আমার আর সাওরির একসাথে হাঁটার সময় যদি হঠাৎ শিওজাকি এসে উপস্থিত হয়, তখন কি করবো জানি না। বিনা কারণে ঝামেলায় পড়ে যাবে সাওরি। সেজন্যেই গত দুই দিনে তার থেকে দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব।
কিন্তু তিন দিনেও যেহেতু শিওজাকির দেখা নেই, খুব বেশি সতর্কতা আর অবলম্বন করছি না। যদিও সকালবেলার চিন্তাটা মাথায় ঘুরছে। তবে একসাথে হেঁটে যাওয়ার সময় কোন সমস্যা হবে না আশা করছি।
“বসন্তের ছুটি শেষ হয়ে যাবে শিঘ্রই,” সাওরি বললো আমার উদ্দেশ্যে। অনবরত নাক টানছে সে। কথা বললে বাষ্প বেরুচ্ছে মুখ থেকে।
“হ্যাঁ,” বললাম আমি। “নতুন শিক্ষাবর্ষ বোধহয় পরশু থেকে শুরু হবে।”
“তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জন্যে পড়া শুরু করবে এখন থেকে?”
ওরিয়েন্টশন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই আমার। এখানকার কাজ শেষ না করে বাড়ি ফিরতে চাই না।
“আরো কয়েকটা দিন এখানে থাকবো।”
চোখে অস্বস্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালো সাওরি।
ক্যাফেতে বেশ বড় একটা হিটার আছে। নির্লজ্জের মত সেটার সবচেয়ে কাছের চেয়ারটায় বসে আবারো চোখের স্মৃতি বইটা পড়লাম।
ঘড়িতে বারোটা বেজে গেলেও কোন কাস্টমার আসেনি সকাল থেকে। দুপুরের একটু আগ দিয়ে সাওরি বেরিয়ে গেল। হিটারের কাছে বসে শিওজাকিকে নিয়ে ভাবছি এসময় অ্যাপ্রন খুলে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে, “একটু কিয়োকোর বাসায় যাচ্ছি। কিমুরাকে বলে দিও।”
মাথা নাড়লাম। কিমুরা এ মুহূর্তে রান্নাঘরে। সাওরি বেরিয়ে গেলে তার সাথে কথা বলতে গেলাম।
“কিন্তু আজকে তো কিছু ডেলিভারি দেয়ার কথা না,” গোঁফে তা দিয়ে বললো কিমুরা।
শিওজাকি সবসময় একটার দিকে মেলানকলি গ্রোভে আসে। কিন্তু আজকেও যখন এলো না সে, স্বস্তি আর দুশ্চিন্তা জেঁকে বসলো আমার চিত্তে। খুবই অস্থির লাগছে ভেতরে ভেতরে। সে কি করছে বা কোথায় আছে এ ব্যাপারে কিছু জানি না। হয়তো ইতিমধ্যেই পালিয়ে গেছে।
“শিওজাকিও দেখি এখন আর আসে না,” গোমড়া মুখে বললো কিমুরা। “হলোটা কি তার?” আসলেও চিন্তিত মনে হচ্ছে তাকে।
“ছুটিতে যাবার ব্যাপারেও তো কিছু বলেনি,” মুখে স্ট্র নিয়েই বললো সুমিদা পাশ থেকে। তার সামনের কমলার জুসের গ্লাসটায় বরফ বাদে কিছু নেই।
সাওরি যাবার এক ঘণ্টা পর উদয় হয়েছে সে। তার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যেই এসেছিল নিশ্চয়ই। যখন বললাম বাইরে গেছে, মুখটা ফাটা বেলুনের মত চুপসে গিয়েছিল বেচারার।
শিওজাকির পালিয়ে যাওয়া নিয়ে ভাবতে লাগলাম।
যদি পালিয়েই যায়, তাহলে তার বাসায় এখন কি আছে? সেখানে গেলে কি কোন প্রমাণ পাওয়া যাবে? হিতোমিকে আটকে রাখার কোন আলামত?
