারটা ভুলে যাও। কাজারি, আমার কথা শোন…” আমি মনস্থির করে ফেলেছি। “তোমাকে বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু মা ইতিমধ্যে জানেন যে কাজটা তুমিই করেছ। কথাটা সত্যি। তিনি জানেন তুমি আমাকে দোষী দেখানোর জন্য বইগুলো নিয়ে গিয়েছ। তুমি দোকানে যাওয়ার জন্য বের হওয়ার সাথে সাথেই মা বাসায় ফিরেছিলেন। আমি সামনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর তার রুম থেকে চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। তারপর দৌড়ে পার্কে চলে আসি। কিন্তু মা এর মধ্যেই বুঝে ফেলেছেন যে তুমি ফুলদানি উলটে পানি ফেলেছ।”

কাজারির মুখ আবারও ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

“তার পক্ষে জানার কোন সুযোগই নেই!”

“কিন্তু তিনি জেনেছেন। আমি সামনের দরজায় দাঁড়িয়ে তার চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন সিডিগুলো উল্টোপাল্টা হয়ে আছে, তারমানে নিশ্চয়ই তুমি করেছ। সেজন্যই তিনি চিৎকার করছিলেন। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, দয়া করে যাও আর তিনি যা চান তা কর।”

কাজারি আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, বিহ্বল।

“মা সবকিছু জানে তারমানে?”

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

“তিনি যদি রেগে যান আর তোমাকে যেভাবে মারেন সেভাবে যদি আমাকে মারেন তাহলে সেটা আমি সহ্য করতে পারব না!”

আমি ভান করলাম যে আমিও বিহ্বল, তারপর ব্যাপারটাকে সামনে নিয়ে গেলাম।

“ঠিক আছে। আমি জানি কি করতে হবে। আমি তোমার জায়গায় গিয়ে তার কাছে মাফ চাইব।”

“তুমি তাকে কি বলবে?”

“শুধ আজ রাতের জন্য, চল পোশাক অদলবদল করি। আমি ভান করব যে আমিই তুমি। আমি তোমার পোশাক পরব, তুমি আমারগুলো পরবে। কাল সকাল পর্যন্ত আমি অভিনয় চালিয়ে যাব, আর তুমি আমি সেজে চুপচাপ থাকবে।”

“তোমার ধারণা তিনি তা বুঝতে পারবেন না?”

“সেটা চিন্তা কোর না। আমরা দেখতে হুবহু একই রকমের। কিন্তু তোমার মনে রাখতে হবে যে আমার মত খানিকটা দুঃখী দুঃখী অভিনয় করতে হবে। সেটা ঠিক মত করলে কোন সমস্যা হবে না। তিনি আমার উপর চিৎকার করবেন আর আঘাত যা করার আমাকে করবেন। তোমাকে সেটা নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা করতে হবে না।”

পার্কের রেস্টরুমে আমরা পোশাক বদলালাম। আমি কাজারির পোশাকগুলো পরে চুল ঠিক করে নিলাম। কাজারি আমার নোংরা পোশাক পরে মুখ কুঁচকে ফেলল।

“তোমার পোশাক থেকে অদ্ভুত গন্ধ আসছে!”

কাজারির পোশাকগুলো ছিল পরিস্কার আর সুন্দর। আমি ওর মোজাগুলো পড়লাম। ওর ঘড়ি পড়লাম। জানি না কতখানি ভাল করতে পেরেছি কিন্তু রেস্টরুমের আয়নায় তাকিয়ে হেসে ফেললাম। আমাকে কম বেশি কাজারির মতই লাগছে। নিজেকে হাসতে দেখে আমার মিসেস সুজুকির কথা মনে পড়ল। হাত দিয়ে মুখে স্পর্শ করলাম। চোখ দিয়ে পানির মত কিছু বেরিয়ে আসছিল। কাজারির থেকে আমার অশ্রু লুকানোর জন্য বেসিনের পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেললাম।

“কি করছ তুমি?” কাজারি বাইরে অপেক্ষা করছিল। রেস্টরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল, ওকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখাচ্ছিল। আমরা পার্ক থেকে বেরিয়ে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে গেলাম। গোধূলির সময়, পুরো বাড়িটা আমাদের সামনে লাল আলোতে স্নান করছিল। উপরে তাকিয়ে আমি দশ তলায় আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের জানালার দিকে তাকালাম। একটু আগে কাজারিকে আমি মিথ্যে বলেছিলাম যে মা বাসায় চলে এসেছেন। ও আমাকে সন্দেহ করেনি।

যদিও আমার নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় নেই, কিন্তু আমার বিশ্বাস মা এতক্ষণে অবশ্যই বাসায় চলে এসেছেন। এসব ব্যাপার মা বেশ মেনে চলেন। তিনি যদি বলেন ছয়টার মধ্যে বাসায় ফিরবেন, তাহলে তাই করবেন।

“কাজারি, বাসায় গিয়ে তুমি ভান করবে যেন তুমি আমি।”

কাজারিকে দেখে মনে হচ্ছিল না পরিকল্পনাটা নিয়ে সে খুশি। মিনমিন করে বলল, “আমি জানি। তো কে আগে ঢুকবে? সেই সেকেন্ড গ্রেডের পর থেকে আমরা কখনো একসাথে বাসায় ফিরিনি। ব্যাপারটাকে ভাল দেখাবে না।”

আমরা রক-পেপার-সিজার খেলোম সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। টানা ত্রিশ বার করলাম, পনের বার ও জিতল, পনের বার আমি। সম্ভবত আমরা জমজ বলে একইভাবে অনুমানও করি। একত্রিশ তম বার আমি জিতলাম। সুতরাং কাজারি, আমি সেজে আগে যাবে। আমি ওকে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙে ঢুকতে দেখলাম। বিল্ডিঙের সামনের একটা গাছে হেলান দিয়ে ডুবতে থাকা সুর্যের আলোয় ভেসে থাকা শহরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার হাতে কনভিনিয়েন্স স্টোর থেকে আনা কাজারির ব্যাগটা। হাঁটুর সাথে ঘষা লেগে প্লাস্টিক খচখচ করে উঠল।

একটা ছেলে সাইকেল চালিয়ে গেল, পেছনে লম্বা ছায়া ফেলে। আকাশের মেঘগুলোকেও লাল দেখাচ্ছিল, যেন ভেতর থেকে জ্বলছিল। কেউ একজন “কাজারি!” বলে ডাক দিল। আমি ঘুরে দেখি আমাদের বিল্ডিঙের এক মহিলা। “স্কুল কেমন চলে?” তিনি জানতে চাইলেন। “তুমি ভাল করছ তো?”

“মোটামুটি,” আমি উত্তর দিলাম। এর পরপরই কিছু একটা উপর থেকে নিচে ধপ করে আছড়ে পড়ল, আর মহিলাটা ভয়ে চিৎকার করে উঠল। মাটির উপর, ময়লা পোশাক পরা একটা মেয়ে পড়ে আছে, যে দেখতে একদম আমার মত ছিল।

আমি অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়ার পর, মৃত কাজারির হয়ে আমাকে একটা নোট লিখতে হল। মা আমাকে লিখতে বাধ্য করলেন। তিনি বললেন পুলিশ আসার আগে আমার হাতে কমবেশি পাঁচ মিনিটের মত আছে। আমি রাজি হলে তিনি বললেন আমি কত লক্ষ্মী একটা মেয়ে, আর তিনি আমাকে কতখানি ভালবাসেন। এই কথাগুলো আমি এর আগে শুধু গভীর রাতে শুনেছি, আমার স্বপ্নে।

নোটটা হতে হবে আত্মহত্যার আগে ইয়োকোর লিখে যাওয়া চিঠি, যেটা আমার জন্য লেখা সহজ ছিল। আমার শুধু দরকার ছিল আমি যখন মরতে চাইতাম তখন যা ভাবতাম তা লিখে ফেলা।

কেউ ইয়োকোর আত্মহত্যা নিয়ে কোন সন্দেহ করেনি। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর যখন আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল, আর সেই অন্ধকারে লোকজন অ্যাপার্টমেন্টের সামনে জড়ো হয়ে ছিল, পুলিশ আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে এসে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। আমরা তাদের আমাদের গল্প শোনালাম। মা আমার সত্যিকারের পরিচয় ধরতে পারেননি। আমি জানি শিগগিরি তিনি বুঝতে পারবেন এবং তখন আতংকিত হয়ে পড়বেন বা রেগে যাবেন। আমি ঠিক করলাম ব্যাগ-ট্যাগ প্যাক করে সে রাতেই বেরিয়ে পড়ে দূরে কোথাও চলে যাব।

পুলিশের সাথে কথাবার্তা অনেক রাত পর্যন্ত চলল, আমাকে আর মাকে দুজনকেই ভুতের মত দেখাচ্ছিল। আমি সত্যি সত্যি ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু মায়েরটা সম্ভবত অভিনয় ছাড়া কিছু ছিল না। পুলিশ যাওয়ার পর তিনি আমার কাঁধ ডলতে ডলতে আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। আমি মারা গেলে আমার মনে হয় না মার মন খারাপটাও হবে। কি দুঃখজনক রকমের একটা মানুষে পরিণত হয়েছি আমি। মনের ভেতরে আমি আসলেই কাজারির জন্য দুঃখিত ছিলাম, যে আর আমাদের সাথে নেই।

মা তার রুমে গেলেন। আমি কাজারির রুমে গেলাম, যেটা অনেক কিউট কিউট জিনিস দিয়ে ভর্তি। আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমি মনে হয় কিচেনের ময়লার ঝুড়ির পাশে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। যখন আমি নিশ্চিত হলাম যে মা রাতের জন্য বিশ্রাম নিয়েছেন, একটা ব্যাগে কিছু জিনিসপত্র ঢুকিয়ে রাখলাম। একটা ঘেঁড়া যাবুতোন যেটা আমি শোয়র জন্য ব্যবহার করতাম, সেটা ব্যাগে ঢোকানোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ঢুকল না। কাজারির কিছু জামা কাপড় বের করে বালিশটা ঢোকার জায়গা করলাম।

অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে মিসেস সুজুকির বাসায় গেলাম আসোকে নিতে। আমার মনে ছিল যে কেউ একজন নির্দোষ কুকুরটাকে এনিম্যাল সেল্টারে দিয়ে আসার কথা বলছিল। আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল আসো তখনো ঐ বাসায় আছে কিনা। গিয়ে দেখি আসোকে মূল দরজার সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। বাড়ির ভেতরে মনে হচ্ছিল মিসেস সুজুকির ছেলেমেয়ে আর নাতি নাতনিরা আছে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রস্তুতির জন্য। আসোকে সেজন্য বাড়ির বাইরে বের করে দেয়া হয়েছে। আমারও একই অবস্থা, আমি ভাবলাম।

আমাকে দেখে আসো এত জোরে লেজ নাড়াতে লাগল যে ভয় হচ্ছিল টর্নেডো না শুরু হয়ে যায়। আমি দড়িটা খুলে কুকুরটাকে কিডন্যাপ করলাম।

কুকুরটাকে নিয়ে ট্রেন স্টেশনের দিকে গেলাম। আমি দুঃখিত যে মিসেস সুজুকি আর ইয়োকো এনদো দুজনেরই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মিস করব। আমার জীবন কিভাবে চলবে সে ব্যাপারে আমার কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। আমার কাছে কোন টাকা ছিল না, হয়ত না খেয়ে মরতে হবে। কিন্তু ক্ষুধার্ত থাকার অভ্যাস আমার আছে, আর নিজের লোহার মত শক্ত পেটটার উপরও আমার ভরসা আছে, সুতরাং রেস্টুরেন্টের ফেলে দেয়া যে কোন কিছু, যেমন গাজরের ছিলকা পর্যন্তও খেয়ে বাঁচতে পারব। পকেটে হাত ঢুকিয়ে আলতো করে চাবিটা চেপে ধরলাম। ওটা আমাকে চলার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা সরবরাহ করছিল। মনে মনে বলে উঠলাম, “হ্যাঁ! আমি মুক্ত!”

জু

ছবি আর ভিডিওর মধ্যে পার্থক্যটা হাইকু (জাপানি ঐতিহ্যগত পদ্য) আর গদ্যের মধ্যের পার্থক্যর মত।

শুধু হাইকু নয়, ছোট আর বড় ছন্দের পদ্যও এর মধ্যে পড়ে। সাধারণত এসব পদ্যর আকার গদ্যের চেয়ে অনেক ছোট হয়। পদ্যর এটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এসব ছন্দবদ্ধ ঘোট ঘোট লাইনগুলো হঠাৎ করে হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে আর লেপ্টে থাকে। একজন কবি জগতটাকে দেখেন এবং শোনেন, তারপর হৃদয়ের অনুভূতিগুলো দিয়ে তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। আর তিনি তা ছোট ছোট বাক্যের দ্বারা ব্যাখ্যা করে থাকেন।

গদ্যের ক্ষেত্রে এগুলো একসাথে যুক্ত হয়ে থাকে। হৃদয়ের এই বর্ণনাগুলো হয় নিরবিচ্ছিন্ন। আর লাইনের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পেতে থাকে, কাঠামোতেও তত পরিবর্তন যুক্ত হতে থাকে। গদ্যে সংগঠিত ঘটনাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন চরিত্রগুলোর ভেতরটা সব একরকম হয় না। কিন্তু এই সমস্ত বাক্যগুলোর মূল ভাব বের করে আনলে তা একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে। সবকিছু একসাথে ধরে রাখার জন্য আমাদের কিছু “পরিবর্তন” যোগ করার প্রয়োজন পড়ে। প্রথম আর শেষ পৃষ্ঠার মধ্যে চরিত্রগুলোর হৃদয় বদলে গিয়ে অন্য কিছু একটায় পরিবর্তিত হতে হবে। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটা সোতের মত এসে হাজির হয়, আর সেটাই গল্পটার কাঠামো তৈরি করে। সরল গনিতের মত ব্যাপার। আপনি যদি একটা গদ্য নিয়ে একে ঘোট ঘোট অংশে বিভক্ত করেন, সেটা তখন হাইকু বা পদ্যতে রুপান্তরিত হয়। আপনি যদি একটা গল্পকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করেন, সেটা তখন ব্যাখ্যায় পরিণত হয়।

ফটোগ্রাফ বা ছবিও কিন্তু বর্ণনামূলক। একটা ক্যামেরা দিয়ে কোন ল্যান্ডস্কেপকে আজীবনের জন্য আটকে ফেলা যায়। একটা ছবি একটা বাচ্চার ক্রন্দনরত মুখটাকে বর্ণনা করতে পারে। ব্যাপারটা হাইকু বা পদ্যতে যা হয় তার কাছাকাছি।

অবশ্যই শব্দ আর ছবির মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু দুটোই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে চিরকালের জন্য থামিয়ে দেয়।

সুতরাং ধরা যাক আমরা কয়েক ডজন, কিংবা কয়েকশ ছবি তুললাম। একই ছবি বার বার নয়-আবার একদম অন্য কিছুও নয়। প্রত্যেকটা ছবি আগের ছবিটার ঠিক পরের মুহূর্তের ছবি, একটার পর একটা, এভাবে সারি বদ্ধভাবে। তারপর আমরা যদি ছবিগুলো দ্রুত একটার পর একটা উলটে যাই তাহলে যা ঘটে তাকে বলা হয় “দৃষ্টির বিদ্যমানতা” যা পুরো ব্যাপারটার মধ্যে সময়ের জন্ম দেয়।

একটা ক্রন্দনরত বাচ্চার উদাহরণ দেয়া যাক: কাঁদতে কাঁদতে একসময় বাচ্চাটা হাসতে শুরু করল। স্থির আলাদা আলাদা ছবির বদলে এগুলো একসাথে একটা চলমান অবস্থার সৃষ্টি করে। যে অবস্থার মধ্যে কান্না থেকে হাসি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার কারনে আমরা ভেতরের পরিবর্তনটা চাক্ষুষ দেখতে পাই। নিশ্চিতভাবে “সময়” হল প্রত্যেকটা মুহূর্তকে একসাথে সংযুক্ত করলে যা পাওয়া যায়, আর এ থেকে আমরা “পরিবর্তন” ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করতে পারি। অন্য কথায় বললে একটা গল্প বলতে পারি। আর সেটাই হল একটা মুভি। অন্তত আমার তাই মনে হয়।

***

আজ সকালে আবারও চিঠির বাক্সে একটা ছবি ছিল। এখন পর্যন্ত কতগুলো হল? এরকম চলছে প্রায় একশ দিন কিংবা তারও বেশি হবে। আমি এখনো এর সাথে মানিয়ে নিতে পারিনি, মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। প্রতিদিন সকাল বেলায় ঠান্ডার মধ্যে আমি বাইরে গিয়ে আমার পুরাতন মরচে পড়া চিঠির বাক্সে একটা করে ছবি খুঁজে পাই। ছবিটা পাওয়ার পর আমার মাথা ঘোরাতে থাকে, হালকা মাথাব্যথা অনুভুত হয়, সেই সাথে বিশ্রী রকমের হতাশাবোধ হয়। ছবিটা শক্ত করে হাতে ধরে আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। প্রত্যেক সকালে এই একই কাহিনী।

ছবিগুলো কোন খামে-টামে আসে না, ডাকেও আসে না। সেফ চিঠির বাক্সের মধ্যে ফেলা থাকে। ছবিগুলো একজন মৃত মানুষের। আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের। দেখে মনে হয় ও কোন গর্তের মধ্যে আছে। ছবিতে ওর বুকের থেকে উপরের অংশ দেখানো থাকে। ওর চেহারায় পঁচন ধরেছে, আগের সেই সৌন্দর্যর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

প্রত্যেক দিনের ছবিতে পঁচন প্রক্রিয়া আগের দিনের ছবির চেয়ে একটু একটু করে এগুতে থাকে। এখন এমন একটা অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যেখানে আমি ওর মুখের উপর পোকা কিলবিল করতে দেখতে পাচ্ছি। পঁচন যত বাড়ে পোকাগুলো চামড়ার অন্য অংশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

ছবিটা নিয়ে আমি আমার রুমে ফিরে যাই। স্ক্যান করে কম্পিউটারে ঢুকাই। ওর যত ছবি আমি এখন পর্যন্ত পেয়েছি, সবগুলো কম্পিউটারে রাখা আছে। আমি ওগুলো ক্রমানুসারে সাজিয়েছি, আর ওর অস্তিত্ব এখন বিশাল পরিমাণ ছবির তথ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একদম প্রথম ছবিটায় ওকে দেখতে একদম মানুষের মত লাগে। দ্বিতীয় ছবিটায়-যেটা আমি ঠিক পরের দিনে পেয়েছিলাম-সেটায় ওর চেহারার উপর হালকা একটা কালো ছাপ ছিল। তারপর থেকে প্রতিটা দিন গিয়েছে আর ছবির মেয়েটা আস্তে আস্তে জীবিত প্রাণী থেকে চেনার অযোগ্য কিছুর দিকে যেতে থেকেছে।

আমি কাউকে এই ছবিগুলো সম্পর্কে কিছু বলিনি। আমার গার্লফ্রেন্ড যে খুন হয়েছে সেটা খালি আমিই জানি। বাকি পুরো দুনিয়ার কাছে সে শুধু নিখোঁজ মানুষের অমীমাংসিত একটা কেস হয়ে রয়ে গিয়েছে।

স্বীকার করছি, আমি ওকে গভীরভাবে ভালবাসতাম। আমার এখনো মনে আছে যেদিন আমরা একসাথে “জু” মুভিটা দেখতে গিয়েছিলাম। মুভিটা ছিল আর্ট ফিল্ম ধরনের, কি হচ্ছে তা আমাদের দুজনেরই মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল।

স্ক্রিনে অসংখ্য সবজি আর প্রাণীর দুরত পঁচে যাওয়ার দৃশ্য দেখাচ্ছিল। আপেল আর চিংড়িগুলো কালো হয়ে বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল। ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণের কারনে ওগুলো থেকে নিশ্চয়ই বাজে গন্ধ ছড়াচ্ছিল। পেছনে ব্যাখ্যাতীত রকমের উৎফুল্ল মাইকেল নাইম্যান সাউন্ডট্র্যাক চলছিল, জীবজন্তুর মৃতদেহগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। তীরে যেভাবে বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে আবার নেমে যায়, সেভাবে মাংসগুলো খুলে খুলে যাচ্ছিল। পুরো ফিল্মটার মূল উদ্দেশ্য ছিল, অন্তত যা আমার মনে হচ্ছিল, যে পঁচনের প্রক্রিয়াটা দেখানো।

আমরা মুভি থিয়েটার থেকে বের হওয়ার পর ও আর আমি ঠিক করলাম স্থানীয় চিড়িয়াখানায় যাব। আমি ডাইভ করছিলাম আর ও আমার পাশে বসে রোড সাইনগুলো পড়ছিল। “দেখ,” সে বলল, উত্তেজনার সাথে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে ইঙ্গিত করছিল। “ব্যাপারটা কাকতালীয় না?”

“চিড়িয়াখানা। বামে মোড়। ২০০ মিটার সামনে।”

সাইনে তাই লেখা ছিল। উপরে জাপানিজে, নিচে ইংরেজিতে। আমার স্পষ্ট মনে আছে ইংরেজি অক্ষরে ‘জু লেখাটার কথা।

আমি স্টিয়ারিং হুইল বাম ঘুরিয়ে মেইন রোড থেকে নামিয়ে পারকিং লটে ঢুকলাম। লোজন প্রায় ছিলই না বলা যায়। সময়টা ছিল শীতের মাঝামাঝি। কেউ ঐ সময় চিড়িয়াখানায় যায় না। বরফ পড়ছিল না, কিন্তু আকাশে ঘন মেঘ ছিল, অন্ধকার হয়ে ছিল চারিদিক। সবদিক থেকে জন্তু জানোয়ার আর ভেজা খড়ের গন্ধ ভেসে আসছিল-আমন্ত্রণ জানানোর মত দারুণ কোন গন্ধ না আমার মতে। আমার গার্লফ্রেন্ড আর আমি হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি হাঁটছিলাম। আমি বলতে পারি, যতক্ষণ আমরা ওখানে ছিলাম পুরোটা সময় ও কাঁপছিল।

“এখানে কেউ নেই,” সে বলল। “আমি এই ব্যাপারে কিছু একটা শুনেছিলাম। সারা দেশের চিড়িয়াখানা আর এমিউজমেন্ট পার্কগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে কারন কেউ আর ওগুলোর ব্যাপারে আগ্রহী নয়।”

চিড়িয়াখানার সার্কিটের মত পথগুলো দিয়ে আমরা হেঁটে গিয়েছিলাম আর আমার নিশ্বাস মুখ থেকে সাদা ধোঁয়ার মত বেরিয়ে এসে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছিল। লোহা দিয়ে বানানো খাঁচাগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম। প্রাণীগুলো যার যার খাঁচার মধ্যে বসে ছিল, নড়াচড়া করছিল না। একটা বানর অবশ্য, সত্যিকারের কুৎসিত দেখতে একটা বানর, তার খাঁচার মধ্যে অনবরত আগপিছ করছিল। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওটার কান্ডকারখানা দেখেছিলাম। বানরটা খুবই নোংরা ছিল আর ওর শরীরের বিশাল অংশের নোম খসে গিয়েছিল। খাঁচাটার ভেতর সে একাই ছিল, সরু কংক্রিটের জায়গাটার মধ্যে হাঁটাহাঁটি করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।

একটা গার্লফ্রেন্ড পাওয়া ছিল অনেকদিন পর্যন্ত আমার জীবনের সেরা ঘটনা। হেমন্তে ও উধাও হয়ে যায়, মনে হয় যেন সেই কবেকার কথা।

আমি অসংখ্য মানুষকে আমার সন্দেহের কথা বলেছিলাম, যে ও হয়ত কোন অস্বাভাবিক ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু পুলিশ কখনোই আমার কথা গুরুত্ব দেয়নি, তাড়া ওর উধাও হওয়ার ঘটনাটাকে সাধারণ বাড়ি পালানোর কেস হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। ওর পরিবারের একইরকম ধারণা ছিল। মনে হচ্ছিল সবাই যেন ধরেই নিয়েছিল যে ও কোন একদিন বাসা থেকে পালিয়ে যাবে। তাই যখন সেটা হল কেউ একদমই অবাক হয়নি।

ইমেজ ফাইলগুলো কম্পিউটারে ঢোকানোর পর আমি মল ছবিগুলো অযত্বের সাথে আমার ড্রয়ারে ফেলে রাখি। এতদিনে ড্রয়ারটায় একশরও বেশি ছবি জমে গিয়েছে।

কম্পিউটারের কার্সর নাড়িয়ে মুভি চালানোর একটা সফটওয়্যারে ক্লিক করলাম। এই সফটওয়্যারটা ভিডিও এডিটও করতে পারে। “ওপেন ইমেজ সিকোয়েন্স” ফাংশনটা থেকে ওর প্রথম ছবিটা সিলেক্ট করলাম। তারপর “সেট ইমেজ সিকোয়েন্স,” সিলেক্ট করে দিলাম। তারপর প্রতি সেকেন্ডে বারো ফেম” সিলেক্ট করলাম।

ছবিগুলো এখন পরপর সাজিয়ে একটা ভিডিও হিসেবে দেখার জন্য তৈরি। প্রতি সেকেন্ডে বারোটা করে ছবি পার হবে। এই সিস্টেমটা প্রথমে ডিজাইন করা হয়েছিল এনিমেশন বানানোর জন্য।

প্লেব্যাক মোডে আমি ওর ক্ষয় হতে থাকা দেখি। পোকামাকড়গুলো ওর সারা মুখে কিলবিল করে ছোটাছুটি করতে থাকে। ওর মাংস ছিঁড়ে খেতে থাকে। মনে হয় যেন পোকামাকড়ের সাগরের ঢেউ।

প্রত্যেক সকালে আমি চিঠির বাক্সের কাছে গিয়ে নতুন করে একটা ছবি পাই, যা পুরো ভিডিওটার দৈর্ঘ্য এক সেকেন্ডের বারো ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধি করে। “আমি এই ক্রিমিনালকে খুঁজে বের করব,” বিড়বিড় করে নিজেকে শোনাই।

যে লোক এই ছবিগুলো তুলছিল, সেই ওর খুনের জন্য দায়ী। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত।

“ওকে এর জন্য মূল্য চুকাতে হবে,” পুলিশ যখন তদন্ত বন্ধ করে দিল তখন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।

কিন্তু আমার একটা সমস্যা ছিল। সমস্যাটা নিরেট, আর তা আমাকেই ধ্বংস করে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল। সেজন্য আমি সমস্যাটা স্বীকার না করে এড়িয়ে চলছিলাম।

“শিট, এই ক্রিমিনাল কোথায় থাকতে পারে?!”

আমার কথাগুলো ছিল স্ক্রিপ্টে লেখা লাইনের মত। অতি নাটুকে। মনে মনে জানতাম ঘটনা আসলে একদম অন্যরকম। কিন্তু আমি এই নাটকের চরিত্র হয়ে থাকিনি, বাস্তবতার রুক্ষতা নেমে এসে আমাকে চিড়ে চ্যাপ্টা করে ফেলত।

অন্য কথায় বললে আমি ভান করছিলাম যে কিছু জানি না। সেটা আমাকে প্রত্যয় দিচ্ছিল যে আমি হয়ত ওর খুনিকে খুঁজে বের করতে পারব। কিন্তু বাস্তবে আমার পক্ষে ওর খুনিকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়।

আমি নিজেই ওকে খুন করেছিলাম।

ওকে হারানোর পর থেকে আমি যতটা সম্ভব সাধারণভাবে আমার জীবন কাটানোর চেষ্টা করেছি। ব্যাপারটা কঠিন ছিল। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকালে দেখতাম আমার গাল বসে গিয়েছে, চোখগুলো কোটরে ঢুকে গিয়েছে।

আমি জানতাম যে আমি ওকে খুন করেছি। আর এই জানা আর ওর খুনি খুঁজে বের করার যে স্পৃহা, সেটার মধ্যের যে স্ববিরোধ আছে তা সম্পর্কেও অবগত ছিলাম। কিন্তু খোদার কসম কেটে বলছি আমার মধ্যে কোন সিপ্লট পারসোনালিটি বা দ্বৈত সত্ত্বা নেই।

ওকে আমি আমার মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতাম। আমি চিন্তাও করতে চাইনি যে আমার নিজের দুই হাত দিয়ে আমি ওকে খুন করেছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এরকম জঘন্য চিন্তাভাবনাকে কোনভাবেই মনের মধ্যে স্থান পেতে দেব না।

দুনিয়ার কোথাও এক খুনি আছে যে কিনা আমি নই, আর আমি যদি আমার গার্লফ্রেন্ডকে খুন করা ঐ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে পারি তাহলে কিছুটা ভাল বোধ করব। নিজের পাপ বোধ থেকে হয়ত মুক্তি পেতে পারব।

“কে এই ছবিগুলো চিঠির বাক্সে ফেলে যাচ্ছে?”

“কেন সে আমাকে এই ছবিগুলো দেখাচ্ছে?”

“আমাকে খালি বল…কে সে? কে ওকে খুন করেছে?!”

পুরোটা একজন মানুষের স্কিট। আমি ভান করছিলাম কিছু জানি না, খুনিকে হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে ঘৃণা করছিলাম, আর নিজের অংশটুকু তীব্র ক্ষিপ্ততার মধ্যে অভিনয় করে যাচ্ছিলাম।

পুলিশকে ছবিগুলো না দেখাতে পারাটা ছিল নিজেকে রক্ষা করার একটা অংশ মাত্র। মনের ভেতর আমি আমাকে বুঝ দিয়েছিলাম যে আমি আমার গার্লফ্রেন্ডের খুনিকে খুঁজে বের করার জন্য পুলিশের সাথে কাজ করে যাচ্ছি। সেজন্য ছবিগুলো আমার কাছে রাখা প্রয়োজন ছিল। পুলিশ, বলা বাহুল্য এসবের কিছুই জানত না। তারা তখনও ওকে একজন নিখোঁজ ব্যক্তি হিসেবেই দেখছিল। আমি আমার কাছে নিজের এমন একটা চিত্র দাঁড় করিয়েছিলাম যে আমি এমন একজন মানুষ যে কিনা তার প্রেমিকার খুনের প্রতিশোধ নিতে চায়, পুলিশের কোন সাহায্য ছাড়াই।

এই ছোট্ট স্ক্রিপ্টটা ধরে আমি অভিনয় করে যেতে যেতে একসময় খেয়াল করলাম আমি ভাবছি আমি ঐ মানুষটা নই যে কিনা তার গার্লফ্রেন্ডকে খুন করেছে। অন্য কেউ করেছে সেটা। আমি নিষ্পাপ, তাই নয় কি?

দুর্ভাগ্যজনকবশত, ছবিগুলো আমার চিঠির বাক্সে আসতেই থাকল, আর আমাকে এই বিভ্রমের দুনিয়া থেকে পুরোপুরি পালাতে বাধা দিচ্ছিল।

অবশ্যই আমি সেই ব্যক্তি যে ওকে খুন করেছিল। ছবিগুলো আমাকে ক্রমাগত সেই কথাই বলছিল।

ওর নিখোঁজ হওয়ার মাস খানেক পরে, নভেম্বরের প্রথম দিকে পুলিশ তাদের তদন্ত বন্ধ করে দিল। এরপর আমি আমার চাকরি ছেড়ে দিলাম যাতে ফুলটাইম নিজেকে ওর খুনি খোঁজার পেছনে কাজে লাগাতে পারি। অবশ্য আমি কিছুই করছিলাম না একজন নিহত নারীর প্রেমিকের রোল করা ছাড়া। আমি নিজেকে একজন ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলাম, যে কিনা প্রেমিকার খুনের জন্য বদলা নিতে চাইছে।

ওর বন্ধু-বান্ধব আর কাছের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ দিয়ে আমি শুরু . করেছিলাম। ও যাকে যাকে চিনত, প্রত্যেক মানুষের সাথে আমি কথা বলেছিলাম-ওর অফিসের কলিগ, ওর পরিবার, যে কনভিনিয়েন্স স্টোরে ও প্রায়ই যেত সেখানকার ক্লার্ক, কাউকে বাদ রাখিনি।

“হ্যাঁ, ওকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ ভাবছে ও বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছে, কিন্তু আমি সেটা বিশ্বাস করতে পারছি না। ও পালিয়ে যাবে, ব্যাপারটা কেমন জানি অবিশ্বাস্য মনে হয়, তাই আমি এরকম ঘুরে ঘুরে লোকজন যারা ওকে চিনত সবাইকে প্রশ্ন করতাম। আপনি কি প্লিজ আমাকে সাহায্য করতে পারবেন? ধন্যবাদ। শেষ কবে ওকে দেখেছেন? ওর কথাবার্তায় অস্বাভাবিক কিছু কি চোখে পড়েছিল? যেমন, ওর সাথে কারো সমস্যা ছিল কিনা, ওর এলাকার মধ্যে কোন সন্দেহজনক ব্যক্তিকে ঘুরাঘুরি করতে দেখেছেন কিনা? ও কি আপনাকে এরকম কিছু বলেছিল? ..ও আমাকে কখনো এরকম কোন কিছু বলেনি…যে আংটিটা ও সবসময় পরে থাকত? হ্যাঁ, ওটা একটা এঙ্গেজমেন্ট রিং ছিল, আমি দিয়েছিলাম ওকে…অ্যাঁই, ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন আমার দিকে। আমার আপনার সহানুভূতির কোন…”

একজন মানুষও সন্দেহ করেনি যে ওর খুনি ব্যক্তিটি আমি। তারা ভেবেছিল আমি বিভ্রান্ত হয়ে আছি, বেচারা একজন যুবক যার গার্লফ্রেন্ড হঠাৎ বাক্সপেটরা বেঁধে ভেগে গিয়েছে। আমার অভিনয় খুবই ভাল ছিল বলে আমার ধারণা। কেউ কেউ আবার কেঁদেও ফেলেছিল, ওর জন্য না, আমার জন্য। দুনিয়াটা খুবই পাগলাটে ধরনের। কেউ কেন বুঝতে পারল না যে আমি ওকে খুন করেছি? আমি যেহেতু নিজেকে নিজে স্বীকার করাতে পারছি না, আমি ভাবছিলাম অন্য কেউ আমার হয়ে সেটা বের করে নেবে।

আমি আসলেই তাই চাইছি। অপেক্ষায় আছি। আমি চাই কেউ একজন আমাকে অভিযুক্ত করুক, বলুক, “তুমি! তুমিই আসল ক্রিমিনাল!” এমনকি পুলিশও-এটা কি ওদের কাজের মধ্যে পড়েনা?-ওরা আমার অপরাধ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে।

কিন্তু এখন…আমি ভাবছিলাম। আমি এই অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হতে চাই। আমি সবকিছুর স্বীকার করতে চাই, আমার অপরাধের স্বীকারোক্তি দিতে চাই। নাহলে আমাকে এই অভিনয় আজীবন চালিয়ে যেতে হবে। নিজেকে নিয়ে আইনের হাতে তুলে দেয়ার মত সাহস আমার নেই। পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত ভীতিজনক। এই সমস্যা থেকে নিজেকে সরাতে না পেরে আমাকে আমার ছলচাতুরি চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

এভাবে এক সপ্তাহের মত আমার নিজস্ব তদন্ত চলার পর ইন্টারভিউ নেয়ার মত লোকজন ফুরিয়ে গেল। ঐ পর্যায়ে আমার নিজেকে মনে হচ্ছিল গোলকধাঁধার অন্ধগলিতে আটকা পড়া কোন ইঁদুরের মত।

“এই ক্রিমিনালকে ধরার জন্য আমার সামনে কোন সূত্র নেই! কারো কাছে কি কোন তথ্য আছে?” আমি নিজেকে একা আমার রুমের কম্পিউটারের সামনে বসে বিড়বিড় করা অবস্থায় আবিষ্কার করলাম।

আরেকবার লাশ পঁচতে থাকার ভিডিওটা চালিয়ে দেখলাম। ভিডিওর শেষে ও পুরোপুরি পঁচে গলে গিয়েছে, এমন কিছুতে পরিণত হয়েছে যা আর পোকামাকড়ের চর্বিত কিছু নেই, না রয়েছে মানুষের সদৃশ কিছু, এমন কিছু যার বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়।

সত্যি বলতে কি দৃশ্যটা দেখে আমার বমি এসে যায়। কাউকে পঁচতে দেখার কোন ইচ্ছে আমার নেই, এমন কাউকে তো নয়ই যাকে কিনা আমি এক সময় ভালবাসতাম। কিন্তু আমাকে দেখতেই হত। শুধু দেখার মাধ্যমেই আমি নিজেকে বোঝাতে পারতাম যে আমিই ওকে খুন করেছিলাম। আমি আমার কাছে অনুনয় করলাম যেন পুলিশ স্টেশনে গিয়ে সবকিছু খুলে বলি। কিন্তু আমার আবেদন আমার বধির কানের সামনে হেরে গেল।

“তুমি শুধু শুধু বসে থাকতে পার না! যাও গিয়ে নতুন তথ্য উদ্ধার কর! গতর খাটাও! তদন্ত করা।”

আমি উঠে দাঁড়িয়ে চোখ থেকে অশ্ন মুছে কম্পিউটার স্ক্রিন আর ওর পঁচে যাওয়ার দৃশ্য থেকে সরে এলাম। ওর একটা ছবি হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। শহর জুড়ে ঘুরে বেড়ালাম যেন ক্রিমিনালকে খুঁজছি।

যে ছবিটা আমি সাথে নিয়ে বের হয়েছিলাম সেটা ওর পঁচতে থাকা লাশের ছবি ছিল না। ও যখন জীবিত আর সুন্দর ছিল তখনকার ছবি ছিল। ছবিতে ওর পেছনে আপনি চিড়িয়াখানায় বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গার মধ্যে থাকা জেব্রা দেখতে পাবেন। কি মনে করে ও ঐ ডিস্পোজাল ক্যামেরাগুলোর একটা সাথে করে নিয়ে এসেছিল। শেষ কয়েক ছবির সময় আমি ক্যামেরা ওর উপর তাক করেছিলাম। সেখান থেকে আমি ওর এই ছবিটা নিয়েছি। ছবিতে ও খানিকটা চোখ রাঙ্গিয়ে তাকিয়ে ছিল।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি অনেক লোকজনকে ছবিটা দেখালাম, জানতে চাইলাম কেউ ওর সম্পর্কে কোন কিছু জানে কিনা। লোকজন মনে হয় আমাকে পাগল ভাবছিল। নয়ত অন্তত কোন ধরনের অভদ্র ব্যক্তি।

আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম কিন্তু কোন উপায় ছিল না। আমাকে কাজটা করতেই হবে। আমি হাত পা খুঁটিয়ে কিছু না করে বসে থাকতে পারি না।

আমার কোন কাজ ছিল না, কাজ করার ইচ্ছা ছিল না, যা সেভিংস ছিল সব শেষ হয়ে যাচ্ছিল। খুব শিগগিরি আমাকে আমার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হবে। সমস্যা নেই, আমি আমার গাড়িতে ঘুমাতে পারব। খাওয়ার কিছু না থাকলে কারো কাছ থেকে টাকা-পয়সা চুরি করে নেব। আমার হাত নোংরা করতে কোন আপত্তি ছিল না। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি খুনিটাকে খুঁজে পাচ্ছি, অথবা তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য চেষ্টার অভিনয় করছি।

সারাটা সকাল আমি শহরের মধ্যে ঘুরে বেড়াই আর লোকজনকে প্রশ্ন করতে থাকি।

“আপনি কি এই মেয়েটাকে চেনেন? একে দেখেছেন কোথাও? প্লিজ…প্লিজ।”

একবার একটা স্থানীয় দোকানের মালিক আমার নামে পুলিশের কাছে অভিযোগ করল। ঐ অভিজ্ঞতার পর আমি শিখলাম এক এলাকায় খুব বেশি সময় না কাটানোর। একাধিকবার লোকাল গ্যাংগুলোর দৃষ্টিতে পড়েছিলাম। তীব্র পরিস্থিতির সৃষ্টিও হয়েছে কয়েকবার। আমি বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু একজন এক পেছনের গলিতে আমার উপর চাকু ধরেছিল। আমি চাইছিলাম সে আমাকে মেরে ফেলুক, হৃদপিণ্ড বরাবর একটা কোপ। শেষ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। সবকিছু শেষ হয়ে যেত। ওকে খুন করেছি স্বীকার

করেই আমি মরতে পারতাম। আমার জীবনের অন্ত হত একজন শিকার হিসেবে, কোন খুনি হিসেবে নয়। তাতে অন্তত আমার সম্মান কিছুটা হলেও রক্ষা হত। আমার পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ ছিল। ওর ছবি নিয়ে আমাকে আর ঘুরতে হত না, শহরে ঘুর ঘুর অস্তিত্বহীন তথ্য খুঁজতে হত না, অস্তিত্বহীন কোন ক্রিমিনালকে আর খুঁজতে হত না।

কিন্তু অল্প বয়সি ছেলেটা আমাকে আঘাত করেনি। আমি ওর চাকু ধরা হাত খপ করে ধরে আমার বুকে এনে ঠেকিয়েছিলাম। ছেলেটা শুধু একটু চাপ, অল্প একটু চাপ দিলেই কাজটা হয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা না করে সে কাঁপতে থাকল আর ক্ষমা চাইল। ওর গ্যাঙের বাকি সদস্যদের চেহারাও ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় পুলিশ এল আর তারা সবাই দৌড়ে পালিয়ে গেল। আমি চিৎকার করে পেছন থেকে ডাকলাম, “আমার জন্য দাঁড়াও! আমাকে সাথে নিয়ে যাও!”

