এমনকি তার প্রথম খুনের পরেও কিছু করেনি। পাহাড়ের ওপর থেকে কেন মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল সেটার সদুত্তর এখনও দিতে পারবে না। এই কাজগুলোর পরিণতি কি হতে পারে, সেগুলো নিয়েও ভাবেনি কখনো। ধরা পড়লে কিছু আসে যায় না তার।
কিন্তু যদি ধরা না পড়ে থাকা যায়, তাহলে সেই চেষ্টা না করাটা বোকামি। আগন্তুকের মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার সুযোগ পেলে, সেটাই করবে।
হাতুড়িটা শক্ত করে চেপে ধরে পা টিপে টিপে সামনে এগোলো সে। কিছুক্ষণ পর দেয়ালের অন্য পাশ থেকে একটা বের হয়ে থাকা কাপড়ের অংশ দেখতে পেল। আগন্তুকের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
আগন্তুক অবশ্য এখনও টের পায়নি যে বাড়ির কর্তা তার পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। যতটা সম্ভব আস্তে শ্বাস টানার চেষ্টা করছে মিকি।
এরকমটাই হয় প্রতিবার। এ পর্যন্ত কতজন চেষ্টা করেছে এই বাড়িটার ভেতরে উঁকি দেয়ার?
আগের বাড়িটাতেও একইরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। তবে সেবার আগন্তুক ছিল এক প্রতিবেশী গৃহিণী। মিকিকে বাইরে দেখে কিছু একটা সন্দেহ হয় তার। হয়তো প্রতিবেশীদের সাথে খুব একটা যোগাযোগ করি না দেখেই মহিলার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। সেখানে থাকার সময় দুজনকে বাড়ির পেছনে কবর দিয়েছি। আমাকে কি দেখে ফেলেছিল? চাইলে তাকেও মারতে পারতাম। কিন্তু তেমনটা করলে তার পরিবারের লোকজন হৈচৈ করতে পারে দেখে আর কিছু করিনি। তাই ভিন্ন কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। সে শক্ত কোন প্রমাণ যোগাড় করে ফেলার আগে উধাও হয়ে যাওয়াই ভালো।
তাই মিকি কায়েদিতে চলে আসে।
দেয়ালে গা ঘেঁষে আবারো আগন্তুকের দিকে তাকালো সে। প্রবল ঠান্ডায় মুখ দিয়ে শ্বাস বের হওয়া মাত্র জমে যাচ্ছে। আগন্তুক যে জানালাটা দিয়ে ভেতর দেখছে সেখানে কি আছে একবার ভাবলো মিকি।
সাথে সাথে হাতুড়িটা উঁচু করে ধরলো।
হিতোমি বলেছিল শেষবারের মতন সূর্য দেখতে চায়।
সে যদি এই অনুরোধটা না করতো তাহলে আগন্তুকের মুখ বন্ধ করতে হতো না তাকে। তলকুঠুরিটা বুজে দিয়ে পালিয়ে গেলেই হতো।
কিন্তু জানালার অন্যদিকে হিতোমিকে রেখে এসেছে সে বেশ খানিকক্ষণ আগে। নিজের হাতে।
আগন্তুক নিশ্চয়ই দেখে ফেলেছে তাকে। সেজন্যেই অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এলো তার মুখ দিয়ে।
.
৭
জানালার ওপাশে সেরকম কিছু চোখে পড়লো না। বড় বড় বই ভর্তি একটা বুকশেলফ। খুব সম্ভবত আর্ট বই। দেয়ালে কিছু পেইন্টিং ঝোলানো। আরেকপাশে না খোলা কার্টন। শিওজাকি স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করে এই ঘরটা।
খুশি হবো নাকি হতাশ, বুঝলাম না। কাঠের বোর্ডটা থেকে নিচে নামলাম। শিওজাকি কি আসলেও চলে গেছে?
হঠাৎই একটা ছায়া দেখতে পেলাম চোখের কোণ দিয়ে। চিৎকার করতে যাবো এসময় খেয়াল করলাম ওটা সুমিদা। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো যেন।
“কিছু পেয়েছো?” জিজ্ঞেস করলো সে।
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিলাম।
এবারে ভেতরে ঢুকবো দু’জন।
সামনের দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলাম প্রথমে। তালা দেয়া। তবে সুমিদা আরেকটা দরজা দেখে এসেছে উত্তর পাশে। সেটার হ্যাঁন্ডেল ঘোরাতেই খুলে গেল দরজা।
ভেতরটা অন্ধকার। একে তো বাইরে মেঘলা, তার ওপর বাড়িটার উত্তর দিকে আছি আমরা এখন। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাতি জ্বালবো কিনা ভাবছি, শিওজাকি না পালিয়ে থাকলে সতর্ক হয়ে যাবে। কিন্তু সুমিদা অতশত না ভেবে সুইচ অন করে দিল।
“সমস্যা নেই, ব্যাটা ভেগেছে মনে হয়।”
“আমাদের আরো সতর্ক হতে হবে,” বললাম। সুমিদা ফিরে আসায় আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেয়েছি আবারো।
পেছনের দরজাটা দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকতে হয়। একটা পুরনো টিমটিমে বাতির আলোয় ফ্রিজের অবয়বটা বোঝা যাচ্ছে। আরেকপাশে কয়েকটা কেবিনেট। আশপাশ নীরব হওয়াতে ফ্রিজের গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছি। তবে রান্নাঘরটা দেখে মনে হচ্ছে না খুব একটা ব্যবহৃত হয়।
সেখান থেকে বের হয়ে অন্য ঘরগুলোয় উঁকি দেয়া শুরু করলাম আমরা। কিন্তু কোথাও কেউ নেই।
একটা ঘর দেখে মনে হলো শিওজাকির স্টুডিও। অর্ধেক কাজ হওয়া কয়েকটা ছবি দাঁড়িয়ে আছে স্ট্যান্ডে। টেবিলের ওপর কাপে বিভিন্ন আকৃতির ব্রাশ।
আগেরবার এসে দেখা কাপড়গুলো এখনও একই জায়গাতেই আছে। পুরো ঘরটা জুড়েই আসলে মেয়েদের কাপড়ে ভর্তি। এগুলোর কোনটাই হিতোমির গায়ে লাগবে বলে মনে হয় না। মাঝবয়সী কোন মহিলার কাপড় এগুলো।
খালি বাথরুমটায় উঁকি দেয়ার পর সুমিদা ঘোষণা করলো, “কেউ নেই বাসায়।”
সুমিদা নার্ভাস হলেও তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে না। হিতোমি এখানে নেই বলেই ধারণা তার। শিওজাকিকেও বোধহয় এখন আর অপহরণকারী মনে হচ্ছে না। আমার মুখের ওপর কথাগুলো বলেনি অবশ্য, কিন্তু হাবভাবে বুঝতে পারছি।
মৃদু আলোয় আলোকিত হলওয়েগুলো ধরে হাঁটছি আমরা। তলকুঠুরিতে ঢোকার প্রবেশপথটা নিশ্চয়ই আশপাশেই কোথাও আছে, কিন্তু সেটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না।
কিছুক্ষণ পর সুমিদা বললো, “চলো বের হয়ে যাই, নামি। হয়তো তোমার কোন ভুল হয়েছে।”
ভেতরে ভেতরে মুষড়ে পড়লাম। ভুল তো হবার কথা না। কিন্তু এ মুহূর্তে করার মত কিছু নেইও আসলে।
“দোতলাটা দেখা বাকি,” ক্ষীণ স্বরে বললাম।
“আমি যাবো না ওপরে,” কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সুমিদা।
