আমিও তার মত একই কাজটাই করছি। মৃত্যুর আগে যে অনুসন্ধানটা শুরু করেছিল সে, সেটা সফল করার দায়িত্ব এখন আমার।
চোখ বন্ধ করে দশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলাম। ভেতরের বমি বমি ভাবটা কেটে গেল। চোখ খুলে বড় করে শ্বাস নিয়ে সন্তর্পণে সামনে এগোলাম। খেয়াল রাখছি যাতে শব্দ না হয়।
আমার উপস্থিতি কি টের পেয়ে গেছে শিওজাকি? ছাদ থেকে দাঁড়কাকটা উড়ে যাবার শব্দ কানে এলো।
.
৪
-রূপকথার গল্পকার
মিকি স্টাডিতে। গোছগাছ মোটামুটি শেষ। এখন শুধু তলকুঠুরিটা বুজে দিয়ে পালাতে হবে। রিয়েল এস্টেটের লোকটার সাথে কথা বলে নেবে পরে, নতুন ভাড়াটিয়া পেতে অসুবিধে হবে না তার।
ডেস্ক, চেয়ার, পর্দা, ঘড়ি-এসব ফেলে যাবে সে। কেবল জরুরি আর ব্যক্তিগত কিছু জিনিস আলাদা করে প্যাক করেছে।
হঠাৎই একটা কথা মনে পড়ায় ডেস্কের ড্রয়ার খুললো মিকি। ভেতরের জিনিসটা বের করে দীর্ঘ একটা সময় তাকিয়ে থাকলো। আগন্তুক ফেলে গিয়েছিল এটা।
এসময় বাইরে থেকে পাখির ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ কানে এলো তার। অন্য সময় হলে পাত্তা দিত না। কিন্তু আর কিছুক্ষণের মধ্যে কেটে পড়বে সে, এই মুহূর্তে অসতর্ক হলে চলবে না।
জিনিসটা পকেটে চালান করে দিল মিকি। স্টাডির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লো না।
দোতলায় হলওয়েতে বেরিয়ে এলো সে। এখান থেকে নিচতলার সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়। হলওয়ের বাম দিকে একটা জানালা আছে। সেই জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বাইরে উঁকি দিল। ইচ্ছে করেই জানালাটা খুললো না। বাইরে কেউ থাকলে সতর্ক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু জানালা না খোলার কারণে ঠিক নিচটায় কি আছে তা দেখতে পাচ্ছে না।
তবুও জানালার কার্নিশ বরাবর দেয়ালটার কোণ দিয়ে একজনের কাঁধ দেখতে পেল এক মুহূর্তের জন্যে। দেয়ালের সাথে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আগন্তুক। নিশ্চয়ই আশপাশ ঘুরে দেখছে।
নিঃশব্দে নিচে নেমে এলো মিকি।
একগাদা ইট আর প্লাস্টার রাখা আছে সিঁড়ির গোড়ায়। তলকুঠুরি থেকে সেগুলো ধীরে ধীরে উপরে নিয়ে এসেছে সে। ভাগ্যিস হাতুড়িটাও এনেছিল। ওটার মাথায় মরিচা ধরলেও বেশ ওজন। যে কোন কিছু ভাঙতে পারবে জোরে আঘাত করলে।
.