কোন এক নোংরা বুড়ি পুলিশদের ডেকেছিল। রাস্তায় যখন ওরা আমাকে ঘিরে ফেলেছিল তখন মহিলা দূর থেকে সেটা দেখেছিল। ছোট একটা ইতর চেহারার বুড়ি, পুলিশের পেছনে লুকিয়ে ছিল। আর তার পোশাক আর পায়ে যে জিনিস পরে ছিল তা দেখে কেউ তাকে আধুনিক জাপানিজ বলে ভাববেও না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি মহিলা ছিল গরিব, টাকা পয়সা ছিল না। হয়ত পেশাব-পায়খানায় ভরা কোন টানেলের মধ্যে ঘুমায়। তার মুখের ভাঁজগুলো ঝুলকালি মাখা ছিল। চুলগুলো ছিল নোংরা। গলার কাছে যে জিনিসটা ঝুলছিল সেটা দেখে কাঠের বোর্ড মনে হচ্ছিল। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম সেটা হয়ত কোন পাচিনকো পার্লারের বিজ্ঞাপন, কিন্তু আমার ভুল হয়েছিল।

ওটা ছিল ভেজা কোন কাঠের তক্তা, সম্ভবত কোন ময়লার ডিব্বা বা সেরকম কোথাও থেকে তুলে আনা। তক্তাটায় বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, “আপনি কি এই লোককে দেখেছেন?” লেখাগুলোর নিচে একটা অল্প বয়সি ছেলের ছবি দেয়া। আমার হাতে ধরা আমার গার্লফ্রেন্ডের ছবির তুলনায় ঐ ছবিটা অবিশ্বাস্য রকমের পুরাতন। মহিলা আমাকে বলল প্রায় বিশ বছর আগে তার একমাত্র ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায় আর এখনো সে রাস্তার কোণায় দাঁড়িয়ে তাকে খোঁজে। পুরাতন ছবিটায় হাত বুলিয়ে সে দুর্বোধ্য কোন আঞ্চলিক উচ্চারে কিছু একটা বিড়বিড় করতে থাকে। ছবিটাই একমাত্র বাস্তব বস্তু যা ছেলের স্মৃতি হিসেবে তার কাছে আছে। মহিলা তার মানসিক অবস্থার শেষ সীমায় প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল।

আমি বুড়ি মহিলাটার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলাম। পায়ের সামনে শুয়ে পড়ে ধুলোয় মুখ ঘষেছিলাম। আমি আমার কান্না থামাতে পারছিলাম না। বুড়ি মহিলাটা আর তার পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসারটা আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আমি শুধু এদিক ওদিক মাথা ঝাঁকানো ছাড়া আর কিছু করতে পারছিলাম না।

পর্বতমালার এক পরিত্যাক্ত কেবিনে আমার আর আমার গার্লফ্রেন্ডের মধ্যে বিশাল যুদ্ধ হয়েছিল। ও একটু আবেগপ্রবণ মানুষ ছিল। সেজন্যই আমরা সেদিন চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। রাস্তায় সাইনবোর্ড দেখেই সে যাওয়ার জন্য হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়। একইভাবে, আমাদের ঝগড়ার দিনে, একটা পাহাড়ি রাস্তায় আমরা একটা পার্শ্ব পথ আবিষ্কার করি। “চল গিয়ে দেখি এই পথটা কোথায় গিয়েছে, সে লাফিয়ে উঠল। আমার মনে হয়েছিল ও হঠাৎ করেই ঐ পথে কি আছে তা দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। ওকে পছন্দ করার অনেক কারনের মধ্যে এই আবেগি ব্যাপারটাও একটা ছিল।

কিছুক্ষণ ডাইভ করার পর কেবিনটা খুঁজে পাই। কেবিন বললে ভুল বলা হবে, দেখে মনে হচ্ছিল একগাদা পুরোনো তক্তার স্তূপ। আমরা গাড়ি থামিয়ে ভেতরে গেলাম। জায়গাটা থেকে ছাতা পড়া গন্ধ আসছিল। আমরা দুজনেই সিলিঙের দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছিল যে কোন সময় আমাদের মাথার উপর ধসে পড়বে। পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে ওর একটা ছবি তুললাম। চিড়িয়াখানাতে যাওয়ার পর থেকে ফটোগ্রাফির প্রতি আমার খানিকটা আগ্রহ জেগেছে।

ক্যামেরা ফ্ল্যাশ জ্বলে ওঠার সময় সে হাস্যকর একটা চেহারা করল। “বেশি জ্বলে গিয়েছে,” ও ছবিটা দেখে মুখ ভোঁতা করে বলল। তারপর ছবিটা দলামচা করে বল পাকিয়ে ফেলল। ব্যাপারটা আমাকে আহত করল। তারপর ও বলল আমার উচিত ওকে ভুলে যাওয়া। মানে কি? আমি জানতে চাইলাম। তারপর ও আঘাত দিয়ে অনেক কথা বলল। ও আমাকে বলল যে ও আমাকে আর ভালবাসে না।

ঐ দিনটাই ছিল সেদিন, যেদিন ও নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, বাকি দুনিয়া অন্তত তাই জানত। কারনটা স্পষ্ট। ও আর ঐ কেবিন থেকে বের হয়নি।

ঐদিন ও স্বীকার করেছিল যে ও কখনো কাউকে আমাদের ডেট করার কথা বলেনি। আর এখন সবকিছুর পর আমি ওর কথা বিশ্বাস করি। ও যদি ওর পরিবার, ওর বন্ধুদের, ওর সহকর্মীদেরকে আমার কথা বলত, তাহলে পুলিশ অবশ্যই আমাকে খুনের ব্যাপারে সন্দেহ করত। আর তারা জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমি স্বীকার করতাম। শুধুমাত্র একটা ফোনই আমি পেয়েছিলাম, সেটা ওর মায়ের থেকে। তিনি জানতে চাইছিলেন আমি তার মেয়েকে চিনি কিনা! ফোনে কথা বলার সময় আমার মনে হয়েছিল মহিলা সম্ভবত তার মেয়েকে খুব একটা ভালবাসেন না। ওর নিখোঁজ হওয়ার পরও তিনি তেমন একটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিলেন না।

আমি ওর মায়ের কাছে প্রায় স্বীকার করেই ফেলছিলাম, কিন্তু আমার মুখ থেকে অন্যরকম কথা বেরিয়ে এল। “কি? নিখোঁজ বলতে চাইছেন? পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেছেন? দাঁড়ান আমি এক্ষুনি আসছি।” তারপর থেকে আমার সেই অর্থহীন দীর্ঘ অভিনয়ের শুরু।

আমি ওর বাসায় গেলাম। পুলিশের জন্য একটা ফর্ম পূরণ করলাম। উদ্বিগ্ন একজন বন্ধুর মত ভান করলাম। নিজের একটা মিথ্যা সত্ত্বা তৈরি করলাম যে ওকে খুঁজে বের করার জন্য মরিয়া, ও খুন হয়ে থাকতে পারে এরকম চিন্তায় যে কিনা পাগল প্রায়।

একদিন আমি আমার প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ডের ছবি হাতে শহরের মধ্যে এদিক ওদিক ঘুরে পারকিং লটে আমার গাড়ির কাছে ফিরে এলাম। দিন তখন প্রায় শেষ, সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। আমি আমার চারপাশ ঘিরে থাকা বিল্ডিংগুলোর দিকে মুখ তুলে চাইলাম। ওগুলো সামনে খোলা জায়গাটার উপর গাঢ় ছায়া ফেলতে শুরু করেছিল।

“আরেকটা দিনের শেষ অথচ কোন অগ্রগতি নেই,” আমি বিড়বিড় করে নিজেকে বললাম। আমার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটা মিথ্যা নিশ্বাস শীতের ঠাণ্ডা বাতাসে সাদা ধোঁয়ার সষ্টি করছিল। আমার ভেঁড়া কোটের পকেট থেকে ওর ছবি বের করে তাকিয়ে থাকলাম। আমার আঙুলের মাথায় একটু কেটে গিয়েছিল, আর ঠান্ডায় আমার চামড়াও শুষ্ক হয়ে গিয়েছিল, তারপরও ছবিতে ওর চেহারার উপর হালকাভাবে আঙুল বোলালাম।

পুরো পারকিং লটে শুধু আমার গাড়িটাই ছিল। কংক্রিটের তলের উপর আমার ছায়া বিস্তৃত হয়ে ছিল।

“কালকে আমি লোকটাকে ঠিকই খুঁজে বের করব…”

সারাদিন হাঁটাহাঁটির জন্য আমার পুরো শরীর ছেড়ে দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল যে কোন সময় পড়ে যাব। গাড়ির দরজা খুলে হুইলের পেছনে গিয়ে বসলাম। ঐ সময় নজরে পড়ল যে প্যাসেঞ্জার সিটের নিচে কিছু একটা পড়ে আছে।

“কি এইটা?”,

একটা কাগজের দলা পড়ে ছিল। আমি তুলে দেখি একটা ছবি। হাত দিয়ে ঘষে সমান করলাম।

“কি…!?” ওর ছবি। ওকে একটু গোমড়া দেখাচ্ছিল কিন্তু তাও কিউট। ওর পেছনে কাঠের দেয়াল দেখা যাচ্ছিল। আর ডান দিকের কোণায় একটা তারিখ।

“একি! এই দিনেই তো ও নিখোঁজ হয়েছিল!” আমি যতটা সম্ভবত অবাক হওয়ার ভান করলাম। এইটাই ঐ ছবিটা যেটা দেখে ও ঐদিনে রেগে গিয়েছিল আর দলামচা করে বল বানিয়ে ফেলেছিল।

“এই ছবি আমার গাড়িতে কি করছে? অদ্ভুত তো৷ কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ক্রিমিনালটা নিশ্চয়ই এখানে এসে রেখে গিয়েছে। আর কিছু তো মাথায় আসছে না…”

ছবিটা রাখার জন্য গ্লাভ কম্পারটমেন্টটা খুললাম। ভেতরে গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের কাগজ, ম্যানুয়াল আর সন্দেহজনক একটা বাতিল কাগজ।

“এইটা আবার কি?”

কাগজটা ছিল গ্যাস স্টেশনের একটা রিসিট।

“তারিখটা…ঐ একই দিনের, যেদিন ও হারিয়ে গিয়েছিল! গ্যাস স্টেশনের ঠিকানা লেখা আছে! এ কি রকমের খ্যাপামি? আমি তো ঐদিন বাইরেই বের হইনি। সারাদিন বাসায়ই ছিলাম…হয়তো…”

আমার সন্দেহগুলো একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অন্তত সেরকমই আমি অভিনয় করছিলাম।

“লোকটা যেই হোক সে নিশ্চয়ই এই গাড়িটা ব্যবহার করে ওকে অপহরণ করেছিল। তাই হবে! ক্রিমিনালটা এভাবেই ওকে বোকা বানিয়েছিল। ও নিশ্চয়ই গাড়িটা দেখে ভেবেছিল আমি চালাচ্ছি, তাই চিন্তা না করে উঠে পড়েছিল!”

আমি ইগ্নিসনের চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি চালু করলাম। ঠিক কোথায় যেতে হবে তা এখন আমার জানাঃ রিসিটে যেই গ্যাস স্টেশনের ঠিকানা লেখা আছে, সেখানে।

“গ্যাস স্টেশনের কর্মী হয়ত খেয়াল করেছিল সেদিন কে এই গাড়ি চালাচ্ছিল! বুঝতে পারছি না তাদের মনে থাকবে কিনা।”

নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে আমি গাড়ি চালিয়ে শহরের বাইরের দিকে যেতে লাগলাম। রাস্তার ধার ধরে পুরনো আমলের ফার্ম হাউজ আর খালি জমি। ডুবতে থাকা সূর্যের রঙ ছিল লাল, উইন্ডসিন্ডের ভেতর দিয়ে আমার চোখে এসে আলো পড়ছিল।

অবশেষে গ্যাস স্টেশনে যখন পৌঁছলাম ততক্ষণে অন্ধকার নেমে গিয়েছিল। একটা মাঝবয়সি লোক আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে এল। পড়নে মেকানিকের জাম্পসুট, তেল-গ্রিজ লাগা হাতগুলো একটা ন্যাকড়া দিয়ে মুছে পরিস্কার করছে। আমি জানালার কাঁচ নামিয়ে তাকে আমার গার্লফ্রেন্ডের ছবি দেখালাম আর কিছু প্রশ্ন করলাম।

“হ্যালো ভাই, একটু এই ছবিটা দেখবেন প্লিজ?”

উত্তর দেয়ার সময় তাকে খানিকটা বিরক্ত দেখাল।

“ও হ্যাঁ, এই মেয়েটা। অনেকদিন আগে এসেছিল। পশ্চিমের দিকে গিয়েছিল।”

“পশ্চিম? কি ধরনের গাড়িতে ছিল সে?”

“মজা করছেন নাকি? আপনি যে গাড়িটা এখন চালাচ্ছেন সেটাতেই ছিল সে।”

“আমি জানতাম!”

“আর আপনিই ডাইভ করছিলেন। কথা শেষ হয়েছে? স্ক্রিপ্ট খতম? বিশ্বাস করতে পারছি না আপনি এখনো প্রতিদিন এই একই কাজ করেন। ক্লান্ত লাগে না? কত মাস হল এখন আপনি আমার সাথে এই খেলা খেলছেন? অবশ্য যাই হোক, আপনি একজন কাস্টমার, খেলে যেতে চাইলে আমি না করতে পারি না।”

“বাজে কথা বলবেন না। আমি ডাইভ করছিলাম? কি ফালতু কথা বলছেন।”

আমি শকড়, কিংবা সেরকম হওয়ার ভান করলাম।

“আপনি বলতে চাইছেন, ঐ দিন যে গাড়িতে ও ছিল, সেটা আমি চাচ্ছিলাম?”

লোকটা আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আর কোন কথা বলতে চায়না। আমি গ্যাস প্যাডেলে চাপ দিয়ে পশ্চিমের দিকে এগুতে লাগলাম।

“শিট! কোথায় যেতে হবে কোন ধারণা নেই আমার আর!” স্টিয়ারিং হইলের উপর কিল মারতে লাগলাম।

“গ্যাস স্টেশনের ঐ লোকটা বলল আমি ড্রাইভ করছিলাম…কিন্তু সেদিন তো আমি সারাদিন বাসাতেই ছিলাম! কি হচ্ছে এসব?! কোনটা বাস্তব আর কোনটা ফ্যান্টাসি?!”

ঐ মুহূর্তে আমার নিজের উপর সন্দেহ জন্মাচ্ছিল। গ্যাস স্টেশনের মেকানিকের সাথে হওয়া কথাবার্তা আমাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আমি নিজেকে সামলানোর জন্য বললাম। সামনে যা আসছে তার জন্য আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

এক পর্যায়ে আশেপাশের এলাকা বদলে গিয়ে রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল শুরু হল। গাড়ির হেডলাইটে একটা কম চলাচল হওয়া পার্শ্বপথ দেখা গেল। আমি জোরে ব্রেক কষলাম।

“এই জায়গাটা আমি আগে দেখেছি, বিশেষ করে এই দৃশ্যটা। বোকার মত কথা। এরকম ভাবার কোন কারনই থাকতে পারে না।”

স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে গাড়িটা পাশের রাস্তায় নামালাম। একটা গাড়ি যাওয়ার মত চওড়া একটা পথ। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ভোলা জায়গা এসে পড়ল। গাড়ির হেডলাইটের আলোতে অন্ধকার ভেদ করে একটা পুরাতন কাঠের কেবিন আমার সামনে দেখা গেল।

“এই জায়গাটা আমি চিনি…আমি…”

গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে তাকালাম। কোন মানুষজন নেই। জঙ্গলের বাতাসটা ঠাণ্ডা আর স্থির হয়ে ছিল। ট্র্যাঙ্ক থেকে আমি একটা পকেট ফ্ল্যাশলাইট বের করে কেবিনটার দিকে এগুলাম। প্রথম যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ল সেটা ছিল একটা ট্রাইপড আর একটা ক্যামেরা। ক্যামেরাটা ছিল পোলারয়েড ক্যামেরা।

কেবিনের মেঝেটা ছিল ভোলা মাটির, মাঝখানে একটা গর্ত খোঁড়া ছিল। ক্যামেরার লেন্সটা ঐ কালো গর্তের দিকে মুখ করে রাখা। আমি আরো কাছে গেলাম। গর্তটার ভেতরটা যেন পানির মত অন্ধকার দিয়ে পূর্ণ। আমি ফ্ল্যাশলাইটের আলো গর্তের ভেতর ফেললাম।

তারপর ওটা দেখতে পেলাম।

হাঁটু ভেঙে পড়ে গেলাম আমি। “এখন আমার মনে পড়ছে। কিভাবে আমি…”

আমি আমার অভিনয় চালিয়ে গেলাম। ওয়ান ম্যান শো, এক চরিত্রের নাটক। আমিই অভিনেতা, আমিই দর্শক।

“…আমি ওকে খুন করেছি…”

কান্নায় ভেঙে পড়লাম। অণুগুলো আমার গাল বেয়ে খোলা মাটির উপর গড়িয়ে পড়ল। আমার পাশে থাকা গর্তটার মধ্যে সে শুয়ে ছিল। ওর শরীর পুরোপুরি ক্ষয়ে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল, পোকামাকড় আকর্ষণ করার মত কিছু আর অবশিষ্ট ছিল না। ও একদম সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল।

“আ…আমি…ওকে। আমি নিশ্চয়ই স্মৃতিটা কোথাও আটকে রেখেছিলাম…”

আমি এসব কথা চিন্তা করছিলাম। সত্যি হল আমি কিছুই ভুলিনি। সবকিছু মনে আছে। কিন্তু এই প্লটটা যেটায় আমি অভিনয় করছিলাম তার মধ্যে আমি আটকা পড়ে গিয়েছিলাম।

“এতদিন ধরে আমি ঐ ক্রিমিনালকে খুঁজছি যে ওকে খুন করেছিল। কিন্তু আমি নিজেই সেই ক্রিমিনাল…ও আমাকে আজেবাজে কিছু কথা বলেছিল যাতে আমি ক্রোধে ফেটে পড়েছিলাম…” আমি চিৎকার করলাম আর গোঙালাম। আমার কণ্ঠ কেবিনটার মধ্যে প্রতিধ্বনি তুলল, কিন্তু শোনার মত কেউ ছিল না। ফ্ল্যাশলাইটটাই রুমের আলোর একমাত্র উৎস ছিল।

ঠাণ্ডা মেঝেতে হাত রেখে আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমার পুরো শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইছিল। আমি গর্তের কোণায় গিয়ে নিচে ওর দিকে তাকালাম। গর্তের গভীরে ও ধুলো বালিতে অর্ধেক ঢাকা পড়েছিল, মানুষের মত কিছু ছিল না।

“পুলিশকে জানাতে হবে…আমাকে জেলে ঢোকাতে হবে…” আমি বিড়বিড় করে মনস্থির করে ফেললাম। এই অংশটাও স্ক্রিপ্টের অংশ, কিন্তু এটা আমি মনের গভীর থেকে বিশ্বাস করেছিলাম। আত্মার গভীর থেকে এটাই আমার চাওয়া ছিল।

“আমার কি তা করার সাহস আছে?”

আমার মুঠিগুলো কাঁপছিল। আমি নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম, নিজেই সেগুলোর উত্তর দিচ্ছিলাম।

“আমি কি এর জন্য প্রস্তুত আছি?”

যাই হোক না কেন, আমাকে এটা করতেই হবে। আমি যে একজন মানুষকে খুন করেছি, এই সত্য থেকে পালিয়ে যেতে পারব না। সত্য হল, আমি যাকে ভালবাসতাম, তাকেই খুন করেছি। এর ফলাফল আমাকে মেনে নিতেই হবে।

“এটাই সমস্যা…এটা মেনে নেয়া…কঠিন।”

আমি মাথা নাড়লাম। সাহস হারাতে শুরু করেছিলাম, আরো অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমি কিভাবে নিজেকে ধরিয়ে দিতে পারি? আমি কিভাবে স্বীকারোক্তি করতে পারি?

“কালকের মধ্যে আমি ভুলে যাব এখন আমার কিরকম লাগছে। আমার মনে হচ্ছে আমি সত্য কি তা ভুলে যাব…আমি এই স্মৃতিটাকে আবার কোথাও বন্দি করে রাখব, আমি আবারও অস্তিত্বহীন ক্রিমিনালের খোঁজে বের হব…আমি…”

দুহাতে নিজের মুখ ঢাকলাম। আমার কাঁধগুলো কাঁপছিল। তখন আমার কিছু একটা মনে পড়ল। কিংবা বলা যায় আমি অভিনয় করলাম যে কিছু একটা মনে পড়েছে।

পোলারয়েড ক্যামেরার কাছে গিয়ে শাটার বাটনে চাপ দিলাম। স্যাঁত করে একটা ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল, ওর দেহটা যেন অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ জেগে উঠল। ছোট একটা শব্দ করে ক্যামেরাটা থেকে একটা ছবি বেরিয়ে এল।

“এই ছবিটার দিকে যখন আমি তাকাব তখন আমার অপরাধের কথা মনে পড়বে। যত চেস্টাই করিনা কেন সত্য থেকে মুখ সরিয়ে রাখার কোন উপায় নেই, সত্যকে অস্বীকার করার কোন ক্ষমতা আমার সামনে থাকবেনা। এই ছবিটা আমাকে দেখাবে আমি কি করেছি…আমি এর মূল্য না দিয়ে কোথাও যেতে পারব না।”

যখন বুঝতে পারলাম আমাকে কি করতে হবে, আমার কণ্ঠ কাঁপতে লাগল। ছবিটা নিয়ে আমি গাড়িতে ফিরে এলাম।

“আমাকে পুলিশের কাছে যেতে হবে…আমি ওদেরকে এই ছবিটা দেখিয়ে বলব যে আমি ওকে খুন করেছি…”

ফ্ল্যাশলাইটটা ট্রাংকে রেখে গাড়ির ভেতর ঢুকলাম। ছবিটা মাত্র ডেভেলপ হতে শুরু করেছিল। আমি ওটা প্যাসেঞ্জার সিটে রেখে গ্যাস পেডেলে চাপ দিলাম।

অন্ধকার ভেদ করে ডাইভ করে গেলাম। এস্কেলারেটরে চাপ বাড়াতে ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। আমার চারপাশে ছিল শুধু নিঃসঙ্গ খালিভূমি। রাস্তার উপরে হেডলাইটের সাদা আলোগুলো মনে হল ভাসছিল। রাস্তার পিচের কালোটাকে আশেপাশে অন্ধকারের চেয়ে বেশি কালো দেখাচ্ছিল।

প্যাসেঞ্জার সিটে আমার পাশে ছবিটা পড়ে ছিল, যেটাতে আমার প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ডের ক্ষয়ে যাওয়া দেহ মনে হচ্ছিল জেগে উঠে আমাকে সঙ্গ দিচ্ছিল।

“আমি স্বীকারোক্তি দেব। আমি পুলিশের কাছে যাব। আমি আমার অপরাধ স্বীকার করব। পালিয়ে যাব না। আমি অবশ্যই পালাবোনা। আমিই ওকে খুন করেছি। এটা হতে পারে না। কিন্তু তাই হয়েছে। এটাই সত্যি। আমি এটা স্বীকার করতে চাই না। এরকম কাজ করার মত মানুষ আমি নই। আমি ওকে ভালবাসতাম। কিন্তু আমিই ওকে খুন করেছিলাম…”

আমি বারবার এসব কথা বলছিলাম, নিজেকে ফোকাসে রাখার জন্য।

কিন্তু আমি জানতাম, জানতাম এরপর কি হবে। যদিও আমি স্ক্রিপ্ট অনুসারে চলছি কিন্তু আমি কখনোই পুলিশের কাছে যাব না। এমন না যে আমি যেতে চাই না, আমি যেতে পারি না। সত্যি হল, আমি চাই যেতে আর এসব থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু আমি জানি আমি আমার সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পারব না।

প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত আমি এই প্যাটার্নটার পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছিলাম। শুধু আজকেই নয়। এই একই নাটক আমি বার বার অভিনয় করে যাচ্ছিলাম। প্রতি বিকেলে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আমি আমার গাড়ির ভেতর ওর ছবি আবিষ্কার করি। ঐ মুহূর্তে আমার নিজের উপর সন্দেহ গজিয়ে উঠতে শুরু করে। আমি গ্যাস স্টেশনে যাই আর ওখানের লোকটার সাথে কথা বলি যে আমাকে সাহায্য করে। প্রতিদিনই আমি প্রায় একই সময়ে হাজির হই আর একই লাইন আউরে যাই। জঙ্গলের ভেতরের কেবিনটায় যাই, ওর মৃতদেহের দিকে তাকাই, আর মনে পড়ে আমি কি করেছি।

আর তারপর আমি সিদ্ধান্ত নেই পুলিশের কাছে যাওয়ার। এই অংশটাও অভিনয় হলেও আমি মনে থেকে তা করতে চাই।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারি না। আমি যদি অত্যন্ত বিষণ্ণ না হতাম, তাহলে হয়ত জেলে বসে একটা সহজ জীবন কাটাতে পারতাম।

আগে যেখানে থেমেছিলাম, সেই গ্যাস স্টেশনটা পার হয়ে যাই। লাইটগুলো নেভানো, সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেদিনের মত। একটু পর আমি একটা বিশেষ সাইন দেখতে পাব। সাইনটা দেখার পর আমার দৃঢ়সংকল্প ভেঙে পড়তে শুরু করবে আমি নিশ্চিতভাবে এটা জানি। প্রতি দিন, প্রতিটা রাতে একই ঘটনা ঘটে। “চিড়িয়াখানা। বামে মোড়। ২০০ মিটার সামনে।”

আমি সেটাই দেখার আশা করি। ইংরেজিতে লেখা অক্ষরগুলো আমার চোখের রেটিনা যেন পুড়িয়ে বসে যায়। চিড়িয়াখানা-জু।

ঐ মুহূর্তে ওর সবকিছু আমার মনের ভেতর ফিরে আসতে শুরু করবে। আমরা একসাথে মুভি দেখতে গিয়েছিলাম। একসাথে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। আমি ওর ছবি তুলেছিলাম। প্রথমবার যখন আমাদের দেখা হয়েছিল। এতিমখানায় আমার বড় হওয়ার গল্প ওকে বলেছিলাম। ও খুব কমই হাসত, প্রথমবার যখন ও আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। এসব যার মধ্যে ফিরে আসতে শুরু করত। অন্ধকার ফুড়ে সাইনটা বেরিয়ে আসবে আর ও আমার পাশের সিটে বসে থাকবে। বাস্তবে নয়, অবশ্যই। ছবি থেকে ওর মৃতদেহ রহস্যময়ভাবে উঠে বসে আমার দিকে তাকাবে, ওর হাত আস্তে করে আমার চুল স্পর্শ করবে। ঠিক এমনভাবেই ঘটবে সবকিছু।

আমি নিশ্চয়ই বিষণ্ণ। সেটা ভাল কথা নয়। এটা হতে পারে না। আমি ওকে খুন করতে পারি না…আমি এরকমই চিন্তা করব। রাস্তা বেয়ে আরেকটু সামনে গিয়ে রাস্তার মাঝে গাড়ি থামিয়ে আমি বাচ্চার মত কাঁদতে থাকি। আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে যাব, প্যাসেঞ্জার সিট থেকে ছবিটা নিয়ে চিঠির বাক্সে ঢুকিয়ে দেব, প্রার্থনা করব কাল যখন সকালে ঘুম থেকে উঠব তখন এই ছবিটা আমাকে সঠিক কাজটা করার জন্য অনুপ্রেরণা দেবে, নয়তো আমি আশা করব ফিল্মটা, এক সেকেন্ডের বারো ভাগের একভাগ লম্বা যেটা, সেটা আমাকে সাফল্যর পথ দেখাবে। ভাঁজ করা পোলারোয়েড ক্যামেরা আর গ্যাস স্টেশনের রিসিটটা গাড়িতে রেখে পরবর্তী সন্ধ্যার জন্য মঞ্চ তৈরি করে রাখব। শো মাস্ট গো অন। শো চলতেই হবে। আর এটাই শেষ কথা।

হ্যাঁ, এটাই ঠিক। শেষ পর্যন্ত আমি তা বুঝতে পারব না। দিনের শেষে আমি কখনোই নিজের কাছে স্বীকার করব না যে আমি ওকে খুন করেছি। কিছুই বদলাবেনা। আমি ঐ চিড়িয়াখানায় খাঁচার মধ্যে পায়চারি করতে থাকা কুৎসিত বানরটার চেয়ে আলাদা কিছু নই। আমি একই জীবন প্রতিদিন বার বার কাটাতে থাকব। কাল আমি চিঠির বাক্সে ছবিটা খুঁজে পাব, আবারও স্তম্ভিত হয়ে যাব। খারাপ তোক ভাল হোক এটাই চলতে থাকবে।

অন্ধকার ভেদ করে গাড়িটা এগিয়ে যেতে লাগল। একই রাস্তা ধরে প্রতি রাতে আমি ডাইভ করে যাই। কত মাস হল আমি এরকম করছি? আমার সামনে আর কত এরকম মাস পড়ে আছে? সাইনটা শিগগিরি চোখে এসে পড়বে, যেই সাইনটা ওর সমস্ত স্মৃতি নিমেষেই ফিরিয়ে আনবে। আমি শক্ত করে স্টিয়ারিং হুইলটা চেপে ধরে মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

“আ…আমি…ওকে…আমি ওকে খুন করেছি…”

দ্য হোয়াইট হাউজ ইন দ্যা কোল্ড ফরেস্ট

একসময় আমি ঘোড়ার আস্তাবলে থাকতাম। আস্তাবলটায় ঘোড়া ছিল তিনটা। পুরো জায়গাটা তারা সারাক্ষণ হাগামুতা করে ভরিয়ে রাখত।

“তুই না থাকলে, এখানে আরেকটা ঘোড়া ঢোকানো যেত,” বিরক্ত সুরে আমার খালা বলেছিলেন।

আস্তাবলের দেয়ালের নিচের অর্ধেকটা ছিল পাথর দিয়ে তৈরি। আর উপরের অর্ধেক অংশ ছিল কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো। পাথরগুলো চারকোনা করে না কেটে গোলাকার পাথরগুলোকে স্রেফ একটার উপর আরেকটা রেখে চুন বালি দিয়ে জোড়া দিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমি যদি আস্তাবলের এক কোনায় গুটিসুটি মেরে না শুতাম তাহলে ঘোড়াগুলো আমাকে ভর্তা করে ফেলত। শোয়ার সময় আমি সবসময় পাথরগুলোর দিকে মুখ করে শুতাম। বিভিন্ন আকারের পাথরগুলোকে দেখতে আমার কাছে মানুষের মুখের মত লাগত। কোন কোনটাকে দেখে আবার মানুষের হাত, পায়ের পাতা, বুক, এমনকি ঘাড়ের মত মনে হত।

ঘোড়ার গোবরের গন্ধ ছিল খুবই তীব্র, কখনো দুর হত না। কিন্তু তারপরেও আস্তাবলই ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে আমি থাকতে পারি। আমার বাড়ি। শীতের রাতগুলোতে প্রচুর ঠান্ডা পড়ত। একগাদা খড় জড়ো করে তার নিচে ঘুমানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু তারপরেও কাঁপুনি থামাতে পারতাম না।

***

আমার কাজ ছিল আস্তাবলের গোবর পরিস্কার করা। কাজটা কখনো শেষ হত না। আস্তাবলের পেছন দিকে সার বানানোর জন্য পাহাড় সমান বিশাল গোবরের স্তূপ জমানো হয়েছিল। প্রতিদিন সেই স্তূপের উপর আমি নতুন করে আরও গোবর ফেলতাম। সেই সাথে খালুর নির্দেশ অনুযায়ী সেই গোবর সার আবার মাঠেও নিয়ে যেতাম। খালু যা যা বলতেন তাই আমাকে করতে হত। তিনি কখনো আস্তাবলের ধারে কাছে আসতেন না। দূর থেকে নাক কুঁচকে সব আদেশ করতেন।

খালার ছেলেমেয়ে ছিল তিনজন-দুই ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলে দুটো প্রায়ই আস্তাবলে খেলতে আসত। বড়টা ছড়ি দিয়ে আঘাত করত আমাকে। সেটা দেখে ছোটটা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ত। ছড়ির আঘাতে চামড়া ফেটে রক্ত বের হত আমার।

সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হয়েছিল যখন ওরা আমাকে ঘোড়ার সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল। ঘোড়ার লাথি খেয়ে আমার চেহারা বদলে গিয়েছিল, সেটা আর ঠিক হয়নি। ছেলেগুলো দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পরে এমন ভাব করেছিল যেন এই ঘটনার কিছুই তারা জানে না।

লাথি খেয়ে আমার মুখের এক অংশের মাংস খসে গিয়েছিল। আমি মাংসের দলাটা তুলে নিয়ে আস্তাবল থেকে বেরিয়ে মূল বাড়িতে গিয়েছিলাম সাহায্যর জন্য। বাইরে তখনো দিনের আলো ছিল। লনের উপর ছিল সবুজ ঘাসের সমুদ্র। হাঁটার সময় ঝুলে পড়ছিল আমার মুখ।

খালা তার কুকুর আর মুরগিগুলো ঘরের ভেতর রাখেন, সেগুলো উঠোনে ঘোরাঘুরি করছিল। আমি ঘরের দরজায় টোকা দিলাম, কোন শব্দ করলাম না। আমার মুখ থেকে জানি না কী খসে পড়েছিল, কিন্তু সেটা আমি শক্ত করে মুঠোর মধ্যে ধরে রেখেছিলাম।

খালা দরজা খুলে আমাকে দেখে চিৎকার করে পিছিয়ে গেলেন। তিনি কখনো চান না যে আমি তার বাড়ির ধারে কাছে যাই।

“বাসা ভর্তি মেহমান,” তিনি বললেন। “আস্তাবলের ভেতরে থাকবি। মেহমানরা এভাবে তোকে দেখলে ঘেন্নায় মরে যাবে।”

তিনি হাত দিয়ে তাড়িয়ে আমাকে আস্তাবলে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। রাত নামার পর ঘোড়ার পানি খাওয়ার চৌবাচ্চায় বসে ক্ষত পরিস্কার করলাম। কুয়ার পরিস্কার পানি ব্যবহার করা আমার জন্য নিষেধ। ব্যথায় কয়েকবার অজ্ঞান হয়ে পড়লেও একসময় ঘুমাতে পেরেছি।

আমার কাজিনরা এরপর থেকে ভয়ে আস্তাবল এড়িয়ে চলতে লাগল। না খেয়ে মরে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে আমি ঘোড়ার জন্য দেয়া জাব খেতে লাগলাম। আমার খালা রাতের উচ্ছিষ্ট আমার জন্য নিয়ে এসে অবাক হয়ে গেলেন। “একি? তুই এখনো বেঁচে আছিস? তোর শরীর নিশ্চয়ই শক্ত কোন ধাতুতে তৈরি।”

আমি পুরো একটা মাস পার করলাম মুখে যেন কিছুর ছোঁয়া না লাগে। সেই চেষ্টা করে। প্রায় ছয় মাসের মত ব্যথা ছিল। মুখের যে অংশটা খুলে আলাদা গিয়েছিল সেটা আমি জমিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু এক সময় মাংসের টুকরোটায় পঁচন ধরল। রঙ বদলে কালো হয়ে গেল আর দুর্গন্ধ বের হতে লাগল। তারপরেও আমি অনেকদিন টুকরোটাকে আমার সাথে রেখেছিলাম। আস্তাবলের দেয়ালের পাথরগুলোকে আমার কাছে মানুষের মুখ মনে হত। মাঝে মাঝে আমি আমার মুখের টুকরোটা পাথরগুলোর উপর রেখে নানান জিনিস কল্পনা করতাম। একসময় ক্ষত শুকিয়ে গেল, কিন্তু আমার চেহারা স্থায়ীভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।

***

মাঝে মাঝে খালার লাল চুলো ছোট মেয়েটা আস্তাবলে এলে আমাদের মধ্যে কথা হত। সে আমার খালা আর তার ছেলে দুটোর চেয়ে একদম অন্যরকম। ছিল, কখনো আমাকে আঘাত করেনি। মাঝে মাঝে সে আমার জন্য বই নিয়ে আসত। ওর দয়াল মনোভাবের কারনে আমি পড়তে শিখেছিলাম। পড়া শিখতে আমার বেশি সময় লাগেনি।

“কি মিথ্যুক রে বাবা!” মেয়েটা আমাকে একদিন বলল। “এত সহজে কেউ বই পড়া শিখতে পারে নাকি”

আমি যে মিথ্যা বলছি না তা ওকে দেখানোর জন্য একটা বই খুললাম আর কিছু অংশ পরে শোনালাম। মেয়েটা অবাক হয়ে গেল।

আমি পুরো বই মুখস্ত করে ফেলতাম। আস্তাবলের ভেতর রাতে কোন আলো ছিল না। দিনের বেলা ফাঁক ফোঁকর দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকত। সেই আলোতে আমি সারাদিন বই পড়তাম। মেয়েটা আমাকে বলেছিল বইগুলোর কথা যেন আর কেউ না জানে। অনেক সময় আমি মাত্র একবার দেখেই বইয়ের লেখাগুলো মনে রাখতে পারতাম।

লাল চুলো মেয়েটা আমাকে অংক কষাও শিখিয়েছিল। পাটিগনিত। সেইসাথে বই পড়েও অনেক সূত্র সম্পর্কে জানলাম। অনেক জটিল হিসাব যা মেয়েটা নিজেও পারত না, সেগুলোও আমি নিমিষেই করতে পারতাম।

“তুমি সত্যি অনেক বুদ্ধিমান!” সে বলেছিল।

একবার খালা আস্তাবলে এসে আমাকে বই পড়া অবস্থায় ধরে ফেললেন। বইটা খড়ের নিচে কানোরও সময় পাইনি। খালা এসে বইটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন। আমাকে বললেন বই খুবই মূল্যবান জিনিস, সেগুলো কোনভাবেই আমার স্পর্শ করা উচিত না। তারপর একটা ছড়ি দিয়ে আমাকে পেটাতে লাগলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কি করে বইটা এখানে এল।

“মা থামো!” লাল চুলো মেয়েটা চিৎকার করে বলল, সে মাত্রই তখন আস্তাবলের ভেতর ঢুকছিল। “এই ছেলেটার মাথা অনেক ভাল! অন্তত আমার দুই ভাইয়ের চেয়ে সে অনেক মেধাবী!”

