“তুমি কি চাও না যে আমি ফিরে আসি?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“অবশ্যই চাই। কিন্তু এটাও চাই যে তুমি তোমার বাবা-মা’র সাথে বসে ভালো করে একবার কথা বলো। এরপর যখন ইচ্ছে এসে পড়ো।”
সুমিদা ট্রেন স্টেশন অবধি পৌঁছে দিচ্ছে আমাকে। কায়েদিতে আসার প্রথম দিনের মতনই, জানালা দিয়ে ছোট্ট পাহাড়ি শহরটা দেখতে লাগলাম। সিডার গাছের সারি, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ছোট ছোটব্রিজ, দূর পাহাড়ের উপত্যকা-সব পেছনে ফেলে এগোচ্ছি। কিছুক্ষণ পর স্টেশনের কাছাকাছি চলে এলাম। কাছেই একটা ইউনিভার্সিটি, হাসপাতাল আর কয়েকটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
“নামি, তুমি তো ফিরে আসবে?” স্টেশনের সামনে গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো সুমিদা। “আমাকে একটা ফোন দিয়ো। গাড়ি নিয়ে চলে আসবো স্টেশনে। তুমি চলে যাওয়াতে সাওরি আবার একা হয়ে পড়বে। ক্যাফেতে তোমার উপস্থিতি সবকিছু স্বাভাবিক করে দিয়েছিল। কাজুয়া থাকার সময় এরকম লাগতো, জানো?।”
“সবকিছু স্বাভাবিক করে দিয়েছিল? এভাবে কেউ কথা বলে? আপনি যে মাঝে মাঝে কিসব বলেন…।”
“মানে ঐ তো আর কি… কাজুয়ার অভাব অনেকটাই পূরণ করে দিয়েছিলে তুমি।”
তাকে সাওরির ভাইয়ের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাতে বললো, মারা যাবার এক বছর আগে বন্ধুত্ব হয়েছিল দু’জনের।
দুর্ঘটনার ঠিক এক বছর আগে, মাতাল কাজুয়াকে ক্যাফেতে নিয়ে এসেছিলাম আমি। হুশ একদমই ছিল না বেচারার।”
“শুনেছি গল্পটা। সেদিনই তো সাওরির সাথে প্রথম দেখা হয় আপনার।”
“হ্যাঁ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, স্বাভাবিক হবার পরে আমাকে আর চিনতে পারে না কাজুয়া,” হেসে বলে সুমিদা। এরপর বেশ কয়েকবার একসাথে ড্রিঙ্ক করেছি, সিনেমা দেখতে গেছি-এসব আর কি।
একদিন নাকি দুজন মিলে হাঁটতে হাঁটতে দূরের একটা সবুজ পাহাড়ি অঞ্চলে চলে গিয়েছিল। সেদিন ক্লাস ফাঁকি দেয় সুমিদা আর কাজুয়া ততদিনে ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে গিয়ে সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে ছিল তারা।
“দুই আহাম্মক আমরা,” সুমিদা বললো। “আসল কাজ না করে সারাদিন টোটো করতাম।”
“আমার তো মনে হচ্ছে দু’জনে ভালোই সময় কাটাতেন।”
কাজুয়ার সাথে সুমিদার সময় কাটানোর গল্পটা ভালো লাগলো আমার। গ্রীষ্মের দিনগুলোতে এভাবে উদ্দেশ্যহীনের মত সময় কাটাতে ভালই লাগবে।
“ওকে আপন করে নেয়ার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,” বললাম।
গাড়ি থেকে নেমে সুমিদাকে বিদায় জানিয়ে স্টেশনে ঢুকে পড়লাম।
কালো রঙের চাবির রিংটা এখনও ঝুলছে গাড়ির ভেতরে। ওটার সাথে লাগানো কালো পাখিটা ক্যাফের সেই বইটার কথা মনে করিয়ে দিল আমাকে। একটা কাক মানুষের চোখ উপড়ে নিচ্ছে! ছবিগুলো ভীষণ অস্বস্তি দায়ক। ঠিক করলাম পরেরবার ফিরে এসে বইটা পড়বো।
