সাইড ভিউ মিররে আমার বাম চোখটা দেখতে পাচ্ছি।
কাজুয়াকে ভালোবাসি আমি। এতদিন চেষ্টা করছিলাম তার প্রতি আমার অনুভূতিটা ঠিক কি ধরনের সেটা নিয়ে না ভাবার। খুব কাছের কারো প্রতি সাধারণত এরকম স্নেহ কাজ করে মানুষের। এর থেকে বেশি কিছু হলে আমি নিজেই কষ্ট পাবো। মারা গেছে কাজুয়।
তার প্রতি শুধু এই অনুভূতিটুকুই যে কাজ করে, তা নয়। বরং নিজেকে মাঝে মাঝে কাজুয়া ভাবি আমি। মনে হয় যেন তার আত্মা ভর করেছে আমার শরীরে। এরকমটা মনে হওয়ার কারণ যে তার স্মৃতিগুলো, এটা জানি। কিন্তু আমার আসল পরিচয় কি, এটা যখন নিজেকে জিজ্ঞেস করি, কোন যুক্তিযুক্ত উত্তর খুঁজে পাই না।
কে আমি? নামির কোন স্মৃতি নেই আমার মধ্যে। কিন্তু কাজুয়ার স্মৃতিগুলোর কারণে নিজেকে তো আর কাজুয়া দাবি করতে পারি না। এই যে তার হয়ে প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে কায়েদিতে ফিরে এসেছি, এটা কি আসলেও ঠিক হচ্ছে? নাকি প্রকৃতি ইচ্ছেকৃতভাবে এরকম একটা পরিস্থিতিতে ফেলেছে আমাকে, ভিন্ন কোন উদ্দেশ্যে?
কিছুক্ষণের মধ্যেই কায়েদিতে ঢুকে পড়লাম আমরা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। পুরোটা দিন রাস্তাতেই কাটলো আজকে।
মেলানকলি গ্রোভ দেখতে পেলাম আবারো। ভেতরে নিশ্চয়ই বিশালদেহী কিমুরা আর বিমর্ষ সাওরি পথ চেয়ে আছে কাস্টমারের অপেক্ষায়।
“এসে পড়েছে!” আমাকে দেখে হেসে বললো সাওরি।
মনে হল যেন কেঁদেই ফেলবো। আমার স্মৃতি ফিরে এলেও এই মুহূর্তটা কখনো ভুলতে চাই না।
“নামি, বাবা-মা’র সাথে কথা বলেছে তো?” সাওরি জিজ্ঞেস করলো। “হ্যাঁ, বলেছি খানিকটা,” অস্পষ্টভাবে বললাম।
“স্কুল শুরু হয়ে যাবে না? এখন এখানে থাকলে অসুবিধে হবে না তো কোন?”
“একটু অসুবিধে হতে পারে। তবে সেটা নিয়ে আপাতত ভাবছি না।”
“আসলে স্কুলে যাওয়ার কোন ইচ্ছেই নেই তোমার, কাউন্টারের ওপর গালে হাত রেখে বললো সে।
কিছু না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
“আমার কাছ থেকে কিছু লুকোতে পারো না তুমি!” এবারে হেসে উঠলো সাওরি। সাথে সাথে মন খারাপ ভাবটা দূর হয়ে গেল আমার।
তার সাথে কথা বলার প্রতিটা মুহূর্তে কেবল মনে হতে লাগলো যে এই স্মৃতিগুলো একসময় ভুলে যাবো। পুরনো নামি কি এই কথাগুলো চিন্তা করে মনে মনে খুশি হয়ে উঠবে কখনোর।
না, স্মৃতিগুলো কখনো ভুলবো না আমি। আগের স্মৃতি আদৌ ফিরে আসবে কিনা জানি না, কিন্তু সাওরি বা কায়েদির কাউকে কখনো ভুলবো না। তবে তাদের প্রতি আমার অনুভূতিগুলো বদলে যেতে পারে। সেটাই আমার সবচেয়ে বড় ভয়।
মিঃ ইশিনোর বাড়িতে ফিরে রাতের খাবার শেষ করে সাওরিকে বললাম যে অনেকদিন ধরেই স্কুলে যাই না আমি। মার সাথেও সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না। তবে এসবের কারণটা কি, তা চেপে গেলাম।
“সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু,” আমাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললো সাওরি। “সময় সবকিছু ভুলিয়ে দেয়, কথাটা শোনোনি?”
