নিশ্চয়ই ভাবছে আমি কেন হিতোমির খোঁজ করছি। তাকেই বা কেন জিজ্ঞেস করলাম। আমার মুখ বন্ধ করার জন্যে এখন কিছু একটা নিশ্চয়ই করবে সে। সেটা আজ হোক বা কাল।
আমি চাইছি যে করুক।
একমাত্র তখনই গোটা পৃথিবীর কাছে তার মুখোশটা খুলে দিতে পারবো।
৪. সুযোগের অপেক্ষায়
চতুর্থ খণ্ড
১
-রূপকথার গল্পকার
“সুযোগের অপেক্ষায় আছেন আপনি, তাই না?” সোফা থেকে জিজ্ঞেস করলো হিতোমি। “নাকি এই মুহূর্তে কাউকে হত্যা করা বা এইখানে নিয়ে আসাটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে?”
মিকি সবকিছু গোছাচ্ছে। এই বাড়িটায় আসার সময় খুব বেশি জিনিস অবশ্য সাথে আনেনি। তাই গোছানোর মতনও সেরকম কিছু নেই। কিছু কাপড়চোপড় আর বই। তবে সে ব্যস্ত অন্য একটা কাজে।
“আমি বাইরে থেকে ঘুরে আসতে চাইলে গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আপনি। তখন নিশ্চয়ই কেউ দেখেছে, হিতোমি বললো। “নতুন গাড়ি কিনলেই দায় এড়াতে পারবেন না।”
মৃদু হাসছে হিতোমি। তার সরু চোখ জোড়া আরো সরু দেখায় হাসলে। হাত-পা বিহীন মেয়েটাকে পুতুলের মত লাগছে এখন।
তাকে সেখানে রেখে তলকুঠুরিতে নেমে এলো মিকি। এই ঘরটা বাদে বাকি ঘরগুলোর ব্যবস্থা করে ফেলেছে সে। ভেতরে পা দিতেই ইউকির গানের শব্দ কান এলো। সেই ইংরেজি গানটাই গাচ্ছে সে। ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে বেদনার সুরটা। প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ইটের দেয়ালে।
ঘরের কোনায় রাখা ইটগুলো সিঁড়ির গোড়ায় নিয়ে এলো মিকি। সবগুলো ইট সরাতে বেশ কসরত করতে হলো।
ইউকির গান বন্ধ হয়ে গেলো হঠাৎ।
“কি করবেন?” অন্ধকার থেকেই জিজ্ঞেস করলো সে। এরপরেই গুঙিয়ে উঠলো। “আমার গোড়ালিতে একটা চোখা পাথরের খোঁচা লাগছে!”
“সরি,” মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে বললো শিনিচি। তাদের বিশাল দেহটা নড়ে ওঠার শব্দ কানে এলো মিকির।
বাড়ি ছেড়ে দেয়ার কথা বললো সে।
“ওহ আচ্ছা, শিনিচি বললো মাথা নেড়ে। “তাহলে বিদায়ের সময় এসে গেছে?”
“মানে?” পাশ থেকে ইউকি জিজ্ঞেস করলো।
“তোমাকে পরে বুঝিয়ে বলবো।”
তলকুঠুরি থেকে বেরিয়ে দোতলার স্টাডিতে চলে এলো মিকি। হিতোমি এখানেই আছে। তাকে দেখেই মন খারাপ হয়ে গেল মেয়েটার।
“আমাকে যেহেতু সাথে করে নিয়ে যাচ্ছেন না, নিশ্চয়ই মেরে ফেলবেন বা এমন কোথাও রেখে যাবেন, যেখানে কেউ কোনদিন আর আমার খোঁজ পাবেন না। শেষবারের মতন সূর্যটা দেখতে চাই।”
মিকি তাকে উঠিয়ে নিল দু’হাতে। মেয়েটার ওজন কম হওয়াতে এই কাজে কোন কষ্টই হয় না তার। বাতাসে দুলছে লম্বা চুলগুলো।
“আপনি ধরা পড়লে আদালতে আমি বলবো যে কখনো আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন নি।
তাকে জানালার পাশে শুইয়ে দিল মিকি।
.