৫
আগন্তুকের মুখোমুখি হবার সময় হয়ে গেছে। দেয়ালে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি। এভাবে থাকলে ওপর থেকে দেখা যাবে নানিশ্চয়ই। দেয়ালটা একদম ঠান্ডা। মুখ দিয়ে সাদা বাষ্প বেরিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে।
এই বাড়িটা অন্য দশটা বাড়ির মত চারকোনা নয়। যেদিকে যেদিকে ঘর, সেখান দিয়ে সামনে বেরিয়ে এসেছে দেয়াল। ফলে বারবার ঘুরতে হচ্ছে গোলকধাঁধার মতন। প্রতিবার ঘোরার সময় মনে হয় এই বুঝি সামনে শিওজাকিকে দেখতে পাবো।
জানালাগুলো দিয়ে ভেতরে উঁকি দিচ্ছি। কিন্তু বেশিরভাগ ঘরেই পর্দা ভেজানো। শিওজাকি এখানে নেই তাহলে। ভেতরটা খালি কোন বাড়ির মতনই ফাঁকা লাগছে।
বেশ কয়েকটা প্ল্যান্টার আছে বাড়ির চারপাশে। অবশ্য কোনটাতেই ঘাস বাদে কিছু জন্মেনি। কয়েকটা মরা শেকড় দেখে বুঝলাম আগে হয়তো ছোট ছোট ঝোপ ছিল সেগুলোয়।
বাড়িটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকটার সাথে আমার লাইব্রেরিতে দেখা স্মৃতিটার সবচেয়ে বেশি মিল। শেষবার এখানে এসে এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছিলাম। এর আগেরবার যেখানে থেমেছিলাম, এবারো সেখানে এসে দাঁড়িয়ে গেলাম। পা দিয়ে জোরে গুঁতো দিলাম প্ল্যান্টারের ইটে। নাহ, এভাবে সরানো যাবে না। সিমেন্ট দিয়ে আটকানো।
এই প্ল্যান্টারটা নিশ্চয়ই গত দুই মাসের মধ্যে কোন এক সময়ে বানানো হয়েছে তাড়াহুড়ো করে। খুঁজলে হয়তো দুর্বল জায়গা পেতাম, কিন্তু সেই সময় নেই।
এ নিয়ে ভাবা বাদ দিলাম। একই জায়গায় খুব বেশিক্ষণ থাকাটা নিরাপদ না।
বাড়ির পেছন দিকে আবারো চোখে পড়লো ছাউনিটা। এখনও আগের মতনই আছে। ছাউনিটার বয়স নিশ্চয়ই বাড়িটার বয়সের সমান। কাঠগুলো পচতে শুরু করেছে। একসময় বোধহয় সাদা রঙ ছিল বাইরে, এখন একদমই উঠে গেছে। বৃষ্টির ফোঁটার দাগ জায়গায় জায়গায়।
কিছু স্থানে বোর্ড উঠে আসছে। ভেতরের অন্ধকার দেখা যাচ্ছে সেদিক দিয়ে। ছাউনির দরজাটা ঠেলা দিলাম জোরে, কিন্তু এক চুলও নড়লো না
ওটা। আরেকবার সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে যাবার মত ফাঁকা জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হলাম। ভেতরটা খালি।
এসময় জানালাটা চোখে পড়লো আমার। ছাউনির পেছনের দেয়াল বরাবর থাকায় বাইরে থেকে দেখা যায় না। এই জানালাটায় কোন পর্দা টাঙানো নেই। আসলে নেই বললে ভুল হবে, দুই পাশে সরিয়ে রাখাহয়েছে হয়তো। বাড়ির ভেতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
আশপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিলাম যে একাই আছি আমি।
জানালাটা বেশ ওপরে। বাড়িটা ঢালের ধারে তৈরি করা হয়েছে বিধায় একেকটা জানালার উচ্চতা একেকরকম। একটা কাঠের বোর্ডে পাড়া দিয়ে কোনমতে উঁচু হয়ে ভেতরে তাকালাম।
.
৬
-রূপকথার গল্পকার
সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে মিকি। ওপরতলা থেকে যাকে দেখেছে, সে বাড়ির পেছন দিকের দেয়াল ঘেঁষে সামনে এগোচ্ছে। সুতরাং মিকিকে চোখে পড়ার সম্ভাবনা নেই।
এই প্রথম যে কেউ ছোঁকছোঁক করতে এসেছে তা নয়। এর আগেও কয়েকবার এমনটা হয়েছে। আসলে কখনো নিজের অপরাধগুলো লুকোনোর সেরকম চেষ্টা করেনি সে।
