“এবার বলো। কেন যাচ্ছো ওখানে?”
হিতোমির ব্যাপারে তাকে কিছু বলবো কিনা সেটা নিয়ে দোটানায় ভুগছি। যুক্তি দিয়ে চিন্তা করলে, সুমিদাকে এসবে জড়ানোর কোন মানে হয় না। কিন্তু একেবারেই কিছু যদি না বলি, তাহলে খারাপ দেখাবে। শিওজাকি একটা মেয়েকে অপহরণ করেছে, এটা বলবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।
“হয়তো আপনি শুনে খুব অবাক হবেন।”
“আজকে তোমার চেহারা দেখে যেরকম অবাক হয়েছি, এর বেশি বিস্মিত হবে বলে মনে হয় না।”
“আমার কথা মন দিয়ে শুনুন।”
“ঠিক আছে, কিছুক্ষণ পর শান্তস্বরে বললো সুমিদা। রাস্তার দিকে চোখ তার। মনে মনে স্বস্তিবোধ করছি, সুমিদাকে নিয়ে এসে ভালো হয়েছে।
তাকে হিতোমর ব্যাপারে অসবকিছু খুলে বললাম। এরপর বললাম যে এই মুহূর্তে হয়তো মেয়েটাকে শিওজাকির বাড়ির তলকুঠুরিতে আটকে রাখা হয়েছে। এর বেশি কিছু জানালাম না। আমার বাঁ চোখের ব্যাপারে কথা বললে সেটা হয়তো সে বিশ্বাসও করবে না।
“তিন দিন আগে শিওজাকিকে হিতোমির একটা ছবি দেখাই আমি।”
ব্যাখ্যা করে বললাম যে গত তিন ধরে শিওজাকির অপেক্ষা করছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পালিয়ে গেছে সে।
সুমিদা চুপচাপ আমার কথা শুনছে। কথা শেষ হলে ক্ষীণকণ্ঠে বললো, “তাই বলে…শিওজাকি?” চেহারা একদম ফ্যাকাসে হয়ে গেছে বেচারার। “আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।”
“মিথ্যে বলছি না।”
“কিন্তু…”
পেঁচানো রাস্তাটা দিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠছি এখন আমরা। দু’পাশেই কেবল সিডার গাছ। কাজুয়া যেখানে মারা গিয়েছিল সেই জায়গটা পার করে আসলাম।
“আমার কথা আপনার না বিশ্বাস করলেও চলবে। আমিই ভেতর যাবো নাহয়, আপনি বাইরে অপেক্ষা করবেন। শিওজাকি হয়তো এখনও ভেতরেই আছে। যদি আমি না ফিরি, তাহলে পুলিশে খবর দেবেন।” ভয় পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলিনি।
“বিপদ হতে পারে নাকি?”
“না হলেই অবাক হবো। কিন্তু আমার কাছে একটা ছুরি আছে।”
আরো ফ্যাকাসে হয়ে গেল সুমিদার চেহারা।
“তবুও… তোমাকে একা যেতে দিতে পারি না আমি।”
কথাগুলো শুনে কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলো মন।
কিয়োকোর বাড়িতে যাবার রাস্তাটা পেছনে ফেলে এলাম। অবশেষে নীল রঙের বাড়িটা দেখতে পাচ্ছি সামনে। ঘন মেঘের কারণে চারদিকে কেমন যেন ঘোলাটে অন্ধকার। বাড়িটা দেখার সাথে সাথে শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল একটা স্রোত বয়ে গেল আমার।
“গাড়ি নিয়ে বেশি কাছে যাবার দরকার নেই,” বললাম। “সামনেই থেমে বাকিটা রাস্তা হেঁটে যাব আমরা।”
“কেন?”
