“যখন কাজুয়া ফর্মটা পূরণ করছিল, তার চোখে কি ব্যান্ডেজ ছিল?”
“এটা জানতে চাইছো কেন?” কৌতূহলী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো সাওরি। “তিন দিন ব্যান্ডেজ ছিল ওর চোখে, হ্যাঁ।”
“ডান চোখে না বাম চোখে?”
“বাম চোখে, আগেও বলেছিলাম না?”
আমার চেহারায় যে চোখটা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে সেটা ব্যান্ডেজে ঢাকা ছিল তখন। অনন্তকাল অপেক্ষা করলেও তাই সেই স্মৃতিগুলো দেখতে পাবো না কখনো। কারণ বাম চোখটা সেই মুহূর্তটুকু প্রত্যক্ষই করেনি কখনো।
এসময় একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় এলো। বাম চোখে দৃশ্যটা দেখতে পারেনি তখন ব্যান্ডেজের কারণে। হয়তো হিতোমিকে তলকুঠুরিতে দেখার পর পালানোর সময়েও এই ধরনের কিছু হয়েছিল। বাম চোখে ব্যথা পেয়েছিল। তাই আমি ঐ পাথুরে দেয়ালটা দেখতে পাইনি স্মৃতিতে।
ব্যথা পেয়ে বাম চোখটা যদি বন্ধ হয়ে যেত, গোটা দৃশ্যটাই তো অন্ধকার হবার কথা। কিন্তু লাইব্রেরিতে সেদিন হঠাৎ এরকম একটা স্মৃতির প্রদর্শনীতে চমকে গিয়েছিলাম ভীষণ। হয়তো এই অল্প সময়ের বিরতিটা খেয়ালই করিনি।
এখন একদম শতভাগ নিশ্চিত আমি।
হিতোমি শিওজাকির বাড়িতেই আছে। আমার ধারণাই ঠিক।
কিছুক্ষণ দ্বিধাবোধের পর মিঃ ইশিনোর ফোনটা চেয়ে নিলাম পুলিশকে ফোন দেয়ার জন্যে। কর্ডলেস ফোন হওয়াতে দূরে গিয়ে কথা বললেও সমস্যা নেই। সাওরি বা তার মামা যদি শুনতে পারে আমি কি বলছি, তাহলে পরিস্থিতি অনর্থক ঘোলাটে হবে। তারা ভেবেছে বাবা-মা’র সাথে কথা বলবো আমি।
যা করছি ঠিক করছি, নিজেকে অভয় দিয়ে তিন ডিজিটের নম্বরটায় ফোন দিলাম। ১-১-০। এতদিন ভেবে এসেছি পুলিশে ফোন দিয়ে কোন লাভ নেই। কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি?
এক মাঝবয়সী লোকের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো অন্য পাশ থেকে। পুলিশের কাজের সুবিধার্থে আমার কথা রেকর্ড করা হবে বলে জানালো
প্রথমে হিতোমি আইজাওয়াকে চেনে কিনা সে এটা জিজ্ঞেস করলাম। “আপনি কি… জানেন কার কথা বলছি?”
জানে না সে।
“এক বছর আগে হারিয়ে যায় সে।”
এরপর বললাম যে অপহরণ করা হয়েছে তাকে।
জবাবে কেবল প্রাণহীন কণ্ঠে “ওহ” বললো অফিসার। এর জবাবে আমি চুপ থাকলে কিছুক্ষণ পর যোগ করলো, আমরা তদন্ত করে দেখবো ব্যাপারটা। আপনাকে ফোন করে জানাবো। এটাই তো আপনার নম্বর?”
কিছু বললাম না তৎক্ষণাৎ। এটা মিঃ ইশিনোর নম্বর। যদি পুলিশ ফোন করার পর সাওরি ধরে, আমার সম্পর্কে কি ভাববে? সত্যটা তখন স্বীকার করতে হবে আমাকে। সবকিছু খুলে বলতে হতে পারে। সবাই ধরে নেবে যে আমি মিথ্যুক।
“আমাকে কি বলতেই হবে?”