আমার খালা ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলেন না। প্রমাণ দেয়ার জন্য মেয়েটা আমাকে বলল স্মৃতি থেকে বাইবেলের একটা অংশ আবৃত্তি করে শোনাতে। আমি ওর কথামত আবৃত্তি করে শোনালাম।

“হেহ, এতে কোন প্রমাণ হয় নাকি?” অবজ্ঞার সুরে খালা বললেন। কথাটা বলে নড়তে গিয়ে ঘোড়ার গোবরে পা পিছলে ধপাস করে পড়লেন।

***

আস্তে আস্তে আমাদের সবার বয়স বাড়ল। ছেলে দুটো সাধারণত আস্তাবল থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলত। শুধু শিকারে যাওয়ার জন্য ঘোড়ার দরকার পড়লেই তারা আস্তাবলে আসত। লাল চুলো মেয়েটা দূরের কোন একটা বোর্ডিং স্কুলে চলে গিয়েছিল পড়াশুনা করতে। এমনকি আমার খালাও উচ্ছিষ্ট আনা বন্ধ করে দিলেন। খালু আস্তে আস্তে তার জমিগুলো অন্য লোকদের কাছে বিক্রি করে দিতে লাগলেন।

আমি আস্তাবলের এক কোনায় পড়ে থাকতাম। সবাই ভুলেই গিয়েছিল আমার কথা। কারো সাথে আমার দেখা হত না। বছরের পর বছর খড়ের নিচে লুকিয়ে থাকার কারনে লোকজন হয়ত ধরে নিয়েছিল আমি বোধহয় অনেক আগেই কোথাও পালিয়ে গিয়েছি। রাতের বেলা আস্তাবল পরিস্কার করতাম। কেউ আস্তাবলের কাছে এলে কোথাও লুকিয়ে পড়তাম। দেয়ালের পাথরগুলোকে আমার কাছে তখনো মানুষের চেহারার মত লাগত। আমি তাদের হাত আর গোড়ালিও দেখতে পেতাম। দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়তাম।

মাঝরাতে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে ময়লার ঝুড়ির কাছে যেতাম যেখানে রাতের উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা হত। এক রাতে খালা আমাকে সেখানে দেখে ফেললেন।

“তুই এখনো এখানে পড়ে আছিস?” তিনি বললেন। তারপর কিছু টাকা ছুঁড়ে ফেলে বললেন, “টাকাগুলো নিয়ে চলে যা এখান থেকে।”

***

এরপর আমি শহরে গেলাম। উঁচু উঁচু বিল্ডিং সবখানে। চারিদিকে খালি মানুষ আর মানুষ। কারো সাথে চোখাচোখি হলে, তারা আমার চেহারা দেখে ঘৃণায় মুখ সরিয়ে নিত। কেউ কেউ আড়চোখে তাকাত। কেউ কেউ আবার হা করেও তাকিয়ে থাকত।

খালার দেয়া টাকাগুলো সামনের বুকপকেটে রেখেছিলাম। এক রাতে এক নির্জন গলিতে কিছু লোক আমাকে ধরল। তারা আমার সাথে বাজে কিছু কাজ করল। আমি উপলদ্ধি করলাম শহর থেকে আমাকে দূরে থাকতে হবে। কেউ যায় না কিংবা ভুলে গিয়েছে এমন সব পথ বেছে নিলাম আমি হাঁটার জন্য।

হাঁটতে হাঁটতে এক সময় এক বনে গিয়ে পৌঁছলাম। আমার মনে হল এখানেই আমি আমার জীবন নতুন করে শুরু করতে পারব। আমি সবসময় লোজন থেকে দূরে থেকেছি। যখনই কোন মানুষের সাথে দেখা হয়েছে তখনই কিছু না কিছু বাজে ঘটনা ঘটেছে। আমি জানতাম থাকার জন্য আমাকে একটা বাড়ি বানাতে হবে। আস্তাবলের পাথরের দেয়ালগুলোর কথা আমার খুব মনে পড়ত। সেরকম কোন কিছু আমাকে বানাতে হবে। পুরো বন ঘুরে মুখ, হাত বা পায়ের সাথে মিল আছে এরকম পাথর খুঁজলাম। কোথাও কোন পাথর পাওয়া গেল না। বনে শুধু গাছ ছাড়া আর কিছু ছিল না। যতদুর যাই খালি গাছ আর গাছ, সেই সাথে পাতা পচা নরম মাটি।

পাথর খুঁজতে গিয়ে পর্বতে উঠার রাস্তায় এক যুবকের সামনে পড়ে গেলাম। সে সেখানে হাইকিং করতে এসেছিল। আমার মনে হয়েছিল মানুষ মানেই জঘন্য ব্যাপার, তাই তাকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

তারপর সেটাই করলাম। খুন করলাম যুবকটাকে।

ওর চেহারাটা পরিচিত লাগছিল। আস্তাবলের দেয়ালের একটা পাথরের সাথে কোথায় যেন যুবকটার চেহারার মিল ছিল। তারপর লাশটা বনের

গভীরে বয়ে নিয়ে গেলাম। অবশেষে নিজের বাড়ি বানানোর জন্য কিছু একটা পাওয়া গেল।

মানুষের দহ দিয়ে আমি আমার বাড়ি বানাতে লাগলাম। লাশের উপর লাশ শুয়ে বাড়ির দেয়াল উঠতে লাগল। মৃতদেহ সংগ্রহের জন্য আমাকে বন থেকে বেরিয়ে লোকালয়ের দিকে যেতে হত।

এক মহিলা, বুকে কাপড়ের একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আমি রাস্তার পাশের এক ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে বসে ছিলাম। মহিলাটাকে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলাম। তারপর ঝোপ থেকে বেরিয়ে পিছু পিছু যেতে লাগলাম। পায়ের শব্দ পেয়ে মহিলাটা পিছনে ফিরে তাকাল। তার চিৎকার ছিল অত্যন্ত জোরালো। বেশিরভাগ মানুষ, আমার বিকৃত চেহারা দেখার পর হয় ভয়ে চিৎকার করে নতুবা রেগে যায়। আমি দু হাত দিয়ে তার গলা চেপে ধরলাম। বুকের কাপড়ের ব্যাগটা খসে পড়ে ভেতর থেকে সবজিগুলো গড়িয়ে গেল। একটা আলু গড়িয়ে আমার পায়ের সাথে এসে লাগল।

মহিলাটার ঘাড়ের হাড় ভাঙা একদম সহজ ছিল। মুহূর্তের মধ্যে যেন তার চিৎকার হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। চোখগুলো কোটর ছেড়ে প্রায় বেরিয়ে পড়েছিল। মরার পরেও লোকজন আমার চেহারার দিকে আতংকিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। মৃতদেহটা টেনে ঝোঁপের আড়ালে নিয়ে গেলাম। তারপর সবজিগুলো সব এক জায়গায় জড় করলাম। পরবর্তীতে ওর ঠান্ডা দেহটা আমার বাড়ির মূল খুটি হিসেবে ব্যবহৃত হল। ঠান্ডা, পাতা পচা মাটিতে শুয়ে থেকে দেহটা দেয়ালে স্তূপ করে রাখা মৃতদেহগুলোর ভারসাম্য ধরে রাখত।

মাথায় টুপি পরা একটা লোক একটা হাতে টানা কার্ট নিয়ে ব্রিজ পার হচ্ছিল। কাঠের ছোট ব্রিজ। ছোট নদীটার দুপার আগাছা দিয়ে ভরা ছিল। কাঠের ব্রিজটার ছায়া পড়ছিল নিচের পানিতে। আমি ব্রিজের নিচে লুকিয়ে ছিলাম। কার্টটা আমার মাথার উপর দিয়ে যেতেই লাফিয়ে উঠলাম। সাবধান ছিলাম যেন কোন শব্দ না হয়। লোকটা প্রথমে খেয়ালও করেনি। কিন্তু কার্টটা হঠাৎ ভারি মনে হওয়ায় সে ঘুরে তাকাল। আর আমি হাতে ধরে থাকা পাথরটা দিয়ে তার মাথা দুভাগ করে ফেললাম। লোকটা এমনকি চিৎকার দেয়ার সময়টুকুও পায়নি।

লাশটা কার্টে তুলে নিলাম। কার্টের ভেতরে কাঠের বাক্স রাখা। বাক্সগুলোর উপর ভেতরে রাখা ফলের নাম লেখা। লোকটা সম্ভবত শহরে যাচ্ছিল সেগুলো বিক্রি করতে। আমি পুরো কার্ট ধরে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গেলাম। অন্যান্য লাশগুলোর মত লোকটার লাশও দেয়ালের অংশ হয়ে গেল, বাড়ি তৈরির মাল মশলা।

এইসব মাল মশলা আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে জোগাড় করতাম। গ্রাম থেকে শহরের যাওয়ার পথে লোকজনকে খুন করে এক জায়গায় নিয়ে জড় করতাম। তারপর কার্টে ভরে খড় দিয়ে ঢেকে রাতের অন্ধকারে জঙ্গলে নিয়ে আসতাম।

এক রাতে আমি কার্ট ঠেলে ফিরছি এমন সময় পেছন থেকে একটা গলার আওয়াজ এল, “থামুন!” একজন পুরুষের গলার আওয়াজ। দ্রুত আমি আমার মুখ লুকিয়ে ফেললাম। কোনভাবেই কাউকে আমার চেহারা দেখানো যাবে না। নয়ত অমঙ্গল কিছু একটা ঘটে যেতে পারে।

“এরকম মাঝরাতে কি মনে করে এখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন অ্যাঁ? জানেন না নাকি? লোকজন বলাবলি করছে এখানে নাকি ইদানিং কিডন্যাপারদের উৎপাত শুরু হয়েছে?”

লোকটার হাতে একটা ইলেকট্রিক ল্যাম্প ছিল। বয়স্ক লোক, কিন্তু আবার অতটা বড়োও ছিল না। লোকটা আমার দিকে এগিয়ে এল। একহাত আমার কার্টের উপর দিয়ে রেখেছে। কার্টের উপরের খড় দেখে বলল, “কিডন্যাপারটা আশেপাশের কয়েকটা গ্রামে হানা দিয়েছে। কেউ জানে না নিখোঁজ লোকগুলোর ভাগ্যে কি ঘটেছে। আমার নাতি-নাতনিদের ধারণা মানুষগুলোকে নাকি কেটেকুটে রান্না করে খেয়ে ফেলেছে সে।”

এমন সময় লোকটার চোখ পড়ল খড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকা এক মহিলার গোড়ালির উপর। সে অবাক হয়ে হাত বাড়াল সেটা স্পর্শ করার জন্য। মত শরীরের শীতলতা অনুভব করে কেঁপে উঠল। আমি। লোকটার গলা টিপে মেরে ফেলে তাকেও কার্টের উপর উঠিয়ে রাখলাম।

বনের ভেতরটা ছিল একদম নিস্তব্ধ। গাছের পর গাছ, গোড়াগুলো লোহার মত শক্ত। বছরের সবচেয়ে ঠান্ডা সময় ছিল সেটা। পাতাগুলো তাদের নিজস্ব রঙ হারিয়ে ফেলেছিল, বেশির ভাগই ঝরে পড়ে গিয়েছিল। আমি লাশগুলো নিয়ে জায়গামত নামিয়ে রাখলাম যেখানে কিনা একটা দেয়াল তৈরি করব।

একদম সাধারণ ধরনের একটা বাড়ি বানালাম, চার কোনা বাক্স আকৃতির। দেয়ালের জন্য লাশগুলো একটা আরেকটার উপর স্তূপ করে রেখেছিলাম, ভেতরে কোন ফাঁক-ফোঁকর ছিল না। কিছু লাশ ছিল পুরুষদের, আর কিছু নারীদের। কেউ কেউ ছিল গ্রামের অধিবাসী, কেউ কেউ ছিল স্রেফ পথিক। বনে নেয়ার পর আমি তাদের পোশাকগুলো খুলে নিয়েছিলাম। তারা ছিল সবাই নগ্ন আর সবার চামড়ার রঙ ছিল একদম সাদা।

দেয়ালটা ঠিক রাখার জন্য কিছু দেহ দেয়ালের ভেতর শুয়ে ছিল আর কিছু বসে ছিল। তাদের কেউ কেউ হাঁটু ভাঁজ করে জড়িয়ে ছিল, কারো কারো হাত অন্যদের গলা ধরে ছিল। দেয়ালগুলো পাতলা ছিল না। এক মানুষ সমান পুরু হলে দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না, দুর্বল হয়ে পড়ত। যে কারনে কয়েক জনের লাশ দিয়ে পুরু করতে হয়েছে। কিছু জায়গায় অতিরিক্ত ঠেক দিতে কাঠ ব্যবহার করতে হয়েছে। বাড়ির কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। মাল মশলা শেষ হয়ে এলে আমি আরো সংগ্রহ করে আনতে যেতাম। দেয়ালগুলো যথেষ্ট উঁচু ছিল। মাল মশলার রঙ যেহেতু সাদা ছিল, বাড়িটার রঙও তাই সাদা ছিল।

শীতের দিন চলতেই থাকল। আমি অর্ধসমাপ্ত দেয়াল ঘেসে ঘুমাতাম। লোকজনের সাথে থাকা খাবারগুলো খেতাম। দেয়ালগুলোর কাজ শেষ হওয়ার পর ছাদের কাজ ধরলাম। গাছের বড় বড় ডাল এনে দেয়ালের উপর রাখলাম তারপর তার উপর আরো কিছু লাশ শুইয়ে দিলাম। ছাদ তৈরি হয়ে গেল। তুষার এখন আর কোন সমস্যা করবে না।

বাড়ির কাজ শেষ। নিরব এক বনের ভেতর ছোট্ট সাদা একটা বাড়ি। লাশগুলোর ত্বক ছিল শীতল আর চাঁদের আলোয় ভয়ংকর রকমের সাদা দেখাত। মনে হত জ্বলজ্বল করছে। গোড়ার কাছের যে লাশগুলো ছিল সেগুলো উপরের ভারে আস্তে আস্তে করে পাতা পচা নরম মাটিতে দেবে যাচ্ছিল।

ভেতরে এক মানুষ দাঁড়ানোর মত জায়গা ছিল। কাঠামোটা ছিল একদম সাধারণ। একটা ছাদ, চারটা দেয়াল আর ঢোকার জন্য একটা মুখ। কিন্তু ঠান্ডা বাতাস ঠেকানোর জন্য এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। মৃতদেহগুলোর সবগুলোর চোখ খোলা ছিল, আমার দিকে তাকিয়ে থাকত তারা। ঠিক আস্তাবলের দেয়ালের পাথরগুলোর মত। দেহগুলো জটিলভাবে একটা আরেকটার সাথে পেঁচিয়ে ছিল। এক মহিলার চুল এত বড় ছিল যে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঝুলে ছিল, সেই সাথে তার নিচের দেহগুলোর মুখগুলোও সে ঢেকে দিয়েছিল।

আমার জীবন ছিল একদম সাধারণ, চুপচাপ। এই বনে তেমন একটা পাখিও ছিল না, শুধু ছিল আমার এই সাদা বাড়ি। যে বাড়ির সবগুলো চোখ সবসময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকত।

দেয়ালের মৃতদেহগুলোর মধ্যে এক লোকের কনুই ভাঁজ করা ছিল। ফলে পাশের লোকের শরীরও বাঁকিয়ে ওই কনুইয়ের সাথে মেলাতে হয়েছে। একটা কম বয়সি ছেলে মাটির উপর সোজা দাঁড়িয়ে মাথার উপর অন্যদের ভার বহন করছিল। সবার হাত-পা এমনভাবে উল্টোপাল্টা পেচিয়ে ছিল যে দেখে মনে হত অনেকগুলো সাপ একসাথে এক জায়গায় কিলবিল করছে। এর মাঝে হাঁটু ভাঁজ করে জড়িয়ে আমি ঘুমাতাম। শীতের ঠান্ডা রাতগুলো শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না।

প্রায়ই খালার বাসায় থাকার সময়ের কথা আমার মনে পড়ত। যখনই চোখ বুজতাম, সাথে সাথে সেই আস্তাবলে ফিরে যেতাম। লাল চুলো মেয়েটার কথা মনে পড়ত। যে বাড়িতে আমার বাবা-মা এর সাথে থাকতাম সেটার কথাও মনে পড়ত। আমরা তেমন বড়লোক কোন পরিবার ছিলাম না। শীতের সময় বাবা বাইরে গিয়ে ঠান্ডায় জমাট বাধা মাঠে চাষের জন্য মাটি খুঁড়তেন। মা তাকে নিজের হাত লাল না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সাহায্য করতেন। এক বৃষ্টির দিনে তারা ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান। একটা ছুটতে থাকা ঘোড়ার গাড়ির সাথে তারা কিভাবে যেন পেঁচিয়ে গিয়েছিলেন। অন্তত আমাকে সেরকমই বলা হয়েছিল

এরপর খালা আমার দায়িত্ব নেন। আমাকে তাদের আস্তাবলে থাকতে দেয়া হয়। মূল বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি ছিল না, কারন আমার শরীর থেকে সবসময় ঘোড়ার গোবরের গন্ধ আসত। আস্তাবলের দেয়ালের নিচের অর্ধেকটা গোলাকার পাথর দিয়ে তৈরি ছিল, যেগুলো দেখে মানুষের মুখের মত মন হত।

সাদা বাড়িতে এভাবে কিছুদিন কাটানোর পর, সেখানে একটা মেয়ে এল।

আমি বাড়িতে বসে চিন্তা করছিলাম এমন সময় বাইরের পড়ে থাকা পাতার উপর কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। কেন জানি মনে হল কেউ নিশ্চয়ই এই গভীর বনে সেফ এই বাড়িটার খোঁজেই এসেছে। ধসর আকাশে একটা মলিন সূর্য বাড়ির প্রবেশ পথে আলো ফেলছিল। একটা ছোট্ট ছায়া সেই আলো ঢেকে ফেলল। কে এসেছে দেখতে আমি মাথা তুললাম। মেয়েটা প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে ছিল।

একদম ছোট একটা বাচ্চা। মুখে ভয়ের চিহ্ন। তার পোশাকের রঙ ছিল খুবই গাঢ় নীল রঙের, প্রায় কালোর কাছাকাছি। মেয়েটার ত্বকের রঙ ছিল ফ্যাকাসে সাদা। ঠোঁট ছিল নীলচে, ঠান্ডা বা ক্ষুধা থেকে নয় বরং ভয় থেকে।

“তুমি কি এখানে থাক?” সে আমাকে প্রশ্ন করল, গলা কাঁপছিল। মেয়েটার হাতগুলো ভাঁজ করে বুকের উপর শক্ত করে ধরা, মাথা দুলছিল। “তোমার বাড়ি তো দেখি মানুষ দিয়ে তৈরি!”

সে আমার ছোট বাড়িতে ঢুকে স্তূপ করে রাখা সাদা মৃতদেহগুলো দেখতে লাগল। আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। “তোমার মুখে দেখি একটা গর্ত!”

গর্তটা নিয়ে ওকে আগ্রহী দেখাল, আমার কাছে এগিয়ে এল।

“বেশ বড় একটা গর্ত, পাখি বাসা বানানোর মত যথেষ্ট বড়। গভীর আর অন্ধকার। ঠিকমত দেখতেও পারছি না।” ওকে দেখে মনে হল সে আমার চেহারা নিয়ে সত্যি সত্যি চিন্তিত।

“তুমিই কি ওদের সবাইকে এখানে নিয়ে এসেছ?” ওকে এতটা চিন্তিত দেখাল যে মনে হচ্ছিল যে কোন সময় অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। “আমার সবসময় মনে হত, লোক আমার ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়েছে সে এখানেই কোথাও আছে, এই বনের গভীরে কোথাও। আমাকে আমার ভাই ফিরিয়ে দাও! আমি এতদুর এসেছি শুধু আমার ভাইয়ের জন্য।”

মেয়েটা লাশগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যে কোন মুহূর্তে কেঁদে ফেলবে। শীতল জঙ্গলে, সূর্যের মলিন আলোতে সাদা লাশগুলো মনে হচ্ছিল জ্বল জ্বল করছিল।

“আমি নিশ্চিত আমার ভাই এখানেই কোথাও আছে। সে খুবই সুদর্শন আর স্মার্ট।”

সদর্শন, স্মার্ট দেখতে একটা ছেলে ভেতরের দেয়ালে আছে। ছেলেটা দাঁড়িয়ে থেকে ওর মাথার উপর অন্য দেহগুলোর ভার ধরে ছিল। আমি মেয়েটাকে লাশটা দেখালাম। সে তার ভাইকে দেখতে পেয়ে নাম ধরে ডাকতে লাগল। ওর কণ্ঠের জোর দেখে চমকে গেলাম আমি। মেয়েটা ওর ভাইয়ের মৃতদেহের কাঁধ ধরে দেয়ালের ভেতর থেকে বের করে আনতে চাইল। আমি ওকে বাধা দিলাম। ছেলেটাকে সরিয়ে নিলে পুরো বাড়িটা ভেঙে পড়বে।

“কিন্তু আমাকে আমার ভাইকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।” মেয়েটা কাঁদছিল। আমার বাবা আমার চেয়ে আমার ভাইকে বেশি পছন্দ করেন। সবসময় মেজাজ খারাপ থাকে তার। তিনি সবসময় আমার গায়ে হাত তুলেন। আমার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে বাবা অনেক মনমরা হয়ে থাকেন। তিনি সবসময় আমার মা আর ভাইয়ের সাথে একসাথে বসে খাবার খেতে পছন্দ করতেন। মা এখন বিদেশে গিয়েছেন কাজে, তিনি ফেরত আসার আগেই আমি আমার ভাইকে বাসায় নিয়ে যেতে চাই। প্লিজ আমার ভাইকে ফিরিয়ে দাও।”

মেয়েটা মরা পাতার উপর হাঁটু গেড়ে বসে আমার কাছে ভিক্ষা চাইতে লাগল। আমি ওর অনুরোধ নাকচ করে দিতে বাধ্য হলাম কারন ওর ভাইকে ছাড়া বাড়ি ভেঙে পড়বে। মেয়েটার চোখ অশ্রুতে ছলছল করছিল। সে আমাকে বলল, “আমি নাহয় ওর জায়গায় দাঁড়াব।”

এই কথার পর আমি ছেলেটার দেহ বের করে আনলাম। মেয়েটা দ্রুত খালি জায়গাটার মধ্যে ঢুকে গেল, যেখানে ওর ভাইয়ের দেহ ছিল এতদিন। সেখানে সে চমৎকারভাবে খালি জায়গাটায় খাপে খাপে লেগে গেল। ও ওর পোশাক পরে ছিল যে কারনে সাদা দেয়ালে একমাত্র রঙটাও ছিল ওর পোশাকের। ছেলেটার দেহ বের করে আনার পরেও লাশটা একইরকম শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

“প্লিজ আমার ভাইকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে এসো…”

ওর কথায় কষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছিল। সে আমাকে তার বাড়িতে কিভাবে যেতে হবে তা ব্যাখ্যা করে বলল। তথ্যটা মনে রাখতে আমার কোন কষ্টই হল না।

“তুমি তো দেখি খুব দ্রুত শিখতে পার।” মৃতদেহের ভিড়ের ভেতর থেকে মেয়েটা অবাক হয়ে বলল। আমি ছেলেটার দেহ বাড়ির বাইরে নিয়ে গেলাম আর এমন ভাব করলাম যেন বাসায় ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছি। আসলে আমি লাশটা কিছুদূর নিয়ে ফেলে দিলাম। তারপর সেটার পাশে বসে আমার সাদা বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। লাশটা ফিরিয়ে দিয়ে আসার কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি চলে গেলে মেয়েটা দেয়াল থেকে বেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করবে।

বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম কিন্তু মেয়েটা বের হল না। একটা পুরো দিন পার হয়ে গেল। মেয়েটার বাসায় গিয়ে ফিরে আসতে আমার এরকম সময়ই লাগার কথা। সুতরাং আমি বাড়িতে ফিরে গেলাম আর ভান করলাম যেন ছেলেটাকে বাসায় রেখে এসেছি। মেয়েটা তখনো দেয়ালের ভেতরেই ছিল, এক বিন্দু নড়ছিল না।

“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ আমার ভাইকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য। আমি নিশ্চিত যে বাবা এখন খুশি হবে, মাও যখন বিদেশ থেকে ফিরে আসবে সেও খুশি হবে।” খুশিতে কাঁদছিল মেয়েটা। একগাদা সাদা মতদেহের ভেতর মেয়েটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথার উপরের দেহগুলোর ভার রক্ষা করছিল।

এভাবে মেয়েটার সাথে আমার জীবন শুরু হল। সে কথা বলতে পছন্দ করত। ছোট্ট বাড়িটা ওর গলার আওয়াজে পরিপুর্ণ হয়ে থাকত। দেয়ালের অন্য দেহগুলোর চোখগুলো তখনো খোলা থাকত। কিন্তু প্রতিটা দিন পার হত আর দেহগুলোর আকৃতি একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল।

মেয়েটা প্রথম প্রথম একটু ব্ৰস্ত থাকলেও কথা বলতে শুরু করা পর থেকে হাসতে শুরু লাগল। নিস্তব্ধ বনের ভেতর ঠান্ডা, শীতল ছোট ঘরটায় ওর হাসি ছিল সূর্যালোকের মত।

“আমাকে বল তো, তোমার চেহারা ওরকম হল কি করে?” সে জানতে চাইল। আমি ওকে আমার খালার বাড়ি সম্পর্কে জানালাম।

“কি দুঃখজনক,” সে সহানুভূতির সরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল। ওর বাবাও ওকে পেটাত। সে নিজেও বাসা থেকে পালিয়ে গিয়ে আস্তাবলে থাকত। আস্তাবলে ঘোড়ার গোবরের গন্ধের কথা মনে পড়তে নাক কুচকাল।

“এই ঘরের গন্ধও বেশ তীব্র, কিন্তু আস্তাবলের গন্ধের মত নয়।”

এভাবে আমরা একজন আরেকজনকে নিজেদের গল্প বলে সময় পার করতে লাগলাম। আমি ওকে খালার বাসায় পড়া বইগুলোর কথা বলতে ভুললাম না।

দিনগুলো তখন বড়ই অদ্ভুত ছিল। এই দিনগুলোর আগে আমি নিঃসঙ্গ ছিলাম। সারাদিন শুধু হাঁটু ভাঁজ করে বসে দেয়ালের খোলা চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আগে যে ভয় আমার ভেতর কাজ করত তা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে আমার হৃদয় শান্তিতে ভরে উঠছিল।

মেয়েটা ঘুমালোও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কিছুদিন পর ও কথা বলা কমিয়ে দিল। ওর মুখ আরো ফ্যাকাসে হয়ে যেতে লাগল আর এক সময় ওকে আশেপাশের লাশগুলোর মতই সাদাটে দেখাতে লাগল। আমার মনে হল ও বোধ হয় ঠান্ডা আর ক্ষুধায় মারা যাবে।

“একটা গল্প শোনাও,” মেয়েটা আমাকে বলল। আমি আমার মুখস্ত করা বই থেকে একটা অংশ শোনালাম।

একসময় মেয়েটার চোখের পলক পড়া থেমে গেল। চোখগুলো বিস্তৃত হয়ে ছিল। একটা হালকা হাসি ওর মুখে ছড়িয়ে ছিল।

ওর উচ্চতাও খানিকটা কমে গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম আস্তে আস্তে ওর মাথার উপর মৃতদেহগুলোর ভার বাড়তে শুরু করেছে। এমনিতে ও ওর ভাইয়ের চেয়ে একটু লম্বা ছিল। মেয়েটার মুখ ঠান্ডায় সাদা হয়ে গেলে শুধু পোশাকের গাঢ় নীল রংটাই বাড়ির একমাত্র রঙ হয়ে রইল। হাঁটু ভাঁজ করে জড়িয়ে আমি মাঝখানে বসে থাকলাম। কথা বলার কেউ যখন আর নেই কথা বলার সব প্রয়োজনও আমার ফুরিয়ে গিয়েছিল। মৃতদেহের। স্তূপ দিয়ে তৈরি বাড়িটায় আবার আগের মত নীরবতা নেমে এল। আমি বুকের ভেতর কোথাও অনুশোচনা অনুভব করছিলাম। মেয়েটাকে দেয়া কথাটা না রাখার জন্য। আমি ঠিক করলাম মেয়েটার বাড়িতে যাব। ওর ভাইকে ফিরিয়ে দিয়ে আসব।

বাইরে ছেলেটার লাশ তখনো পড়ে ছিল। সূর্যের আলোর কারনে পঁচে গলতে শুরু করেছে। লাশটা তুলতে গেলে নরম টুকরোগুলো ভেঙে খসে পড়তে লাগল। মেয়েটাকেও আমি ওর বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছিলাম কারন সে তার বাবা-মাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালবাসত।

মেয়েটার কাঁধ ধরে টেনে দেয়াল থেকে বের করে আনলাম। পুরো বাড়িটা থর থর করে কাঁপতে শুরু করল। লাশটা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতেই আমার সাধের সাদা বাড়ি পুরো ভেঙে পড়ল। প্যাঁচানো দেহগুলোকে একসাথে দেখে আর মানব দেহ বলে চেনা সম্ভব ছিল না। বরং ওগুলোকে দেখতে বড় এক তাল গোবরের মত লাগছিল।

নীরব, নিস্তব্ধ, শীতল বনের ভেতর অসংখ্য গাছের সারির মাঝে পর্বতের মত একতাল মাংসের স্তূপ পড়ে রইল। যেই কাঠের বাক্সটা আমি লাশ পরিবহনের কাজে ব্যবহার করতাম সেটা কাছেই পড়ে ছিল। একসময় সেটায় ফলমূল পরিবহন করা হত। কোন বাক্সে কোন ফল রাখা তা উপরে লেখা ছিল। মেয়েটা আর ওর ভাইয়ের পঁচে যাওয়া, দেহ আমি বাক্সটায় নিয়ে ভরলাম। ছেলেটার গলে যাওয়া দেহ সুন্দর মত মেয়েটার ভাঁজ করা দেহের সাথে ফাঁক ফোঁকরে ঢুকে গেল। ঢাকনাটা লাগিয়ে বাক্সটা নিয়ে ওদের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

ওদের বাড়ির দরজার কাছাকাছি পৌঁছুতে খেয়াল করলাম একজন মহিলা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। মহিলার হাতে বড় একটা ব্যাগ। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল মহিলাটা মেয়েটার মা হবে, বিদেশ থেকে ফিরছে।

আমি সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে মহিলাটার কাছে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। একসময় সে আমার সামনে এসে থামল। তার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

“আহ তুমি! তুমি বেঁচে আছ!” সে এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল।

“ইশ্বরকে ধন্যবাদ। তোমার চেহারা আগের মতই রয়েছে, ওই যে ঘোড়ার লাখি খাওয়ার পর যেমন ছিল, ঠিক তেমনই। গত কয়েক বছর আমি যে কতবার তোমার কথা চিন্তা করেছি!”

মেয়েটার বয়স বাড়লেও চুল এখনো আগের মতই লাল রয়েছে। “তুমি এখন থেকে আমার বাড়িতে কাজ করতে পার। আমি বিদেশে গিয়েছিলাম, অনেকদিন পর ফিরছি। এতদিন পর ছেলেমেয়েদের আবার দেখতে পাওয়ার জন্য তর সইছে না।”

লাল চুলো মহিলাটা আমার হাতে ধরা বাক্সটার দিকে তাকাল। ঢাকনাটা খুলে দেখতে চাইলে আমি তাকে বাধা দিলাম।

“বাজে গন্ধটা কিসের? ভেতরের ফলগুলো নির্ঘাত পঁচে গিয়েছে। তুমি কি আমার হয়ে এটা পিছনের সারের স্তূপে নিয়ে ফেলতে পারবে?”

আমি বাক্সটা নিয়ে বাড়ির আস্তাবলের পেছনে গোবরের স্তূপের দিকে গেলাম। সেখানে সার বানানোর জন্য পাহাড় সমান গোবর স্তূপ করে রাখা, ঠিক যেমনটা আমি ছোট থাকতে দেখেছিলাম। ছেলেটা আর মেয়েটার মৃতদেহগুলোকে আমি ওই গোবরের স্তূপের ভেতর ঢুকিয়ে দিলাম। তারপর আস্তাবলে গিয়ে ঢুকলাম। জায়গাটা ঠিক আগের মতই রয়েছে। আস্তাবলের দেয়ালের পাশে হাঁটু ভাঁজ করে গুটিসুটি মেরে শুয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

 ফাইন্ড দ্য ব্লাড!

অ্যালার্ম ক্লক যখন বাজল, আমি (চৌষট্টি বছর বয়স) আমার চোখ খুললাম। ঘড়িটাকে চুপ করালাম, তারপর একই হাত দিয়ে ঘুম তাড়ানোর জন্য চোখ ডলতে লাগলাম। ভোর পাঁচটা বাজছি। বিছানার পাশের পর্দাবিহীন জানালা দিয়ে সূর্যের আলো আসছে। জানালাগুলো এত বাজেভাবে ফিট করা ছিল যে লক তো হয়ই না তার উপর যত চাপাচাপি টানাটানি করা হোক না কেন তিন সেন্টিমিটারের বেশি ফাঁক হয় না। রুম থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় ছিল দরজাটা।

নিজের হাতের দিকে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলাম। ওগুলো গাঢ় লাল। কোন লাল জিনিস শুকিয়ে মাখামাখি হয়ে আছে। ভয়ে আমি চিৎকার করে উঠলাম। অতীতে আমার একটা বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল আর মনে হচ্ছিল (সম্ভবত) সেটা আবারও হতে যাচ্ছে।

“কি হয়েছে বাবা? আমাকে ভেতরে আসতে দিন!” দরজা ধাক্কানোর শব্দ। আমার মেঝো ছেলে, সুগুয়ে (বয়স সাতাশ বছর) এর গলা। মনে হল, দরজাটা ভেতর থেকে লক করা, তাই সে ভেতরে আসতে পারছে না। আমি বিছানা থেকে উঠে বোঝার চেষ্টা করলাম আমার শরীরের কোন অংশ থেকে রক্তপাত হচ্ছে।

“কো…কো…কো…কোত্থেকে? রক্ত কোত্থেকে বের হচ্ছে?”

আমি থরথর করে কাঁপছিলাম, কিন্তু কোনভাবেই বের করতে পারলাম না কোথায় আঘাত পেয়েছি। আমার চোখে রক্ত থাকায় সবকিছু ঘোলাটে দেখছিলাম। যে মুহূর্তে ভাবছিলাম কোত্থেকে রক্তপাত হচ্ছে সেটা বের করার আশা ছেড়ে দেব আর (কোনভাবে) তখন উঠে দরজার কাছে গিয়ে লকটা খুলতে পারলাম।

“বাবা!”

সুগুয়ে দরজা খুলে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল। তারপর আমার অবস্থা দেখে চিৎকার করে উঠল, “অ্যাঁ!”

“কো…কো…কো…কোত্থেকে আমার রক্ত বের হচ্ছে? তাড়াতাড়ি দেখ সুগুয়োয় খুঁজে বের কর!”

