সেদিন রাতে নিচ থেকে বাবা-মা’র কথা কাটাকাটির আওয়াজ শুনতে পেয়ে নেমে এলাম চুপিচুপি। আমাকে নিয়ে ঝগড়া করছে দু’জন। নামি আর ঐ মেয়েটা এই দুটো শব্দ শুনলাম বেশ কয়েকবার।
সিঁড়িতে বসে তাদের কথা শুনলাম অনেকক্ষণ। তবে ঝগড়ার বিষয়বস্তু কি সেটা বোঝার আগেই তর্ক থামিয়ে দিল তারা। বাতি নিভিয়ে দেয়ায় গোটা নিচতলায় এখন ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। সেই অন্ধকারের সঙ্গী হয়েছে নৈঃশব্দ্য।
সিঁড়িটা ঠান্ডা, তবুও বসে রইলাম। একটা কথা মাথায় ঘুরছে-বাবা মা আছে আমার।
এর আগ পর্যন্ত আমি ভাবতাম এই বাড়িতে যারা থাকে তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। হয়তো স্মৃতি হারিয়ে ফেলায় এমনটা মনে হয়েছিল। সাওরি যখন বললো বাবা-মার সাথে ভালো করে কথা বলতে, তখন মনে হয়েছিল বাবা-মা থাকাটা আসলেও জরুরি কিনা।
কিন্তু তারা দুজন আমাকে নিয়ে ঝগড়া করছে। আমার ব্যাপারে দু’জনেরই আলাদা আলাদা মতামত আছে। সেটা ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক তা বুঝতে পারিনি। তারা যে আমাকে নিয়ে চিন্তিত, সেটা আগেও বুঝতে পারতাম। কিন্তু সেই উপলব্ধিটা আমার মধ্যে কোন ভাবনার উদ্রেক করেনি। সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছি, তবুও আমিই তারই সন্তান। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।
*
ডাক্তার সাহেব বললেন যে স্মৃতি একটা রহস্যময় ব্যাপার।
সেই হাসপাতালটায় এসেছি আবার ফলোআপের জন্যে। নস্টালজিক ভঙ্গিতে মাঝবয়সী ডাক্তারের সামনে বসে আছি এখন।
বুড়ো আঙুল দিয়ে আমার চোখের নিচে টেনে ধরে পরীক্ষা করছেন তিনি। ওপরে নিচে, ডানে বামে তাকাতে বলছেন। আপাতত সব ঠিকই আছে মনে হচ্ছে।
আমাকে কিছু প্রশ্ন করলেন তিনি, যেমন-”চোখে ব্যথা আছে নাকি?”
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিলাম।
“আগের কিছু মনে পড়েছে?”
“এখনও না।”
“আচ্ছা। যে কোন সময়ে একেবারে ফিরে আসতে পার, কিংবা ধীরে ধীরে মনে পড়বে সবকিছু।”
তার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। সত্যি বলতে স্মৃতি ফিরে আসার ব্যাপারে চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছি আগেই।
“আমাদের মস্তিষ্ক খুবই জটিল একটা যন্ত্র,” বললেন তিনি। তার দেখা অন্য এক রোগীর ব্যাপারে গল্প করলেন আমার সাথে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিল লোকটা। বিগত দশ বছরের সবকিছু মুছে যায় মস্তিষ্ক থেকে। সম্পূর্ণ নতুনভাবে জীবনযাপন শুরু করেছিল সে। দু’বছর পর একদিন হঠাৎ আস্তে আস্তে ফিরে আসতে শুরু করে স্মৃতিগুলো।
“মাঝে মাঝে একসাথে ফিরে আসে সব স্মৃতি। আবার কখনো নির্দিষ্ট বিরতিতে এক এক করে ফেরে। কেউ কেউ অবশ্য স্মৃতি একদমই ফিরে পায় না। এরকম নজিরও আছে। কিন্তু তোমার বয়স কম। অতীতের কথাগুলো মনে পড়তেও পারে।”
স্মৃতি ফিরে পাবার ব্যাপারে ভাবলাম। আবারো আগের নামি হয়ে যাবো আমি। কিন্তু সেটা তো চাই না?