সাথে সাথে কথা বলার ধরণ পাল্টে গেল অফিসারের।
নিজের পরিচয় না দেয়াতে সে ভাবছে আমি বোধহয় ফাজলামো করার জন্যে ফোন দিয়েছি। বারবার বললাম যে সেরকম কোন উদ্দেশ্য নেই আমার, কিন্তু লাইন কেটে দিল সে।
পরদিন নতুন সংকল্প নিয়ে মেলানকলি গ্রোভে পা রাখলাম আমি।
শিওজাকি প্রতিদিন দুপুর একটার সময় আসে ক্যাফেতে। ততক্ষণ অবধি কিয়োকোর সাথে কথা বললাম।
আমাদের কথোপকথনের মাঝামাঝি এক পর্যায়ে সে বললো, “সাওরি যে কাজুয়াকে নিয়ে কি ভাবে সেটাই চিন্তা করি মাঝে মাঝে।
এখনও ভাইয়ের মৃত্যু মন থেকে মেনে নিতে পারেনি সাওরি। মনে মনে এই কথাটা ভাবলেও মুখে বলতে পারলাম না।
“আমার ধারণা সবসময় তাকে নিয়েই চিন্তা করে মেয়েটা,” কিয়োকো বললো।
তাকে কাজুয়ার সোনালি হাতঘড়িটার কথা বললাম। সাওরি যে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছে সেটা, তাও জানালাম।
“ঘড়ি?”
“দুর্ঘটনায় ভেঙে যায় ঘড়িটা। ঠিক দুর্ঘটনার সময়টাতেই থেমে গেছে কাটাগুলো।”
এর আগের দিন বাসায় ফেরার সময় সাওরির বলা কথাটা মনে পড়লো। কিয়োকোর সাথে কি বিষয়ে কথা বলতে গিয়েছিল সে? জানতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু এভাবে জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।
একটা বেজে গেল দেখতে দেখতে। ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টার শব্দটা শুনতে পেলাম। একজন কাস্টমার এসেছে।
প্রতিদিনের মত আজকেও কালো কোটটা পরনে শিওজাকির। ধীরে সুস্থে হেঁটে নিজের টেবিলটায় গিয়ে বসলো।
মাথা নিচু করে সাহস জোগালাম মনে মনে। ভয় লাগছে ভীষণ। কিন্তু পুলিশের লোকেরা যেহেতু ধরে নিয়েছে আমি ফাজলামো করছি, এখন আর অন্য কোন উপায় নেই।
“কোন সমস্যা?” জিজ্ঞেস করলো কিয়োকো।
“নাহ, কিছু না,” মৃদু হেসে বলে উঠে পড়লাম।
শিওজাকির সামনে এসে দাঁড়ালাম একটু পর। পকেট থেকে একটা পুরনো খবর কাগজ বের করে তার চোখের সামনে ধরলাম। হিতোমি আইজাওয়ার স্কুলের ছবিটা আছে সেখানে।
“শিওজাকি,” ডাক দিলাম।
মুখ উঠিয়ে আমার দিকে তাকালো সে। “হ্যালো।”
আমার হাত কাঁপছে। এখন আর ফিরে যাবার সময় নেই। “একটা প্রশ্ন ছিল আপনার কাছে। এই মেয়েটাকে খুঁজছি আমি। তাকে চেনেন?”
গলার কাঁপুনিটা চেষ্টা করেও লুকোতে পারলাম না। আমার কাছ থেকে কাটা খবরের কাগজটা নিল শিওজাকি। সেসময় আমার হাত স্পর্শ করলো তার হাত। ভীষণ ঠান্ডা। কেঁপে উঠলো আমার গোটা শরীর; সেটা ভয়ে নাকি ঠান্ডায় তা বলতে পারবো না।
কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। এরপর আমার দিকে চোখ ফেরালো।
“নাহ, আগে কখনো দেখিনি,” ছবিটা ফিরিয়ে দিয়ে বললো শিওজাকি।
এরপর আমাদের মধ্যে আর কোন কথা হয়নি। তার কাছ থেকে এরকম প্রতিক্রিয়াই অবশ্য আশা করেছিলাম। কিন্তু ছবিটা দেখার পর ভেতরে ভেতরে নিশ্চয়ই ঝড় বইতে শুরু করেছে তার।