সুগুয়োকে সবসময় কাপুরুষ মনে করে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতাম, আর এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল সে হয়ত দেখেই দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ও (আশ্চর্যজনকভাবে) আমার আকুতি শুনল আর আমার পেছন দিকটা পরীক্ষা করল। আমি ওর মুখ থেকে বের হওয়া ছোট ছোট শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম-আউঃ ইক!

“অ্যাঁ! এই যে পেয়েছি!” ও বলল। “আপনার একপাশে কেটে গিয়েছে বাবা!” আমি হাত দিয়ে জায়গাটা স্পর্শ করার চেষ্টা করলাম আর অনুভব করলাম শক্ত কিছু একটা আমার শরীরে গেঁথে আছে।

সেই সময় আমার দ্বিতীয় স্ত্রী সুমাকো (বয়স পঁচিশ বছর) আর বড় ছেলে নাগায়ো (বয়স চৌত্রিশ বছর) এসে হাজির হল। চোখে রক্ত লেগে থাকার কারনে আমি পরিস্কার করে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু এটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম যে ওরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে এখানে।

আমি ওদের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম :

“আয় হায়!”

“এ কি..!”

“সুগুয়ো, আমাকে বল, আমার পিঠে এই শক্ত জিনিসটা কি লেগে আছে?”

“উম…” ও এমন একটা সুরে বলল যার অর্থ অনিচ্ছা আর বুঝতে সময় লাগা দুটোই হতে পারে।

“যত দূর যা মনে হচ্ছে…উম…তোমার পিঠের পাশে যে জিনিসটা লেগে আছে সেটা…একটা কিচেন নাইফ।”

আমার মনে হচ্ছিল জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। আমার ডান দিক দিয়ে রক্ত বেয়ে পড়তে থাকল, আর কার্পেটের উপর একটা দাগ হয়ে আস্তে আস্তে বাইরের দিকে যেতে লাগল। ছুরি দিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার কোন স্মৃতি আমার মনে নেই।

দশ বছর আগে আমার কারনে একটা ভয়াবহ ট্রাফিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। যে গাড়িটা আমি চালাচ্ছিলাম সেটা ছিল বুলেটপ্রুফ, সেই সাথে স্পিঙ্কলারস দিয়েও সজ্জিত ছিল। এটা ছিল আমার “টাকা কথা বলে” ধরনের গাড়ি যা একটা ট্যাংকের মত করে তৈরি করা হয়েছিল। আমার প্রথম স্ত্রী সে সময় প্যাসেঞ্জার সিটে বসে ছিল।

দুর্ঘটনাটা ছিল ভয়াবহ। আমার গাড়ি, যেটা নিয়ে আমার অনেক গর্ব ছিল, একদলা ভাঙাচোরা ধাতব বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। যাইহোক, সৌভাগ্যজনক (অনভিজ্ঞ) অভিজ্ঞতা বলা যায় যে আমি সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলাম।

হাসপাতালের বিছানায় জ্ঞান ফেরে আমার। আমার পুরো শরীর ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়ানো থাকলেও কোথাও কোন ব্যথা বোধ করছিলাম না। আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাসপাতালের ভেতর ঘোরাফেরা করতে লাগলাম, জানার চেষ্টা করলাম আমার স্ত্রীর কি হল।

আমাকে দেখে একজন পুরুষ নার্স চিৎকার করে উঠেছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম যে আমার শরীরে কিছু একটা অন্যরকম লাগছিল, আর তারপর দেখি আমার একটা পা জোড়া দেয়া। আমাকে বলা হল যে আমার অনেক হাড় ভেঙে গিয়েছে তাই আমার উচিত চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকা।

কথাটা গ্রহণ করতে আমার কষ্ট হচ্ছিল। কোন ব্যথা হচ্ছে না, কেন আমাকে শুয়ে বিশ্রাম নিতে হবে?

পরদিন ডাক্তার এসে পরিস্থিতিটা আমার কাছে ব্যাখ্যা করলেন। দুর্ঘটনায় আমার মাথা বেশ ভালভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এতে ব্রেনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রভাবে তখনও ভুগছিলাম। ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা (সম্পূর্ণভাবে) হারিয়ে ফেলেছিলাম।

তখন থেকে, আমি যেকোন ধরনের ক্ষত নিয়ে আতংকে ভুগি। ধরা যাক, হয়ত খবরের কাগজে কমিক্স পড়ছি, আর হোমোবোমো-কুন এর চতুর্থ ফেম লালে ঢেকে আছে। ব্যাপারটা আমাকে বিরক্ত করে তুলল। কে এভাবে আসল অংশটার বারোটা বাজাল? এটা কি ধরনের কার্টুন রে বাবা? কে জানে কার্টুনটার আসল কোন অংশ ছিল নাকি ছিল না? আর সেই মুহূর্তে আমি উপলদ্ধি করলাম আমার আঙুল কেটে যাওয়ায় রক্তপাত হচ্ছিল, আমার নিজের রক্তের দাগ পড়েছিল খবরের কাগজে। হয়ত আমার কুত্তাটা (একটা তোসা প্রজাতির কুকুর) কামড়ে আঙুলের মাংস তুলে নিয়েছে কারন আমি ওকে সকালে খেতে দিতে ভুলে গিয়েছি। নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় আমার কাছে নেই।

কিংবা হয়ত আমি গোসলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, এন্টার রুমে আন্ডারওয়্যার ছাড়া সব খুলে ফেলেছি, তারপর আমার কাপড়ে লাল লাল বিন্দুর মত চোখে পড়ল। মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। চিন্তা করতে লাগলাম কে

এরকম বিদঘুঁটে ধরনের আন্ডারওয়্যার কিনেছে আমার জন্য। তারপর উপলদ্ধি করলাম বিন্দুগুলো আমার নিজের রক্ত। ঘুমানোর সময় একটা পেরেক আমার পিঠের দুই তিন জায়গায় ফুটো করে দিয়েছে। আমি এমনই গভীর ঘুম ঘুমাই (তাই তো মনে হচ্ছে) যে নড়াচড়ার কারনে আরও কয়েক জায়গায় ফুটো হয়ে গিয়েছে।

এই হল আমার অবস্থা। মাঝে মাঝে আমার স্রেফ চোখে পড়ে যে রক্তপাত হচ্ছে। মাঝে মাঝে এরকম পেরেকে গেঁথে যাই আর খেয়ালও করি না। একবার ড্রেসারের কোনায় কড়ে আঙুলে এত জোরে বাড়ি খেয়েছিলাম যে হাড়ই ভেঙে গিয়েছিল। পুরো দুটো দিন আমার চোখে কোন অসঙ্গতি ধরা পড়েনি।

আমি আমার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত ভীত ছিলাম। ঠিক করলাম প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পারিবারিক ডাক্তার, ডঃ ওমোজি (বয়স পঁচানব্বই বছর) আমাকে পরীক্ষা করে দেখবেন। আমি নিশ্চিত হতে চাই যে কোথাও আহত হইনি।

দুর্ঘটনার পরবর্তী বছরে আমি বেঁচে থাকার সমস্ত উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। স্ত্রীকে হারিয়ে, আকাইম্মা ছেলেপেলের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে, আমার আনন্দ বলতে একমাত্র জিনিস যা ছিল তা হল নিজের কোম্পানিকে বড় থেকে আরো বড় হতে দেখা।

তবে এই উন্নতি আসলে ছিল দুদিকে ধারওয়ালা তলোয়ারের মত। কোম্পানির সম্পদের কারনে আমি ধনী থেকে আরো ধনী হতে লাগলাম। কিন্তু যেহেতু আমার ছেলেদেরকে দায়িত্ব নেয়ার যোগ্য মনে করতে পারছিলাম না তাই কখনো অবসর নেয়ার কথাও কল্পনা করতে পারছিলাম না। হাসি কমে গেল। ব্যথাহীন এক পৃথিবীতে আমি আহত হওয়ার ভয় নিয়ে বসবাস করতে লাগলাম।

আমার জানালা থেকে সকালের নতুন সূর্যের আলোতে পর্বতমালা দেখতে পাচ্ছিলাম। অসাধারণ দৃশ্য। অবশ্য জানালার বাইরে পাখিদের কিচিরমিচির বেশ বিরক্তিকর ছিল। সুগুয়ো আর সমাকে বিছানার পাশের টেবিলে বসল।

“তোমার অনেক রক্তপাত হচ্ছে। ফোয়ারার মত,” সুমাকো বলল। হাত দিয়ে মুখ চেপে রেখেছে। নাগায়ো ফোন শেষ করে টেবিলে ফিরে এল।

“বাবা, এ্যাম্বুলেন্স ডেকেছি। পর্বতমালার গোড়া থেকে এখানে আসতে ওদের আধঘন্টার মত সময় লাগবে। তুমি কি করতে চাও?”

আধঘণ্টা অপেক্ষা করা নিয়ে আমি গজগজ করলাম। তারপর দেহে নিষ্ঠুরভাবে গেঁথে থাকা ছুরিটার দিকে তাকালাম। দেহটাকে একটু ঘুরাতে হচ্ছে ছুরিটার দিকে তাকানোর জন্য। নয়ত চর্বির জন্য দেখা যাচ্ছিল না। কেউ আমাকে ছুরি মেরেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই।

“ওরকম করো না, বাবা! তুমি আরো রক্ত চিপে বের করছ, কাপড় মুচড়ে পানি নিংড়ানোর মত!”

“ওহ, ঠিক বলেছ, তুমি ঠিক বলেছ।” সুগুয়োর দরদ মাখা কণ্ঠ শুনে আমি আমার ক্ষতের দিকে তাকানো বাদ দিলাম। এভাবে যদি রক্তপাত হতে থাকে তাহলে আমি কোনভাবেই ত্রিশ মিনিট টিকব না। এখানে আমাদের মাউন্টেইন লজের একদম কাছাকাছি কোন হাসপাতাল নেই।

“সুমাকো…” নাগায়ো আমার স্ত্রীকে নাম ধরে ডাকে কারন সে ওর চেয়ে বয়সে ছোট। “তুমি হাত দিয়ে মুখ চেপে আছ কেন? অসুস্থ বোধ। করছ?”

সুমাকো মাথা নাড়ল। “না তা নয়। আমি আসলে আমার হাসি চাপার চেষ্টা করছি। আমি অনেক আনন্দিত। অবশেষে আমার এই বুড়ো স্বামী আসলেই মরতে বসেছে।”

আমার কমবয়সি সুন্দরি স্ত্রী আমাকে বিয়ে করেছে শুধু আমার টাকার জন্য।

“কি বলছ এসব?” নাগায়ো আমার দিকে ঘুরল, মুখে তোষামুদে হাসি ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে আমার বড় ছেলে এক নাম্বারের একটা ভণ্ড। “বাবা, তুমি নিশ্চয়ই আশা করছ না তোমার সম্পত্তি আমরা এই নারীর সাথে ভাগাভাগি করব? কোম্পানি আমার উপর ছেড়ে দিয়ে তুমি নিশ্চিন্তে মরতে পার।”

“কি বলে দেখ। তুমি এতটাই ঋণে ডুবে আছ যে ওই টাকায় হাত দেয়ার জন্য তর সইছে না।”

“আমি এই দুজনকে বিশ্বাস করতে পারছি না,” সুগুয়ে, আমার কাপুরুষ সন্তান বলল। নিজের চেয়ার ওদের থেকে আরেকটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল।

“কি বলছ, নিজেদের কথাগুলো শুনেছ? তোমরা সবাই আজেবাজে কথা বলছ আর আমি এদিকে মরতে বসেছি।”

“এসব হচ্ছেই কারন তুমি মরতে বসেছ,” সুমাকো ছোট একটা নিশ্বাস ছেড়ে হালকাভাবে বলল।

হারামজাদি, ওকে উইল থেকে বাদ দিব আমি।

“বাবা, তোমার রেগে যাওয়া উচিত হচ্ছে না। রক্তচাপ বেড়ে গেলে রক্তপাতের অবস্থা আরো খারাপ হবে।” সুগুয়োর কষ্ট আমাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনল। আমি জোরে নিশ্বাস নিয়ে রাগ সংবরণ করার চেষ্টা করলাম। তারপর হঠাৎ খেয়াল হল যে সকাল হওয়ার পর থেকে একজন ব্যক্তিকে আমি এখনো দেখিনি।

“ভাল কথা, ডাঃ ওমোজি কোথায়?” তাকে ছাড়া আমি কোথাও ভ্রমণ করি না, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমরা পাঁচজন একসাথে ছুটি কাটাতে কেবিনে এসেছি।

ডাঃ ওমোজি রীতিমত একজন প্রাগৈতিহাসিক ফসিল। আপনাদেরকে তার বয়সের ধারণা দেয়ার জন্য বলছি, বেশিরভাগ মানুষ তাকে দেখে সাধারণত বলে, “এই বুড়ো কুটের (এক ধরনের হাঁস) এখনো মেডিক্যাল লাইসেন্স আছে? আমি আমার জীবন এরকম কোন বুড়ো ভামের হাতে দিতে চাই না যে কিনা শোগানের (১১৮৫-১৮৬৮ সাল পর্যন্ত জাপানে চলা সামরিক স্বৈরতন্ত্রের নেতৃবৃন্দ) সময় ঘোরাফেরা করেছে। যে কারনে ডাঃ ওমোজির ক্যালেন্ডার সবসময়ই ফাঁকা থাকত। আর আমি আমার সাথে কোন যাত্রায় যেতে বললে তিনি সবসময় দ্রুত উত্তর দিতেন, “আনন্দের সাথেই যাব।” যাওয়ার জন্য তার কোন রিজার্ভেশন ছিল না যে বাদ দিতে হবে (কিচ্ছু না)।

“আমার মনে হয় তিনি এখনো তার রুমে ঘুমাচ্ছেন,” সুগুয়ো মাথা নাড়তে নাড়তে বলল। “আমি গিয়ে তাকে ঘুম থেকে উঠাচ্ছি।”

ডাঃ ওমোজির রুম এক তলাতেই ঠিক আমার পাশের রুমটায়। এইসব চিল্লাচিল্লিতে তারই সবার আগে লাফিয়ে ওঠার কথা। কিন্তু কানে বিশাল সমস্যা থাকায় তিনি সম্ভবত টের পাননি। হয়ত তিনি রাতেই বিছানায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সব কিছুই সম্ভব। তার বেডরুমের দরজাটা লিভিং রুমের দিক থেকে খুলে, যে কারনে আমি পরিস্কার দেখতে পারলাম নাগায়ো দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাক্তারকে ডাকল।

কিছুক্ষণ পর তিনি মাথার পেছনটা চুলকাতে চুলকাতে বেরিয়ে এলেন। উনি আর নাগায়ো এগিয়ে এল আমরা যে টেবিলে বসে ছিলাম সেদিকে। এই পুরোটা সময় আমার শরীর থেকে রক্ত বেয়ে পড়তেই থাকল, কারপেট ভিজে চুপচুপ।

“ডাঃ ওমোজি, আপনার ঘুমে বাধা দেয়ার জন্য দুঃখিত। আপনি একটু দয়া করে দেখবেন? কেউ একজন আমার পিঠে ছুরি মেরেছে মনে হচ্ছে?”

নাগায়ো ডানে বামে মাথা নাড়ল।

“না, বাবা, তুমি ভুল করছ। ডাক্তারসাহেব জেগেই ছিলেন।”

আপাদমস্তক সাদা পোশাক পড়া ডাঃ ওমোজি আমার দিকে এগিয়ে এলেন। কোথাও যাওয়ার সময় তিনি প্রায় সবসময়ই পুরো সাদা পোশাক পড়েন।

“আ…আমি খুবই দুঃখিত। আমি আপনাকে চিল্লাচিল্লি করতে শুনেছি। কিন্তু প্রতিদিন ভোর সোয়া পাঁচটায় একটা ট্রাভেল শো হয় যেটা আমার খুব পছন্দ। আমার কাছে মনে হয়েছে আপনার সমস্যা যাই হয়ে থাকুক না কেন তার চেয়ে এই প্রোগ্রামটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ।”

“বুড়ো হাঁস কোথাকার!” সুমাকো ফেটে পড়ল।

“আচ্ছা যাই হোক, এখন এখানে এসে দেখুন তো আমাকে,” আমি বললাম। ওমোজি কাত হয়ে আমার ক্ষত পরীক্ষা করলেন।

“আহা!” তিনি বললেন। “একটা কিচেন নাইফ গেঁথে আছে আপনার শরীর! এ ব্যাপারে আমার কিছুই করার নেই।”

“ওয়াও! নিজের চোখে একটা শবচ্ছেদ দেখার সুযোগ পাচ্ছি। কখনো ভাবিনি এরকম সুযোগ হবে।” নাগায়ো বলল।

শবচ্ছেদ? কি বলতে চাইছে সে? আমি এখনো মারা যাইনি। “আপনি কি কোনভাবেই কোন সাহায্য করতে পারবেন না ডাক্তারসাহেব?” আমি বললাম, আমার নির্বোধ সন্তানকে উপেক্ষা করার যথাসাধ্য চেষ্টা চালালাম।

“দাঁড়ান, আমাকে একটু চিন্তা করতে দিন। ওরকম একটা ক্ষত নিয়ে আপনি টিভির সকালের খবর পর্যন্তও টিকবেন না। খুব খারাপ অবস্থা।”

টেবিলের অপর পাশে সুমাকোর চোখগুলো যেন বেরিয়ে আসছিল, হাতের তালু দিয়ে মাথা চাপড়াচ্ছিল ও।

“কি হচ্ছেটা কি এখানে? তাহলে আমাদের সাথে একজন ডাক্তার রেখে লাভটা কি হল যদি…।”

এক হাতের আঙুল ওর দিকে তাক করে অন্য হাত দিয়ে ডাঃ ওমোজির হাত আঁকড়ে ধরলাম।

“আমার স্ত্রী আতংকিত। এ থেকে বেঁচে যাই এরকম উপায়ই কি নেই?”

ডাক্তারের ভাঁজপড়া মুখ থেকে একটা হাসি বেরিয়ে এল।

“চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এরকম কোন কিছু কোন একদিন হতে পারে তা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। যে কারনে আমরা কোন টিপে গেলে আমি সবসময় সাথে করে ট্রান্সফিউসনের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত বহন করি।”

এই কথাগুলো শুনে আমি হাঁটু ভেঙে বসে পড়লাম। মাঝে মাঝেই সে আমার বাহুতে সুই ঢুকিয়ে কিছু রক্ত বের করে নিত। এত ঘন ঘন করত যে আমার সন্দেহ পর্যন্ত হয়েছিল বুড়ো আমার রক্ত নিয়ে কোথাও বিক্রি করে কিনা। এখন বুঝতে পারলাম সে আসলে এরকম কোন পরিস্থিতির জন্য রক্ত সংরক্ষণ করছিল। ওর মাথার উপর স্বর্গদূতদের মত পবিত্র আলোর রিং দেখতে পাচ্ছিলাম বলে মনে হল।

আমরা যদি এখন ট্রান্সফিউশন শুরু করি তাহলে আপনি এ্যাম্বুলেন্স আসা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবেন। কেউ একজন এ্যাম্বুলেন্স ডেকেছে বলে ধরে নিয়েছি আমি।”

আমরা তাকে ব্যাখ্যা করলাম যে লজ পর্যন্ত এ্যাম্বুলেন্স আসতে আধা ঘন্টার মত লাগবে।

“তাহলে তো একদম ক্লোজ কল। যাই হোক, আপনার রক্তের একটা বড় সাপ্লাই আমার রুমে রাখা আছে। আমি গিয়ে সেটা নিয়ে আসছি।”

ডাঃ ওমোজি তার রুমের দিকে ছুটলেন।

“যাক, বেঁচে থাকার প্রতি তোমার যথেষ্ট আগ্রহ দেখে আমি আনন্দিত, বাবা।”

“হ্যাঁ, আমিও তাই বলব। সবচেয়ে আনন্দজনক হবে যদি তুমি বেঁচে থাকো আর আমাদের সাথে নিয়ে লম্বা একটা জীবন পার কর।”

নাগায়ো আর সুমাকোর এইসব ভাবা কথা আমার কাছে খুবই ক্লান্তিকর লাগল। কেউ একজন জিব্বা দিয়ে ইস! ধরনের শব্দ করল।

“বাবা, তুমি যদি মারা যাও, আমাকে তাহলে এই দুজনের সাথে থাকতে হবে? তাহলে অনেক ভয়ের ব্যাপার,” সুগুয়ো বলল, কেঁদে ফেলবে মনে হচ্ছিল। ও আমার কাঁধে হাত রেখে নিজের কথার উপর জোর বাড়াতে চাইল।

হাত সরাও, আমি নিজে নিজে ভাবলাম, তুমি শুধু রক্তপাতটাকেই বাজে অবস্থায় নেবে। ওর হাত সরে গেল (অবশেষে) যখন ডাঃ ওমোজি ফিরে এলেন। তার হাসি এক কান থেকে আরেক কানে গিয়ে ঠেকেছে।

“প্লিজ, ডাক্তারসাহেব, আমাকে রক্ত দিন। আমার মনে হচ্ছে জ্ঞান হারিয়ে ফেলব।”

“আমার মনে হয় সেটা সম্ভব হচ্ছে না।”

মানে?

“আমি দুঃখিত, কিন্তু মনে হচ্ছে আমি আপনার রক্ত রাখা ব্যাগটা কোথাও ফেলে এসেছি।”

পঁচানব্বই বছর বয়সি এক বুড়োকে লজ্জায় লাল হতে দেখাটা অবশ্যই একটা দুর্লভ দৃশ্য।

কোথাও ফেলে এসেছে মানে?

“আমি বুঝতে পারছি না কিভাবে এমনটা হল, কিন্তু জিনিসটা আমার রুমে নেই।’

নাগায়ো আর সুমাকোকে আনন্দিত দেখাল।

“আমরা যখন বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম তখন তো ব্যাগটা আপনার সাথে ছিল, নাকি? কোন জায়গায় আপনি ফেলে গিয়ে থাকতে পারেন?”

“কোন ধারণা নেই,” ডাঃ ওমোজি মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন। “আমার এমনকি স্পষ্ট মনে নেই, আমরা যখন এখানে এসেছি তখন সেটা আমার কাছে ছিল কিনা। আমি হয়ত সেটা আগের ট্রেনেই ফেলে এসেছি। হতে পারে অন্য কারো লাগেজের সাথে উল্টোপাল্টা হয়ে গিয়েছে।”

আমি আমার স্ত্রী আর ছেলেকে নির্দেশ দিলাম গিয়ে ওদের ব্যাগ পরীক্ষা করে দেখতে।

“সুমাকো আর নাগায়ো যদি তোমার রক্তসহ ব্যাগ খুঁজেও পায় তাহলেও হয়ত ওরা সেটা লুকিয়ে ফেলবে,” সুগুয়ো বলল। ঠিকই বলেছে অবশ্য।

“ঠিক আছে তাহলে একটা কাজ করা যাক: যেই ব্যক্তি আমার রক্তওয়ালা ব্যাগ খুঁজে পাবে, তাকে আমি আমার সব সম্পদ দিয়ে দেব-কোম্পানি, সম্পত্তি, সব। তোমরা যদি টাকাই চাও, তাহলে যাও, গিয়ে রক্ত খোঁজো!”

নাগায়ো আর সুমাকো আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, বিস্মিত।

“কোন চিন্তা কোরনা প্রিয়! আমি এখনই খুঁজে বের করছি!”

“আমিও!”

ওরা দুজন উঠে রুম থেকে বেরিয়ে দোতালায় ওদের রুমের দিকে ছুটে গেল। সগুয়োও একই কাজ করল। ডাঃ ওমোজি তার সাদা কোটের হাতা গুঁটিয়ে নিলেন, মনে হচ্ছিল তিনিও তাদের সাথে যোগ দেবেন।

“আপনি না, ডাঃ ওমোজি, আপনি রক্ত খুঁজে পেলে আমি আপনাকে আমার কিছুই দিচ্ছি না।”

“আমিও তাই ভেবেছি।”

“এই বাড়ির অন্য কারো শরীর থেকে কি আমি রক্ত গ্রহণ করতে পারব?।”

“আপনি তো ‘টাইপ ও তাই না? বাকি সবাই এ, বি কিংবা এবি। দুঃখিত সেটা সম্ভব নয়।”

উপরের তলা থেকে ভেসে আসা শব্দে বুঝতে পারছিলাম তিনজন মানুষ তাদের লাগেজ তছনছ করছে। পুরোটা সময় আমার শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে যেতেই থাকল।

“আপনি কি অন্তত কিছু একটা করতে পারেন না যাতে অন্তত রক্তপাতটা বন্ধ হয়?”

তিনি মাথা ঝাঁকালেন। “আমার সাথে আমার প্রিয় স্কালপেল আর সেলাই দেয়ার সুতো আছে। আমি একটা ছোট অপারেশন করতে পারি। সৌভাগ্যজনকভাবে আমাদের অ্যানাস্থাসিয়ার প্রয়োজন নেই।”

“আপনার কাছে হাত জোর করছি। আমাকে আরো খানিকটা সময় বাঁচতে হবে। এই তিনজনের উপর কে নির্ভর করতে পারবে বলুন? বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে আমি এই কোম্পানি দাঁড় করিয়েছি। আপনার কি ধারণা আমি সেটা ধ্বংস করার জন্য ওদের হাতে তুলে দিতে পারব?”

“চিন্তা করবেন না। আপনি এখনই মরছেন না।”

ডাক্তারসাহেব তার পকেট থেকে একটা মরচে ধরা স্কালপেল বের করলেন।

“এক মিনিট দাঁড়ান। এই স্কালপেল দিয়ে অপারেশন চালাবেন? এটাতে তো মরিচা লেগে আছে!”

“খানিকটা মরিচা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন কেন? এখন তো জীবন-মরণের প্রশ্ন। প্রত্যেকটা সেকেন্ড এখন মূল্যবান!” তার স্কালপেল ধরা হাতটা পাতার মত কাঁপছিল।

“ডাক্তারসাহেব, শেষ কবে আপনি কারো অপারেশন করেছেন?”

“ওহ, সম্ভবত আপনার জন্মের আগে।”

এক ঝটকায় (বিস্ময়করভাবে) আমি ডাক্তারের হাত থেকে স্কালপেলটা ফেলে দিলাম।

“শুনুন ডাক্তারসাহেব, আমার মনে হচ্ছে আপনার জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভাল হয় যদি মনে করতে পারেন রক্তের ব্যাগটা কোথায় রেখেছেন। ওইটা ছাড়া আমি একদম শেষ।”

আগেরদিন বাসা ছেড়ে বের হওয়ার পর কি কি ঘটেছে তার খুঁটিনাটি মনে করার চেষ্টা করলাম আমি।

***

দুটো ট্যাক্সিতে করে সকাল দশটায় বাসা ছেড়েছিলাম। বাকি সবার মধ্যে একমাত্র আমারই ডাইভিং লাইসেন্স আছে, কিন্তু দুর্ঘটনাটার পর থেকে স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে আর বসা হয়নি।

“আপনি কি নিশ্চিত যে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় রক্তের ব্যাগটা আপনার কাছে ছিল?”

“কোন সন্দেহ নেই, আমার কোলের উপরই ছিল।”

দুটো ট্যাক্সিই স্টেশনে পৌঁছলে আমরা ট্রেনে চড়েছিলাম। আমার মনে পড়ল ট্রেনের দোলায় ডাঃ ওমোজিকে কেমন দেখাচ্ছিল। দুই হাত দিয়ে নিজের লাঞ্চ বক্স চেপে ধরে রেখেছিলেন।

“ট্রেনের ভেতর আপনি দুই হাত দিয়ে আপনার লাঞ্চ বক্স ধরে রেখেছিলেন।”

“ঠিক বলেছেন, একদম ঠিক। আমারও সেটা স্পষ্ট মনে আচ্ছে। লাঞ্চটা ভাল ছিল।”

“কিন্তু রক্তের ব্যাগটা কোথায় ছিল তখন?”

“ধুর! আমি কি বোকা! আমি নিশ্চয়ই সেটা ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে ফেলে এসেছিলাম।”

ভুলো মনের বুড়ো ভাম কোথাকার! আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার পেছনে একটা কণ্ঠ বলে উঠল।

“সেটা হয়নি। আমরা ডাক্তারসাহেবের লাগেজ প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে তুলেছিলাম। আমি নিজে রক্তের কালো ব্যাগটা টেনে তুলেছিলাম।”

কণ্ঠটা সুগুয়োর। এর মধ্যে কোন এক সময় নিশ্চয়ই সে নিচতলায় ফিরে এসেছে।

“তাহলে সুগুয়ো, ব্যাগটা কি তুমি তোমার রুমে নিয়ে গিয়েছিলে?”

“না আমার রুমে সেটা নেই,” সে মাথা নাড়ল। আমি অনুভব করলাম আমার কাঁধগুলো অসন্তুষ্টির ভারে দেবে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল শরীরের তাপমাত্রা পড়ে যাচ্ছে, হাত-পায়ের আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।

“বাবা তোমাকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।”

“অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে পরিমাণ রক্ত হারিয়েছি। সুগুয়ো, আমি ধূমপান করতে চাই। একটা সিগারেট দাও।”

“সিগারেট তোমার জন্য ক্ষতিকর, জানো না?”

“এখন কি এইসব কথাবার্তা বলার আর সময় আছে?”

ট্রেন থেকে নামার পর আমরা আবার ট্যাক্সি নিয়েছিলাম। তারপর চল্লিশ মিনিটের মত ডাইভের পর এই মাউন্টেইন লজে এসে পৌঁছাই। তবে আমরা প্রথমে স্টেশনের কাছে একটা মুদির দোকানে গিয়েছিলাম। এটা আমাদের সাধারণ রুটিন। গাট্টিবোঁচকা নিয়ে কেনাকাটা করতে যাওয়া বেশ ঝামেলাদায়ক। তাই সুগুয়ো আর ডাঃ ওমোজি আমাদের সবার ব্যাগ নিয়ে কেবিনে চলে গিয়েছিল।

আর নাগায়ো, সুমাকো, আমি গাট্টি বোঁচকাহীন অবস্থায় বাজার করতে গেলাম। বেকারির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সুমাকো বলল, সে মিষ্টি কিছু কিনতে চায়।

“কিছু কেক কিনে নেয়া যাক নাকি? আর আমাদের একটা ছুরিও কিনতে হবে। আমার স্পষ্ট মনে আছে কেবিনে একটাও ছুরি নেই।”

আমার মনে আছে ওর বাম হাতে একটা কালো ব্যাগ ঝুলছিল। আমি নিশ্চিত, ওটা ডাঃ ওমোজির রক্তের ব্যাগটাই ছিল।

“আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি? প্রথম ট্যাক্সি যেটা কেবিনে ব্যাগট্যাগ নিয়ে গিয়েছিল, সেটায় কি রক্তের ব্যাগটা ছিল?”

“আমার তা মনে হয় না,” সুগুয়ো বলল, কিন্তু ওকে দেখে তেমন একটা আত্মবিশ্বাসী মনে হল না।

“যখন সুগুয়ো আর ডাঃ ওমোজি গাড়িতে উঠলেন তখন রাস্তার উপর একটা কালো ব্যাগ পড়েছিল,” সুমাকো আমার পেছন থেকে বলল। আমি ঘুরে তাকালাম। ও দুইতলা থেকে নেমে এসেছে, এখন চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। “ওটা যে ডাঃ ওমোজির ব্যাগ তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম, সেকারনে আমাদের কেনাকাটার সময় সেটা আমি বহন করেছিলাম।”

আমি হাতের মুঠি পাকিয়ে ডাক্তারের দিকে তাকালাম।

“এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস আপনি কি করে রাস্তায় ফেলে গেলেন?”

“আমাকে কেন মুঠি তুলে শাসাচ্ছেন? মারবেন নাকি? আমি সেফ একজন বুড়ো মানুষ যার খুব একটা ভবিষ্যৎ বাকি নেই আর!”

আমার নিজেরও কোন ভবিষ্যৎ বাকি নেই!

“ঠিক আছে, ডিয়ার, শান্ত হও। বুড়ো হাঁসটা এমনিতেই সবকিছু আধা মনে রাখতে পারে, তাই সে যদি উলটাপালটা কিছু করে ফেলে তাহলে মাফ করে দেয়াই ভাল।”

তোমার কি কোন রক্ত নেই? কোন অ নেই? “তারমানে তোমার কাছে রক্তের ব্যাগটা ছিল। ব্যাগটা কি রুমে ছিল?”

সে ওর মাথা নাড়ল। “আমি নিশ্চিত যে আমরা যখন এখানে এলাম তখন পর্যন্ত সেটা আমার সাথেই ছিল, আমি নিশ্চয়ই সেটা কোথাও নামিয়ে রেখেছিলাম…।”

কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। আমার দৃষ্টিশক্তি ঘোলাটে হতে শুরু করল, ঘুম পাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম এগুলো খারাপ লক্ষণ। বালিঘড়ির মত নিয়মিতভাবে আমার ক্ষত থেকে রক্ত বেয়ে পড়তে থাকল। প্রতি সেকেন্ডে আমার আয়ুও কমতে থাকল।

“কিন্তু তুমি নিশ্চিত তো ব্যাগটা এই কেবিনেই আছে?”

“হ্যাঁ, যেমনটা সুগুয়ো বলল।”

“কিন্তু কেবিনের কোথায় থাকতে পারে সেটা?”

সবাই চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। নাগায়ো (ভণ্ডটা) লিভিং রুমের মুখ থেকে বলে উঠল।

“গত রাতে আমি ব্যাগটা দেখেছিলাম।”

কথাটা সবার মনোযোগ আকর্ষণ করল।

“কি? আসলেই?”

“হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত যে ব্যাগটা দেখেছি। এই দরজার কাছেই সেটা পড়ে ছিল।”

“তারমানে, নাগায়ো, তুমি রক্ত খুঁজে পেয়েছ?”

“না, পাইনি। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে গত রাতে, যখন আমি প্লাটিপ্লাসের অঙ্গভঙ্গি করছিলাম তখন সেটা এখানে একদিকে কাত হয়ে পড়েছিল।”

গত রাতের ডিনারের কথা মনে পড়ল। সুমাকোর রান্না করা খাবার খেয়েছিলাম আমরা সবাই। তারপর আমার স্ত্রী আর দুই ছেলে কিছু অভিনয় করে দেখিয়েছিল। নাগায়োর প্লাটিপ্লাসের অঙ্গভঙ্গি অভিনয় করে দেখানোটা ছিল সবচেয়ে (এখন পর্যন্ত) খারাপ।

সুগুয়ো বলল, “নাগায়ো, বাবা তোমাকে গতরাতে একদম গাধা বানিয়ে ছেড়েছিল।”

সুমাকো সাথে যোগ করল : “সবচেয়ে বেকুবি ব্যাপার হল, একটা প্লটিপ্লাস নিজে কখনো বলতে পারে না, সে একটা স্তন্যপায়ী নাকি একটা হাঁস, আর তুমি আমার সৎ ছেলে হলেও কিছু আসে যায় না, তুমি আসলেই একটা রাম গাধা।”

“এহ, বকবকানি বন্ধ কর। প্লাটিপ্লাসের মধ্যে কোন ভুল নেই। আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। প্লাটিপাস অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় স্তন্যপায়ী প্রাণী। ওদের পাগুলো ছোট আর পায়ে হিল আছে! আসলে গতরাতে, সুমাকো তুমি নিজেই সবকিছু গুব্রট পাকিয়েছিল তোমার ফালতু ‘আপেল ডামপ্লিং গ্যাং’ গান নিয়ে। ঐটার জন্যই বাবা ক্ষেপে গিয়েছিল। তা না হলে তিনি আমার পরিবেশনা ঠিকই পছন্দ করতেন। তুমি জানো না তিনি ডামপ্লিং দুচোখে দেখতে পারেন না?”

