হিতামি এই বাড়িতেই কোথাও আছে, এই কথাটা মাথায় আসার সাথে সাথে হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল। ঠিকমতন নিঃশ্বাসও নিতে পারছি না। তার এত কাছে এসেও বাঁচাতে পারছি না! এটা কোন কথা!
বাড়ির মাঝ বরাবর একটা সিঁড়ি। দোতলার হলওয়ের রেলিংটা দেখা যাচ্ছে নিচ থেকে। ওখানে কি আছে? উপরে গিয়ে যে দেখবো, সেই সাহস নেই। ধরা পড়ে গেলে নিশ্চিত সন্দেহ করবে শিওজাকি।
অন্য একটা ঘরের দরজা খুললাম আমি। খুব বেশি সময় নেই হাতে। আমাকে ফিরে যেতে হবে দ্রুত।
পেয়ে গেছি! মেয়েদের কাপড় ঝুলছে ভেতরে। একটা সবুজ ব্লাউজ আর কালো রঙের স্কার্ট। কার জিনিস এগুলো?
নিজেকেই প্রশ্নটা করেছি, এমন সময় পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেলাম। ঘুরে দাঁড়ালাম ভয়ে ভয়ে। শিওজাকি।
“আমার স্ত্রীর কাপড়গুলো এই ঘরটায় রেখে দিয়েছি।”
তার স্ত্রী মারা গেলেও কাপড়গুলো কাউকে দিয়ে দেয়ার কথা নাকি মাথায় আসেনি শিওজাকির।
“দুঃখিত… পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাম। তার চোখের দিকেও তাকাতে পারছি না।
“নামি,” সুমিদা ডাক দিল। “চলো, যাওয়া যাক।
আমাদের পার্কিং লট অবধি এগিয়ে দিল শিওজাকি। নীল বাড়িটা থেকে বের হয়ে ঢালু রাস্তা ধরে নিচে নামতে শুরু করলো গাড়িটা।
“ওহ, ফিসফিসিয়ে বললাম আমি। “সে তো বলেছিল একটা ভাঙা দেয়াল ঠিক করবে। সেজন্যে জিনিসপত্রও কিনেছিল, কিন্তু…”
আমাকে তো এটাই বলেছিল শিওজাকি।
“ঠিক করবে? কি?” সামনের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো সুমিদা।
তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে কিছুদিন আগে ভূমিকম্প হয়েছিল কিনা।
“হ্যাঁ, ছোটখাটো ভূমিকম্প।”
তাহলে আমাকে মিথ্যে বলেছে শিওজাকি, জিনিসগুলো কেনার অন্য উদ্দেশ্যে ছিল তার।
.
৩
রূপকথার গল্পকার
গাড়িটা চলে যেতে দেখলো মিকি। সামনের দরজা বন্ধ করে তালা দিয়ে দোতলার স্টাডিরুমে চলে এলো দ্রুত।
“কথার আওয়াজ পেলাম,” কাউচ থেকে হিতোমি বললো। “বাসার আশেপাশে কয়েকদিন ধরে যে ঘুরঘুর করছে, সে-ই এসেছিল নাকি?”
কাঁধ ঝাঁকালো মিকি।
“কি হয়েছে বলুন না।”
বলতে গিয়েও থেমে গেল মিকি, অনর্থক ঝামেলা বাড়িয়ে কাজ নেই।
“আমি কিন্তু চাইলে চিৎকার করতে পারতাম। তবুও চুপ ছিলাম, আপনাকে বাঁচানোর জন্যে করেছি এটা ভাববেন না। আমি যদি কিছু বলতাম তাহলে আরো একজন লোককে মেরে ফেলতেন আপনি, তাই না?”