পুরনো আমিকে ভিডিওটেইপে দেখেছি। আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে পিয়ানো বাজাচ্ছিল সে। কিবোর্ডের ওপর দিয়ে আঙুলগুলো উড়ে চলছিল যেন। নতুন আমি কি কখনো ওরকম কিছু করতে পারবে?
যদি স্মৃতি ফিরে পাই, তাহলে এখনকার আমির কি হবে? ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম কথাটা।
“সেটা বলা মুশকিল।”
চেহারায় অস্বস্তি নিয়ে একবার গোঁফে হাত বুলালেন তিনি। স্মৃতি ফিরে পেলে আবারো আগের মতন হয় যাবো ঠিকই, কিন্তু এখনকার সবকিছু মনে থাকবে। এটা শোনার পর কিছুটা স্বস্তি পেলাম। আমি চাই না কাজুয়ার স্মৃতিগুলো মুছে যাক।
“আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে, আমার দু’টো সত্তার দৃষ্টিভঙ্গি দু’রকম। মানে স্মৃতি ফিরে পাবার আগে পরের কথা বলছি।”
“এরকমটা হতে শুনেছি।”
অন্য একজন রোগীর ব্যাপারে আমাকে খুলে বললেন তিনি। স্মৃতি হারাবার আগে সবকিছু ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে লোকটা, কিন্তু স্মৃতি হারাবার পর একদম নেতিবাচক হয়ে যায় তার আচার-আচরণ। একসময় যখন স্মৃতি ফিরে আসে, আবারো আগের মত ব্যবহার করা শুরু করে সে।
“অ্যামনেশিয়ার রোগীরা স্মৃতিবিহীন অবস্থায় যে সময়টুকু কাটায়, তাদের পুরো জীবনের সময়কাল তুলনায় সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব অল্প। স্মৃতি ফিরে এলে মধ্যবর্তী সময়টুকু মনে হয়ে একটা লম্বা স্বপ্ন।”
হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার গোটা পথে এই কথাটা নিয়েই ভাবলাম কেবল।
স্মৃতি ফিরে এলে আমার কি হবে? সবাই আগের মতন পছন্দ করতে শুরু করবে আমাকে, আগের মতন পড়াশোনা আর খেলাধুলায় ভালো করবো। কিন্তু এই আপদগ্রস্ত আমার কি হবে তখন?
আগের নামি কি কখনো রাস্তা দিয়ে মাথা নিচু করে হেঁটে যাবার সময় একাকীত্ব অনুভব করতো? কখনো কি বীতস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকাতো আয়নায় নিজের দিকে? যাদের সবাই ভালোবাসে, তাদের প্রতি কি ঈর্ষা কাজ করতো তার মনে?”
ঐ নামির আছে সতেরো বছরের ইতিহাস। কিন্তু আমার স্মৃতিগুলোর বয়স মাত্র দুই মাস। স্মৃতি ফিরে এলে, এই কথাগুলো যে ভাবছে, তাকে কি বড় ঠুনকো চরিত্রের কেউ মনে হবে? গোটা সময়টাই একটা স্বপ্ন
অপারেশনের পরে অনেকটা সময় কোন স্বপ্ন দেখিনি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ঘুমিয়ে পড়লে সাওরি আর কায়েদি শহরের অন্যদের দেখি স্বপ্নে। একটা স্বপ্নে নীল রঙের একটা গাড়ির সাথে জোরে ধাক্কা লাগে আমার চোখ খোলার পরেও মনে হয় পাহাড়ি ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছি। অভিজ্ঞতাটা একদম বাস্তব। পরের কয়েকটা দিন রাস্তা দিয়ে চলার সময় কেবলই মনে হয় যে এই বুঝি নীল গাড়িটা এসে ধাক্কা দিবে আমাকে।