“আমার কোন ধারনাই ছিল না। আমি কিভাবে জানব যে ওর প্রথম স্ত্রী। দশ বছর আগে ডামপ্লিং গলায় আটকে মারা গিয়েছিল? আমি তো এতদিন ভেবেছি সে ওই ট্রাফিক এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল।”

আমি চোখ বন্ধ করে গত রাতের সবকিছু মনে করার চেষ্টা করলাম। ঘুরন্ত লণ্ঠনের মত, দৃশ্যগুলো আমার চোখের পর্দার উপর প্রতিফলিত হল।

****

গত রাতে, খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়ার পর আমরা এই তিনজনের পরিবেশনা দেখেছিলাম-সুমাকো, নাগায়ো, সুগুয়ো-এই ক্রম অনুসারে। আমার মেজাজ খারাপ চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছেছিল নাগায়োর পরিবেশনা শেষ হওয়ার পর। কিন্তু তারপর সুগুয়ো কার্ডের কিছু খেলা দেখাল যেগুলো খারাপ ছিল না। হতে পারে ও একটা কাপুরুষ, আকাইম্মা, বখে যাওয়া একটা ছেলে, কিন্তু জাদু পরিবেশনায় ওর খানিকটা দক্ষতা আছে। ওর রুমের বুকশেলফ রহস্যোপন্যাস দিয়ে ভর্তি।

আমার মনে পড়ল ও যখন ছোট ছিল তখন একবার ওকে তারার দিকে হ্যাঁ করে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় ধরে ফেলেছিলাম।

“কি ভাবছিলে?” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম ওকে।

“আমি একটা জাদুর কথা ভাবছি যা দিয়ে মানুষ মারা যাবে, সে চোখ টিপে বলেছিল। আমি হাসিতে ফেটে পড়েছিলাম।

“তুমি যে কাপুরুষ, এরকম একটা জাদুর কথা তুমি কেন ভাববে? আর যদি এরকম কিছু একটা বের করেও ফেলতে পার, এরপর কি করবে? এই নিয়ে গল্প লিখবে? নাকি কাউকে খুন করতে ব্যবহার করবে? তুমি যে কাপুরুষ তাতে এর কোনটাই করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি যাবে কলেজে আর ভাল গ্রেড অর্জন করবে তারপর তোমার দিন কাটবে কুকুর হাঁটাতে নিয়ে বেরিয়ে।”

ও স্রেফ শুনে গেল, হাসল আর মাথা চুলকাতে থাকল। আমি ওকে যত আজেবাজে কথাই বলি না কেন ও খালি হাসবে, বেচারা।

গত রাতে ও যখন কার্ডের জাদু দেখানো শেষ করল তখন আমি খেয়াল করলাম ঘড়িতে ইতিমধ্যে দশটা বেজে গিয়েছে। ডাঃ ওমোজি বলা শুরু করলেন যে তিনি হিকারু উদার একটা গান গাইতে চান, কিন্তু কোন সুযোগ দিলাম না তাকে। অন্যদের চেয়ে আগেই আমি ঘুমুতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ছুটিতে ঘুরতে গেলেও আমি আমার নিয়মমত চলার চেষ্টা করি, রাত দশটায় শুয়ে পড়ি আর ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠি।

ঘুমুতে যাওয়ার আগে ডাঃ ওমোজি আমার রুমে এলেন কোথাও কেটে টেটে গিয়েছে কিনা পরীক্ষা করে দেখার জন্য। আমি শুয়ে পড়ে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জানালার ফেমটা ছোট আর একদম চারকোনা, দরজার উল্টোপাশের দেয়ালে লাগানো। বিছানার ঠিক পাশেই। যে কারনে জানালা দিয়ে বাইরের তারাভরা আকাশ দেখা যায়। খালি জানালাটা বাজেভাবে লাগানোর কারনে কয়েক সেন্টিমিটারের বেশি খোলা যায় না। রুমের ভেন্টিলেসনের অবস্থা তাই (খুবই) খারাপ। কেউ আমার সাথে রুম বদলাতে রাজি না হওয়ায় প্রতিবার কেবিনে এলে এই রুমটাতেই আমাকে ঘুমাতে হয়।

রুমের দরজা খোলা ছিল। লিভিং রুমে বসে আমার স্ত্রী আর দুই পুত্রর হাহাহিহি পরিস্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। ওরা (মনে হল) কেক খাওয়ার মুডে ছিল।

যেহেতু আমার ত্বক কোনো স্পর্শ অনুভব করতে পারে না তাই ডাক্তার তার হাত দিয়ে কি করছিলেন তা বলা মুশকিল। আমার চিন্তা হচ্ছিল যে তিনি আসলে আমাকে পরীক্ষা না করে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কিনা। বিছানার নিচ থেকে আসা থপথপ শব্দ শুনে নিশ্চিত হলাম তিনি এখনো ঘুমিয়ে পড়েননি। কিন্তু যখন আমি ঘুরে তাকালাম তখন দেখি তিনি শুধু বিছানার পাশের চেয়ারে বসে আছেন। বোঝাই যাচ্ছে ঝিমাচ্ছেন।

খোলা দরজাটা দিয়ে আমি লিভিং রুমের টেবিল দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি দেখলাম সুমাকো কিচেন নাইফ দিয়ে কেক কাটছে।

“ডাক্তারসাহেব! ওরা সবাই ওই রুমে কেক খেয়ে শেষ করে ফেলছে,” আমি বিড়বিড় করে বললাম। তিনি চেয়ার থেকে উঠে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, চিৎকার করে বলতে বলতে, “উপরের চকলেট বারটা কিন্তু আমার।”

আমি বিরক্তির সাথে মাথা নেড়ে বিছানা ছেড়ে উঠলাম আর দরজার দিকে এগুলাম। ওদের চারজনকে কেক ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে চাইছিলাম।

একটু পর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ছিটকিনি লাগালাম, আর রুমের ভেতর একা হয়ে পড়লাম। বাতি নিভিয়ে হাই তুলে ঘুমিয়ে পড়লাম।

***

“তুমি যখন রুমে ফিরে গেলে আমরা তখন কেক খাচ্ছিলাম। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে রক্ত ভর্তি ব্যাগটা তখন লিভিং রুমে আর ছিল না।”

নাগায়োর কণ্ঠ শুনে আমি চোখ খুললাম আর বর্তমান আলোচনায় ফিরে এলাম। টেবিলে চারজন বসে আছে, আর আগের মতই আমার শরীর থেকে রক্ত (এখনো) বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি তখনো দেখতে পাচ্ছিলাম ছুরিটা শরীরে বিঁধে আছে। এক সময় মনে হল, প্লাটিপ্লাসের অনুকরণ নিয়ে আলোচনা শেষ হলে রুমের ভেতর নীরবতা নেমে এল।

“নাগায়ো, যদি তোমাকে আমার বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে রাত দশটায় আমি যখন রুমে ঢুকেছিলাম তার আগেই ব্যাগটা ঢোকার মুখ থেকে। নাই হয়ে গিয়েছিল।”

সুমাকো কথা বলে উঠল। ওর মুখে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি। “সম্ভবত এগারোটা কিংবা তারও পরে, আমরা সবাই আমাদের যার যার রুমে ফিরে গিয়েছিলাম…এই কথায় আরেকটা কথা মনে পড়ল, এই কেবিনে শুধু একটাই ছুরি আছে।”

মানে কি? “আহ হা! আমি বুঝতে পেরেছি?” সুগুয়ে বলল, সুমোকোর কথার মূল বক্তব্য ধরতে পেরে। তার মানে বাবার শরীরের ছুরিটা অবশ্যই….”

“হ্যাঁ, ভাল করে দেখ, ব্লেডের শেষ মাথায়, হাতলের কাছে, একটু খানি হুইপড ক্রিম লেগে আছে।”

সেই মুহূর্তে, ডাঃ ওমোজি রক্তাক্ত ছুরিটা টেবিলের উপর রাখলেন। দেখে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল এই একই ছুরি দিয়ে কেকটা কাটা হয়েছিল।

“অ্যাঁই, এক মিনিট দাঁড়াও! ছুরি! কেউ একজন সেটা আমার শরীর থেকে টেনে বের করেছে!”

আমি হাত দিয়ে স্পর্শ করে টের পেলাম ছুরিটা আর আমার শরীরে গেঁথে নেই।

“হেঃ হেঃ হেঃ এবার কে বোকা হল? আমি আপনার শরীর থেকে ছুরিটা টেনে বের করে ফেলছি আর আপনি একদমই টের পাননি!”

“আপনি! আপনি কি আসলেই কোন ডাক্তার?”

নাগায়ো ওর হাত দুটো ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ানো কোন সেলসম্যানের মত, যারা কিনা সরল গৃহিণীদের পটানোর ধান্দায় থাকে।

“হ্যাঁ, বাবা রুমে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা কেক কাটিনি।”

আমি মাথা ঝাঁকালাম। দরজা বন্ধ করার আগ মুহূর্তে আমি যা দেখেছিলাম তা ছিল সুমাকো ছুরি দিয়ে এক পিস কেক কেটে প্লেটের উপর রাখছে।

“এরপরই তুমি দরজা লাগিয়ে দিলে,” নাগায়ো বলল। “তাহলে এই হুইপড ক্রিম মাখানো ছুরিটা তোমার রুমের ভেতর গেল কি করে। আমি নিশ্চিত তুমিও এই প্রশ্নর উত্তর জানতে চাও, এমনকি সেটা অন্য দুনিয়াতে যাওয়ার পর হলেও…”

আমি এখনো মারা যাইনি..

রক্তশুন্যতার কারনে আমার মাথা ঘোরাচ্ছিল। আমি আমার স্ত্রী আর দুই পুত্রকে আবারও ঝাড়লাম রক্তের ব্যাগটা কোন কিছুর নিচে আড়াল হয়ে পড়ে আছে কিনা ভাল করে দেখতে। আমার জিহ্বা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, শব্দগুলো উচ্চারণের সময় ঠিকমত বের হচ্ছিল না।

নাগায়ো, সুগুয়ো আর সুমাকো প্রত্যেকটা জিনিস সরিয়ে সরিয়ে ভাল করে খুঁজে দেখছিল। আমি বিশ্বাস করতে আরম্ভ করছিলাম যে আমি (বিশেষ করে) অনিচ্ছা সত্ত্বেও মরতে যাচ্ছি। এই মানুষগুলো সবাই অকাট নির্বোধ। আমি শান্তিতে মরতে পারতাম যদি শুধু জানতাম যে আমার উত্তরাধিকারদের মধ্যে কেউ একজন আমার কোম্পানির বারোটা বাজাবে না।

ডাঃ ওমোজির সাহায্য নিয়ে আমি লিভিং রুমের সোফা পর্যন্ত গেলাম। সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। নিজে নিজে হাঁটাচলা করার ক্ষমতা আর ছিল না। পাগুলো থরথর করে কাঁপছিল।

“আহ! তাই তো!” সুমাকো বলে উঠল, ও কিচেনের ভেতর ব্যাগটা খুঁজতে গিয়েছিল। আমার সোফার দিকে এগিয়ে এল। ওর গলা শুনে নাগায়ো আর সগায়েও লিভিং রুমে এসে হাজির হল। “আমি যখন কেক বেড়ে দিচ্ছিলাম, তখন লিভিং রুমের দরজার কাছে কিছু একটায় পা পড়েছিল বলে মনে পড়ল। কি বোকা আমি, সেটা কি রক্তের ব্যাগটা ছিল?”

“কি বলতে চাও? ওটা নিয়ে পরে কি করেছিলে?” শরীর থেকে শক্তিও বেরিয়ে যাচ্ছিল, আমার কণ্ঠও নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল।

“ওটা আমার মেজাজ খারাপ করে দিয়েছিল। তাই কষিয়ে একটা লাথি দিয়েছিলাম।”

“আমার রক্ত..!”

“কিন্তু ব্যাগটা, ওটা তাহলে কোথায় এখন?”

সুগুয়ো মাথা বাঁকাল। ওটা যদি ওর রুম কিংবা সুমাকোর, নাগায়োর, ডাঃ ওমোজির রুমে না থাকে তাহলে কোথায় থাকতে পারে?

আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি মরতে যাচ্ছি। ঐ পর্যায়ে, আমার জঘন্য স্ত্রী আর পুত্রদের প্রতি এক রকমের মমতা বোধ জেগে উঠছিল। আমি তাদেরকে শেষবারের মত একবার ভাল করে তাকিয়ে (মমতা পূর্ণ?) দেখলাম।

তখনই মুডটা নষ্ট করে আধমরা ডাক্তারটা চেয়ার টেনে একদম আমার সামনে এসে বসলেন। খবরের কাগজ থেকে খেলার পাতাটা বেছে নিয়ে জোরে জোরে পড়তে লাগলেন। গতকালকের সুমো ম্যাচের একটা বড় ছবি আমার পুরো দৃষ্টি জুড়ে ভেসে উঠল। এরকম কোন দৃশ্য আমার শেষ মুহূর্তে অবশ্যই দেখতে চাইনিঃ এক দল সুমো রেসলার একজন আরেকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কিন্তু আমি অন্য কিছু লক্ষ্য করলাম।

“ডাঃ ওমোজি! আপনি আপনার পা দিয়ে ঠকঠক করছেন না!”

খবরের কাগজের তলা দিয়ে মেঝের উপর তার পা দেখতে পাচ্ছিলাম। তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমার মাথায় কোন সমস্যা আছে। “গত কয়েক বছর ধরে আমি আমার অনবরত পা ঠক ঠক করার অভ্যাসের সুইচ বন্ধ করে রেখেছি,” বলে তিনি খবরের কাগজের পাতা উল্টালেন।

আমি একটা সম্ভাবনা নিয়ে ভাবলাম, আর আমার মাথার উপর একটা ছোট বাল্ব জ্বলে উঠল। “সুগুয়ো, আমার রুমে গিয়ে খুঁজে দেখ তো!”

আমার কণ্ঠস্বর ভীষণ দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। সুগুয়ো আমার আর ডাঃ ওমোজির মাঝখান দিয়ে রুমের দিকে তাকাল।

“অ্যাঁ? অসম্ভব! আমি এটা কল্পনাও করতে চাই না। ব্যাপারটা খুবই ভীতিকর। পুরো রুমটা রক্তে থৈ থৈ করছে!”

“ঠিক আছে তাহলে, নাগায়োয় আমার ঘরে গিয়ে ভাল করে খুঁজে দেখ, বিশেষ করে বিছানার তলে!”

আমার বড় পুত্র আমার কথা শুনল আর আমার রুমে গেল। সোফার যেখানে আমি শুয়ে ছিলাম সেখান থেকে খোলা দরজা দিয়ে ওর পিঠ দেখা যাচ্ছিল। বিছানার নিচে খোঁজাখুঁজি করছে। অবশেষে ও বলল, “পেয়েছি!” যখন লিভিং রুমে ফিরে এল তখন ওর হাতে কালো ব্যাগটা দেখা গেল।

একদম সময় মত…।

আমার মনে হল বুকের উপর থেকে বিশাল একটা বোঝা নেমে গেল। ততক্ষণে আমি প্রায় অর্ধেক অচেতন, কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস ছিল যে আরো কিছুক্ষণ টিকে থাকতে পারব।

“কিন্তু ব্যাগটা ওখানে গেল কি করে?” সুমাকো মাথা কাত করে প্রশ্ন করল।

“ডাঃ ওমোজি যখন আমাকে পরীক্ষা করছিলেন তখন তুমি ব্যাগটায় লাথি মেরেছিলে। এখান থেকে দরজার ঠিক পাশেই বিছানাটা হওয়ায় সেটা সোজা বিছানার নিচে চলে যায়।”

ডাঃ ওমোজি যখন আমাকে পরীক্ষা করে দেখছিলেন তখন একটা শব্দ (আসলেই) আমার কানে এসেছিল। আমি ভেবেছিলাম সেটা ডাঃ ওমোজির পা দিয়ে ঠকঠক করার শব্দ। আসলে সেটা ছিল ব্যাগটা পিছলে বিছানার নিচে ঢুকে যাওয়ার শব্দ।

নাগায়ো আর সুমাকো ব্যাগটার দিকে তাকাল। ওদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল বড়ই অসন্তুষ্ট। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম ডাঃ ওমোজি কখন আমার বাহুতে আইভি নিডল পুশ করবেন।

“ডাক্তারসাহেব, দয়া করে তাড়াতাড়ি করুন। আমি আমার সীমায় প্রায় পৌঁছে গিয়েছি।”

“সম্ভব হচ্ছে না,” তিনি বললেন। মুখে আফসোসের ছায়া। ব্যাগটা খুলে ভেতরে দেখালেন। “ব্যাগের ভেতরে কিছু নেই।”

“বুড়ো ভাম কোথাকার, আপনি ব্যাগে রক্ত ভরতে ভুলে গিয়েছিলেন, শেষ চেতনাটুকু আঁকড়ে ধরে আমি বললাম। আমার এক পা ততক্ষণে (নিশ্চিতভাবে) অন্য জগতে। কিন্তু আমার কণ্ঠ শুনে মনে হল কোন ঘোট মেয়ে নাকি কান্না কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ছে। আমি বুঝতে পারছিলাম মৃত্যুর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, একদম হতভম্ব। আমার জীবন তার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে।

পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে, বিন্দুমাত্র শক্তি নেই। বাঁচার আর কোন পথ খোলা নেই মনে হচ্ছে। একমাত্র পথ ছিল চোখ দুটো বন্ধ করে ঘুমের গভীর সাগরে ডুব দেয়া, যেখান থেকে আর কখনো মাথা তোলা হবে না।

আমার দৃষ্টি যখন ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছিল, তখন দেখতে পাচ্ছিলাম ডাঃ ওমোজি তার হাত বাম থেকে ডানে নাড়াচ্ছেন। তিনি নিশ্চয়ই আমার একদম সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু মনে হচ্ছিল অনেক দূরে দাঁড়ানো।

“না তা সত্যি নয়, একদম সত্যি নয়। আমি ওগুলো ব্যাগে ভরেছিলাম। সত্যি সত্যি ভরেছিলাম। হতে পারে কেউ সেগুলো সরিয়ে ফেলেছে। যাতে আমি আপনাকে রক্ত ট্রান্সফিউজ করতে না পারি। যাতে আপনার মৃত্যু নিশ্চিত করা যায়। আমি সত্যি সত্যি ব্যাগে রক্ত ভরেছিলাম। সত্যি বলছি। আমি এত বুড়ো হইনি। হতে পারে আমাকে এখন এডাল্ট ডায়াপার পড়তে হয়, কিন্তু তাই বলে এত ভুলো মন হইনি। ও টাইপের রক্ত। আইভি টিউবিং। সব আমি ব্যাগে ভরেছিলাম।”

“অ্যাঁ? কি বললেন, আপনি ডায়াপার পড়েন?” সুগুয়ো হাঁ হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“আরে সেটা মজা করার জন্য বললাম। সেফ একটা কৌতুক।” ডাঃ ওমোজ মুখ টিপে হাসলেন।

এটা হাসার কোন সময় হল? এক মুহূর্তের জন্য আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু টিউবিং শব্দটা আমাকে আবার চিন্তায় ফেলে দিল। আমার মাথার ভেতরে সবকিছু সাদা রূপ ধারন করতে শুরু করে দিয়েছিল, কিন্তু তার মধ্যেও সেই ছোট বাল্বটা আরেকবারের জন্য জ্বলে উঠল।

কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একবার চিন্তা করেছিলাম যে এরকম কিছু আমার সাথে হতে পারে কিন্তু বিশ্বাস করতে পারিনি যে তা আসলেই সত্যি হবে।

“আমি আনন্দিত যে তোমার জন্য বেশ বড় একটা ইনস্যুরেন্স পলিসি নিয়ে রেখেছিলাম, বাবা,” চেহারায় স্বস্তি নিয়ে নাগায়ো বলল। আমার মেজাজ খারাপ ছিল কিন্তু কিই বা করার ছিল। ক্ষত দিয়ে রক্তের সাথে সব শক্তিও বেরিয়ে গিয়েছে। কথা বলার মত কোন শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু আমার চোখগুলো তখনও খোলা ছিল। কোনরকমে আমার বড় পুত্রের দিকে সেগুলো ঘোরাতে সক্ষম হলাম।

“তুমি নিশ্চয়ই একটা ঠিকঠাকভাবে করা উইল রেখে যাচ্ছ, নাকি?” অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে কোনরকমে মাথাটা একটু নাড়িয়ে নড় করতে পারলাম। এটা সত্যি যে বেশ কয়েক বছর আগেই আমি আমার লইয়ারের সাথে বসে আমার সম্পত্তি ভাগাভাগির ব্যাপারটা সেরে ফেলেছিলাম। আমার সবকিছু আমার দুই পুত্র আর স্ত্রীর মধ্যে সমান ভাগে বন্টন করে দিয়েছি।

মৃত্যু আস্তে আস্তে আমার চোখের পাতাগুলোকে গ্রাস করে নিতে শুরু করল। অবশেষে, আমি ভাবলাম। আমার মৃত্যুর মুহূর্ত উপস্থিত টের পেয়ে সবাই সোফাকে ঘিরে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। নাগায়ো আর সুমাকোর চোখে আশা আর প্রতীক্ষার চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। ডাঃ ওমোজির অভিব্যক্তি বেশ জটিল মনে হচ্ছিল। তবে সুগুয়ো রুমের অন্য মাথা থেকে আমার কাছে এল, আর চোখ টিপল। সেটা দেখা মাত্র সব প্রশ্নের উত্তর পরিস্কার হয়ে গেল আমার কাছে।

সুগুয়ো কিভাবে আমাকে খুনের পরিকল্পনা করেছিল তা আমি আর কখনোই জানতে পারব না। ওর ছোটবেলার কথা আমার মনে পড়ল, জড়সড় অবস্থায় আমাকে কার্ডের জাদু দেখিয়েছিল। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, ওর প্রশংসা করেছিলাম, ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে সুখি মানুষ। সেটাই হয়ত ছিল বাবা-পুত্রের সম্পর্কের শেষ অভিব্যক্তি।

আমার জেনে শান্তি লাগল যে ওর মাথার ভেতর অন্তত এই বুড়োকে খুন করার মত মগজ আছে। আমি সবসময় ওকে দুর্বল আর কাপুরুষ ভেবেছি, কিন্তু এখন আমার মনে হল ওর হাতে কোম্পানিটা নিরাপদেই থাকবে।

আমার ধারণা ও এই ট্রিপ শুরুর আগেই এই পরিকল্পনা সেরে রেখেছিল। লজে আসার সময় পথেই কোথাও ডাঃ ওমোজির ব্যাগ খালি করে ফেলেছিল-সম্ভবত আমরা যখন ট্রেনে উঠছিলাম, তখনই।

পরদিন ভোরে পাঁচটার সময় বরাবরের মত ঘুম থেকে উঠলাম আমি। পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্য আমার এই অভ্যাসের কথা জানে। কিন্তু তার আগেই সুগুয়ো আমাকে খুনের সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল।

আইভি টিউব আর সংরক্ষিত রক্ত নিয়ে ও বাড়ির বাইরে গিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে আমার ঘুমন্ত শরীরে আমারই ও-টাইপ রক্ত ছিটিয়ে দিয়েছিল। সবাই জানত আমার রুমের জানালা কয়েক সেন্টিমিটারের বেশি খোলা যায় না, আমি সবসময় এটা নিয়ে চিল্লাচিল্লি করতাম।

তারপর ও টিউবিং আর রক্তের বোতল সরিয়ে ফেলে লিভিং রুমে ফিরে আসে আর অ্যালার্ম ক্লক বাজার জন্য অপেক্ষা করে। আমি কখনোই জানতে পারব না ও কেন একটা হুইপ ক্রিম লাগানো ছুরি ব্যবহার করল, কিংবা সুমাকো যদি সেটা না কিনতে চাইত তাহলে ও কি করত। যাই হোক, পাঁচটার সময় আমি জেগে উঠলাম।

জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো যখন ঢুকল তখন আমি খেয়াল করলাম রক্তে মাখামাখি হয়ে আছি। আমাকে চিৎকার করতে প্রথম শুনেছিল সুগুয়োই, আর ও ওর স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী খেলতে থাকল। দরজা ধাক্কাতে লাগল, আমাকে লক খুলতে বলল। আমার শরীরে ক্ষত কোথায় হয়েছে তা পরীক্ষা করার নাম করে পেছন থেকে ছুরি বসিয়ে দিল। যেহেতু আমি কোন ব্যথা অনুভব করতে পারি না তাই অদ্ভুত হলেও আমি ব্যাপারটা খেয়াল করিনি।

সোফায় শুয়ে আমি আমার দিকে নিচু হয়ে তাকিয়ে থাকা চার জনের মুখের দিকে তাকালাম। ওদের মাথা ছাড়িয়ে ফুরোসেন্ট বাতির আলোটাকে অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছিল। আমি হাসলাম, আর অন্যদের থেকে একটু আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুগুয়ের দিকে মুখ করে একটা শব্দহীন ইঙ্গিতের মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম, “আমি জানি।”

“কেন, কেন সে হাসছে এভাবে?” সুমাকোর হতবুদ্ধি গলা আমার কানে এল। বুক ভর্তি শান্তি নিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করলাম আমি।

মুখবন্ধ

জু – অৎসুইশি / অনুবাদ : কৌশিক জামান / প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৯

মুখবন্ধ

অৎসুইশি এর ‘গথ’ পড়ে পাঠকদের কেউ কেউ জানতে চেয়েছিলেন ‘জু’ কবে আসবে। পুরো বই অনুবাদ করার পরিকল্পনা প্রথমে ছিল না। অনেককে এমনকি বলেও দিয়েছিলাম যে ‘জু’ বের হওয়ার খুব একটা সম্ভাবনা নেই। এর তিনটি গল্প অন্য সংকলন, ম্যাগাজিন আর অনলাইনে প্রকাশিতও হয়েছিল। তারপরেও সবার চাপাচাপিতে বাকি গল্পগুলো অনুবাদ করে বইমেলা ২০১৯ এর জন্য বইটি শেষ করলাম। আমি যে অলস, চাপাচাপি ছাড়া কাজ হয় না! তাছাড়া “কাজারি অ্যান্ড ইয়োকো” এবং “সো-ফার” এর মত গল্পগুলো অনুবাদ করতে মানসিকভাবে কিঞ্চিৎ চাপেও পড়তে হয়েছে। পাঠকগণ গল্পগুলো পড়লেই কারনটা বুঝবেন।

কিছু মানুষের সাহায্য ছাড়া এই বইটি অনুবাদ করা সম্ভব হত না। বইটি জাপানিজ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন টেরি গেলাঘের। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত হয়েছে ক্যাট, দানির ইয়ানগিরভ, আন্তন সেমেনভ, এবং তোরেস কোসে এর চিত্রকর্ম। মূল বইটি মালয়শিয়া থেকে কিনে এনে দিয়েছিলেন সেঁজুতি ভাবি। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ঔপন্যাসিক ফারিয়া প্রেমা বরাবরের মত সম্পাদনার বিরক্তিকর কাজটি দ্রুত করে দিয়েছেন। ‘চাপাচাপি’বাজ অ্যান বলেছে বই শেষ করতে পারলে শার্ট কিনে দেবে। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

সব শেষে প্রকাশক নাজিম ভাইকে ধন্যবাদ বইমেলার সমস্ত ভেজাল মাথায় নিয়ে দ্রুত বইটি পাঠকদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য। আশা করি বইটি থ্রিলার প্রেমী সবার ভাল লাগবে।

সূচিপত্র

১. সেভেন রুমস

২. ইন আ ফলিং এয়ারপ্লেন

৩. দ্য হোয়াইট হাউজ ইন দ্যা কোল্ড ফরেস্ট

৪. ফাইন্ড দ্যা ব্লাড!

৫. ইন আ পার্ক অ্যাট টোয়ালাইট, আ লং টাইম এগো

৬. ওয়ারড্রব

৭. সং অফ দ্যা সানি স্পট

৮. কাজারি অ্যান্ড ইয়োকো

৯. সো-ফার

১০. ওয়ার্ডস অফ গড

১১. জু

সং অফ দ্য সানি স্পট

চোখ খোলার পর আবিষ্কার করলাম আমি একটা স্ল্যাবের উপর শুয়ে আছি। উঠে বসে আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে পেলাম একটা বড় রুমের ভেতর আছি, যার ভেতর একগাদা অদ্ভুত দেখতে জিনিস জমা করে রাখা। উল্টো দিকে দেয়ালের কাছে একজন লোককে চেয়ারে বসে থাকতে দেখলাম। তাকে দেখে মনে হল গভীর কোন চিন্তায় ডুবে আছে, কিন্তু আমাকে ঠিকই লক্ষ্য করল। তার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল।

“গুড মর্নিং,” চেয়ারে বসেই সে বলল। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরনের সব কিছুরই রঙ সাদা।

“তুমি কে?” আমি জানতে চাইলাম। উত্তর দেয়ার আগে সে উঠে দাঁড়াল আর হেঁটে কাছের একটা লকারের দিকে গেল। লকার খুলে কিছু পোশাক আর জুতো বের করল।

“আমি সেই ব্যক্তি যে তোমাকে সৃষ্টি করেছে, সে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল। সিলিং থেকে আসা সাদা আলো আমাদের দুজনকে ভাসিয়ে দিচ্ছিল। সে কাছাকাছি এলে আমি বুঝতে পারলাম তার ত্বক কতটা ফ্যাকাসে ছিল। সাদা ত্বকের বিপরীতে তার চুলগুলো ছিল গাঢ় কালো। সে আমার কোলের উপর কাপড়গুলো রেখে বলল পরে নিতে। আমি শার্ট আর ট্রাউজারটার দিকে তাকালাম; ওগুলো দেখতে ঠিক তার পরা পোশাকগুলোর মতই ছিল, একই রকম সাদা রঙের। আমি নগ্ন ছিলাম।

“হ্যাপি বার্থডে,” সে বলল। রুমের উপর আবার চোখ বুলিয়ে আমি দেখতে পেলাম আমাদের চারপাশে অনেক রকমের যন্ত্রপাতি আর বানানোর সামগ্রী রাখা। আমি যেখানে বসেছিলাম তার পাশে একটা প্ল্যাটফর্মের উপর একটা মোটা বই দেখতে পেলাম। দেখে মনে হচ্ছিল বইটা অসংখ্যবার পড়া হয়েছে, একগাদা সাজানো নোট রাখা।

আমি পোশাকগুলো পরে তার পিছুপিছু রুম থেকে বের হলাম। অনেকগুলো দরজা আর শাটারসহ একটা লম্বা হলওয়ে ধরে হেঁটে গেলাম। তারপর একটা সিঁড়ি সামনে পড়ল, যেটা উপর দিকে গিয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর আরেকটা দরজা পড়ল। দরজাটা সে খুলতেই উজ্জ্বল আলো আমার মুখের উপর এসে পড়ল আর কিছুক্ষণের জন্য অন্ধ হয়ে গেলাম। সেই মুহূর্তে আমি প্রথম উপলদ্ধি করলাম, যেই রুমে আমি প্রথম চোখ খুলেছিলাম, সেটা ছিল ভূগর্ভস্থ। আমার ত্বক দ্রুত উষ্ণ সূর্যালোক শুষে নিতে লাগল।

দরজা দিয়ে বের হওয়ার পর আমি দেখতে পেলাম আমরা একটা ঘাসে ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছি। উপরের এই চওড়া সবুজ ঢালু জায়গা থেকে সামনের পুরোটা এলাকা সুন্দরভাবে চোখে পড়ছিল। আমাদের ভূগর্ভস্থ চেম্বারের দরজাটা একদম চুড়োর কাছে অবস্থিত। কাঠামোটা একদম সাধারণ ধরণের ছিল। কংক্রিটের তৈরি আয়তক্ষেত্র, লম্বায় আমার চেয়ে বেশি নয়। একটাই দরজা ঢোকার কিংবা বের হওয়ার জন্য। ছাদটা। কংক্রিটের একটা সমতল জায়গা, যেটার কিছু অংশ ঘাসে ঢেকে ছিল। একটা পাখি সেখানে বাসা বেঁধেছে।

আমি চারপাশের এলাকার উপর চোখ বোলালাম তথ্য সংগ্রহের জন্য। আমাদের ছোট পাহাড়টার চারিদিকে উঁচু পর্বতমালা। পাহাড়টার আকৃতি ছিল কোন গোলকের উপরের এক তৃতীয়াংশের মত। ব্যাস এক কিলোমিটার। পর্বতগুলো গাছে ছেয়ে ছিল। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটার মত আর কোন ঘাসভূমি চোখে পড়ল না। আমি সিদ্ধান্তে এলাম যে পাহাড়টা অবশ্য

“নিচের ঐ বনের ভেতরে আমাদের বাড়ি, লোকটা হাত তুলে দেখিয়ে বলল। পাহাড়ের নিচে একটা বেড়া দেয়া জায়গা দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে পর্বতমালা পর্যন্ত গাছ ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এর ভেতরে একটা ফাঁক দিয়ে আমি একটা বাড়ির ছাদের কিছু অংশ দেখতে পেলাম।

“ঐ বাড়িতে তুমি আমার দেখাশোনা করবে,” সে বলল। তারপর আমরা পাহাড় বেয়ে নামতে লাগলাম।

বনের কাছাকাছি একটা জায়গায় দুটো সাদা রঙের কাঠের তক্তা একত্র করে ক্রস বানানো হয়েছে। এমনিতে জায়গাটা একদম সমতল, খালি ঐ জায়গাটায় মাটি একটু উঁচু।

“কবর,” সে বলল।

কাছে যাওয়ার পর আমি দেখতে পেলাম বাড়িটা বেশ বড় আর পুরোনো। বিষয়টা আমার কাছে পরিস্কার যে, বাড়িটাকে প্রকৃতির ইচ্ছের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে গাছ গজিয়েছে। ছাদের টাইলস থেকে সবুজ পাতা উঁকি দিচ্ছিল। বাড়ির সামনে বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা ঘেসো উঠোন, একটা কুয়া আর একটা জং ধরা পুরাতন ট্রাক।

কাঠের দরজাটা থেকে সাদা রঙের চলটা উঠে গিয়েছে। আমি তার পেছন পেছন ভেতরে গেলাম। মেঝের কাঠের বোর্ডগুলো আমাদের ভারে কাঁচকোঁচ করে উঠল।

বাড়িটায় দুটো তলা আর একটা চিলেকোঠা ছিল। আমাকে নিচ তলায় কিচেনের পাশের রুমটা দেয়া হয়েছিল। ছোট একটা রুম। একটা বিছানা, আর একটা জানালা ছিল শুধ।

সে আমাকে কিচেনে ডাকল।

“প্রথমে আমি চাই তুমি কফি বানাও।”

“আমি জানি কফি কি, কিন্তু কিভাবে বানাতে হয় তা জানি না।”

“সেটা ঠিক আছে।”

সে শেলফ থেকে কফি বিন ভর্তি একটা ছোট কৌটা নামাল আর পানি জ্বাল দিল। দু কাপ কফি বানাল, আমি দেখলাম। তারপর এক কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।

“ধন্যবাদ,” আমি বললাম। গাঢ় তরলে ঠোঁট লাগিয়ে চুমুক দিলাম। “আমি দেখেছি তুমি কিভাবে কফি বানালে। পরেরবার আমি বানাব।” কাপে টোকা দিয়ে আমি তরলটা মখের ভেতর দিয়ে নেমে যেতে দিলাম।

“তবে,” আমি বললাম, “এর স্বাদটা আমার পছন্দ হল না।”

“হ্যাঁ,” সে মাথা ঝাঁকাল। “তোমার মনে হয় কিছুটা চিনি দিয়ে নেয়া উচিত।”

আমি তার কথা মত কাজ করলাম আর নতুন মিষ্টি করা কফিতে চুমুক দিলাম। জেগে উঠার পর এটাই ছিল প্রথম খাবার যা আমার শরীর পরিচিত হয়েছিল। পাকস্থলীর কলকজাগুলো সব পুষ্টি ঠিকমত শুষে নিল।

হাঁটার পর খানিকটা ক্লান্ত বোধ করায় আমি একটু বসলাম আর কাপটা কিচেনের টেবিলের উপর রাখলাম। জানালা থেকে একটা ধাতব ডেকোরেশন ঝুলছে। ধাতুর তৈরি বিভিন্ন সাইজের রড বাতাসের প্রবাহের সাথে দুলছে আর চমৎকার একটা শব্দ হচ্ছে। আমরা চুপচাপ বসে সেই অনিয়মিত শব্দ শুনলাম।

দেয়ালে একটা ছোট আয়না লাগানো ছিল। আমি সেটার সামনে গিয়ে বসে আমার চেহারাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। মানুষ দেখতে কি রকম হয় তা আমি আগে থেকেই জানতাম, তাই আমাকে একজন নারীর আদলে তৈরি করা হয়েছে দেখে অবাক হলাম না। আমি জানতাম যে আমার শরীরের প্রতিটা খুঁটিনাটি-আমার সাদা ত্বক, লাল চুল, সবকিছু মানুষের সাথে মিলিয়ে ডিজাইন করা।

কিচেনের কাপ বোর্ডে কিছু পুরোনো ছবি খুঁজে পেলাম। ওগুলোতে বাড়িটার সামনে দুজন মানুষকে দেখা যাচ্ছিল। সে আর একজন সাদা চুলের বুড়ো মানুষ। “তোমার সাথের জন কোথায়?” আমি জানতে চাইলাম।

সে একটা চেয়ারে বসে ছিল, আমি শুধু তার পিঠ দেখতে পাচ্ছিলাম। সে আমার দিকে না ঘুরে উত্তর দিল, “কোথাও না।”

“কোথাও না কথাটা দিয়ে কি বোঝাতে চাইছ?”

সে আমাকে জানালো পৃথিবীর মানুষেরা প্রায় বিলুপ্তির মুখে। সে ব্যাখ্যা করল যে পৃথিবীর আকাশে জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছিল, আর দুই মাসের মধ্যে প্রায় পুরো গ্রহের জনসংখ্যা মুছে যায়। ব্যতিক্রম না হলেও ও ভাগ্যবান। ছিল। আক্রান্ত হওয়ার আগে সে গ্রামের দিকে তার চাচার বাড়িতে চলে আসতে সক্ষম হয়। ওর চাচা এক সময় মৃত্যুবরণ করে আর তাকে পাহাড়ের পাদদেশে কবর দেয় ও। এখানে আসার সময় আমরা যে ক্রসটা দেখেছিলাম।

“দুদিন আগে আমি নিজেকে পরীক্ষা করেছি,” সে বলল। “জানতে পারলাম আমি জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি।”

“তারমানে তুমিও মারা যাবে।”

“হ্যাঁ, কিন্তু আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম। কয়েক দশক ধরে জীবাণুগুলো আমাকে খুঁজে পায়নি।”

আমি ওকে ওর বয়স জিজ্ঞেস করলাম। প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি, সে বলল।

“তোমাকে দেখে মনে হয় না। আমি যা বুঝি তাতে তোমাকে দেখে বিশের কাছাকাছি মনে হয়।”

“আমি ব্যবস্থা নিয়েছি।”

যা বোঝা গেল তা হল কিছু সার্জারির মাধ্যমে মানুষ এখন ১২০ বছরের মত বেঁচে থাকতে পারে।

“কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে পারলাম না।”

আমি উঠে গিয়ে কিচেনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতিগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম। রেফ্রিজারেটরে বিভিন্ন সবজি, সিজনিং, অন্যান্য খাবার রাখা ছিল যা গরম করে খাওয়া যাবে। ইলেকট্রিক জিনিসগুলোর মধ্যে একটা না থোয়া ফায়িং প্যান ছিল। আমি সুইচ অন করলে স্টোভের কয়েল ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠল।

“আমাকে একটা নাম দাও, প্লিজ,” আমি বললাম।

সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে লনের উপর কয়েকটা প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখছে। বোঝা যাচ্ছে অন্যমনস্ক।

“লাভ কি?”

জানালা দিয়ে বাইরের ঝিরঝিরে বাতাস ঘরে ঢুকছে। বাতাসের সোতে রিমঝিম শব্দ তুলছে ধাতুর তৈরি চাইমটা।

“আমি যখন মারা যাব,” সে বলল, “আমি চাই তুমি আমাকে ঐ পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে গিয়ে কবর দেবে। আমি আমার চাচার পাশে বিশ্রাম নিতে চাই। সেজন্যেই তোমাকে তৈরি করেছি।”

সে আমার মুখের দিকে তাকাল।

“বুঝতে পেরেছি। আমাকে তৈরি করা হয়েছে গৃহস্থালি কাজ করার জন্য আর তোমাকে কবর দেয়ার জন্য।”

সে মাথা ঝাঁকাল।

“এগুলোই তোমার অস্তিত্বের মুল কারন।”

আমি ঘর পরিস্কার করা শুরু করলাম। একটা ঝাড়ু নিয়ে মেঝে ঝাঁট দিলাম আর এক টুকরো ত্যানা দিয়ে জানালাগুলো মুছলাম। আমি যখন আমার কাজ করছিলাম তখন সে চেয়ারে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

জানালার ধুলো পরিস্কারের সময় আমি খেয়াল করলাম একটা ছোট পাখি স্থির হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। আমার মনে হল ওটা মৃত, তাই বাইরে গেলাম ওটা তুলে দেখতে। পাখির দেহটা একদম ঠাণ্ডা হয়ে ছিল, আমার সন্দেহ সঠিক প্রমানিত হল।

সে এর মধ্যে কোন এক সময় জানালায় এসে দাঁড়িয়েছি। আমার হাতে মরা পাখিটা দেখে বলল, “তুমি এটা দিয়ে কি করবে এখন?”