২
শিওজাকিকে হিতমির ছবিটা দেখানোর পর থেকে ভয়ে ভয়ে কাটতে লাগলো আমার সময়। যে কোন মুহূর্তে আঘাত হানতে পারে সে, ভাবি আমি।
ক্যাফের রান্নাঘরে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় এরকম জিনিসের অভাব নেই। নানা আকৃতির পাঁচটা ছুরি ঝুলছে একপাশে। এগুলো ইচ্ছে করলেই সরিয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু নিতে ইচ্ছে করছে না আমার। কোটের পকেটে সবসময় একটা ছুরি লুকিয়ে রাখা বাড়তি ঝামেলা। তাছাড়া সে যদি আমাকে অতর্কিতে পেছন থেকে আক্রমণ করে, তখন পকেটের ছুরি দিয়ে কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।
শেষমেশ তাই কাপবোর্ড থেকে ছোট্ট ভাঁজ করা যায় এরকম একটা ছুরি নিলাম। জানিনা এটা আদৌ কোন কাজে আসবে কিনা, তবুও মনকে শান্ত রাখার জন্যে এই সতর্কতাটুকু অবলম্বন করতেই হবে।
সাওরি আর তার মামার উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখেছি। আমার যদি কিছু হয়, তখন নিশ্চয়ই জিনিসপত্র খুঁজে দেখবে তারা। তখন চিঠি পড়ে জানতে পারবে কেন কায়েদিতে এসেছি আমি। হঠাৎ করে উধাওই বা হলাম কেন।
আমি উধাও হয়ে গেলে পুলিশের লোকদের কাজে নামতেই হবে। শিওজাকির ব্যাপারে চিঠিতে বিস্তারিত লিখেছি। সে যদি আমাকে আক্রমণ করে, তাহলে জিত আমারই হবে।
প্রতিদিন সকালে ওঠার পর মনে হয় যে তখনও কি করে বেঁচে আছি আমি। বাড়িতে বা বাইরে একা থাকার সময় সামান্যতম শব্দেও চমকে উঠি। ভয়ে ভয়ে তাকাই সবদিকে। হৃৎস্পন্দন কখনো স্বাভাবিক হয়নি সেদিনের পর থেকে।
কিন্তু শিওজাকির দেখা নেই। বরং মেলানকলি গ্রোভে আসাই থামিয়ে দিয়েছে সে।
*
সবকিছুরই একটা ইতি আছে। কিন্তু এই ব্যাপারটার ইতি কিরকম হবে তা জানি না। খুব সুখকর কিছু হবার সম্ভাবনা নেই।
তিন দিন হতে চললো শিওজাকিকে হিতোমির ছবি দেখিয়েছি আমি।
আমার অনুসন্ধানের শেষ দিন এসে গেছে।
*
প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে আজকে সকাল সকাল। ঘুম থেকে উঠে মনে হলো হাত পা রীতিমত জমে বরফ হয়ে আছে। কম্বলের নিচেই গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। ভালো লাগছে এভাবে শুয়ে থাকতে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার হৃত্যন্ত্রের ধুকপুকানি দ্রুত হয়ে গেল। এর আগে একদিন অনুসন্ধানের শেষদিন নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেদিনও সকালবেলা এরকম ঠান্ডা পড়েছিল। তাহলে আজকেই কি সেই দিন? হতে পারে।
কাজুয়া আর সাওরির কথা ভেবে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম।
“আগে কখনো এপ্রিলে এত ঠান্ডা পড়তে দেখিনি,” সাওরির মামা বললেন মুখ গোমড়া করে। জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। তাকে বিদায় জানিয়ে ক্যাফের দিকে রওনা হলাম আমি আর সাওরি।