“শিওজাকি যদি ভেতরে থেকে থাকে, তাহলে সতর্ক হয়ে যাবে।
ভেতরে প্রবেশ করার আগে আরেকবার বাড়ির চারদিকটা দেখে নিতে চাই আমি। কিছুদূর এগিয়ে গাড়ি বন্ধ করে দিল সুমিদা। আমার শরীর রীতিমত কাঁপছে এখন। চোখ বন্ধ করে মনে মনে প্রার্থনা করে নিলাম একবার।
কাজুয়া যখন হিতোমিকে বাঁচাতে এসেছিল, সে-ও নিশ্চয়ই ভয় পাচ্ছিল এরকম।
“তৈরি?” ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞেস করলো সুমিদা। আগের চেয়েও ফ্যাকাসে লাগছে এখন তার চেহারা।
মাথা নেড়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
.
৩
গেটের দু’পাশে আমার উচ্চতার দু’টা গেটপোস্ট। লোহার দরজাটা হা করে খোলা। মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলাম আমি আর সুমিদা।
নুড়ি বেছানো পথে কিছুদূর এগোনো পর নীল দেয়াল চোখ পড়লো। আজকে কেন যেন আগের তুলনায় বড় লাগছে বাড়িটাকে। মনে হচ্ছে এক বিশাল দানো পেটভর্তি অন্ধকার নিয়ে ঘাপটি মেরে আছে। আমার আত্মশুদ্ধ কেঁপে উঠলো কথাটা ভেবে। যতই সাহসী কথাবার্তা বলি না কেন, বাড়িটা দেখলে সব সাহস দূরে পালায়। কেমন যেন অশুভ একটা ব্যাপার আছে বাড়িটাকে ঘিরে।
নীল হচ্ছে একাকীত্ব আর অন্ধকারের রঙ। নীল সমুদ্রের ভেতরটা একদম ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। সুতরাং সে অর্থে বলা যায় নীল আর ভেতরকার অন্ধকারের কোন পার্থক্য নেই। আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটাও সেটারই প্রমাণ।
বাইরে যেরকম অন্ধকার, অন্য কেউ হলে ভেতরে আলো জ্বালতো নিশ্চয়ই। কিন্তু জানালাগুলো ভেতরের অন্ধকারের পক্ষেই গান গাইছে। কেউ আছে বলে মনে হয় না।
শিওজাকির গাড়িটা অবশ্য আগের জায়গাতেই আছে।
“সে ভেতরে আছে নাকি বুঝতে পারছি না,” সুমিদার উদ্দেশ্যে বললাম। আমার নিজের কানেও নিজের কণ্ঠস্বরটা বড় খেলো শোনাচ্ছে।
“গাড়ি রেখেই পালিয়েছে হয়তো।”
গাছের আড়ালে আছি আমরা এখন। বনটা এতটাই নিশ্চুপ আমার কানের রক্তপ্রবাহের শব্দও শুনতে পাচ্ছি। মাঝে মাঝে দুই একটা পাখি উড়ে যাচ্ছে, শব্দ বলতে এটুকুই।
এই নিখাদ নৈঃশব্দের সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি, এসময় একটা একাকী দাঁড়কাককে বসে থাকতে দেখলাম ছাদের ওপরে। চুপচাপ বসে আশেপাশে নজর রাখছে ওটা।
দুই দিক থেকে বাড়িটা চক্কর দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা।
“সুমিদা, আপনি ডানদিকে যান, আমি বামে যাচ্ছি।”
“যদি কিছু হয়, চিৎকার করবে,” চিন্তিত চেহারায় বললো সুমিদা। একটু পর উধাও হয়ে গেল ডানদিকে।
তার থেকে হঠাৎ আলাদা হবার পরই ঘাবড়ে গেলাম। সুমিদা নিজেও যে খুব বেশি শক্তিশালী, তা নয়। কিন্তু একা থাকার চেয়ে দু’জন থাকা উত্তম।
এভাবে ভয় পেলে চলবে না, নিজেকে বোঝালাম। কাজুয়া তো এখানে একাই এসেছিল। ভেতরে ঢোকার উদ্দেশ্যে ছিল তার, এজন্যেই স্কু ড্রাইভারটা নিয়ে এসেছিল পকেটে করে।
