গানের শব্দ এখন আরো স্পষ্ট হয়েছে। টিভি বা রেডিও না, কেউ একজন গান গাইছে নিচে।
তলকুঠুরি। ভুল দেখিনি তাহলে।
খুব সাবধানে নিচে নামতে লাগলাম। এতটাই বিচলিত যে শ্বাস নিতেও ভুলে গেছি। বুকে কেউ হাতুড়ির বাড়ি বসাচ্ছে অনবরত।
সিঁড়ির দু-পাশে নগ্ন ইটের দেয়াল। ওখানে হাত রেখে নিচে নামছি। যাতে হুমড়ি খেয়ে না পড়ে যাই।
সিঁড়ির নিচে সঁতসেঁতে গন্ধ। আর্দ্রতা ওপরের থেকে অনেক বেশি। একবার মনে হলো দম বন্ধ হয়ে যাবে। টিমটিমে আলোটা ঘরের অন্ধকার দূর করতে পারছে না।
একটা ঘরে প্রবেশ করেছি, এখানেও মৃদু আলোর একটা বা ঝুলছে। সিলিং থেকে। একটু পর পর নিভছে-জ্বলছে সেটা, যে কোন সময় চিরতরে নিভে যাবে। কোনার দিকগুলোতে পৌঁছাচ্ছে না বাটার আলো। বরং অন্ধকার আরো গাঢ় করে তুলছে মনে হলো। পেছনের দিকে কয়েকটা শেলফের অবয়ব চোখে পড়লো।
আমার ঠিক সামনে বিশাল একটা কাঠের ডেস্ক। এই ডেস্কটা খুব সম্ভবত ওয়ার্কবেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। হাতুড়ি, করাত জাতীয় কয়েকটা যন্ত্র পড়ে আছে এলোমেলো ভাবে। অন্য যন্ত্রপাতিগুলো পুরনো হলেও একটা হাতুড়ি একদম নতুন।
স্কালপেলও দেখতে পেলাম। শেষ এরকম কিছু দেখেছিলাম হাসপাতালে, আমার অপারেশনের সময়। মৃদু আলোয় চকচক করছে স্কালপেলের ফলাটা। ডেস্কের পুরো উপরিতল জুড়ে কালচে দাগ।
ওগুলো মানুষের রক্ত, এই ভাবনাটা জোর করে মাথা থেকে দূর করে দিলাম। তেলও হতে পারে, মনে মনে বললাম।
শেলফগুলোর সামনে কয়েকটা বাক্স ভর্তি পুরনো অব্যবহৃত জিনিসপত্র। হয়তো এখানে এমন কিছু জিনিস আছে যেগুলো বাড়িটা তৈরির সময় থেকে ছিল। একটা পুরনো আমলের পেন্ডুলাম ক্লক আর ধুলোভর্তি বেবি ক্যারিজ রাখা এক পাশে।
এখনও গানের আওয়াজ ভেসে আসছে ঘরটার পেছন দিক থেকে। ওদিকটায় বাল্বের আলো পৌঁছায় না। ইংরেজি কথাগুলো বুঝতে পারছি না, তবে গানটা যে কষ্টের সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। মনে হচ্ছে যেন এই বাড়ির সমগ্র অন্ধকার একীভূত হয়ে গানটা গাইছে।
একবার গায়িকার উদ্দেশ্যে কিছু বলে উঠতে চাইলাম, কিন্তু কোন আওয়াজ বেরুলো না গলা দিয়ে। আরো কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, “কেউ আছেন?”
অন্ধকার যেন গিলে নিল আমার কথাটা। নীরবতা নেমে এলো গোটা তলকুঠুরিতে।
এরপর এক নারীকণ্ঠ ভেসে এলো ঘরের পেছন দিক থেকে। “কে আপনি?” উৎকণ্ঠা মিশে আছে তার গলায়।
“তুমি নিশ্চয়ই হিতোমি আইজাওয়া,” কণ্ঠস্বরটা যেদিক থেকে আসছে সেদিকে এগিয়ে বললাম।
“ও হিতোমি না।”
একটা পিলারের পাশে থমকে গেলাম।
একটা তরুণের কণ্ঠ এটা। আগের জায়গা থেকেই আসছে।
“আমি শিনিচি হিসামোতো। একটু আগে ইউকি কথা বলেছে আপনার সাথে।”
এই প্রথম শুনলাম নাম দুটো মাথায় চিন্তার ঝড় বইতে শুরু করেছে। এতদিন তো ভেবে এসেছি তলকুঠুরিতে একাই আছে হিতোমি।
“হিতোমি কোথায়?”