উত্তরে আমি পাখিটাকে বনের দিকে ছুঁড়ে মারলাম। আমার পেশীগুলো সাধারণ একজন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর মতই, তবুও অনেকদূর পর্যন্ত উড়ে গিয়ে গাছের ডালে পড়ে হারিয়ে গেল।

“এরকম করলে কেন?” সে মাথা কাত করে আমাকে জিজ্ঞেস করল।

“কারন ওটা পঁচে গেলে সারে পরিণত হতে পারবে।” আমি উত্তর দিলাম। সে মাথা ঝাঁকাল।

“যখন সময় আসবে, তুমি আমাকে ঠিকমত কবর দেবে। তোমাকে মৃত্যু সম্পর্কে কিছু জিনিস জানতে হবে,” সে বলল।

সে ঠিকই বলেছিল। আমি মৃত্যু কি তা বুঝতে পারছিলাম না। হতবুদ্ধি হয়ে ছিলাম।

এভাবে একসাথে আমাদের জীবন শুরু হল।

সকালে উঠে আমি কিচেন থেকে বালতিটা নিয়ে পানি তুলতে কুয়ার দিকে যাই।

এই কুয়ার পানি আমরা রান্না-বান্না আর ধোয়াধুয়ির কাজে ব্যবহার করি। সেলারে একটা ছোট ইলেক্ট্রিক জেনারেটর ছিল, কিন্তু পানি তোলার জন্য কোন পাম্প ছিল না।

পাথর বসানো একটা বাঁকানো পথ দিয়ে বাড়ি থেকে কুয়া পর্যন্ত যেতে হত। প্রতিদিন সকালে আমি ঐ বাঁকানো পথটা বাদ দিয়ে সোজাসুজি কুয়ার দিকে যেতাম। শুধু যে পথটা উপেক্ষা করতাম, তাই নয়। যাওয়া আসার সময় ফুলের গাছগুলোকেও মাড়িয়ে যেতাম।

কুয়াতে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা বালতি লাগানো ছিল। আমি সেটা ছেড়ে দিতাম কুয়ার গভীরে পানিতে পড়ার জন্য। পানিতে পড়ে ছলাৎ করে শব্দ উঠলে বুঝতে পারতাম নিচে পৌঁছেছে। বালতিটা টেনে তোলার সময় পানির ওজন টের পেয়ে অবাক লাগত।

পানি আনার পর দাঁত ব্রাশ করতাম। প্রত্যেকদিন সকালে আমার মুখের ভেতর কেমন বিচ্ছিরি একটা স্তর জমা হত। ঘুমের মধ্যে লালার হজমশক্তি আটকা পড়ত, আর আমি টুথব্রাশ দিয়ে সেটা পরিস্কার করতাম।

জরুরি জিনিস আর খাবার দাবার সব একসাথে ভূগর্ভস্থ গুদাম ঘরে রাখা হত। আমি খেয়াল করলাম যে এই রুমের পাশের রুমেই আমার জন্ম হয়েছিল। আমি ওখানে যেতাম প্রতিদিনের খাবার আনার জন্য। তার সাথে বাগানে চাষ করা শাকসজি দিয়ে ইলেকট্রিক চুলায় ফাইপ্যানে রান্না করতাম। আমি যখন রান্না করতাম তখন সে তার দোতালার রুম থেকে নেমে এসে টেবিলে বসততা। খাবারের সাথে সবসময় কফি খেত।

“তোমার কাছে অতীতের কোন ছবি বা রেকর্ড করা কিছু নেই?” একদিন আমি ব্রেকফাস্টের সময় জিজ্ঞেস করলাম। খাওয়া শেষে আমি সব পরিস্কার করার পর সে আমাকে কিছু ছবি দেখাল। পুরাতন ছবি যেরকম হয়, রঙ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ছবিতে একটা শহর দেখা যাচ্ছে যেখানে অনেক মানুষ বসবাস করত। আমি লম্বা বিল্ডিংগুলো, গাড়িগুলো আর মানুষগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম।

একটা ছবিতে তাকে একটা বিল্ডিঙের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম ওটা কি ছিল, সে জানাল ওখানে সে একসময় কাজ করত।

আরেকটা ছবিতে একজন নারী ছিল। তার চেহারা আর চুল হুবহু আমার মত দেখতে ছিল।

“তুমি অনেক জনপ্রিয় ছিলে,” সে বলল।

পর্বতমালা আর পাহাড়টা যেখানে মিলিত হয়েছে, সেখানে আমাদের বাড়িটা ছিল। বাড়ির পেছন দিয়ে পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত চলে গেছে একটা রাস্তা। আগাছা জন্মে রাস্তাটা প্রায় ঢেকে গেছে। কেউ সেটা ব্যবহার করে এরকম কোন চিহ্ন ছিল না। রাস্তাটা বাড়ি পর্যন্ত-বলা যায় অন্ধ গলির মত শেষ হয়েছে এখানে এসে।

“তুমি যদি এই রাস্তা ধরে পর্বতমালা পর্যন্ত যাও, সেখানে কি আছে?” আরেকদিন আমি ব্রেকফাস্টের সময় জানতে চাইলাম।

“ওখান থেকে ধ্বংসস্তূপের শুরু, কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সে উত্তর দিয়েছিল। উঠোনের গাছপালাগুলোর ভেতর দিয়ে পর্বতমালার পাদদেশটা ভাল মত দেখা যেত। সে যেরকম বলেছিল, দেখে মনে হচ্ছিল এক সময় সেখানে কোন শহর ছিল। আমি পরিত্যক্ত বাড়িঘর আর গাছপালা দেখতে পেলাম। কিন্তু কোন মানুষজন থাকার কোন চিহ্ন দেখতে পেলাম না।

আরেকদিন ব্রেকফাস্টের সময় সে কাঁটাচামচ দিয়ে তার সালাদের একটা অংশ আমার সামনে তুলে ধরল। একটা লেটুস পাতার কোনার দিকে ছোট ছোট দাঁতের দাগ। যেন কেউ চাবিয়ে রেখেছে। লেটুসটা আমাদের বাগানের থেকে তোলা।

“খরগোশ,” সে বলল। আমরা অবশ্য রোগ বালাইয়ের ধার না ধেরে খরগোশের চাবানো লেটুস খেয়ে ফেললাম। বেছে নিতে বললে আমি অবশ্য দাঁতের দাগ ছাড়া লেটুস খেতেই আগ্রহ বোধ করতাম।

ব্রেকফাস্টের পর আমি বাড়ির মধ্যে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম আর কিছু চিন্তা করলাম। ভাবছিলাম ওর জীবন শেষ হওয়ার পর কি হবে। এক সময় আমিও তো আর নড়াচড়া করতে পারব না। আমার মত অস্তিত্বরও একটা কর্মক্ষম পর্যায় আছে, যা প্রথম থেকেই ঠিক করা থাকে। সেই সময়টা আসতে এখনো অনেক দেরি কিন্তু আমি জানতাম আমার জীবনের আর কতটুকু বাকি। হাতগুলো তুলে কান চাপলাম। ভেতরে ছোট ছোট মোটর ঘোরার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। এগুলোই একদিন বন্ধ হয়ে যাবে, নিজেকে নিজে বললাম।

ভূগর্ভস্থ গুদাম ঘরে গিয়ে নিশ্চিত হলাম যে সেখানে একটা কোদাল রাখা আছে। সে যেহেতু চায় তাকে পাহাড়ের পাদদেশে কবর দিতে, আমার উচিত মাটি খোঁড়াটা একটু অনুশীলন করা।

আমি এখনো কল্পনা করতে পারছি না মৃত্যু ব্যাপারটা কি রকম হতে পারে। সে কারণে হয়ত বা, অনেক গর্ত খোঁড়ার পরেও আমি শুধু চিন্তা করছিলাম, কি হবে?

***

বাড়ির সমস্ত জানালার পাশে একটা করে চেয়ার রাখা ছিল। আর দিনের বেলায় সে ওগুলোর কোন একটা বেছে নিয়ে তাতে বসে থাকত। চেয়ারগুলোর বেশিরভাগই ছিল একজনের বসার মত কাঠের চেয়ার। তবে যে জানালাটা থেকে কুয়া দেখা যেত, সেটার পাশে একটা লম্বা বেঞ্চ ছিল।

আমি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমার করণীয় কিছু আছে কিনা। সে শুধু হাসল, আর বলল “না।” মাঝে মাঝে আমি তার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে এলে সে বলত, “ধন্যবাদ।” তারপর আবার জানালার দিকে ঘুরে যেত। চোখগুলো এমনভাবে কুঁচকে থাকত যেন অতি উজ্জ্বল কোন কিছু দেখছে।

অনেকবার এমন হয়েছে যে আমি তাকে বাড়ির কোথাও খুঁজে পেতাম না। শেষে দেখতাম বাইরে, তার চাচার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রসের সাদা রঙের সাথে ওর পোশাকের সাদা রঙটা চমৎকার মিলে যেত।

কবর সম্পর্কে আমার কিছু ধারণা ছিল। ঐ জায়গায় মৃতদেহ মাটি চাপা দেয়া হয়। কিন্তু এই নির্দিষ্ট কবরটার সাথে ওর সম্পর্কটা আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এতদিনে নিশ্চয়ই ওর চাচার দেহ গলে মাটির সাথে মিশে গিয়ে গাছদের খাবারে পরিণত হয়েছে।

আমার জন্মের পর থেকেই উঠোনের সবজির বাগানটা দেখে আসছি। সে ওখানে চাষ করত। এখন আমি ওগুলোর দেখাশোনা করি।

মাঝেমাঝে খরগোশ এসে সবজিগুলো চিবিয়ে রেখে যায়। পুরো বনের সব গাছপালা রেখে তাদের মনে হয় আমাদের বাগানটাই বেশি পছন্দ।

মাঝেমাঝে যখন আমার কিছু করার থাকে না তখন ঝোঁপের কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। যখন ছোট মত সাদা কোন কিছুকে সবজির দিকে এগুতে দেখি তখন দৌড়ে গিয়ে ধরার চেষ্টা করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার শারীরিক ক্ষমতা কোন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর চেয়ে বেশি নয়। তাই কখনোই কোন খরগোশ ধরতে পারিনি। তারা আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে দৌড়ে বনের মধ্যে হারিয়ে যায়।

খরগোশের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে মাঝে মধ্যে আমি কোন কিছুতে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। তখন পেছনের জানালা থেকে মুখ টিপে হাসার শব্দ ভেসে আসে। বাড়ির দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখতে পাই সে হাসছে। পরাজয় মেনে নিয়ে মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়িয়ে আমি আমার সাদা পোশাক থেকে ধুলো কাদা ঝাড়তে থাকি।

“যত দিন যাচ্ছে তুমি তত মানবীয় হয়ে উঠছ, বাড়িতে ফেরার পর সে হাসিমুখে আমাকে বলল। তার কথার অর্থ বুঝতে আমার সমস্যা হচ্ছিল। সে যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল, আমার অনেক মেজাজ খারাপ হচ্ছিল। আমার শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেল, কিভাবে প্রতিক্রিয়া

জানাবো বুঝতে পারছিলাম না। কিছু না পেয়ে আমার মাথা চুলকালাম আর বলে উঠলাম, “আহা!” বিব্রতকর পরিস্থিতিতে কি এরকম অনুভূতি হয়? আমার জানা নেই। আমি শুধু জানতাম যে আমার উপর হাসার কারনে তার উপর বিরক্ত লাগছিল আমার।

লাঞ্চের সময় সে টেবিলে দুবার চাপড় দিল আমার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। আমি এক বাটি সুপ খাচ্ছি আর সে সালাদ খাচ্ছে। লেটুসে বরাবরের মত খরগোশের দাঁতের চিহ্ন লেগে আছে।

“আমার সালাদের সজিতে খরগোশের দাঁতের দাগ আছে অথচ তোমার সুপেরগুলোতে নেই কেন?”

“বিষয়টা পুরোপুরি কাকতালীয়,” আমি বললাম আর খাওয়ায় মনোযোগ দিলাম।

***

দোতালায় একটা রুম ছিল যেটায় কোন বইয়ের শেলফ, ডেস্ক বা চেয়ার কিছুই ছিল না। শুধু প্লাস্টিকের তৈরি কিছু খেলনা ব্লক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, ছোট বাচ্চাদের খেলনার মত। আমি কখনো সত্যিকারের বাচ্চা দেখিনি কিন্তু ওরা কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে আমার কিছু ধারণা আছে।

প্রথম যখন আমি ঐ রুমে উঁকি দিয়েছিলাম, পুরো রুমটা বিকেলের সূর্যের আলোয় লালচে হয়ে ছিল। তীব্র লাল আলোতে ব্লকগুলোকে আরও গাঢ় লাল লাগছিল।

ব্লকগুলোর কয়েকটা একসাথে জুড়ে অসমাপ্ত একটা জাহাজের মত বানানো হয়েছিল। পুরোটা শেষ করলে এত বড় হবে যে দু হাত লাগবে জড়িয়ে ধরতে। জাহাজের বো টা ছিল না। ভোলা ব্লকগুলো মেঝের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

“আমি একবার ওটায় লাখি দিয়েছিলাম, তখন ওগুলো ভেঙে খুলে পড়েছিল।” সে আমার পেছন থেকে বলল। সে আমাকে ওগুলো নিয়ে খেলার অনুমতি দিলেও আমি বুঝতে পারছিলাম না কোত্থেকে শুরু করা উচিত। আমার মনে হচ্ছিল হঠাৎ যেন আমার ব্রেনটা জমে গিয়েছিল।

“তোমার জন্য কিছু বানাতে যাওয়াটা কঠিন মনে হতে পারে, সে বলল। খুঁটিনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলে দেয়া হলেই শুধু আমি কাজে লাগতে পারি। সে বলল আমি নাকি কখনো শিল্পকর্ম সৃষ্টি বা সঙ্গীত রচনা করতে পারব না। তাই চুপচাপ সেখানে বসে থাকলাম, কিছু করতে পারলাম না।

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর বাইরে অন্ধকার নেমে এল। উঠোনের আলোগুলো নিজে নিজে জ্বলে উঠল। সাদা আলোগুলো জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে।

সে ঐ রুমে বসে একটা ব্লক আরেকটার উপর সাজাতে লাগল। একটা জাহাজ বানাচ্ছিল। লাল জাহাজটা বানানো শেষে সে সবদিক থেকে ঘুরিয়ে সেটা দেখল। আমারও ইচ্ছা হচ্ছিল যদি তার মত করে ব্লকগুলো নিয়ে খেলতে পারতাম।

ল্যাম্পগুলোর চারপাশে সবসময় মথ উড়াউড়ি করত। আমরা যখন রাতে আমাদের দাঁত ব্রাশ করতাম তখন মাটির উপর মথের উড়ার ছায়া পড়ত। আমরা আমাদের মুখ ধুয়ে পানি নর্দমাতে ফেলতাম। নর্দমাটা বনের কোল ঘেসে পর্বতমালার কাছে একটা নদী পর্যন্ত লম্বা ছিল।

দাঁত ব্রাশ করার পর থেকে বিছানায় যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে আমরা লিভিং রুমে বসে মিউজিক শুনতাম। আমাদের দুজনের কেউই তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাওয়ার ব্যাপারটা পছন্দ করতাম না। মাঝে মাঝে আমরা হালকা মিউজিক চালিয়ে দাবা খেলতাম। একবার ও জিতলে একবার আমি জিততাম। আমার মানসিক ক্ষমতা একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি দেয়া হয়নি।

জানালাগুলোতে পর্দা টেনে দেয়া হত যাতে পোকা ঢুকতে না পারে। কিচেনের জানালা দিয়ে রাতে যখন বাতাস ভেসে আসত, ধাতুর চাইমটা নড়ে উঠে পরিচিত শব্দ সৃষ্টি করত। শব্দটা পরিস্কার এবং সুমধুর।

“জানালার ঐ চাইমের শব্দটা হল বাতাসের মিউজিক। আমার এটা পছন্দ…এই শব্দটা,” আমি ওকে বলেছিলাম। সে তখন দাবার পরবর্তী চাল কি হতে পারে তা নিয়ে চিন্তা করছিল। আমার কথা শুনে প্রথমে ভুরু কুঁচকে তাকাল, তারপর মাথা ঝাঁকাল।

আমি নিশ্চিন্তবোধ করছিলাম। প্রথম যখন আমি এই বাড়িতে এসেছিলাম তখন উইন্ড চাইমের শব্দটা অনিয়মিত ঝনঝন আওয়াজের মত মনে হত। এক সময় আমি অনুভব করলাম সেটা অন্যকিছুতে পরিণত হয়েছে। এরপর পুরো একটা মাস পার হয়ে গিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আমার অজান্তেই আমার হৃদয় বদলে গিয়েছে।

সে রাতে সে তার বেডরুমে যাওয়ার পর, আমি একা বাইরে হাঁটতে গেলাম। কালির মত ঘন অন্ধকার রাত ছিল, কিন্তু একটা ল্যাম্পের নিচে দাঁড়ানোর কারনে আমার চারপাশে আলো ভেসে যাচ্ছিল। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে চিন্তা করলাম, আমার মধ্যে কী কী পরিবর্তন এসেছে।

কোন একদিন, আমার মনে নেই সেটা কবে, আমি কিচেন থেকে কুয়াতে সরাসরি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। আমি এখন ঐ পাথর বসানো বাঁকানো পথ দিয়ে ঘুরে যাই আর খেয়াল রাখি যেন কোন ফুলের গাছ মাড়িয়ে না ফেলি। আগে আমার মনে হত এটা সময় আর শক্তির অপচয়। আর এখন আমি হাঁটার সময় চারদিক উপভোগ করি।

যখন আমি প্রথম ঐ ভূগর্ভস্থ কামরা থেকে বের হয়েছিলাম তখন সূর্যের আলো পছন্দ করেছিলাম শুধু এর উজ্জ্বল আলো আর ত্বকের উপর উষ্ণ অনুভুতির জন্য। আর এখন আমি এটাকে আরো ব্যক্তিগতভাবে উপলদ্ধি করতে পারি-যেটা হয়ত শুধুমাত্র কোন কাব্যিক ভঙ্গিতে প্রকাশ করা সম্ভব। এখন মনে হয় সূর্যের সাথে আমার হৃদয়ের কোথাও কোন গভীর সম্পর্ক আছে।

অনেক কিছুই এখন আমার কাছে মূল্যবান মনে হয়: বাড়িটা, এর দেয়ালে বেড়ে ওঠা গাছগুলোসহ। পাহাড়ের ধারের ঘাসভূমি। ভূগর্ভস্থ গুদামঘরে যাওয়ার দরজা, সেটার মাথার উপরে পাখির বাসাটা। মাথার উপরের নীল আকাশ আর ভেসে যাওয়া তুলোর মত মেঘগুলোও ভাল লাগে। তেতো কফি আমার ভাল লাগে না, অনেক চিনি দিয়ে খেলে ভাল লাগত। গরম গরম অবস্থায় মিষ্টি তরলটা জিহ্বাতে ছড়িয়ে যাওয়ার অনভুতিটা আমাকে আনন্দিত করে তোলে। “ আমি খাবার রান্না করা আর ঘরবাড়ি পরিস্কার রাখা চালিয়ে যেতে লাগলাম। সাদা পোশাকগুলো ধুয়ে দিতাম। কোথাও ছিঁড়ে ফেটে গেলে সুই সুতো দিয়ে সেলাই করি। একটা প্রজাপতি জানালা দিয়ে উড়ে এসে রেকর্ড প্লেয়ারের উপর বসল। বাতাসের শব্দ শুনতে শুনতে আমি চোখ বন্ধ করলাম।

রাতের আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি। বাতাসে গাছগুলো এদিক ওদিক দোলে আর পাতাগুলো ঝিরঝির শব্দ তোলে। আমি এর সবকিছু ভালবাসি, তাকেসহ।

গাছের ফাঁক দিয়ে আমি দূরে শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেতাম। কোথাও কোন আলো ছিল না। পুরো অন্ধকার।

“আর এক সপ্তাহের মধ্যে আমি মারা যাব,” পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল। একটা মেডিক্যাল টেস্ট ওকে জানিয়েছিল ঠিক কখন সে মারা যাবে। আমি তখনো পুরোপুরি ‘মৃত্যু মানে কি তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু আমি তাকে বললাম যে আমি বুঝেছি।

ওর শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। সকালে উঠে নিচে আসতে দেরি হয় এখন। আমরা ঠিক করেছি সে এখন থেকে এক তলায় আমার রুমে ঘুমাবে। এর বদলে আমি দোতালায় গিয়ে ঘুমাবো।

আমি তাকে বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে চেয়ারে গিয়ে বসতে সাহায্য করি। সে অবশ্য বলে যে তার কোন সাহায্যের দরকার নেই আর আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। আমি যা করি তার কোনটাকেই নার্সিং বলা যাবে না। সে কখনো জ্বর কিংবা শরীরে ব্যথা নিয়ে কোন অভিযোগ করেনি। তার বক্তব্য হল জীবাণুগুলো নাকি ওভাবে কাজ করে না। ওগুলো কোন ব্যথা সৃষ্টি করে না, শুধু মৃত্যু।

ওর নড়াচড়ার ঝামেলা কমানোর জন্য, সে যেখানে বসে থাকে সেখানেই খাওয়ার অভ্যাস করলাম আমরা। সে যদি বেঞ্চে বসে থাকত তাহলে আমি ট্রেতে করে আমাদের খাবার সেখানে নিয়ে আসি। সে যদি অন্য কোন চেয়ারে বসে থাকে, তাহলে তার পায়ের কাছে বসে রুটি-টুটি কিছু একটা খাই।

সে তার চাচার কথা বলত। কিভাবে তারা ট্রাকে চড়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে যেত। সেখানে দরকারি কিছু পাওয়া যায় কিনা ঘাঁটাঘাঁটি করত। আর দিন শেষে বাড়ি ফিরে আসত। যে ট্রাকটা তারা ব্যবহার করত সেটা এখন মরচে ধরে পড়ে আছে, চালানোর জন্য কোন ফুয়েল নেই বলে।

“তোমার কি কখনো মানুষ হওয়ার ইচ্ছা হয়?” সে একদিন হঠাৎ কথার মাঝখানে জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ হয়,” আমি বললাম। “যখনই আমি কিচেনের জানালায় ঝুলানো উইন্ড চাইমের আওয়াজ শুনি, আমার মনে হয় মানুষ হতে পারলে চমৎকার

এমনকি বাতাসেরও ক্ষমতা আছে সঙ্গীত সৃষ্টি করার, আমি নিজের মনে ভাবতাম। আমার কোন কিছু সৃষ্টি করার কোন ক্ষমতা নেই। ব্যাপারটা আমাকে বিষাদগ্রস্থ করে তুলত। কথাবার্তার সময় আমি কাব্যিক ভঙ্গি ব্যবহার করতে পারতাম, এমনকি মিথ্যা বলতেও। আমার শৈল্পিকতার দৌড় ঐ পর্যন্তই।

“হুম…” সে বলল। তারপর আবার তার চাচার গল্পে ফিরে গেল। তারা দুজন মিলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে শহরের ধ্বংসাবশেষ ঘুরে বেরিয়েছিল।

আমি বুঝতে পারি যে সে তার চাচাকে গভীরভাবে ভালবাসত। সেকারনে চাইত চাচার পাশে সমাহিত হতে। সেজন্যই আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল-তার অসুস্থতার সময় তার সেবা করার জন্য, যতক্ষণ না মৃত্যু এসে হাজির হয়।

আমি যেখানে বসেছিলাম তার পাশের মেঝেতে একটা আধ খাওয়া রুটি ধপ করে পড়ল। সে ফেলেছে। ধপ শব্দটা খুবই ক্ষীণ ছিল, বাতাসের মৃদু একটা ঝাপ্টার মত।

ওর ডান হাত হালকা কাঁপছিল। সে সেটা নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। কাঁপতে থাকা হাতটার দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে থেকে সে আমাকে প্রশ্ন করল, “তাহলে, এখন কি তুমি বুঝতে পারছ মৃত্যু কিরকম?”

“এখনো না। কি রকম?”

“ভীতিকর।”

আমি রুটিটা তুলে নিয়ে ট্রেতে রাখলাম। সঙ্গত কারনে সেটা না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি এখনো ভালমত মৃত্যুকে বুঝতে পারছি না। জানি কোন এক সময় আমি নিজেও মারা যাব। কিন্তু আমি ভীত নই। হঠাৎ করে থেমে যাওয়ার মধ্যে কি ভয়ের কিছু আছে? এই বিরাম এবং ভীতির মধ্যে কোথাও কিছু একটা আছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি না। আর সেটাই আমাকে জানতে হবে।

আমি মাথা কাত করে তার দিকে তাকালাম। সে হয়ত খেয়াল করছিল যে তার হাতগুলো তখনও কাঁপছে। তার চোখগুলো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। আমিও বাইরে তাকালাম।

উঠোনটা আলোকিত হয়ে ছিল, উজ্জ্বলতা এতটাই বেশি ছিল যে আমাকে চোখ সরু করতে হল। বাড়িটা ঘিরে থাকা বনের দিকে তাকালাম, পাশেই থাকা জরাজীর্ণ ডাকবাক্স, পরিত্যাক্ত ট্রাক আর বাগান। সবজির সারির উপর ঘোট ঘোট প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে।

একটা ছোট সাদা তুলোর বল সবুজ পাতার ছায়ার ভেতর অর্ধেক লুকানো অবস্থায় বসে ছিল। একটা খরগোশ। আমি উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। আমি জানি এটা সঠিক আচরণ হল না কিন্তু যে মুহূর্তে আমি খরগোশটাকে দেখেছি আমার মনে হয়েছে এটা আমাকে শিকার করতে কিছুটা সুবিধা দেবে।

***

তার মৃত্যুর পাঁচ দিন আগের দিনটাতে আকাশ ছিল মেঘলা। আমি বনে গিয়েছিলাম বন্য সবজি জোগাড় করতে। গুদাম ঘরে প্রচুর খাবার জমা করা থাকলেও সে মনে করত বাগানের টাটকা সবজি আর প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়াই ভাল।

হঠাৎ হঠাৎ কোন খবর না দিয়েই ওর হাত পা কাঁপতে শুরু করত। এই পর্বগুলো বেশিক্ষণ চলত না ঠিকই কিন্তু নিয়মিত ঘটতে লাগল। সে তার মোটর ফাংশন এর নিয়ন্ত্রন হারাতে শুরু করেছিল। যেমন, সে হয়ত এক কাপ কফির জন্য হাত বাড়াল কিন্তু কফিটা টেবিলের উপর ছড়িয়ে ফেলল। এই ক্রমশ খারাপ হতে থাকা শারীরিক অবস্থার মধ্যেও সে তার ধৈর্য ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। সে কখনো বিরক্ত হত না, শরীর সাড়া না দিলে সে শুধু ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে থাকত।

বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি একটা গিরিখাতের কাছে চলে গিয়েছিলাম। সে আমাকে গিরিখাতটার ব্যাপারে সাবধান করেছিল। ওখান থেকে দূরে থাকতে বলেছিল। জায়গাটা বিপদজনক, আমি পড়ে যেতে পারি। কিন্তু গিরিখাতের কোণায় অসংখ্য বন্য সবজি দেখা যাচ্ছে। কাছে না গিয়ে পারলাম না।

আমার কাছে মনে হল হঠাৎ যেন মাটি শেষ হয়ে আকাশে পরিণত হয়েছে। সবজি তুলে তুলে আমার হাতের ঝুড়িতে রাখছিলাম। সেই সাথে গিরিখাতের পর পর্বতমালার সারির দিকে তাকাচ্ছিলাম। পর্বতগুলো আকাশের মেঘের সাথে গিয়ে মিশে গিয়েছিল যেন। ওগুলো দানবাকৃতির ধূসর ছায়ার মত দেখাচ্ছে।

কিনারার এক জায়গায় আমার দৃষ্টি পড়ল। জায়গাটা দুমড়ে মুচড়ে আছে যেন কেউ ওখানে লাথি মেরেছে।

কিনারা থেকে মাথা বের করে নিচে তাকালাম। ত্রিশ মিটারের মত নিচে একটা পানির ধারার মত বয়ে যাচ্ছে যেটাকে দড়ির মত দেখাচ্ছে। বিশ মিটার নিচে একটা টেবিলের সমান পাথর ঝুলে ছিল। উপরে পরিত্যক্ত ঘাসের চাপড় দেখা যাচ্ছে।

সাদা রঙের কিছু একটা দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা খরগোশ। ওটা নিশ্চয়ই চলার সময় খাদ থেকে পা ফসকে নিচে পড়ে গিয়েছিল। আর উপরে উঠতে পারেনি।

দূর থেকে বজ্রপাতের গর্জন ভেসে এল। এক ফোঁটা বৃষ্টি আমার হাতের উপর এসে পড়ল।

ঝুড়িটা মাটিতে রেখে আমি খাদের কিনারা দু হাত দিয়ে ধরে আস্তে আস্তে এক পা এক পা করে বেয়ে বেয়ে পাথরটার দিকে নামাতে লাগলাম।

ঠাণ্ডা এক ঝাপ্টা বাতাস এসে আমার চুলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। এতদিন পর্যন্ত আমি খরগোেশ নিয়ে বিরক্ত হয়ে এসেছি, কিন্তু এখন এটাকে অসহায় অবস্থায় দেখে আমার মনে হয়েছে একে রক্ষা করতে হবে।

আমি খরগোশের দিকে হাত বাড়ালে প্রথমে সেটা প্রতিরক্ষামূলক ভঙ্গিতে ছিল। কিন্তু পরে তুলতুলে সাদা প্রাণীটা আমাকে ওকে তুলে নিতে দিল। আমি এর ক্ষুদ্রতা, এর উষ্ণতা অনুভব করতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিল উষ্ণ একটা ছোট বল।

বৃষ্টি শুরু হল। আর পর মুহূর্তেই আমি কিছু একটা নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। একটা ঝাঁকি আমার পুরো শরীর নাড়িয়ে দিল। খাদটা হঠাৎ উপরে উঠে গেল। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় এক মুহূর্তের জন্য মনে হল আমি বাতাসে ভাসছি। খাদের যেখানে আমার সবজির ঝুড়ি রেখে এসেছিলাম সেটা অনেক দুরে সরে গেল, অনেক ছোট দেখাল। আমি খরগোশটাকে নিরাপদে রাখার জন্য বকের সাথে চেপে ধরে রাখলাম।

একটা শক্ত ধাক্কা অনুভব করলাম। ধুলোর একটা মেঘ ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তখানেকের জন্য। কিন্তু তারপরই বৃষ্টি সেটাকে ধুয়ে ফেলল। গিরিখাতের গোড়ায় পানির ধারার পাশে এক জায়গায় আমরা গিয়ে পড়েছিলাম।

আমার অর্ধেক শরীর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। একটা পা ঝুলছিল, কোন কাজ করছিল না। তলপেট থেকে বুক পর্যন্ত একটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। আমার ভেতরের যন্ত্রপাতি সব বেরিয়ে আসতে চাইছিল কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম নিজের শক্তিতে বাড়ি ফিরে যেতে পারব।

বুকে ধরে থাকা খরগোশের দিকে তাকিয়ে দেখি সাদা পশম লাল হয়ে আছে। আমি বুঝতে পারলাম সেটা ওর রক্তের দাগ। খরগোশের শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে এর শরীরের সব উষ্ণতা আমার হাত দিয়ে বয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

বাড়ি ফেরার সময় পুরোটা পথ আমি দুহাত দিয়ে খরগোশটা ধরে ছিলাম। আমি এক পায়ে লাফাতে লাফাতে এগুচ্ছিলাম আর আমার শরীর থেকে নাটবল্ট খুলে খুলে মাটিতে পড়ছিল। থামানোর জন্য আমার কিছু করার ছিল না। পিঠে বৃষ্টির ঝাপ্টা লাগছিল।

বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে আমি তাকে খুঁজতে লাগলাম।

আমার শরীর থেকে পানি ঝরে মেঝে ভেসে গিয়েছে। চুলগুলো ত্বকের সাথে লেপ্টে আছে। আমার সিনথেটিক ত্বকের বেশিরভাগই ঝড়ে খসে গিয়েছিল। সে জানালার পাশে বসে ছিল, যেখান থেকে বাগানটা দেখা যায়। আমার অবস্থা দেখে সে ধাক্কা খেল।

“আমাকে ঠিক কর, প্লিজ,” আমি বললাম। কি ঘটেছে তা খুলে বললাম।

“ঠিক আছে,” সে বলল। “চল গুদাম ঘরে যাই।”

“আর তুমি কি একেও ঠিক করত পারবে?” আমি মিনতির সুরে বললাম, দুহাতে খরগোশটাকে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম।

সে মাথা নাড়ল। খরগোশটা ইতিমধ্যে মরে গিয়েছে। সে আমাকে বলল। খরগোশটা পতনের ধাক্কা হজম করতে পারেনি। ওটা আমার কোলের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে।

আমার মনে পড়ছিল খরগোশটা যখন বাগানের ভেতর দিয়ে ছুটোছুটি করত, কত চটপটে ছিল সেটা। আর আমি আমার কোলে থাকা মৃত প্রাণীটার দিকে তাকালাম। এর সাদা পশমে লাল রক্তের দাগ, আর চোখগুলো আজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ও যখন আমাকে গুদাম ঘরের দিকে যেতে তাড়া দিল তখন ওর কণ্ঠ অদ্ভুত কোন কারনে মনে হচ্ছিল দূর থেকে ভেসে আসছে। সে আমাকে দ্রুত পরীক্ষা করে মেরামত করতে চাইছিল।

“আঃ…আঃ।” আমি মুখ হাঁ করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু কোন শব্দ বের হল না। বুকের গভীরে চাপা একটা কষ্ট অনুভব করছিলাম। যদিও সেটার সাথে আমার শারীরিক কষ্টের কোন সম্পর্ক ছিল বলে মনে হচ্ছে না, তবু অন্য কোন শব্দ আমার মাথায় এল না। আমার দেহ শক্তি হারিয়ে ফেলল আর আমি হাঁটু ভেঙে পড়ে গেলাম।

“আ-আমি…” আমি আবিষ্কার করলাম আমার অশ্রু নির্গত করার ক্ষমতা আছে। “আমি এই ছোট প্রাণীটার সাথে অনেক বেশি জড়িয়ে গিয়েছি।”

সে আমার দিকে তাকাল, তার চোখে সমবেদনার চিহ্ন। “এরই নাম মৃত্যু,” সে বলল, আমার মাথার উপর হাত রাখল। তখন আমি বুঝতে পারলাম। মৃত্যু অর্থ হারানোর উপলদ্ধি।

ও আর আমি একসাথে হেঁটে হেঁটে ভূগর্ভস্থ গুদাম ঘরে গেলাম। প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে, ঝড়ের ভেতর প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমি তখন এক পায়ে লাফাচ্ছিলাম, খরগোশটা বুকের কাছে ধরে রাখা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সে বলেছিল খরগোশটা বাড়িতে রেখে যেতে কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত অপারেটিং টেবিলে যখন আমার উপর ইমারজেন্সি প্রক্রিয়া চলছিল তখন খরগোশটা আমার পাশের ডেস্কে রাখা ছিল।

আমি সিলিঙের লাইটের ঠিক নিচে চিত হয়ে পড়ে ছিলাম। প্রায় দুই মাস আগে এখানে এভাবেই শুয়ে ছিলাম আমি। চোখ খুলে তাকানোর পর সে আমাকে “গুড মর্নিং” জানিয়েছিল। এটাই আমার প্রথম স্মৃতি।

সে আমার দেহের ভেতরটা পরীক্ষা করল। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। বিরতি নিয়ে নিয়ে কাজ করছিল। ক্লান্ত হয়ে পড়লে চেয়ারে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে।

পরীক্ষা করার সময় আমি আমার মাথাটা একদিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলাম যাতে খরগোশটাকে দেখতে পাই। খুব শিগগিরি সেও খরগোশটার মত নিশ্চল হয়ে পড়বে। শুধু সেই নয়, এক পর্যায়ে সবকিছুরই মৃত্যু ঘটবে, আমারও। এখন আমি তা জানি। আগে কখনো এই জানাটার সাথে ভয় যুক্ত ছিল না, যেটা এখন আছে।

আমি আমার মৃত্যুর কথা চিন্তা করলাম। এর অর্থ একসময় শুধু থেমে যাওয়া নয়। এর অর্থ পৃথিবীর সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, এমনকি নিজের থেকেও। আর এই কথাটা সবসময় সত্যিই থাকবে যতই আমি কোন কিছু ভালবাসি না কেন। এই ব্যাপারটাই মৃত্যুকে ভয়ানক রকমের বিষাদগ্রস্থ করে তোলে।

একজন যত বেশি ভালবাসে, মৃত্যুর অর্থ ততটাই ভারি হয়, হারানোর অর্থ ততটাই গম্ভীর হয়। ভালবাসা আর মৃত্যু কোন আলাদা বিষয় নয়, একই জিনিসের সামনের আর পেছনের দিক।

সে যখন আমার শরীরের জিনিসপত্র ঠিক করছিল, পুরোটা সময় আমি নীরবে ফোঁপাচ্ছিলাম। অর্ধেকের মত মেরামত হলে সে বিশ্রাম নেয়ার জন্য বসল।

“ইমারজেন্সি কাজটুকু কালকের মধ্যে শেষ হবে। তবে পুরো কাজ শেষ। করতে আমার আরো তিনদিন সময় লাগবে।

ওর শরীর তার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। এর মানে হল মূল কাজ শেষ হওয়ার পর বাকি কাজ আমাকেই করতে হবে। আমার শরীরের সাধারণ কাজ কিভাবে হয় তা আমার জানা ছিল। যদিও আমার কোন অভিজ্ঞতা ছিল না কিন্তু যদি চেষ্টা করি তাহলে আমি নিশ্চিত, প্রয়োজনীয় সব কাজ নিজেই সারতে পারব।

“বুঝতে পেরেছি,” আমি বললাম, কান্নার কারনে আমার কণ্ঠ থেমে যাচ্ছিল। “তোমার জন্য খারাপ লাগছে।”