কিছু বললো না মিকি।
“ওহ না, আপনি তো কাউকে একেবারে মেরে ফেলতে পারেন না,” বক্তব্য শুধরে নিল হিতেমি।
মিকি তাকে বললো ইচ্ছে করলে যে কাউকে হত্যা করতে পারে সে। কেবল মাথাটা কেটে ফেলতে হবে।
“কিন্তু কেউ যদি এরকম একটা লাশ খুঁজে পায়, তাহলে তো বিপদ হবে।”
সেক্ষেত্রে ঘটনা এমন ভাবে সাজাবে মিকি, যাতে গোটা ব্যাপারটাই দুর্ঘটনা মনে হয়।
ধরুন কাউকে মেরে ফেলতে হবে মিকির। তাকে পাহাড়ের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে কিংবা টুকরো টুকরো করে কাটলেও মরবে না। মিকির ভিক্টিমরা তার হাতের স্পর্শ আছে এরকম কোন উপায়ে কখনোই মারা যায় না। শরীরের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিলেও লাভ হয় না।
কিন্তু মিকি চাইলে সেই লোকটাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে ফেলতে পারে বা বেশি মদ খাইয়ে মাতাল করে তুলতে পারে। এরপর একটা চলন্ত গাড়ির সামনে ধাক্কা দিয়ে দিলেই কেল্লা ফতে। তখন মিকি না, গাড়ি চালকের কারণে মারা যাবে নোকটা। অনেকে আত্মহত্যাও ভাবতে পারে গোটা ব্যাপারটাকে।
“আপনি কি এই ব্যাপারে নিশ্চিত? আগে কখনো চেষ্টা করে দেখেছেন?”
মিকি জবাব দিল না। মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ বলে ধরে নিল হিতেমি।
নিচতলার কথোপকথনের কথা ভাবলো মিকি। যে আগন্তুকের অপেক্ষায় ছিল, আজকে বাসায় কি সে-ই এসেছিল? একদমই সাধারণ কথা বার্তা হয়েছে আমাদের… কিছু কি সন্দেহ করেছে।
যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে গড়ায়, তাহলে এই বাসাটা ছেড়ে দিতে হবে আমাকে।
[তবে তার আগে আগন্তুকের মুখটা চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারে। ঠিকভাবে কাজটা করলে জায়গা বদলানোর প্রয়োজন হবে না।]
.
৪
বাড়ি ফিরতে হবে আমাকে। বাবা বারবার বলছে ডাক্তারের কাছে যাবার কথা। আর দেরি করাটা উচিৎ হবে না।
সত্যি বলতে, আমার ঐখানে যাওয়ার তেমন একটা ইচ্ছে নেই। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর থেকে নিজের বাসায় কাটানো সময়ের খুব বেশি স্মৃতি নেই আমার মাথায়। যেগুলো আছে, সেগুলোও খুব সুখকর নয়। বরং কাজুয়ার স্মৃতিগুলো ভাবতেই বেশি ভালো লাগে। কায়েদি, সাওরি, মেলানকলি গ্রোভ।
সাওরিকে যখন বললাম যে বাড়ি ফিরে যাচ্ছি, মাথা নাড়লো সে। চেহারায় মন খারাপের ভাব স্পষ্ট।
“ঠিক কাজটাই করছে। তোমার বাবা-মা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করে আছেন।”
“আমি কি ফিরে আসতে পারি?”
“কবে আসবে?”
“চারদিন পর।
একটু অবাক হলো সে আমার উত্তরে। “পরিবারের সাথে সময় কাটাতে একদমই ভালো লাগে না তোমার?”
যত দ্রুত সম্ভব কায়েদিতে ফিরে আসতে চাই আমি। এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা তো করাই হয়নি। হিতোমিকে উদ্ধার করতে হবে। শিওজাকির বিরুদ্ধে প্রমাণ জড়ো করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এখনও।
‘নামি… সাওরি বললো গম্ভীর কণ্ঠে। “তোমার পরিবারের ব্যাপারে কখনো কিছু বলোনি আমাকে। জানি আমার নাক গলানোটা ঠিক না এই ব্যাপারে, তবে তাদের সাথে তোমার সম্পর্কটা আসলে ঠিক কি কারণে এমন, সেটা নিয়ে ভেবেছি গত কয়েকদিনে। এভাবে হুট করে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা মোটেও ভালো কোন কাজ নয়।”