“ও বোধহয় ঘুমাচ্ছে। একটু আস্তে কথা বলুন,” শিনিচি বললো।
দু’জনে ফিসফিস করছে তাকের অন্য পাশ থেকে। আমি তাদের দেখতে পাচ্ছি না অন্ধকারে, কিন্তু তারা নিশ্চয়ই আমাকে দেখতে পাচ্ছে।
প্রচণ্ড অদ্ভুত একটা অনুভূতি কাজ করছে আমার ভেতরে। চেষ্টা করেও সামনে এগোতে পারছি না। এই বাটার টিমটিমে আলোর বলয় ছেড়ে ইচ্ছে করছে না যেতে। অন্য দু’জন অন্ধকারে কেন লুকিয়ে আছে কে জানে। খারাপ কিছু ভাবনা মাথায় খেলে গেল, সেগুলো সত্যি না হলেই ভালো হবে।
“আপনি নিশ্চয়ই শিওজাকির বন্ধু নন?” ইউকি জিজ্ঞেস করলো। শিওজাকিকে নিয়ে কেন কথা বলছে সে, জানি না। আপনার কণ্ঠস্বর শুনে একবার নড়ে উঠেছে ও।”
“সে… এখানে?”
“আমাদের পাশেই আছে,” শিনিচি বললো। “কথা বলার মত দশায় নেই, কিন্তু আপনার গলা শুনে গুঙিয়ে উঠেছিল।
শিওজাকি এখানেই আছে। কথা বলার মত দশায় নেই। এটা কি কোন কৌতুকশালা নাকি ভাবতে লাগলাম।
এখনও চোখে পেছনের অন্ধকারটা পুরোপুরি সয়ে আসেনি, তাই তাদের দেখতে পাচ্ছি না। নিচু সিলিংয়ের কারণে দমবন্ধ লাগছে। আমার বোধহয় ক্লস্টোফোবিয়া আছে।
পাশে সিলিং থেকে কিছু জিনিস ঝুলছে। কয়েকটা মাছ ধরার বর্শি। ওগুলোর মাথায় শুকনো কিসব লেগে আছে।
“শিওজাকি কথা বলতে পারছে না কেন?” জিজ্ঞেস করলাম।
“দু’হাতে হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে আছে সে। পুরো শরীরে কয়েকটা শিক বিধাননা। একটা শিক বোধহয় ফুসফুস ফুটো করে বেরিয়ে গেছে। এখনও বেঁচে আছে অবশ্য।”
“সেটা কি করে সম্ভব?” কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করলাম। বিশাল কিছু একটা নড়ে ওঠার শব্দ কানে এলো।
“সম্ভব। কারণটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে,” অনিশ্চিত কণ্ঠে বললো শিনিচি। “দয়া করে আস্তে কথা বলুন।
এই সময় একটা তাক নড়ে উঠলো। যেন কিছু একটা ধাক্কা দিয়েছে সেটাকে। একটা বাক্স ওপর থেকে পড়ে গেল নিচে।
মুখে হাত দিয়ে পিছিয়ে এলাম।
তাকটা নড়ার ফলে বাল্বের আলো শিনিচি আর ইউকির ওপর গিয়ে পড়েলো এক মুহূর্তের জন্যে।
নিশ্চয়ই ভুল দেখেছি। মাথা খারাপ হয়ে গেছে আমার। নিজেকে প্রবোধ দিলাম।
“চেহারা এরকম করবেন না প্লিজ,” দুঃখী কণ্ঠে বললো ইউকি।
“আপনাকে দেখতে পাচ্ছি আমরা।
“কেন…” কথাটা শেষ করতে পারলাম না। কেউ যেন ভেতর থেকে সব শক্তি শুষে নিয়েছে আমার। এখান থেকে এখনও পালাইনি কারণ এক কদম পা ফেলার শক্তি নেই।