সে কেন আমাকে তৈরি করেছিল? এই দুনিয়ায় যদি আমার জন্ম না হত তাহলে আমাকে কোন কিছু ভালবাসতে হত না কিংবা কোন আবেগ অনুভব করতে হত না। মৃত্যু ভয়ও পেতে হত না আমাকে।

অপারেটিং টেবিলে শোয়া অবস্থায় আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে এই কথাগুলো মুখ দিয়ে বের করে আনতে সক্ষম হলাম।

“আমি তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে কবর দিতে হবে ভাবতে আমার কষ্ট হচ্ছে। আমার হৃদয়ে প্রচণ্ড কষ্ট অনুভুত হচ্ছে। ভাল হত যদি আমার কোন হৃদয় না থাকত। এরকম হৃদয় দেয়ার জন্য আমি তোমাকে ঘৃণা করি।”

তার মুখটা বিষাদপূর্ণ হয়ে ছিল।

***

আমার পুরো শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো অবস্থায় আমি ঠাণ্ডা শক্ত হয়ে যাওয়া খরগোশটাকে তুলে নিয়ে ভূগর্ভস্থ গুদাম ঘর থেকে বের হলাম। বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গিয়েছে, ঘাস ভূমির উপর ভ্যাপসা রকমের বাতাস ঝুলে ছিল। বাইরে তখন অন্ধকার, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে কোন মুহূর্তে ভোর হবে। মেঘগুলো আকাশ জুড়ে সরে যাচ্ছে। আমার পেছনে সে দরজা খুলে বেরিয়ে এল।

ইমারজেন্সি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আমি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিলাম। অবশ্য মেরামতের সব কাজ শেষ হয়নি। হঠাৎ কোন নড়াচড়া করা আমার জন্য নিষেধ ছিল। আপাতত নিজে নিজে কোন মেরামতির কাজ করার কোন ইচ্ছা আমার নেই। আমাকে এখনো বাড়ির কাজ করতে হবে আর তার জন্য খাবার তৈরি করতে হবে।

আস্তে আস্তে আমরা বাড়ির দিকে হেঁটে গেলাম। সূর্য তখন পুব আকাশে আলো ছড়াতে শুরু করেছে। আমরা ওর চাচার কবরের ক্রসের সামনে থামলাম।

“আর চার দিন,” সে বলল।

ঐ সকালে আমি খরগোশটাকে কবর দিলাম। সবুজ উঠোনটার এক কোণায়, যেখানে অনেক পাখির আগমন ঘটে। আমার মনে হয়েছিল পাখিগুলো হয়ত খরগোশটাকে সঙ্গ দিতে পারবে। আমি যখন মাটি দিয়ে কবরটা ভরাট করছিলাম আমার মনে হচ্ছিল বুকের উপর ভারি একটা বোঝা আমাকে নিচের দিকে টানছে। একই জিনিস আমার ওর জন্যও করতে হবে। এই কথা চিন্তা করে আমার সন্দেহ হল আমার সেই শক্তি আছে কিনা।

এরপর সে একতলার বিছানায় গিয়ে শুল এবং আর উঠল না। সে শুধু বিছানার কিনারায় শুয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকত, আমি ব্রেকফাস্ট বানিয়ে তার জন্য নিয়ে আসতাম। আমি আর হাসতে পারছিলাম না। ওর পাশে থাকা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

একসময় আমি বুঝতে পারলাম কেন সে সবসময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করত। আমার মত, সেও এই পৃথিবীকে ভালবাসত। তাই মৃত্যু এসে তাকে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে চেয়েছিল ভাল করে সব দেখে মনে গেঁথে নিতে। এরকম একটা মানুষের সাথে আমি যতটা সম্ভব সময় কাটাতে চাইছিলাম। একসময় আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে তার মৃত্যু নিকটে চলে এসেছে। বাড়ির যে কোন স্থানেই আমি তা অনুভব করতে পারছিলাম।

সেই ঝড়ের পর থেকে আকাশ এখনো মেঘলা। কোন বাতাস নেই, কিচেনের জানালার উইন্ড চাইমটাও তাই নীরব। রেকর্ডগুলো বাজানোর কোন শক্তি আমাদের ছিল না। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে ছিল। একমাত্র শব্দ যা হচ্ছে, তা হল আমার পায়ের নিচে আলগা কাঠের তক্তার কাঁচকোঁচ শব্দ।

“লাইট বাল্বটা নষ্ট হওয়ার সময় হয়ে এসেছে,” এক সন্ধ্যায় সে বলল, বরাবরের মত জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। উঠোনের বাগুলোর একটা ম্লান হয়ে মিটমিট করছিল। এভাবে কিছুক্ষণ থেকে একবার চমকে উঠে অন্ধকার হয়ে গেল।

“কাল দুপুরের মধ্যেই আমি মারা যাব,” নিভে যাওয়া বাটার দিকে তাকিয়ে সে বলল।

সে যখন ঘুমিয়ে পড়ল, আমি তখন সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় গেলাম। ঐ রুমটায় গেলাম লাল রঙের জাহাজটাকে আবার দেখতে। ওটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি চিন্তায় ডুবে দিয়েছিলাম।

আমি ওকে ভালবেসেছিলাম। কিন্তু একই সাথে কিছু একটা আমার হৃদয়ে গেঁথে ছিল। আমাকে এই পৃথিবীতে আনার জন্য তার প্রতি অসন্তুষ্টি অনুভব করছিলাম। একটা কালো মেঘ আমার হৃদয়টাকে ছেয়ে ফেলল।

ওর সাথে আমার সম্পর্কটার সংজ্ঞা ছিল এরকম বিভিন্ন ধরনের জটিল আবেগের সংমিশ্রন। শ্রদ্ধা আর অসন্তোষের সংমিশ্রণ। কিন্তু এর কিছুই আমি বাইরে প্রকাশ করিনি।

আমার ভেতরে যে ঝড় যাচ্ছিল সেটা তার জানার কোন প্রয়োজন নেই। কাল দুপুরে আমি শুধু তাকে আমাকে সৃষ্টি করার জন্য ধন্যবাদ জানাবো। কোন সন্দেহ নেই যে সেটাই ওর মৃত্যুর জন্য সেরা উপায় হবে, কোনরকম কোন অনুশোচনা ছাড়া।

আমি ব্লক জোড়া দিয়ে বানানো লাল রঙের জাহাজটা হাতে নিলাম। ঠিক করেছি আমি আমার সমস্ত অসন্তোষ আর অন্ধকার আবেগগুলোকে আমার হৃদয়ের গভীরে চাপা দেব। কিন্তু যতবারই আমি এসব নিয়ে চিন্তা করছিলাম ততবারই নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি ভীত ছিলাম। আর আমার মনে হচ্ছিল আমি তাকে মিথ্যা বলছি।

হঠাৎ জাহাজের যে জায়গাটায় ধরেছিলাম সে জায়গাটা খুলে এল। জাহাজের হালটা ভেঙে মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আমি সবগুলো টুকরো এক জায়গায় জড়ো করে ভাবছিলাম কি করব এখন। আমার মত কেউ একজন, যে কিনা মানুষ নয়, যে কিনা কখনো ছবি আঁকতে পারবে না, মূর্তি গর্তে পারবে না কিংবা সঙ্গীত রচনা করতে পারবে বা। সে মারা যাওয়ার পর এই ব্লকগুলো আজীবনের জন্য এরকম খোলাই থেকে যাবে।

ঐ মুহূর্তে আমি উপলদ্ধি করলাম যে ব্লকগুলো দিয়ে করার মত একটা জিনিস আমার জানা আছে। আমার মনে আছে কিভাবে জাহাজ বানাতে হয়। আমি ওকে জাহাজটা বানাতে দেখেছিলাম, সেটা আমার মনে আছে। ও যেভাবে করেছিল সেভাবে আমি একটা একটা করে ব্লক জোড়া দিয়ে জাহাজটাকে আবারও বানালাম।

বানানো শেষ হওয়ার পর আমি কেঁদে ফেললাম। হয়তো, হয়তো। হৃদয়ের গভীরে আমি এই জিনিসটাই চিন্তা করেছিলাম, বার বার, অসংখ্যবার।

***

পরদিন সকালে পুরো আকাশ একদম নীল হয়ে ছিল। শুধুই নীল, আর কিছুই না। এই মাথা থেকে ঐ মাথা পর্যন্ত নীল, কোন মেঘ ছিল না। সে তখনো ঘুমাচ্ছিল। আমি কুয়ার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করলাম, মুখ ধুলাম। কুয়া থেকে পানি তুলে বালতিতে ভরলাম। কিছু পানি কাছের ফুল গাছগুলোতে ঢালোম। ফুলগুলোর পাপড়ি পানির ফোঁটার ভারে একদিকে কাত হয়ে ছিল। পানির ফোঁটাগুলো মাটিতে পড়ে সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় চকমক করে উঠলে আমি তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম।

এতদিন মেঘলা থাকায় একগাদা জামা কাপড় জমে গিয়েছিল। আমি ঠিক করলাম সব ধুয়ে ফেলা যাক। ভেজা কাপড়গুলো বাইরে শুকোতে দেয়ার সময় আমার শরীরের ব্যান্ডেজ ঢিলে হয়ে গেল। আমাকে থেমে আবার সব ঠিক করে বেঁধে নিতে হল।

লন্ড্রির কাজ শেষ হওয়ার পর আমার খেয়াল হল সে জানালা দিয়ে আমাকে দেখছে। ওর বেডরুমের জানালা নয়, হলওয়ের যে বসার জায়গাতে সূর্যের আলো পড়ে সেখান থেকে। আমি দৌড়ে ওর কাছে গেলাম।

“তুমি কি ঠিক আছ, এভাবে উঠে পড়লে যে?”

“আমি এই জায়গায় বসে মরতে চাই।” মনে হল সে তার শেষ শক্তিটুকু খরচ করে এই জায়গায় এসে বসেছে।

আমি বাড়ির ভেতর গিয়ে তার পাশে বসলাম। মাত্র শুকোতে দেয়া কাপড়গুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। সাদা রঙটা যেন একদম ঠিকরে বের হচ্ছিল। চমত্যার একটা সকাল, মৃত্যুর কোন চিহ্ন কোথাও নেই।

“আর কয় ঘন্টা বাকি?” বাইরে তাকিয়ে আমি জানতে চাইলাম। সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল, তারপর জানাল আর কতক্ষন বাকি, সেকেন্ডে।

“এই যে মৃত্যুটা ঐ জীবাণুগুলো বয়ে আনে, তাদের সময়জ্ঞান কি খুবই নিখুঁত?”

“কি জানি।”

ওর কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। আমি প্রশ্ন করলাম, “তুমি কি আমাকে একটা নাম দিতে পারোনি, একইভাবে আমি যেরকম ছবি আঁকতে বা মিউজিক করতে পারি না?”

অবশেষে সে জানালা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকাল।

“আমি আমার মৃত্যুর নির্দিষ্ট সেকেন্ডটা জানি, আমার মত কারোর জন্য জীবনের শর্তাবলী পূর্বনির্ধারিত। আর তোমার জন্যও…”

সত্যি কথা হল, জীবাণুগুলো ওকে কখনোই সংক্রমিত করেনি। ও একজন মানুষকে ব্লকগুলো দিয়ে জাহাজটা বানাতে দেখেছিল। যে কারনে ও নিজেও জাহাজটা বানাতে পারত। ও এমন একটা পৃথিবীর একমাত্র উত্তরসুরী ছিল যেখানের সব মানুষ মারা গিয়েছিল। সে আমার মুখের দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে থাকল, তারপর মাথা নিচু করল। ফ্যাকাসে মুখটার উপর ছায়া জমল।

“আমি দুঃখিত, তোমাকে মিথ্যে বলেছি…”

আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে আমার মাথা রাখলাম। ছোট ছোট মোটর চলার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

“কেন তুমি মানুষ সাজার ভান করেছ?”

নিচু কণ্ঠে সে ব্যাখ্যা করল যে সে তার মন থেকে তার চাচার মত হতে চেয়েছিল। চাচাই ওকে তৈরি করেছিলেন। মাঝে মাঝে আমার মনে হত মানুষ হলে ভাল হত। এখন মনে হচ্ছে ওরও একইরকম মনে হত।

“প্রথমে আমি ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় ওভাবে কিছু দেখতে পাবে না।”

ও ভেবেছিল আমাকে যদি বলা হয় যে একজন মানুষ আমাকে তৈরি করেছে, আমার মত কেউ তৈরি করেনি, তাহলে আমার কষ্ট কম হবে।

“তুমি একটা বোকা।”

“এখন সেটা বুঝতে পারছি।” কথাটা বলতে বলতে সে আলতো করে আমার মাথায় হাত রাখল। অন্তত আমার কাছে ও একজন মানুষ কি মানুষ

তাতে কিছু আসে যায় না। আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকলাম। অবশিষ্ট সময়টা আর অল্পই বাকি ছিল।

“আমি চাইছিলাম আমার চাচার পাশে সমাহিত হত। আমার দরকার ছিল এমন কাউকে, যে কিনা কোদাল দিয়ে আমার উপর মাটি ঢেলে দিতে পারে। আর এই স্বার্থপর কারনে আমি তোমাকে তৈরি করেছি।”

“কত বছর ধরে তুমি এই বাড়িতে একা ছিলে?”

“চাচা মারা যাওয়ার পর দুইশ বছর পার হয়ে গিয়েছে।”

যে আবেগগুলো আমাকে তৈরি করার পেছনে ওকে তাড়না দিয়েছে সেগুলো আমি ভাল করেই বুঝতে পারছিলাম।

যে মুহূর্তে মৃত্যু ডাকতে হাজির হয়, সে মুহূর্তে কেউ একজন যদি হাত ধরে বসে থাকে তাহলে কত ভালই না হয়। আর তাই যে মুহূর্তে মৃত্যু ওকে নিয়ে যাবে সে মুহূর্ত পর্যন্ত আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকতে চাইছিলাম। তাহলেই সে বুঝতে পারবে যে সে একা নেই।

একটা সময় আসবে যখন হয়ত আমাকেও মৃত্যুবরণ করতে হবে, তখন ও যা যা করেছে আমিও একই কাজ করব। যা যা যন্ত্রপাতি, প্ল্যান আর পার্টস প্রয়োজন, সবই গুদামঘরে রাখা আছে। যখন আমি আর নিজের একাকীত্ব সহ্য করতে পারব না তখন হয়ত আমি আমাকে কাছ থেকে ধরে রাখার জন্য নতুন একটা জীবন তৈরি করে নেব। আর তাই আমি ওকে ক্ষমা করে দিলাম।

আমরা দুজন একত্রে ঐ বেঞ্চে বসে চুপচাপ একটা সকাল কাটালাম। পুরোটা সময় আমি ওর বুকে আমার কান চেপে রেখেছিলাম। সে কিছুই বলছিল না, শুধু জানালা দিয়ে বাইরে শুকোতে দেয়া কাপড়গুলো বাতাসে নড়তে দেখছিল।

ইমারজেন্সি ব্যবস্থার পর থেকে আমার শরীর ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়ানো ছিল। সে আমার ঘাড়ের কাছের ব্যান্ডেজ ঠিক করে দিল। জানালা দিয়ে সূর্যের উষ্ণ আলো এসে আমার কোলের উপর পড়ছিল। সবকিছুই উষ্ণ ছিল। দয়াল আর নরম। এগুলো যখন আমি অনুভব করছিলাম তখন টের পেলাম হৃদয়ের সব বিয়োগাত্মক অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

“আমাকে সৃষ্টি করার জন্য তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ,” কথাগুলো নিজে নিজেই আমার ঠোঁটগুলো থেকে বেরিয়ে এল। “কিন্তু আমি আবার তোমাকে ঘৃণাও করি।”

বুকের উপরে মাথা রাখার কারনে আমি ওর মুখ দেখতে পারছিলাম না, তবে বুঝতে পারছিলাম যে সে মাথা উপর নিচ করল।

“তুমি যদি আমাকে তোমার কবর দেয়ার জন্য সৃষ্টি না করতে, তোমার অসুস্থতার পরিচর্যা করতে না দিতে, তাহলে আমি মৃত্যুভয় কি বা কারো মৃত্যু হলে হারানোর যে অনুভূতি হয় তা কখনোই জানতে পারতাম না।”

ওর দুর্বল আঙুলগুলো আমার চুল স্পর্শ করল।

“আমি যত বেশি কিছু একটাকে ভালবাসব, সেটাকে হারানোর পর ততই বেশি আমার হৃদয় কেঁদে উঠবে। আর বাকি যতটা সময় আমি বেঁচে থাকব, বার বার আমাকে এই কষ্টটা ভোগ করে যেতে হবে। ব্যাপারটা খুবই নিষ্ঠুর। এরকমই যদি হয় তাহলে আমি কখনোই আর ভালবাসতে চাই না। আমি একজন হৃদয়হীন ব্যক্তি হতে চাই…”

বাইরে কোথাও একটা পাখি ডাকছিল। আমি চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলাম আকাশে এক সাথে অনেক পাখি উড়ে যাচ্ছে। আমার গাল বেয়ে অণু গড়িয়ে পড়ল।

“এখন অবশ্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি যদি এই পৃথিবীতে কখনো জন্ম না নিতাম তাহলে এই ঘেসো পাহাড়টাকে কখনোই দেখা হত না। যদি আমার হৃদয় না থাকত তাহলে একটা পাখির বাসা দেখার মধ্যে কখনোই আনন্দ খুঁজে পেতাম না, তেতো কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ বাঁকাতে পারতাম না। এই উজ্জ্বল রত্নের মত মূল্যবান বিষয়গুলো অনুভব করতে পেরে আমার নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। সেভাবে যদি চিন্তা করা হয়, তাহলে আমার হৃদয় থেকে যতই রক্তপাত হোক না কেন, এসবই আসলে আমার বেঁচে থাকার পক্ষে প্রমাণ।”

অদ্ভুত একটা ব্যাপার, তাই না? একই সাথে কৃতজ্ঞতা আর অসন্তোষ দুটোই অনুভব করা? কিন্তু আমার এরকমই মনে হচ্ছিল। আসলে আমার মনে হয় সবাইই এভাবে চিন্তা করবে। এমনকি যে মানুষের সন্তানেরা অনেক বছর আগে মারা গিয়েছে, তারাও তাদের পিতা-মাতা সম্পর্কে এরকমই পরস্পরবিরোধী চিন্তাই করত। ওদেরকে ভালবাসা আর মৃত্যু সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে বড় করা হত। আর তারা তাদের জীবন পার করত এই দুনিয়ার আলোকোজ্জল অংশ থেকে অন্ধকার অংশে ভ্রমনের মধ্য দিয়ে।

আর সেই সন্তানেরা বড় হয়ে একইভাবে দুনিয়াতে নতুন জীবন আনার ভার গ্রহণ করত।

আমি পাহাড়ের পাদদেশে, তোমার চাচা যেখানে ঘুমিয়ে আছে তার পাশে তোমার জন্য কবর খুঁড়ব। সেখানে তোমাকে শুইয়ে চাদরের মত মাটি দিয়ে ঢেকে দেব। একটা ক্রুশ দাঁড় করাব আর কুয়ার কাছ থেকে বুনো ফুলের চারা এনে লাগিয়ে দেব। প্রতিদিন সকালে আমি তোমাকে অভিবাদন জানাবো। আর সারাদিন কি হল তা প্রতি সন্ধ্যায় এসে রিপোর্ট করব।

এরপর ঐ বেঞ্চে আমরা চুপচাপ একজন আরেকজনকে ধরে বসে থাকলাম। দুপুর প্রায় হয়ে এসেছিল। ওর শরীরে মোটরগুলোর শব্দ আরো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে আমি আর কোন শব্দ শুনতে পেলাম না। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ফিস ফিস করে বললাম, “গুড বাই।”

সেভেন রুমস

প্রথম দিন : শনিবার

জ্ঞান ফেরার পর প্রথমে বুঝে উঠতে পারছিলাম না কোথায় আছি। খুব ভয় হচ্ছিল। প্রথম যা মনে পড়ে তা হল একটা দুর্বল হলুদ বা অন্ধকারে মলিন আলো ছড়াচ্ছিল। চারদিকে ধূসর কংক্রিটের দেয়াল। চারকোনা রুমটায় কোন জানালা ছিল না। আমি মেঝেতে পড়ে ছিলাম, যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।

হাতে ভর দিয়ে ফ্লোরের উপর উঠে বসলাম। কংক্রিটের মেঝের রুক্ষতা ভালই টের পাচ্ছিলাম। রুমে চোখ বোলাতে গিয়ে মাথার ভেতর ব্যথায় ছ্যাঁত করে উঠল, মনে হল যেন ব্যথায় দুভাগ হয়ে যাচ্ছে।

এমন সময় কোথাও গোঙানির শব্দ পেলাম। আমার বড় বোন দুহাতে মাথা চেপে এক পাশে পড়ে আছে।

“আপু, কি হয়েছে! তুমি ঠিক আছ তো?”

আমার শরীর কাঁপছিল। আপু চোখ খুলল। আমার মত চারদিকে তাকিয়ে দেখল।

“আমরা কোথায়?”

“জানি না,” সাবধানে মাথা নেড়ে বললাম।

ছাদ থেকে ঝুলে থাকা নগ্ন বাটা ছাড়া পুরো রুমে আর কিছু নেই। কিছু না। আমাদের দুজনের কারোরই মনে নেই কিভাবে এখানে এসেছি।

আমার শুধু মনে আছে শহরতলীর একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কাছে দুপাশে গাছে ঢাকা একটা রাস্তা দিয়ে আমি আর আপু হাঁটছিলাম। আম্মু শপিং করছিল, আর আপু আমার দেখাশোনা করছিল। আমরা দুজনেই ব্যাপারটা নিয়ে বিরক্ত ছিলাম। আমার বয়স দশ, আমাকে বেবিসীট করার কিছু নেই। আর আমার বোনেরও ছোট ভাইকে দেখাশোনা করা ছাড়া

জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কিন্তু আম্মু কিছুতেই আমাদের একা ছাড়তে রাজি ছিলেন না।

তাই আমরা একজন আরেকজনের সাথে কথা না বলে চুপচাপ রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। আমার মনে আছে যে রাস্তার চারকোনা ইটগুলো একটা বিশেষ প্যাটার্ন ধরে বসানো ছিল। রাস্তার সাথের গাছগুলো আমাদের মাথার উপর ছাদের মত ছড়িয়ে ছিল।

মাঝে মাঝে আমি আর আপু একজন আরেকজনের সাথে ঝগড়া করছিলাম।

“তোর উচিত ছিল বাসায় থাকা!”

“তুমি একটা স্বার্থপর!”

আপু এবার হাইস্কুলে উঠবে। কিন্তু আমি এরইমধ্যে ওর সাথে তর্কে পারদর্শী হয়ে উঠেছি। আমরা যখন তর্ক করতে করতে এগুচ্ছিলাম তখন পেছনে ঝোঁপের মধ্যে নড়াচড়ার শব্দ কানে আসে। ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিল। ঘুরে তাকিয়ে দেখতে যাচ্ছিলাম এমন সময় মাথায় ভয়াবহ ব্যথা টের পাই। তারপর আর কিছু মনে নেই।

“কেউ নিশ্চয়ই পেছন থেকে আমার মাথায় বাড়ি দিয়েছিল। তারপর অজ্ঞান অবস্থায় আমাদের এখানে বয়ে এনেছে।”

আপু উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ঘড়ি দেখল।

“শনিবার! তারমানে রাত তিনটা বাজে এখন?”

ওর কব্জিতে একটা রুপালি রঙের এনালগ হাতঘড়ি। ঘড়ির ছোট ডিসেপ্লতে সপ্তাহের কোন দিন তাও দেখা যায়। ও ঘড়িটা এত ভালবাসে যে কখনো আমাকে ছুঁতেও দেয়না।

রুমটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা তিন মিটার করে হবে। একদম নিখুঁত কিউবের মত। বাল্বের মলিন আলো রুমের শক্ত, রুক্ষ তলে অন্ধকার ছায়া ফেলছিল।

এক দেয়ালে একটা লোহার দরজা লাগানো। ভেতর থেকে কোন হাতল বা খোলার জন্য কিছু নেই। দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটা ভারি লোহার পাত কংক্রিটের দেয়ালে গেঁথে আছে।

দরজার নিচে পাঁচ সেন্টিমিটারের মত একটা ফাঁক আছে যেটা দিয়ে বাইরের আলো দেখা যায়।

আমি শুয়ে দেখার চেষ্টা করলাম ফাঁক দিয়ে বাইরের কিছু দেখা যায় কিনা।

“কিছু দেখতে পাচ্ছিস?” আপু কাতর গলায় প্রশ্ন করল, কিন্তু আমি মাথা নাড়লাম।

রুমের দেয়াল আর মেঝে বেশ পরিস্কার। কেউ সম্ভবত কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্কার করেছে, কোথাও কোন ধুলো দেখলাম না। আমার মনে হল আমরা যেন একটা ধূসর ঠান্ডা বাক্সের মধ্যে বন্দি হয়ে আছি।

সিলিঙের মাঝখানে লাগানো ইলেকট্রিক বাল্বটা হল আলোর একমাত্র উৎস। আমি আর আপু পুরো রুমটা ঘুরে দেখলাম। আমাদের ছায়াগুলো চার দেয়ালের মধ্যে জেগে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল। বাল্বের আলো খুবই দুর্বল ছিল, রুমের কোনাগুলোতে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারছিল না।

রুমটার একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত ছিল। পঞ্চাশ সেন্টিমিটারের মত চওড়া একটা নালা রুমটাকে সমান দুটো ভাগে ভাগ করেছিল। দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়ালে, নালাটা বাম দিকের দেয়ালের মাঝখান থেকে এসে ডানদিকের দেয়ালের ভেতর দিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল। নালার পানি ছিল ঘোলাটে আর পানিতে বিদঘুঁটে গন্ধ ছিল। বাম থেকে এসে ডানে বয়ে যাওয়া এই পানি জঘন্য রঙের দাগ ফেলেছিল নালার গায়ে।

আপু দরজায় কিল মারছিল আর চিৎকার করছিল। “হ্যালো? কেউ শুনতে পাচ্ছেন?!”

কোন উত্তর নেই। দরজাটা একদম নিরেট, যত কিল ঘুষি মারা যোক, একটুও নড়ল না। ভারি দরজার উপর ওর হাতের বাড়ি রুমের ভেতর প্রতিধ্বনি তুলল। যেন নিষ্ঠুরভাবে আমাদের বোঝাতে চাইল আমরা এখানে কতখানি একা। আমি তখনো শক কাটিয়ে উঠতে পারিনি। কিছুটা বিষণ্ণতাও অনুভব করছিলাম। কি করে আমরা এখান থেকে বের হব? আমার বোনের ব্যাগটা উধাও। ব্যাগে ওর সেল ফোনটা ছিল। তারমানে বাসায়ও ফোন করতে পারব না।

আপু মেঝেতে মুখ চেপে দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে যতটা সম্ভব জোরে চিৎকার করে সাহায্য চাইল। ততক্ষণে ওর পুরো শরীর ঘেমে গোসল হয়ে গিয়েছে, কাঁপছিল।

এমন সময় কিছুটা দূরে কোথাও আমরা মানুষের কণ্ঠের ফিসফিসের মত কিছু একটা শুনতে পেলাম বলে মনে হল। আপু আর আমি একে অপরের দিকে তাকালাম। কাছাকাছি কোন মানুষ আছে বলে মনে হল। কণ্ঠস্বর যেহেতু পরিস্কার নয়, আমরা বুঝতে পারছিলাম না সে কি বলছিল। তারপরেও আমার মনে হল দুশ্চিন্তার ভার কিছুটা কমল।

এরপর বেশ কিছুক্ষণ আমরা দুজনেই পাল্লা দিয়ে দরজায় লাথি ঘুষি চালালাম, কিন্তু কোন কাজ হল না। একসময় দুজনেই হাঁপিয়ে গিয়ে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। মেঝেতে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

***

সকাল আটটার দিকে আমার ঘুম ভাঙল।

আমাদের ঘুমের মধ্যে দরজার নিচ দিয়ে একটা প্লেটে এক স্লাইস পাউরুটি, আর এক বাটি পরিস্কার পানি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আপু রুটিটা দুভাগ করে অর্ধেকটা আমাকে দিল।

কে পাউরুটি রেখে গিয়েছে তা নিয়ে আমরা কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। যে আমাদেরকে এখানে আটকে রেখেছে সেই যে হবে তা নিয়ে আমাদের কোন সন্দেহ হচ্ছিল না। আমরা ঘুমালেও নালা দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছিল অবিরাম। বাজে গন্ধটায় আমার গা গুলিয়ে উঠছিল, মনে হচ্ছিল যেন কোথাও কিছু একটা পঁচে গিয়েছে। পানিতে মরা পোকামাকড় আর খাবারের উচ্ছিষ্টও ভেসে আসছিল।

আমার টয়লেটে যাওয়া দরকার ছিল। আপুকে বলতেই আপু দরজার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

“মনে হয় না আমাদের এই রুমের বাইরে যেতে দেবে। তোকে এই নালাতেই কাজ সারতে হবে।”

আমরা বসে থেকে অপেক্ষা করছিলাম কখন রুম থেকে ছাড়া পাব। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকলেও কেউ দরজা খুলে আমাদের মুক্ত করতে এল না।

“কে আমাদেরকে এখানে আটকে রেখেছে, এবং কেন?” আপু রুমের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করল। আমি কোন উপায় না দেখে নালায় বাথরুম সারলাম। কংক্রিটের ধূসর দেয়াল, ইলেকট্রিক বাল্বের মলিন আলো আর অন্ধকার ছায়া, আপুর ক্লান্ত চেহারা…সবকিছু আমাকে বিষণ্ণ করে তুলছিল। আমি এই রুম থেকে বের হতে চাই, যত দ্রুত সম্ভব।

আপু আরো একবার দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করল। আমরা শুনতে পারলাম কোন এক জায়গা থেকে কেউ কিছু একটা জবাব দিল।

“আমি জানতাম, কেউ একজন আছে ওখানে।”

কিন্তু তখনো আমরা কথাগুলো বঝতে পারছিলাম না।

দরজা দিয়ে আর কোন খাবার এলো না। মনে হচ্ছিল আমাদের শুধু সকালে খাবার দেয়া হবে। আপুর কাছে অভিযোগ করলাম কতটা খিদে পেয়েছে আমার। ও শুধু আমার সাথে চিৎকার করল।

রুমে কোন জানালা না থাকায় নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যাচ্ছিল না, কিন্তু আপুর ঘড়ি বলছিল তখন সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। দরজার কাছ থেকে আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম দুর থেকে পায়ের শব্দ কাছে আসছে।

আপু রুমের কোণায় বসে ছিল তখন, মুখ তুলে তাকাল। আমি দরজা থেকে সরে এলাম।

পায়ের শব্দ আরো কাছে এল। আমরা ভেবেছিলাম কেউ একজন আমাদের রুমে আসছে। আমরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম সে এসে পুরো ব্যাপারটা আমাদেরকে ব্যাখ্যা করবে। আমরা দুজনেই দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলাম কখন দরজাটা খুলবে। কিন্তু পায়ের শব্দ পার হয়ে গেল। মনে হল, আপুর মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। ও দৌড়ে গেল দরজার দিকে।

“দাঁড়ান” ও মরিয়া হয়ে চিৎকার করল। লোটা আপুর অনুরোধ পাত্তা না দিয়ে হেঁটে চলে গেল।

“লোকটা যেই হোক, আমার মনে হয় না আমাদেরকে এখান থেকে বের হতে দেয়ার কোন ইচ্ছা তার আছে।” আমি বললাম।

“কিন্তু সেটা তো ঠিক না,” আপু বলল। ও ঠিক আমার মতই ভয় পেয়েছে।

ঘুম ভাঙার পর একটা পুরো দিন পার হয়ে গিয়েছে। সে সময় আমরা একটা ভারি দরজা খোলার আর বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম। সেই সাথে মানুষের কণ্ঠস্বর আর ভারি যন্ত্রপাতির আওয়াজ। কিন্তু কোন আওয়াজই স্পষ্ট ছিল না। মনে হচ্ছিল বিশাল কোন প্রাণীর গর্জনের শব্দ শোনা যাচ্ছে-বাতাসের কম্পনের চেয়ে বেশি কিছু নয়।

দরজা আর খুলল না। আমরাও একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

দ্বিতীয় দিন : রবিবার

চোখ খুলেই আমি দেখলাম দরজার ফাঁক দিয়ে আবারো এক স্লাইস পাউরুটি দেয়া হয়েছে। এবার কোন পানি দেয়া হয়নি। আগের দিনের খালি বাটিটা সেখানেই পড়ে আছে। আপর ধারণা আমরা বাটিটা ফাঁক দিয়ে ফেরত দেইনি বলে পানি দেয়া হয়নি।

“ধ্যাত!” আপু বাটিটা তুলে নিতে নিতে বলল। বাটিটা ও এমনভাবে তুলল মনে হচ্ছিল যেন ছুঁড়ে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু ভেঙে ফেললে আমাদেরকে হয়ত আর কখনোই পানি দেয়া না হতে পারে। আমি নিশ্চিত চিন্তাটা ওর মাথাতেও এসেছিল।

“আমাদেরকে এখান থেকে বের হতেই হবে।”

“তা তো অবশ্যই, কিন্তু সেটা কিভাবে?” আমি আস্তে করে প্রশ্ন করলাম। আপু এক মুহূর্তের জন্য আমার দিকে তাকিয়ে তারপর রুমের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া নালাটার দিকে তাকাল।

“এই নালাটা নিশ্চয়ই আমাদের টয়লেট করার জন্য রাখা হয়েছে।”

নালা দিয়ে অবিরাম পানি বয়ে যাচ্ছিল তখনো।

“নালাটা আমার জন্য অনেক সরু,” সে বলল, “কিন্তু আমার মনে হয় তুই এর মধ্যে দিয়ে যেতে পারবি, তুই শুকনা আছিস।”

আপুর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম তখন প্রায় দুপুর।

আপু যা চাইছে তা হল আমি নালায় নেমে তারপর দেয়ালের নিচে দিয়ে বেরিয়ে যাই। যদি বিল্ডিঙের বাইরে যেতে পারি তাহলে হয়ত কারো সাহায্য চাইতে পারব। যদি বের হতে নাও পারি তাহলেও আশপাশ সস্পর্কে জানা হবে। ওর চিন্তা ভাবনা আমার পছন্দ হল না।

নালা দিয়ে নামতে হলে আমাকে আন্ডারওয়্যার ছাড়া সব খুলতে হবে। তারপর ওই গন্ধ পানির ভেতর না জানি কি লুকিয়ে আছে সেগুলো ঠেলে বের হতে হবে, এই ব্যাপারটাও আমার পছন্দ হচ্ছিল না। কিন্তু আপু অনুনয় করছিল।

“প্লিজ! তুই পারবি?”

অগভীর পানিতে এক পা দিয়েও আমি ইতস্তত করছিলাম। পানির তলে আমার পা সহজেই পৌঁছল। তলাটা পিচ্ছিল। নালার পানি আমার হাঁটু পর্যন্তও গভীর না।

দেয়ালের মাথায় যেখান দিয়ে পানি বেরিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে অন্ধকার চারকোনা একটা গর্ত। গর্তটা ছোট হলেও আমার মনে হচ্ছিল সেটার ভেতর দিয়ে বের হতে পারব। পুরো ক্লাসের সবার মধ্যে সবচেয়ে ছোট সাইজ আমার।

মাথা নামিয়ে পানির যতটা কাছে যাওয়া সম্ভব গেলাম। বিচ্ছিরি দুর্গন্ধে চোখে পানি চলে এল। খুবই জঘন্য গন্ধ। চারকোনা গর্তের ওপাশে কি আছে তা দেখা যাচ্ছিল না। পানিতে ডুব দেয়া ছাড়া উপায় নেই।

ভয় পাচ্ছিলাম। যদি টানেলের ওপাশে ভয়ানক কিছু থেকে থাকে? বিপদজনক কিছু? তাহলে হয়ত আর ফেরত আসতে পারব না।

আপুকে কথাটা বলতে আপু আমার সব কাপড় চোপড় জোড়া আর আমাদের বেল্টগুলো দিয়ে একটা লাইফ লাইন বানালো। সেটার সাথে জুতার ফিতা দিয়ে আমার এক পায়ে বাধল। যদি আমি কোথাও আটকে যাই তাহলে ও আমাকে টেনে আনতে পারবে।

“কোনদিকে যাব প্রথমে?” ডান-বামে তাকিয়ে বললাম আমি। স্রোতের দিকে না সোতের বিপরীতে?