*
বুলেট ট্রেনে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগলো।
বাসার কাছের স্টেশনটায় যখন পৌঁছালাম, সন্ধ্যা নেমে গেছে। লোকজনের ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। পশ্চিমের আকাশে এখনও লালচে আভা। গোধূলির আলোয় স্টেশনের পাশের দোকানগুলো দেখে মনে হচ্ছে আকাশ থেকে রংধনু নেমে এসেছে।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাসার দিকে হেঁটে যাচ্ছি। সাওরি তো তখন বললো কথাটা, কিন্তু আসলেও বাবা-মা’র সামনে কিছু বলতে পারবো কিনা কে জানে। কয়েকবার মনে হলো ঘুরে স্টেশনের দিকে রওনা দেই।
কিন্তু বাবাকে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছি ফেরার কথা।
শিরাকি-নামফলকের বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। পরিচিত দৃশ্যটাও অপরিচিত ঠেকছে এখন। কলিংবেলে চাপ দিতে মা দরজা খুলে দিল। আমাকে দেখে মুখ থেকে হাসিটা মুছে গেল তার। কি বলবে বুঝতে পারছে না যেন।
“এসেছি আমি,” কিছুক্ষণ পর বললাম।
অন্য দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো মা।
কি করবো জানি না। কি বলবো জানি না। কান্না চেপে মা’র পেছন পেছন গেলাম
মাকে আমি ঘৃণা করি না, কিন্তু সে আমাকে ঘৃণা করে। কিছু একটা বলা উচিৎ আমার। তবুও ভয় ভয় লাগছে। কি এমন বলবো? পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে ভাবতে লাগলাম-আমি যদি কথা বলি, সে কি না শোনার ভান করবে?
“এসেছো তাহলে,” বাবা লিভিং রুম থেকে বললো।
“ওভাবে হুট করে চলে গিয়েছিলাম দেখে দুঃখিত।
মিশ্র একটা অনুভূতি খেলা করছে বাবার চেহারায়, কিন্তু পুরনো কথা ভুলে যেতে বললো সে।
তিনজন মিলে রাতের খাবার সারতে বসলাম। প্রথম দিকে আমি আর মা দুজনই চুপ থাকলাম।
পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক করার জন্যে বাবা মাঝে মাঝে এটা সেটা বলছে। হা-হুঁ করে জবাব দিচ্ছি আমি। বেচারার জন্যে খারাপই লাগছে আমার।
“কোথায় ছিলে এতদিন?” জিজ্ঞেস করলো বাবা। কায়েদির কথা– ফোনে জানাইনি তাকে। শুধু বলেছি অন্য একটা শহরে আছি।
“এক বন্ধুর বাড়িতে। পাহাড়ি এলাকায়।”
সাওরি, মেলানকলি গ্রোভ, কিমুরা আর সুমিদার ব্যাপারে সবকিছু খুলে বললাম তাদের। বললাম যে কিভাবে সাওরির সাথে কার্ড খেলেছি, সুমিদা একটু উল্টোপাল্টা কিছু বললেই কিমুরা গাট্টি বসায় তার মাথায়। কথাগুলো বলার সময় মুখে আপনা থেকেই একটা হাসি ভর করলো। এই মানুষগুলোকে নিয়ে চাইলে সারাদিন কথা বলতে পারবো।
কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম হাতে গাল দিয়ে একমনে আমার কথা শুনে যাচ্ছে বাবা।
“অনেকদিন পর এভাবে কথা বলতে শুনছি তোমাকে। পুরনো হাসিটা আবার ফিরে এসেছে।”
কিন্তু মা যে এসব কথা শুনে বিরক্ত সেটা তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। উঠে দাঁড়িয়ে এঁটো বাসনগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করলো সে।
