কিন্তু বেশিরভাগ স্বপ্নই ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার পর আর মনে থাকে না। স্মৃতি ফিরে পেলে কি এখনকার আমিকে একেবারে ভুলে যাবো?
আগের নামিকে অচেনা এক সত্তা মনে হয় এখন। তবে এটা যে ভ্রান্ত একটা ধারণা, তা-ও জানি।
*
ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে কাটাতে লাগলাম পরের কয়েকটা দিন। বাজে অভিজ্ঞতাগুলোই ঘুরে ফিরে আসছে মনে। চাইলেও মাথা থেকে বিদায় করতে পারছি না ওগুলো।
মার সাথে আমার সম্পর্কের আরো অবনতি হয়েছে। কেউই কারো সাথে কথা বলার চেষ্টা করি না। আসলে কি বলবো সেটা জানি না। আমি নিশ্চিত, মা’র ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য।
এ মুহূর্তে মা রাতের খাবার বানাচ্ছে। পেছনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি আমি। এই দৃশ্য আগেও অনেকবার দেখেছি নিশ্চয়ই, তবুও একদম নতুন মনে হচ্ছে।
মা খুব বেশি লম্বা না। ছিপছিপে, দোহারা গড়ন। চুল ধূসর হতে শুরু করেছে। ছুরি দিয়ে একমনে গাজর কেটে চলেছে সে। ছুরির নড়াচড়ার তালে কাঁধও নড়ছে।
তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ইচ্ছে করে চোখ ঘুরিয়ে নিল মা!
“মা, তুমি তো আমাকে অনেক ভালোবাসতে। আর সেই কারণেই এখন এত ঘৃণা করো। সেটাই স্বাভাবিক, এখন তো আর আগের মত কিছু করতে পারি না আমি, স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছি…”
জবাব দিল না সে। সমস্যা নেই, ভাবলাম।
“ডাক্তার সাহেব বলেছেন আমার স্মৃতি ফিরে পাবার ভালো সম্ভাবনা আছে। তিনি অবশ্য চোখের ডাক্তার, কিন্তু এমন অনেককেই চেনেন যাদের অ্যামনেশিয়া সেরে উঠেছে কয়েক বছর পর। আবারো আগের মতন হয়ে যাবো তখন।”
কিন্তু আমি চাই এখনকার নামিকে ভালোবাসো তুমি। এটা ঠিক যে আগের মত সবকিছুতে আর দক্ষ নই আমি। তবুও, এখনকার এই চিন্তাভঙ্গিটা কি এতই ফেলনা? স্মৃতি ফিরে পেলে হয়তো এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর কথা ভেবে হাসবো। কিন্তু এখনকার আমিকে নিয়ে আমি যথেষ্ট গর্বিত। প্রথম দিকে খুব খারাপ লাগতো, এখন আর লাগে না। আমি চাই তুমি বর্তমান নামিকেও মেনে নাও।
“কালকে আবারো বন্ধুর বাসায় যাবো আমি কয়েকদিনের জন্যে।”
বলে দৌড়ে ওপরতলায় আমার ঘরে চলে আসলাম।
পরদিন খুব ভোরে কাউকে কিছু বলে বেরিয়ে গেলাম বাসা থেকে।
*
স্টেশন থেকে ফোন দিলাম সুমিদাকে।
“তাড়াতাড়িই ফিরলে দেখছি,” আমি গাড়িতে ওঠার পর বললো সে।
“এখানে কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। সাওরির কি খবর?”
“ইদানিং বড় চুপচাপ হয়ে গেছে ও,” বললো সুমিদা। গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে কাজুয়ার ব্যাপারে আমার সাথে গল্প করলো সে। কাজুয়া সম্পর্কে নতুন যে কোন তথ্য লুফে নেই আমি। সুমিদা এখন যে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংটায় থাকে, সেটার সামনে থামলাম আমরা। ডিভিআরের রেকর্ডিং চালু করে আসতে ভুলে গেছে সে। বিল্ডিংটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় সে বললো গত এক বছর ধরে এখানে থাকছে। আগে অনেক দূরে থাকত বিধায় ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করতে অসুবিধে হতো। তাই চলে এসেছে এই নতুন অ্যাপার্টমেন্টে।
গাড়িতে বসেই সুমিদার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম আমি। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে ইঞ্জিন চালু করে রিয়ারভিউ মিররে অ্যাপার্টমেন্টটা দেখে সে বললো, “কাজুয়া প্রায়ই আসততা এখানে।”
“তাই নাকি? রাতে থাকতো?”
“সাওরি যখন বাসা থেকে বের দিয়েছিল ওকে, তখন কয়েকদিন ছিল,” হেসে বললো সুমিদা।
“কি কারণে বের করে দিয়েছিল সেটা শুনতে ভালোই লাগবে আমার, খুব বেশি আগ্রহ না দেখিয়ে বললাম। ভেতরে ভেতরে কৌতূহলে ফেটে পড়ছি।
একবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সুমিদা। ইঞ্জিন চালু না করে কাজুয়ার ব্যাপারে কথা বলতে শুরু করলো সে।
মিডল স্কুলে থাকার সময় খুব একটা খারাপ ছাত্র ছিল না কাজুয়া। কিন্তু হাইস্কুলে ওঠার পর রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। সেসময় অবশ্য সুমিদা চিনতো না তাকে; এসবই কাজুয়ার কাছে শুনেছে।
কোনমতে হাইস্কুল থেকে পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় কাজুয়া। সুমিদা যেখানে পড়ে সেখানে না, অন্য একটা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি মন উঠে যায় তার।
“ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। সারাদিন বাসায় বসে থাকতো।”
জীবনের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা অনুভব করতে না কাজুয়া। ক্লাস বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে সময় যেন একদম থেমে যায় তার। বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাতও বন্ধ করে দেয়। সুমিদার সাথে যখন পরিচয় হয় তার, সবাই যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। একা একা কায়েদিতে ঘুরে বেড়াতো কাজুয়া। কখনো পাহাড়ে চড়তো, কখনো পার্কে গিয়ে বসে থাকতো, কখনো পুরনো স্কুলে গিয়ে টিচারদের সাথে কথা বলতো।
“সন্ন্যাসী বনে গেছিল রীতিমত,” সুমিদার কণ্ঠের আবেগটুকু বুঝতে অসুবিধে হলো না আমার।
সাওরি কাজুয়ার এরকম ছন্নছাড়া জীবনের প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠলে সুমিদার অ্যাপার্টমেন্টে এসে পড়েসে।
গাড়িতে করে কায়েদি ফিরে যাবার পথে কেবল কাজুয়াকে নিয়েই ভাবলাম। সুমিদা অবশ্য কথা বলার চেষ্টা করলো কয়েকবার, কিন্তু আমার প্রাণহীন উত্তরে দমে গেল কিছুক্ষণ পর। আমাকে আর বিরক্ত করলো না।
কায়েদির এক অলস গ্রীষ্মের দিনে একা একা হেঁটে বেড়াচ্ছে কাজুয়া-এই দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। লম্বা ঘাসের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হাত বাড়িয়ে সবুজটুকু মুঠোবন্দি করার চেষ্টা করছে। একটা পাখি কাজুরার পায়ের শব্দ পেয়ে উড়ে গেলে সেটার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকলো সে কিছুক্ষণ। হাঁটার সময় শুকনো বাতাস মুখে এসে লাগলে সেই অনুভূতিটাও উপভোগ করছে। নিজে নিজেই কথা বলছে হয়তো।
