একাই ওপরে উঠলাম। দোতলার হলওয়ে থেকে নিচতলাটা পুরোপুরি দেখা যায়। এখানেও কয়েকটা ঘর পাশাপাশি। একটা ঘর দেখে মনে হলো শিওজাকির বেডরুম। অন্য ঘরটায় বিশাল একটা কাঠের ডেস্ক। খুব সম্ভবত
স্টাডি রুম। আরো দমে গেলাম। কোথাও কিছু নেই।
কিছুক্ষণ আগে যখন সুমিদা বললো যে ওপরে আসবে না, ভেতরে ভেতরে রেগে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তার কথায় যুক্তি আছে।
এতক্ষণে ভয়টা অবশ্য কেটে গেছে। বাইরে থেকে দেখে শয়তানের বাসস্থান মনে হলেও, বাড়িটার ভেতরে অদ্ভুত কিছু নেই। বরং শিওজাকির আঁকা ছবিগুলো দেখে মনে হচ্ছে এরকম কারো অপহরণকারী হবার সম্ভাবনা একদমই ক্ষীণ। একটা ছবিতে প্রজাপতিকে তাড়া করছে একটা বাচ্চা কুকুর, অন্যটায় টিভি দেখছে কয়েকটা বাচ্চা।
তলকুঠুরিতে যাওয়ার কোন দরজা নেই কেন? অপহরণের আলামত বলা যায় এরকম কিছু খুঁজে পাচ্ছি না কেন? এই প্রশ্নগুলো মাথায় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
হলওয়ের একদম কোনায় একটা জানালা চোখে পড়লো এ সময়। পর্দা ভেড়ানো থাকলে অবশ্য চোখে পড়তো না। এখান থেকে বাইরের বন দেখা যায়। কিছুটা দূরে পাহাড়ের ওপর আরেকটা বাড়ি। শিওজাকির বাড়িটার মতনই একই নকশার ওটা। তবে ইটগুলো লাল রঙের।
হয়তো ওটাই কিয়োকোর বাড়ি। কিমুরার কাছে শুনেছিলাম সে-ও ইটের তৈরি বাড়িতে থাকে।
এমনটা কি হতে পারে যে চোখে রঙিন সানগ্লাস পরে ছিল কাজুয়া সেদিন। তাই রংটা নীল মনে হয়েছে আমার কাছে?
পরক্ষণেই বাতিল করে দিলাম ভাবনাটা। এটা সম্ভব না। কিন্তু মন থেকে সন্দেহ পুরোপুরি দূর হলো না।
কাজুয়ার স্মৃতিতে তলকুঠুরির একটা জানালা দেখেছিলাম। কিন্তু এই বাড়িটার বাইরে একটা প্ল্যান্টার। তাছাড়া দুই মাসের মধ্যে তো প্ল্যান্টারে ঘাস জন্মে মরে যাবে না। তাহলে কি আমারই ভুল হয়েছে?
ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক সেকেন্ড। কাজুয়া যদি সেদিন কিয়োকোর বাড়ীর তলকুঠুরি দেখে থাকে… তাহলে খুব বড়সড় ভুল করে ফেলেছি আমি।
রুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম। নিচে নামার মত ধৈর্য নেই, তাই রেলিংয়ের ধারে গিয়ে সুমিদার নাম ধরে ডাক দিলাম। “সুমিদা!”
সিঁড়ির গোড়ায় হেঁটে এলো সে। “দেখা শেষ?”
“গাড়ি বের করুন! আমাদের কিয়োকোর বাড়িতে যেতে হবে!”
বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো সে।
“পরে বুঝিয়ে বলছি!”
আমার কথায় খুব একটা ভরসা পেয়েছে বলে মনে হলো না। তবে আর কিছু না বলে সামনের দরজার দিকে দৌড় দিল।
সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামার সময় ভাবলাম, কাজুয়া আসলে সেদিন কিয়োকোর বাড়িতেই গিয়েছিল। আর সেটা সত্যি হলে সাওরি বিপদে আছে। ওখানেই যাওয়ার কথা বলে বের হয়েছে সে।
শেষের কয়েকটা ধাপ লাফিয়ে নামলাম।
.