“হয়তো আমার কথাই ভুলে গেছে সময়।”
আমি যে অ্যামনেশিয়ায় ভুগছি, এটা সাওরিকে বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সেটা সম্ভব না। তখন সে বুঝতে পারবে যে কাজুয়ার সাথে বন্ধুত্বের ব্যাপারে আমি যা বলেছি, তার পুরোটাই মিথ্যে।
একদিন সবকিছু খুলে বলবো তাকে। এখানে আসার সত্যিকার কারণটাও বলবো।
*
সেই রাতে দাঁত ব্রাশ করার সময় সামনের দরজা খোলার শব্দ কানে এলো আমার। কুলি করে মুখ মুছে দ্রুত নেমে এলাম নিচে। মিঃ ইশিনোর পুরনো জুতোটা নেই দরজার পাশে। ঝাপসা কাঁচের দরজার অন্যপাশে তার অবয়বটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অবশ্য।
কোনকিছু না ভেবেই শুভরাত্রি বলার জন্যে দরজা খুললাম।
সিঁড়ির ওপরে বসে আছেন তিনি। কাঁধ দুটো ঝুঁকে আছে। কাজুয়ার বাম চোখে তাকে যেরকম দেখেছিলাম, তার চাইতে একদমই ভিন্নরকম লাগছে এখন। মনে হচ্ছে যেন বাঁচার ইচ্ছেটা হারিয়ে ফেলেছেন।
দরজা খোলার শব্দে পেছনে তাকিয়ে আমাকে দেখে একটা দুর্বল হাসি ফুটলো তার মুখে। “হ্যালো,” আলতো মাথা নেড়ে বললেন।
“ঘুমোতে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম আপনি কি করছেন দেখে যাই,” বললাম।
জবাবে কি বলবেন সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন মিঃ ইশিনো। “আমার স্ত্রীর কথা ভাবছিলাম, কিছুক্ষণ পর বললেন ক্ষীণ কণ্ঠে।
গেটের সামনের দিকটায় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। ওখানটাতেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন মিসেস ইশিনো।
“সরি, আপনাকে বিরক্ত করাটা উচিৎ হয়নি আমার…”
মনে হচ্ছে যেন কেঁদে ফেলবো।
“সমস্যা নেই। ওর কথা সবসময়ই ভাবি আমি।”
বাইরে বেশ ঠান্ডা। রাতের অন্ধকার দিনের উত্তাপটুকু শুষে নিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে এখনো আরো বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার ইচ্ছে তার। হয়তো অবচেতন মনে নিজেকে এভাবেই শাস্তি দিচ্ছে সে। স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার কারণে এখনও অনুতাপ কাজ করে তার ভেতরে।
এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার নাক গলানোর কোন অধিকার নেই।
তবুও সরে যেতে পারলাম না দরজা থেকে। তার পিঠের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপনার স্ত্রীর সম্পর্কে আমাকে অনেক কিছু বলেছে কাজুয়া।”
আসলে তাকে বাম চোখে দেখেছি আমি।
এক রাতে মিঃ ইশিনো মাতাল হয়ে লিভিং রুমেই ঘুমিয়ে পড়েন। তার স্ত্রী পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন চেহারায় উদ্বিগ্ন ভাব নিয়ে। কিছুক্ষণ পর একটা কম্বল নিয়ে এসে তার গায়ে চাপিয়ে দেন।
