একদমই সাধারণ একটা দৃশ্য।
কিন্তু তার চেহারায় স্বামীর জন্যে যে অনুভূতিটা খেলা করছিল, তা মোটেও সাধারণ কিছু ছিল না।
মিঃ ইশিনোকে সেটাই বললাম।
“আমি নিশ্চিত আপনার ওপর কোন ক্ষোভ ছিল না তার, কাজুয়া এমনটাই বলেছিল।”
চুপ রইলেন মিঃ ইশিনো।
ভেতরে যাওয়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়ালাম।
“ধন্যবাদ,” আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন।
ঘরে এসে কম্বলের নিচে ঢুকে পড়লাম। তিনি আসলে জানতেন। জানতেন যে তার মৃত্যুর পর এরকম দশা হবে মিঃ ইশিনোর। তাই কখনো পাল্টা রাগ দেখাননি। এটাই হয়তো ভালোবাসা।
এটা কি কাকতালীয় যে মামীর সাথে এতটা সময় কাটানোর পরও এই স্মৃতিটাই মনে রেখেছে কাজুয়া। মনে হয় না। ওটা যে সাধারণ কোন মুহূর্ত ছিল না এটা কাজুয়া বুঝতে পেরেছিল।
*
আমি জানি হিতোমি ঐ নীল বাড়িটাতেই আছে। কিন্তু শিওজাকির বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ যোগাড় করতে না পারা অবধি কিছু করা সম্ভব নয়।
ক্যাফেতে তার সাথে কথা হয়েছে আমার। “কয়েকদিন আপনাকে দেখিনি এখানে। শুনেছিলাম বাড়ি ফিরে গেছেন।”
“হ্যাঁ,” জবাব দেই শান্ত কণ্ঠে। কিন্তু ভেতরে ভতরে তার মুন্ডুপাত করছিলাম।
তার কারণেই মারা গেছে কাজুয়া। প্রচণ্ড রাগ লাগে আমার। তা সত্ত্বেও নিজেকে সামলাই, যাতে উল্টোপাল্টা কিছু না করে ফেলি।
কথা না বাড়িয়ে নিজের পছন্দের টেবিলটার দিকে চলে যায় শিওজাকি। সে বসার পর কিছুটা শান্ত হই, আসলে তার প্রতি এখনও একটা ভয় কাজ করে আমার মনে।
মাঝে মাঝে সন্ধ্যা অবধি মেলানকলি গ্রোভেই থাকি। ক্যাফে বন্ধ হওয়া অবধি অপেক্ষা করি। এরপর সাওরির সাথে একসাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরি। তার মামার বাড়িতে যাওয়ার পথে একটা বনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় আমাকে। সাওরি বলে যে ছোট থেকেই এই পথে যাতায়ত আছে তার, কোন ভয় নেই। তবুও কেমন যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি কাজ করে ভূতুড়ে গাছগুলর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়।
আজকেও সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ক্যাফে বন্ধ হওয়া পর্যন্ত থাকবে। তাই হাতে কিছুটা সময় আছে। বইয়ের শেলফে ‘চোখের স্মৃতি’ নামের রূপকথার বইটা চোখে পড়লো এসময়। ভেতরের ছবিগুলো খুবই অস্বস্তিকর। ওটাই তুলে নিলাম পড়ার জন্যে।
কাউন্টারে বসে পড়তে শুরু করলাম। রূপকথার বই হলেও ভেতরে এমন কিছু ছবি আছে যেগুলো বাচ্চাদের উপযোগী নয়। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল বইটা। লেখকের লেখার হাত বেশ ভালো। বইটা বন্ধ করার পরেও একটা কাককে ঠোঁটে রক্তাক্ত চোখ নিয়ে ঘুরতে দেখলাম মনের পর্দায়।
কাকটা চায়নি যে মেয়েটা তার খারাপ কাজগুলো সম্পর্কে জানুক। সে যে মানুষ নয় এটাও জানাতে চায়নি। ব্যাপারটা পীড়া দিয়েছে তাকে। আর শেষটা…
“আমি জানতাম যে গল্পের শেষটা ভালো হবে না,” সাওরির উদ্দেশ্যে বললাম। কিন্তু মেয়েটার বাবা-মা’র কি দশা হয়েছিল চিন্তা করো।”’
কাউন্টারের পেছনে বসে বইটা সম্পর্কে আমার কি ধারণা সেটা শোনার জন্যে অপেক্ষা করছিল সে। “আমিও এটাই ভেবেছিলাম।”
“বইটা কি কিমুরার খুব পছন্দ? সেজন্যেই রেখে দিয়েছে শেলফে?”