৮
-রূপকথার গল্পকার
আগন্তুককে দেখে হিতোমির চেহাআর কি দশা হয়েছে সেটা ভাবছে মিকি। তার যে হাত পা কেটে ফেলা হয়েছে, এটা কি বুঝতে পারবে আগন্তক? যে কোন সুস্থ মানুষের তো ভয় পেয়ে যাবার কথা।
বাড়ি বসানোর জন্যে হাতুড়িটা ওপরে তুলেছে এ মুহূর্তে তার পকেটের চাবিগুলো শব্দ করে উঠলো। কান না পাতলে সেই শব্দ শুনতে পাবার কথা না কারো। কিন্তু এটুকু শব্দেই সতর্ক হয়ে গেল আগন্তুক। দৌড় দিল আশপাশে না তাকিয়ে।
মিকিকেও দৌড়াতে হবে এখন। আগন্তুকের মুখটা বন্ধ করতে হবে।
.
৯
সামনের দরজার উদ্দেশ্যে দৌড় দিলাম আমি। সুমিদা নিশ্চয়ই গাড়ির ইঞ্জিন চালু করবে এখন। যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছাতে হবে আমাকে।
এসময় এমন একটা শব্দ কানে এলো যেটা এখানে শুনতে পাবো সেই কল্পনাও করিনি।
কেউ গান গাচ্ছে।
সিঁড়ির নিচে ফিরে এলাম আবারো। একদম ক্ষীণ একটা আওয়াজ, তবে সেটা যে মেয়েকণ্ঠ তা বুঝতে অসুবিধে হলো না। ইংরেজিতে গান গাইছে।
হয়তো কোন একটা ঘরে রেডিও বা টেলিভিশন চলছে। দ্রুত কিয়োকোর বাড়িতে পৌঁছুতে হবে। মনে মনে এই কথা বললেও গানের উৎস না খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত শান্তি পাবো না মনে।
অনেক হয়েছে। এবারে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে আমাকে। কাজুয়া সেদিন যে রঙ্গেরই সানগ্লাস পড়ে থাকুক না কেন, লাল ইট কখনো নীল দেখাবে না…
সিঁড়ি থেকে সামনে এগোলে গানের শব্দ কমে যায়। সিঁড়ির পেছন দিকে যে কেবিনেটটা আছে সেখান থেকে সবচেয়ে জোরে শোনা যাচ্ছে গানটা।
পুরনো কাঠের কেবিনেটটা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে দেয়াল থেকে। ওটার পাল্লায় কান রাখলাম। শুনে মনে হচ্ছে কেবিনেটের পেছন থেকে গানের শব্দটা আসছে।
কেউ আছে ওপাশে। কেবিনেটটা ইচ্ছেকৃতভাবে কিছু একটা লুকোনোর জন্যে ঝোলানো হয়েছে এখানে।
কেঁপে উঠলাম একবার। কিয়োকোর বাড়িতে যাবার ইচ্ছে মরে গেছে। কেবিনেটটার ভেতরে কিছু নেই। বহনের সুবিধার জন্যে ইচ্ছেকৃতভাবে খালি রাখা হয়েছে নিশ্চয়ই।
ওটা এতই হালকা যে আমি ধাক্কা দিতেই সরে গেল। পেছনের দেয়ালে একটা গর্ত। বাড়ির অন্য দেয়ালগুলোর মতনই এখানকার দেয়ালেও সাদা ওয়ালপেপার লাগানো হয়েছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু একটা জায়গায় উঠে গেছে। ওয়ালপেপার। একজন মানুষ ভেতরে অনায়াসে ঢুকতে পারবে গর্তটা গলে। প্লাস্টার ছাড়া ইটের গাঁথুনি কোনার দিকগুলোয়।
ইটের পেছনে দরজার চৌকাঠ চোখে পড়লো। হয়তো দরজাটা ঢাকার জন্যেই সামনের ইটগুলো অদক্ষ হাতে বসানো হয়েছে। পেছনে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে। সিলিং থেকে জ্বলছে কম ওয়াটের বাতি। দেখে মনে হচ্ছে একটা বিশাল দানো মুখ হা করে রেখেছে।