প্রথমে যে জিনিসটার কথা মাথায় এলো সেটা হচ্ছে কাপড় চোপড়। এর আগে ঐ বাসায় মেয়েদের কাপড় দেখেছি আমি। কিন্তু হিতোমিকে তো কাজুয়া হাত-পা বিহীন অবস্থায় একটা বস্তার ভেতরে দেখেছিল। সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক কাপড় তার গায়ে হবার কথা না।
হয়তো আমি যেগুলো দেখেছিলা, সেগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় পড়তো সে?]।
আরেকটা ব্যাপার মাথায় এলো। শিওজাকি নিশ্চয়ই পালিয়ে যাওয়ার আগে তলকুঠুরিটার একটা ব্যবস্থা নেবে? জানালাটা প্ল্যান্টার দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। সেরকম তলকুঠুরিতে যাওয়ার রাস্তাটাও চাইলে ইট দিয়ে বুজে দিতে পারে।
আর কি আলামত থাকতে পারে সেখানে? সে-ই যে অপহরণকারী এটা প্রমাণ করার জন্যে কি কি তথ্য বের করতে হবে আমাকে?
উঠে দাঁড়ালাম। নিজের বোকামিতে নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে ভীষণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই তো ভুলে বসে আছি।
হিতোমি আইজাওয়াকে খুঁজে বের করতে হবে। কেউ যদি জানতে পারে যে বেঁচে আছে মেয়েটা, তখন সেটা শিওজাকির জন্যে বিপদ ডেকে আনবে। তাহলে এরকম পরিস্থিতিতে কি করা উচিৎ তার?
তাকে সাথে করে নিয়ে যেতে পারে অথবা এমন এক জায়গায় রেখে যেতে পারে যেখানে কেউ তাকে কোনদিন খুঁজে পাবে। হিতামিকে যে সহজেই হত্যা করতে পারে শিওজাকি, এই ভাবনাটা জোর করে মাথা থেকে দূরে রাখলাম।
এখনই শিওজাকির বাড়িতে যেতে হবে আমাকে।
*
“আমাকে এক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে আপনাকে!”
সুমিদা অবাক চোখে আমার দিকে তাকালো। “কি? কোথায়?”
“চলুন প্লিজ!” অনুনয়ের স্বরে বললাম। “এখনই যেতে হবে আমাদের?”
কাউন্টারের পেছন থেকে কৌতুকপূর্ণ চোখে আমাদের দেখছে কিমুরা। “নিয়ে যাও তো,” সুমিদাকে নির্দেশ দিল সে। মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম তাকে।
সুমিদাকে একরকম ঠেলতে ঠেলতে বের করে নিয়ে এলাম ক্যাফে থেকে। বিল না মিটিয়েই বেরিয়ে এসেছে সে। তার হয়ে আমি পরে টাকা দিয়ে দিব।
বাইরে নিশ্চয়ই প্রচণ্ড ঠান্ডা, কিন্তু উত্তেজনার কারণে কিছু অনুভব করতে পারছি না। ক্যাফের পার্কিং লটে রাখা সমিদার গাডিটার প্যাসেঞ্জার সিটে লাফিয়ে উঠে পড়লাম।
“আগে একটু শান্ত হয়ে বোসো,” সুমিদা বললো। “টেনে টেনে আমার জামার হাতাটাই বড় করে দিয়েছে।”
“সরি,” লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বললাম। “কিন্তু তাড়া আছে আমার। দ্রুত শিওজাকির বাড়িতে চলুন।”
আবারো বিস্ময় ভর করলো সুমিদার চেহারায়। “কেন?”
“যেতে যেতে বলছি। দয়া করে ইঞ্জিন চালু করুন।”
চুপচাপ চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিন চালু করে ফেললো সে। মেলানকলি গ্রোভ পেছনে ফেলে শিওজাকির নীল বাড়িটার দিকে ছুটে চললাম আমরা।