“মনে হয় না এটা তার বই। একদিন হঠাৎই শেলফটায় পায়।”
আরেকবার পাতাগুলো ওল্টালাম। একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম এবারের ছবিতে প্রথম যে ছেলেটার চোখ তুলে নেয় কারাসু, সেই ছেলেটা রাগত ভঙ্গিতে হাত নাড়তে থাকে তার উদ্দেশ্যে। কিন্তু চোখ হারাবার পর তো ব্যথায় কাতরানোর কথা তার। মনে হয় যেন শারীরিক কষ্টের ব্যাপারটা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রচ্ছদে লেখকের নাম লেখা-শান মিকি।
*
সাওরি আর আমি হেঁটে বাড়ি ফিরছি। ঠান্ডায় কাঁপছি দু’জনই। সাধারণত এ সময় কথা বলি আমরা, কিন্তু আজকে একদম চুপচাপ সে। মনে পড়লো যে সুমিদা বলেছিল ইদানীং সবসময় মুখ গোমড়া করে রাখে সাওরি।
“কি ভাবছো?”
“ইয়ে মানে…” সাওরি বললো। “কিয়োকোর কথা।”
“কিয়োকো?” কণ্ঠের বিস্ময় গোপন করতে পারলাম না। মনে আছে একবার তোমার সাথে কিয়োকোর বাসা থেকে ফেরার পথে দেখা হয়েছিলা আমার?”
“আসলে সেদিন তার সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম আমি,” সাওরি বললো। কি নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিল জিজ্ঞেস করায় চুপ করে থাকলো সে, শুধু একবার হাসলো দুর্বল ভঙ্গিতে।
আবারো চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম দুজনে।
“কাজুয়া যখন চোখ দান করে দেয়ার কথা বলেছিল, তুমি কি আপত্তি করেছিলে?”
“খুব বেশি না। আসলে ব্যাপারটাকে অতটা গুরুত্ব দেইনি তখন।”
“কেন?”
“কারণ ওর নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমার কোন কিছু চাপিয়ে দেয়ার কোন অধিকার নেই। তাছাড়া ওর চোখটা এখনও অন্য কারো শরীরে বেঁচে আছে, এটা ভালো না?”
মরণোত্তর চক্ষুদানের জন্যে একটা ফর্ম পূরণ করতে হয়। সেখানে অভিভাবকের সই দরকার। কাজুয়ার ফর্মটায় সাওরি সই করে। ব্যাপারটা নিয়ে সাওরিকে কথা বলতে শুনে ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলাম।
ওরা দু’জন যদি কাজটা না করতো, তাহলে আমার কি হতো? অন্তত কায়েদিতে আসতাম না। এই সুন্দর মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে পারতাম না। একসময় হয়তো স্মৃতি ফিরে পেতাম। কিন্তু নিজেকে ভুলতে না চাওয়ার যে অনুভূতিটা, সেটার স্বরূপও কখনো জানতাম না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে কাজুয়ার ফর্মটা পূরণ করার স্মৃতি দেখিনি আমি বাম চোখে। এসময় হঠাৎই বুঝতে পারলাম যে কেন দেখিনি।