“যেদিকে তোর খুশি,” আপু বলল। “কিন্তু যদি মনে হয় টানেলটা অনেক লম্বা তাহলে ফেরত চলে আসবি।”

আমি ঠিক করলাম প্রথমে ঘোতের বিপরীত দিকেই যাব। অর্থাৎ দরজা থেকে বাম দিকের গর্তে। চোখ বন্ধ করে ডুব দিলাম। নোংরা পানিতে মনে হচ্ছিল পোকামাকড় সব আমার গায়ে কিলবিল করছে। দম ধরে রেখে চোখ বন্ধ করে গর্ত দিয়ে প্রথমে মাথা ঢুকালাম। টানেলের সিলিংটা খুবই নিচু আর সরু। মাথার পেছনটা সাথে সাথে সিলিঙের সাথে বাড়ি খেল। চারকোনা গর্তটা একদম আমার শরীরটা ঘষটে ঘষটে ঢুকানোর সমান চওড়া ছিল। মনে হচ্ছিল যেন সুইয়ের ফুটো দিয়ে সুতো ঢুকাচ্ছি। পানির মোত তেমন জোরালো ছিল না, যে কারনে আমাকেও খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

দুই মিটারের মত যাওয়ার পর আমি টের পেলাম মাথার সাথে সিলিঙের টোকা লাগছে না। নালাটা আবার চওড়া হয়ে গিয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি মাথা তুলে উঠে দাঁড়ালাম।

তারপর একটা চিৎকার শুনতে পেলাম।

চোখে নোংরা পানি ঢুকুক সে ইচ্ছা আমার ছিল না কিন্তু এখন চোখ খুলতে বাধ্য হলাম। এক মিনিটের জন্য মনে হল আগের রুমেই ফিরে এসেছি। জায়গাটা ঠিক আমাদের রুমটার মতই ধূসর, কংক্রিটের তৈরি একটা কিউব। সেই একই নালা দুই দেয়াল ভেদ করে চলে গিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম আমাদের রুমের একদিকের গর্ত দিয়ে ঢুকে আরেক দিকের গর্ত দিয়ে রুমে ফেরত এসেছি।

আসলে তা নয়। আমার বোনের বদলে এই রুমে অন্য কাউকে দেখতে পেলাম। একটা অল্প বয়সি মেয়ে। আপুর চেয়ে বয়সে একটু বড়ই হবে মনে হয়। আগে কখনো একে দেখেছি বলে মনে হয় না।

“কে তুমি?!” সে চিৎকার করছিল। বোঝা যাচ্ছিল আমাকে দেখে ভয় পেয়েছে। আমার থেকে যতটা সম্ভব দুরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি আর আমার বোন পাশের রুমে আছি। স্রোত যেদিকে যাচ্ছে সেদিকের রুমে। পায়ের থেকে ফিতাটা খুলে নিয়ে আমি ঠিক করলাম আরো সামনে যাব।

একইভাবে সামনে আরো দুটো রুম আবিষ্কার করলাম।

সুতরাং মূল বক্তব্য হল, আমাদের রুম থেকে স্রোতের বিপরীত দিকে গিয়ে মোট তিনটা রুম পেলাম। প্রত্যেক রুমেই একজন করে মেয়ে ছিল।

প্রথম রুমে ছিল অল্প বয়সি মেয়েটা।

তার পরের রুমে লম্বা চুলের আরেকটা মেয়ে।

সবচেয়ে দূরের রুমের মেয়েটার চুল লাল রঙ করা ছিল।

তারা সবাই আমাদের মতই বন্দি, এবং কেউই জানে না কেন তাদেরকে বন্দি করা হয়েছে। সবার মধ্যে আমি আর আপই সবচেয়ে ছোট। আমার মনে হয় আমাকে আর আপুকে এক রুমে রাখা হয়েছে কারন আমি এখনো অনেক ছোট। আমাকে পুরো একজন মানুষ হিসেবে ধরা হয়নি। আপু আর আমি মিলে একজন মানুষের সমান বা এরকম কিছু।

লাল চুলো মেয়েটার রুমের পর একটা লোহার খাঁচা দিয়ে নালার মখ বন্ধ করা ছিল যে কারনে আর সামনে যেতে পারিনি। রুমে ফিরে এসে আপুকে সব জানালাম।

ভেজা শরীর শুকিয়ে যাওয়ার পরও আমার গায়ে দুর্গন্ধ লেগে থাকল। ধোয়ার জন্য পরিস্কার পানি না থাকায় মনে হল দুর্গন্ধ পুরো রুমে ছড়িয়ে গেল। আপু অবশ্য গন্ধ নিয়ে কোন অভিযোগ করল না।

“তারমানে সোতের দিক থেকে চার নাম্বার রুমে রয়েছি আমরা।” বিড়বিড় করে বলল ও, কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত সে।

এক সারিতে অনেকগুলো রুম প্রত্যেকটায় একজন করে মানুষ বন্দি। ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার আশ্চর্য লাগছিল। আমার মত আরো অনেকে একই অবস্থায় আছে ভেবে একটু স্বস্তি, আবার একটু সাহসও পাচ্ছিলাম যেন।

প্রথম দেখায় মেয়েরা সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তারপর সবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দেখে মনে হচ্ছিল এরা সবাই বেশ কিছুদিন ধরে এখানে বন্দি, আর এতদিন কখনো কোন মানুষের দেখা পায়নি। তাদের কারোরই দরজা কখনো খুলেনি। তারা কোথায় আছে, তাদের দেয়ালের বাইরে কি আছে কিছু জানত না তারা। তাদের শরীর ছোট সাইজের না হওয়ায় কেউই নালায় নেমে অন্য পাশে গিয়ে দেখতে পারেনি।

আমি যখন নালার ভেতর দিয়ে রুমগুলোতে গিয়েছিলাম, প্রত্যেকে আমাকে অনুরোধ করেছে আবারও যেন আসি। এসে ওদেরকে যেন জানাই অন্য রুমগুলোতে আমি কি কি দেখেছি।

কে আমাদেরকে এখানে আটকে রেখেছে? আমরা কেউই এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। আমরা জানি না এই জায়গাটা আসলে কি, সবাই শুধু জানতে চাইছিলাম কখন আমরা এখান থেকে মুক্তি পাব।

আপুর কাছে সোতের বিপরীতের রুমগুলো নিয়ে রিপোর্ট করার পর তৈরি হলাম সোতের দিকে গিয়ে দেখার জন্য। আগের মতই আরো কয়েকটা কংক্রিটের রুম আবিষ্কার করলাম।

প্রথম রুমটায় আমার বোনের বয়েসি একটা মেয়ে ছিল। আমাকে দেখে সে চমকে উঠল। কিন্তু সব কথা শোনার পর শান্ত হল। বাকি সবার মতই কেউ একজন তাকে এখানে ধরে এনেছে। ওর কোন ধারণা নেই কেন কেউ সেটা করল।

পরের রুমটায় গেলাম। এই রুমটার সবই এক, শুধু একটা জিনিস অন্য রুমগুলোর চেয়ে আলাদা ছিল। সেটা হল, রুমটায় কেউ ছিল না। একদম শূন্য। আরেকটা মলিন বা ম্লান আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বাকি সব রুমগুলোতে কেউ না কেউ ছিল। এই একটা খালি দেখে আমার কাছে অদ্ভুত লাগল।

নালা ধরে পরের রুমটীয় গেলাম। ফিতা ধরে রাখার কেউ ছিল না কিন্তু সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছিলাম না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম আরো কিছু ছোট ছোট রুম পাবো যে কারনে ফিতা আপুর কাছে রেখে এসেছিলাম।

স্রোতের দিকে তৃতীয় রুমে আম্মুর বয়সি একজন মহিলাকে পেলাম।

তিনি আমাকে নালা থেকে উঠতে দেখে অবাক হলেন না। দূর থেকে দেখেই কেন জানি আমার মনে হচ্ছিল মহিলাটার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু একটা রয়েছে। তিনি জড়সড় হয়ে এক কোণায় বসে কাঁপছিলেন। প্রথম দেখায় যে তাকে আম্মুর বয়সি মনে হয়েছিল সেটা সম্ভবত ভুল, তিনি আরো কমবয়সি হবেন হয়ত।

সামনে তাকিয়ে দেখি নালার মাথায় একটা লোহার গেট লাগানো। এর বেশি আর যাওয়া সম্ভব নয়। তারমানে সোতের দিকের শেষ মাথায় চলে এসেছি।

“আপনি…আপনি ঠিক আছেন?” মহিলাটাকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি কাঁধ ভাগ করলেন। ভয় মেশানো দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করলেন, “কে..?”

তার কণ্ঠ কেমন মৃত শোনাল, কোন জোর নেই গলায়।

অন্য রুমের মেয়েদের চেয়ে উনি স্পষ্ট আলাদা রকমের। কংক্রিটের মেঝেতে মাথা চুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। মহিলাটার হাত মুখ ঘর্মাক্ত আর নোংরা হয়ে ছিল। চোখ ভেতরে ঢুকে গিয়েছে, চাপা ভাঙা, দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটা কংকাল।

আমি তাকে জানালাম আমি কে আর কি করছি। মনে হল তার অন্ধকার চোখগুলোতে একটু আলোর ফুলকি দেখা দিল।

“তারমানে তুমি বলছ ওদিকে আরো জীবিত মানুষ রয়েছে?!”

জীবিত মানুষ মানে? আমি তার কথার অর্থ বুঝতে পারছিলাম না।

“তুমি তাদের দেখেছ তাই না? না দেখে কিভাবে থাকা সম্ভব! প্রতিদিন, ঠিক সন্ধ্যা ছয়টার সময় এই নালা দিয়ে লাশগুলো ভেসে যায়!।”

***

ফিরে গিয়ে আপুকে সব খুলে বললাম।

“তারমানে সব মিলিয়ে রুমের সংখ্যা সাতটা। হুম…”

আপু যখন বলছিল, আমি তখন রুমগুলোকে নাম্বার দিচ্ছিলাম সহজে ব্যাখ্যা করার জন্য। সোতের শুরু থেকে ধরলে আমি আর আপু যেই রুমে আছি সেটা হল চার নাম্বার। আর শেষ রুম, যেটায় মহিলাটা ছিল সেটা হল সাত নাম্বার।

আমি ভাবছিলাম মহিলা যে পাগলামি কথাগুলো বলেছিল ওগুলো আপুকে বলব কিনা। আমাকে চিন্তা করতে দেখে আপু কিছু একটা আঁচ করতে পারল। কাঁপতে কাঁপতে আপুকে বললাম সাত নাম্বার রুমের মহিলা কি দেখেছে। প্রতিদিন ছয়টার সময় নাকি নালা দিয়ে মানুষের লাশ ভেসে যায়।

কথাগুলো শোনার সময় এরকম ছোট নালা দিয়ে কিভাবে লাশ ভেসে যেতে পারে তা ভেবে আমার আশ্চর্য লাগছিল। তাছাড়া সাত নাম্বার রুমে নালার শেষে একটা লোহার গেট আছে। লাশ যদি কোনভাবে ভেসেও আসে তাহলে গেটে আটকে যাওয়ার কথা না? মহিলা বলেছিল লাশগুলোকে কেটে ছোট ছোট টুকরো করা হয় যাতে গেটের লোহার বারগুলোর ভেতর দিয়ে পার হয়ে যেতে পারে। মাঝে মধ্যে দু-একটা টুকরো আটকে যায় ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই কোন সমস্যা হয় না। একদম প্রথম দিন থেকেই মহিলা নালা দিয়ে লাশগুলোকে ভেসে আসতে দেখছে।

আপু এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে সব শুনল।

“কাল সন্ধ্যায়ও দেখেছে?”

“হ্যাঁ।”

গত সন্ধ্যায় আমরা কোন লাশ ভেসে যেতে দেখিনি। তাহলে কিভাবে সম্ভব? আমরা তো ছয়টা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। রুমের যে অংশেই বসে থাকা হোক না কেন, নালা চোখে পড়বেই। যদি নালা দিয়ে অদ্ভুত কিছু ভেসে যায় সেটা আমাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

“আচ্ছা তিন নাম্বার রুমের মেয়েটা কি কিছু বলেছে যে সে এরকম কিছু দেখেছে?”

আমি মাথা নাড়লাম। একমাত্র সাত নাম্বার রুমের মহিলাই লাশের কথা বলেছে আর কেউ না। মহিলা কি কোন ধরনের হ্যালুসিনেসনে ভুগছে বা কিছু?

কিন্তু মহিলাটার চেহারা আমি মাথা থেকে দূর করতে পারছিলাম না। ওই ভাঙা মুখ, চোখের নিচের কালো দাগ। চোখগুলোতে এমন গভীর অন্ধকার ছিল যেন মনে হচ্ছিল সে ইতিমধ্যেই মৃত। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল এমন একজন যে কিনা ভীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। মহিলা যে সত্যিই খারাপ কিছু একটা দেখেছে তা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।

“তোমার কি মনে হয় মহিলা সত্যি বলছে?” আপুকে প্রশ্ন করলাম। কিন্তু আপু শুধু মাথা নেড়ে বলল, “জানি না।।” আমার এত ভয় লাগছিল বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত।

“যখন সময় হবে আমরা সব জানতে পারব।”

আপু আর আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকলাম। অপেক্ষায় থাকলাম কখন আপুর ঘড়িতে ছয়টা বাজে।

এক সময় ঘড়ির বড় কাটা আর ছোট কাটা মিলে সোজা একটা লাইন তৈরি করল। বাল্বের মলিন আলো পড়ে রুপালি কাটাগুলো চকচক করছিল। যেন আমাদেরকে বলতে চাইছিল যে সময় হয়েছে। আমি আর আপু জোরে দম নিয়ে নালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

দরজার বাইরে মনে হল দূরে কোথাও থেকে কারো যাওয়া কিংবা আসার শব্দ ভেসে এল। সেটা শুনে আমরা দুজনেই উসখুস করছিলাম। ছয়টা বাজার সাথে ওই পায়ের শব্দের কি কোন সংযোগ আছে? আপু কিছু বলল না। হয়ত ও ভাবছিল বলে কোন লাভ নেই।

দুর থেকে মনে হল কোন মেশিনের শব্দ ভেসে এল। কিন্তু নালা দিয়ে কোন লাশ কিংবা লাশের টুকরো ভেসে এল না। স্রেফ আগের সেই ঘোলা পানি আর পানিতে ভেসে থাকা মরা পোকামাকড়।

তৃতীয় দিন : সোমবার

ঘুম ভাঙল যখন তখন ঘড়িতে সকাল সাতটা। আমাদের নাশতা, এক স্লাইস পাউরুটি দরজার ফাঁক দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আগেরদিন আমরা পানির বাটিটা ফাঁক দিয়ে বের করে দিয়েছিলাম। সেটায় পানি ভরে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে। যে লোকটা কিংবা মহিলা আমাদের এখানে আটকে রেখেছে সে সম্ভবত পাউরুটির সাথে পানি জগ নিয়ে আসে। আমি কল্পনা করলাম মুখ-মন্ডলবিহীন একজন লোক এক দরজা থেকে আরেক দরজায় যাচ্ছে আর এক পিস করে রুটি দিচ্ছে, বাটিতে পানি ঢালছে।

আপু পাউরুটিটা দু টুকরো করে আমাকে বড় টুকরোটা দিল।

“তোকে একটা কাজ করতে হবে আমার জন্য,” সে বলল। সে চায় আমি নালা দিয়ে গিয়ে সবাইকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে আসব। আমার ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু ও তাহলে আমার রুটি ফিরিয়ে নেবে বলল। সুতরাং না করে আমার কোন উপায় ছিল না।

“আমি চাই তুই সবাইকে দুটো প্রশ্ন করবি। তারা কতদিন ধরে আটকে আছে আর নালা দিয়ে কোন লাশ ভেসে যেতে দেখেছে কিনা। এই দুটো প্রশ্ন।”

আমি তাই করলাম।

প্রথমে আমি মোতের বিপরীতের রুম তিনটায় গেলাম।

তিনজনই আমাকে দেখে খুশি হল। আমি তাদেরকে আপুর প্রশ্নগুলো করলাম।

রুমগুলোতে কোন জানালা ছিল না। তাই সময়-দিন হিসাব করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারপরেও সবারই মোটামুটি ধারণা ছিল তারা কতদিন ধরে বন্দি। ঘড়ি না থাকলেও প্রতিদিন একবার খাবার আসে, সেভাবে বলা সম্ভব কত দিন গেল।

তারপর আমি স্রোতের দিকের রুমগুলোতে গেলা, এবং অদ্ভুত একটা ব্যাপার দেখতে পেলাম।

পঞ্চম রুমে আগের দিনের মেয়েটাই ছিল।

কিন্তু ষষ্ঠ রুমে, যেটা কিনা গতকাল খালি ছিল, সেখানে এখন নতুন একজন মেয়ে। সে আমাকে দেখে ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। নোরায় মাখামাখি অবস্থায় আমাকে দেখে সে সম্ভবত কোন দৈত্য বা সেরকম কিছু একটা ভেবেছে। তাকে বোঝাতে গিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হল। সব শুনে একসময় সে কিছুটা শান্ত হল।

যা বুঝলাম তা হল গতকালকেই সে এই রুমে এসেছে। রাস্তায় জগিং করছিল। একটা সাদা স্টেশন ওয়াগন কাছেই পার্ক করা ছিল। গাড়িটা তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওর মনে হল কিছু একটা এসে মাথায় লাগল। এরপর সব অন্ধকার। মেয়েটা মাথা টিপে দেখল তখনো ব্যথা করছে কিনা।

আমি সপ্তম রুমে গেলাম। যে রুমে আগেরদিন পাগল মহিলাটা আমাকে লাশগুলোর কথা বলেছিল। কিন্তু রুমে কেউ ছিল না। মহিলা। উধাও। খালি কংক্রিটের রুম আর ম্লান হলুদ বাল্ব।

আরেকটা অদ্ভুত জিনিস আমি খেয়াল করলাম সেটা হল রুমটাকে আগের দিনের চেয়ে পরিস্কার দেখাচ্ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল না এখানে কেউ কখনো ছিল। দেয়ালে কিংবা মেঝেতে এক বিন্ধু ধুলো পড়ে নেই। যে মহিলাটার সাথে কথা বলেছিলাম সে কি তাহলে কল্পনা ছিল নাকি আমি ভুল রুমে এসেছি?

চতুর্থ রুমে ফিরে এসে আপুকে যা যা জেনেছি সব জানালাম।

প্রথম প্রশ্নের উত্তর সবার আলাদা আলাদা ছিল। এক নাম্বার রুমের লালচুলো মেয়েটার আজকে ষষ্ঠ দিন। সে নিশ্চিত যে সে ছয়দিন খাবার খেয়েছে।

দুই নাম্বার রুমের মেয়েটার আজকে পঞ্চম দিন। তিন নাম্বার রুমের মেয়েটার চতুর্থ দিন। চার নাম্বার রুমে আমরা আছি। আমাদের আজকে তৃতীয় দিন। পাঁচ নাম্বার রুমের মেয়েটার আজকে দ্বিতীয় দিন। ছয় নাম্বার রুমের মেয়েটাকে গত রাতে ধরে আনা হয়েছে। তারমানে আজকে তার প্রথম দিন।

সাত নাম্বার রুমের মহিলাটা কতদিন ধরে ছিল তা জানার উপায় নেই কারন সে এখন আর সেখানে নেই।

“হয়ত সে বের হয়ে যেতে পেরেছে?” আমি আপুকে বললাম, কিন্তু আপু অতটা নিশ্চিত না।

দ্বিতীয় প্রশ্নটা ছিল কেউ নালা দিয়ে লাশ ভেসে যেতে দেখেছে কিনা। উত্তর হল, কেউ দেখেনি। কিন্তু প্রশ্নটা শুনে সবাই একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।

“এই প্রশ্ন কেন করলে?” প্রত্যেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল। তাদের সবার ধারণা আমি বোধহয় ভেতরের কোন খবর জানি। তা অবশ্য জানি। আমি ছাড়া ওরা কেউ তো নালা দিয়ে এক রুম থেকে আরেক রুমে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছিল না। ওরা খালি পারছিল কল্পনা করতে। এরকম রুমে বন্দি থেকে কল্পনা করা ছাড়া সময় পার করার কোন উপায় নেই।

“পরে সব বলব।” তাড়াতাড়ি সবার উত্তর জানার জন্য আমি সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে পার পেতে চাচ্ছিলাম।

“এটা ঠিক না। আমি তোমাকে এভাবে যেতে দেব না। হয়ত যে গ্যাং আমাকে এখানে আটকে রেখেছে তুমি তাদেরই কেউ। অন্য আরো রুম আছে, সেখানে আরো মানুষ বন্দি আছে এই কথা আমি তোমার থেকে শুনে বিশ্বাস করব কেন?” প্রথম রুমের মেয়েটা আমাকে বলেছিল। নালার উপর দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে দেয়াল আটকে রেখেছিল যেন আমি যেতে না পারি।

আমার আর কোন উপায় ছিল না। তাই ওকে আগের রাতে শোনা পাগল মহিলার কথাগুলো বললাম। সব শুনে মেয়েটার মুখ কাগজের মত সাদা হয়ে গেল আর আমাকে নির্বোধ বলে বকাঝকা করল। সে বলল এই কাহিনী কোনভাবেই সত্যি হতে পারে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আমাকে যেতে দিল।

সবাই বলল তারা কোন লাশ ভেসে যেতে দেখেনি। আমার মনে হল সাত নাম্বার রুমের মহিলা তাহলে নিশ্চয়ই হ্যালুসিনেসন কিংবা এরকম কিছুতে ভুগছিল। মহিলাটা বলেছিল সে নাকি প্রতিদিন একই সময়ে লাশের টুকরো ভেসে যেতে দেখে। কিন্তু অন্য মেয়েরা বলল তারা সেরকম কিছু দেখেনি। এই ধাঁধার কোন অর্থ বের করতে পারলাম না আমি।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি দড়ি দিয়ে শরীর থেকে নোংরা তরলগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করলাম। আপু আর আমি মিলে আমার শার্ট আর প্যান্ট দিয়ে দড়িটা বানিয়েছি। এই কয়েকদিন আমি শুধু আমার আন্ডারপ্যান্ট পরে আছি। রুমটা যথেষ্ট উষ্ণ, যে কারনে ঠাণ্ডা লাগার চিন্তা নেই। দড়িটার এমনিতে আর কোন কাজ নেই, টাওয়াল হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া। অন্য সময় সেটা রুমের কোণায় পড়ে থাকে।

আমি মেঝেতে দলা পাকিয়ে শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কংক্রিটের মেঝে বুকের হাড়ে লেগে ব্যথা করছিল, কিন্তু কিছু করার ছিল না।

যদিও আমার তথ্যগুলো অবিশ্বাস্য, কিন্তু তারপরেও আমার মনে হল রুমগুলোতে গিয়ে গিয়ে সবার সাথে কথা বলা উচিত। তারা রুমে একা রয়েছে আর সবাই আতংকিত।

কিন্তু অন্যদিকে আমার সাথে কথা বললে ওরা আরো বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। আমি জানি না কাজটা ভাল হবে নাকি আরো খারাপ হবে।

আপু রুমের এক কোনায় বসে দেয়ালের দিকে একটানা তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ সে খপ করে কিছু একটা ধরল।

“কোত্থেকে আমার মাথায় একটা চুল এসে পড়ল,” অবাক হয়ে দু আঙুলে একটা লম্বা চুল ধরে রেখেছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না ও কি বলছে।

“দ্যাখ, কত বড় চুল!”

ও উঠে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুলটা কত লম্বা সেটা মাপার চেষ্টা করল। আন্দাজে মনে হল পঞ্চাশ সেন্টিমিটারের মত হবে।

অবশেষে আমি বুঝতে পারলাম ও কি বলার চেষ্টা করছে। আমার বা আপুর কারো চুলই এত বড় না। তারমানে চুলটা অবশ্যই অন্য কারোর।

“তাহলে কি আমাদের আগে এই রুমে অন্য কাউকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল?”

আপুর মুখ শুকিয়ে গেল। মুখ দিয়ে ভাঙা ভাঙা শব্দ বেরিয়ে এল।

“তাহলে…তাহলে…অবশ্যই…না, না…হয়তো…হয়তো বোকার মত কথা…কিন্তু…তুই কি বুঝতে পারছিস কি বলতে চাইছি? সোতের বিপরীতের রুমগুলোর মানুষগুলো আমাদের চেয়ে বেশি সময় ধরে আছে। দুই নাম্বার রুমের থেকে এক নাম্বার রুমের মেয়েটা এক দিন বেশি আছে। তারমানে হল আমাদের সবাইকে সিরিয়ালি রাখা হয়েছে। প্রথম রুম থেকে।”

আপু মনে করিয়ে দিল প্রত্যেক রুমে কে কয়দিন ধরে আছে।

“তাহলে এখানে কে ছিল?”

“এখানে আর কেউ ছিল? এটা কি আগে খালি ছিল না?”

“হ্যাঁ খালি ছিল ঠিকই। কিন্তু তার আগে?”

আপু রুমের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল। এক পাশ থেকে আরেক পাশে মাথা দোলাচ্ছে।

“ভেবে দ্যাখ, গতকাল আমাদের যখন ঘুম ভাংল, সেটা ছিল আমাদের দ্বিতীয় দিন। আমাদের পাশের পাঁচ নাম্বার রুমের মেয়েটার জন্য প্রথম দিন। ছয় নাম্বার রুমটা খালি ছিল, বা বলা যায় শুন্য দিন। কিন্তু সাত নাম্বার রুমের মহিলাটার জন্য কত নাম্বার দিন ছিল? সিরিয়ালি ধরলে মাইনাস এক দিন। তোদের কি স্কুলে নেগেটিভ নাম্বার শেখানো শুরু করেছে?”

“হ্যাঁ ওইটুকু আমি জানি।” কিন্তু সত্যি কথা হল ব্যাপারটা বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছিল।

“বুঝতে পারছিস না তাই না? মাইনাস একদিনে ওই রুমে কেউ ছিল। তারমানে, আমার ধারণা, গতকাল ওই মহিলার এখানে ষষ্ট দিন ছিল। সে নিশ্চয়ই এক নাম্বার রুমের মেয়েটার এক দিন আগে এখানে এসেছিল।”

“তাহলে সে এখন কোথায়?”

আপু পায়চারি থামিয়ে আমার দিকে তাকাল। শকড। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে আমাকে ব্যাখ্যা করল। সম্ভবত ওই মহিলা আর এই দুনিয়ায় নেই। সম্ভবত সে এখন মৃত।

গতকাল যে উধাও হয়ে গিয়েছে তার জায়গায় আজকে নতুন মানুষ এসেছে। আমি যা দেখেছি তা নিয়ে চিন্তা করলাম। তথ্যগুলো আপুর কথার সাথে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম।

“একেকটা দিন যায়, আর স্রোতের দিকে একটা করে রুম খালি হতে থাকে। শেষ মাথায় গিয়ে আবার প্রথম রুম থেকে শুরু হয়। সাতটা রুম। সপ্তাহের প্রতিদিনের জন্য একটা করে…”

একেক দিন একেকটা রুমের মানুষকে খুন করা হয় আর নালা দিয়ে তার লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়। পরের দিন সেই রুমে নতুন মানুষ আনা হয়।

খুন করা হয় আর সে জায়গা নতুন কাউকে দিয়ে পূরণ করা হয়।

গতকাল ছয় নাম্বার রুমে কেউ ছিল না। আজকে সেখানে নতুন একজনকে আনা হয়েছে। নতুন একজনকে কিডন্যাপ করা হয়েছে-শূন্যস্থান পূরণ করা হয়েছে।

গতকাল সাত নাম্বার রুমে একজন ছিল। আজকে সেখানে কেউ নেই, উধাও। কেটে টুকরো টুকরো করে নালা দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে।

আপু মেঝের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছিল। শুনে মনে হচ্ছিল কোন জাদুমন্ত্র পড়ছে। ওর দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোন কিছুতে সীমাবদ্ধ ছিল না।

“সেকারনেই সাত নাম্বার রুমের মহিলাটা নালা দিয়ে লাশ ভেসে যেতে দেখেছে। রুমগুলোতে মানুষ এমনভাবে রাখা যে নালা দিয়ে কেউ ভেসে গেলে সোতের দিকের রুমগুলোর কারো দেখতে পাওয়ার কথা না। মহিলাটা ঠিকই দেখেছিল, হ্যালুসিনেশনে ভুগছিল না সে। শেষ রুমে থাকায় অন্য রুমের লাশগুলোকে সে ভেসে যেতে দেখেছিল।”

আর গতকাল সাত নাম্বার রুমের মহিলাটা খুন হওয়ায় তার লাশ কেউ দেখেনি। আপু আমাকে পুরোটা ব্যাখ্যা করে বোঝাল। পুরো ব্যাপারটা অনেক জটিল মনে হলেও আপ যা বলছিল তা আমি বিশ্বাস করলাম।

“আমাদেরকে এখানে আনা হয়েছে শুক্রবার। আমার মনে হয় ওই দিন পাঁচ নাম্বার রুমে যে ছিল তাকে খুন করে নালায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরেরদিন ছয় নাম্বার রুমের জনকে খুন করা হয় আর পাঁচ নাম্বার রুমে নতুন বন্দি আনা হয়। তুই যে সেদিন খালি রুম দেখলি, ওই রুমের বন্দিকে খুন করা হয়েছিল। তারপর রবিবারে সাত নাম্বার রুমের বন্দিকে খুন করা হয়। আমরা সারাদিন তাকিয়ে থাকলেও নালায় কিছু দেখতে পেতাম না কারন লাশ স্রোতের উল্টোদিকে যায় না। আজকে সোমবার…”

প্রথম রুমের বন্দিকে আজকে খুন করা হবে।

***

আমি ছুটে প্রথম রুমে গেলাম।

লাল চুলের মেয়েটাকে আপুর ব্যাখ্যা শোনালাম। কিন্তু সে আমাকে বিশ্বাস করল না। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল এরকম কোন কিছু কখনোই সত্যি হতে পারে না।

“কিন্তু কোনভাবে যদি সেরকম কিছু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে পালানোর উপায় খোঁজাই কি বুদ্ধিমানের মত কাজ হবে না?”

কিন্তু আমাদের দুজনেরই কোন ধারণা ছিল না কি করা যেতে পারে।

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না!” সে ক্ষেপে গিয়ে আমার মুখের উপর চিৎকার করল। “আর এটাই বা কোন নরকে এসে পড়লাম?”

আমি নালা দিয়ে আমাদের রুমে ফিরে এলাম। আসার সময় আমাকে অন্য দুটো রুমও পার হতে হল। দু জায়গাতেই আমাকে প্রশ্নের উত্তর দিতে হল কোন খবর জানি কিনা। আমার কিছু বলা উচিত কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না। তাই ঠিক করলাম আপাতত কিছু না বলাই ভাল। আমি শুধু বললাম যে শিগগিরি এসে জানাব।

আপু রুমের এক কোণায় হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে ছিল। আমি নালা থেকে উঠতেই এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল, খেয়াল নেই যে আমি নোংরায় মাখামাখি হয়ে আছি। ওর ঘড়িতে তখন ছয়টা বাজে।

দুজনেই একসাথে খেয়াল করলাম যে নালার পানি লাল হয়ে উঠেছে। আমি আর আপু দুজনেই কথা হারিয়ে নালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ছোট ছোট সাদা সাদা জিনিস নালার চারকোনা গর্ত দিয়ে ভেসে আসতে লাগল। আমরা প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না ওগুলো কি। পরে মুখের নিচের পাটির একসারি দাঁত ভাসতে দেখলাম। আধ ডোবা অবস্থায় সেটা নালার এক মাথা থেকে ভেসে আরেক মাথায় চলে গেল। শিগগিরি কান, আঙুল, পেশী, হাড় সব পিছু পিছু ভেসে এল। একটা আঙুলে তখনো সোনার আংটি লেগে ছিল। একগাদা লাল চুল ভেসে গেল। ভালো করে তাকালে আমরা দেখলাম শুধু চুল না, চুলের সাথে মাথার তালুর কিছু অংশ লেগে ছিল।

আমি বুঝতে পারছিলাম এটা এক নাম্বার রুমের মেয়েটার লাশ। ঘোলাটে পানিতে ওর শরীরের অসংখ্য টুকরো ভেসে যেতে লাগল। ওগুলো দেখে মনে হচ্ছিল না কোন মানুষের শরীর। আমার কেমন যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল।

আপু হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে গোঙাতে লাগল। এক কোণায় গিয়ে বমি করল। পেটে তো তেমন কিছু ছিল না, বমিতে কিছু বের হল না। আমি গিয়ে ওর সাথে কথা বললাম কিন্তু ও কোন উত্তর দিল না। চুপ করে থাকল।

আলাদা আলাদা কিউব আকৃতির রুমে আমাদেরকে আটকে রাখা হয়েছে। খুন করার আগে আমাদেরকে কিছু সময় দেয়া হয়েছে একাকী বসে চিন্তা করার জন্য।

“কোন নরকে এসে পড়লাম?” এক নাম্বার রুমের মেয়েটা আমার দিকে চিৎকার করে বলেছিল। তার খনখনে, কাঁপাকাপা কন্ঠ যেন আমার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, কোনভাবে মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না। আমি উপলদ্ধি করতে পারছিলাম এই বন্ধ রুমগুলো শুধু আমাদেরকে আটকে রাখেনি, এরচেয়ে অনেক বেশি কিছু এর সাথে জড়িত। আমার মনে হচ্ছিল রুমগুলো হয়ত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের জীবন, আমাদের আত্মাকে এখানে আটকে রেখেছিল। আমাদেরকে আলাদা করে ফেলেছিল। আমাদের ভেতর থেকে যেন আলো পর্যন্ত কেছু নিয়েছিল। এই জায়গাটা একটা জেলখানা, যা আমাদের আত্মাকে বন্দি করে রেখেছে। এই রুম আমাকে এমন এক একাকীত্ব শিখিয়েছে যা আমি আগে কখনো দেখিনি, আগে কখনো অনুভব করিনি। ভবিষ্যহীন, মুল্যহীন এক জীবন।

আপু নিজেকে বলের মত গুটিয়ে নিয়ে হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে ফোঁপাচ্ছিল। আমি নিজের মনে ভাবলাম অতীতে আসলে মানুষ কিরকম ছিল? যখন আমাদের জন্যও হয়নি, কিংবা ইতিহাস শুরুরও আগে? অন্ধকার একটা স্যাঁতস্যাঁতে বাক্সে বসে আমার বোন এখন যা করছে তা কি? আঙুলে গুনে দেখলাম খুন হওয়ার আগে আমাদের হাতে আর কদিন সময় আছে। ষষ্ঠ দিনে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টায় আমাদেরকে খুন করা হবে।

চতুর্থ দিন : মঙ্গলবার

কয়েক ঘন্টা পর নালার পানি থেকে লাল রঙ মিলিয়ে গেল। শেষের দিকে পানির মধ্যে সাবানের ফেনার মত ভাসছিল। যেন কেউ ধোয়ার কাজে নালাটা ব্যবহার করছিল। হয়ত কেউ প্রথম রুমটা পরিস্কার করছিল। কাউকে খুন করলে প্রচুর রক্ত বের হওয়ার কথা। সেগুলো তো কাউকে না কাউকে পরিস্কার করতে হবে তাই না?

আপুর হাতে ঘড়িতে বারোটা বাজল। মাঝরাত। মঙ্গলবারের শুরু। আমাদের এখানে আনার পর চতুর্থ দিন।

আমি নালায় নেমে এক নাম্বার রুমের দিকে গেলাম।

অন্য দুই রুমের দুজন মেয়েই আমাকে নালায় ভাসতে থাকা জিনিসগুলো নিয়ে প্রশ্ন করল। “পরে,” আমি তাদেরকে বললাম। তাড়াতাড়ি প্রথম রুমে যেতে হবে আমাকে।

যেমনটা ভেবেছিলাম। লালচুলো মেয়েটা নেই। রুমটা দেখে মনে হচ্ছিল হোস পাইপ দিয়ে থোয়া হয়েছে। কেউ একজন অবশ্যই রুমটা পরিস্কার করেছে। যদিও সে কে সে ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে সেই একই লোকই আমাদেরকে এখানে বন্দি করে রেখেছে।

আমি একই রকম নিশ্চিত যে আপু আমাদের রুমে যে লম্বা চুল খ পেয়েছিল তার মালিক আমাদের আগে আমাদের রুমে বন্দি ছিল। এবং খুন হয়েছিল। পরিস্কার করার সময় ওই চুলটা কোনভাবে রয়ে গিয়েছিল।

ভেবে অবাক লাগল কি ধরনের মানুষ হলে আরেক মানুষকে ধরে এনে এই রুমগুলোতে রেখে খুন করতে পারে। ছয়দিন একটা রুমে আটকে রেখে উপভোগ করছে তারপর এসে কেটে টুকরো টুকরো করছে।

আমরা এখন পর্যন্ত লোকটাকে দেখিনি। তার গলার আওয়াজ শুনিনি। কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে সে আছে, প্রতিদিন দরজার সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করছে। প্রতিদিন নিয়ে আসছে পাউরুটি আর পানি। আর মৃত্যু। ওই লোকটা এই রুমগুলোর ডিজাইন করেছে, এগুলো তৈরি করেছে, আর সেই সাথে তৈরি করেছে এখানের মৃত্যুর নিয়মগুলোও।

আমরা না চাইলেও বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। এক সময় না এক সময় আমি আর আমার বোনও খুন হব! মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই খুনির সাথে আমাদের দেখা হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।

এই খুনি আসলে স্বয়ং মৃত্যু দেবতা। আপু, আমি, বাকি সবাই-এই উন্মাদ লোকটার ফাঁদে আটকা পড়ে আছি। আমাদের সবার মৃত্যু ঘোষণা করা হয়ে গিয়েছে।

***

আমি দুই নাম্বার রুমে ফিরলাম। ওই রুমের মেয়েটাকে বললাম ওর ছয়দিন বন্দিত্ব হয়ে গিয়েছে। আরো বললাম আপু যা যা আগেরদিন বলেছিল। এই মেয়েটা আমাকে নির্বোধ বলে গালি দেয়নি। ও নালা দিয়ে লাশের টুকরোগুলো ভেসে যেতে দেখেছে। ও বুঝতে পেরেছে ও এখানে একজন বন্দি। যে কিনা আর কোনদিন দুনিয়ার আলো চোখে দেখতে পারবে না। আমার বলা শেষ হওয়ার পর সে চুপ করে থাকল, ঠিক আপুর মত।

“আমি পরে আবার আসব,” বলে রুম নাম্বার তিনের দিকে গেলাম। সেখানে আমি একই কাহিনী আবারো বললাম।

তিন নাম্বার রুমের মেয়েটা খন হবে কালকে। এতদিন ওর কোন ধারণা ছিল না কতদিন পর্যন্ত এখানে বন্দি অবস্থায় থাকতে হবে। এখন স্পষ্ট ধারণা হল।

মেয়েটা যখন মুখে হাত চেপে কাঁদতে শুরু করল। আমি কেন জানি অবাক হলাম না।

আমি জানি না, ঠিক কোন সময়ে আপনি মরতে যাচ্ছেন তা জানতে পারা ভাল নাকি খারাপ। হয়ত কিছু না জানতে পারাই সব থেকে ভাল। তাহলে আপনি সেফ উদ্বিগ্ন হয়ে দিনের পর দিন নালা দিয়ে লাশ ভেসে যেতে দেখবেন। তারপর একদিন হঠাৎ দরজা খুলে যাবে এবং কোনদিন দেখেননি এমন কেউ এসে আপনাকে খুন করবে। আমার সামনে কান্নারত মেয়েটাকে দেখে আমার সাত নাম্বার রুমের মহিলাটার কথা মনে পড়ল। এদের সবার চেহারার অভিব্যক্তি একই রকমের ছিল।

আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে দিনের পর দিন এই চারকোনা কংক্রিটের ঘরগুলোতে আটকে রাখার ব্যাপারটা কারো কাছে খেলার মত। মৃত্যু দেবতা আসবে, আপনার নাম ধরে ডাকবে…পুরো ব্যাপারটাই বিচ্ছিরি রকমের ভীতিজনক।

সা