ফেরার পথে সাওরিকে দেখলাম কিয়োকোর বাসায় যাওয়ার রাস্তাটা থেকে বেরুতে। তাকে ডাক দিলাম আমি। “আজকে ডেলিভারি দেয়ার দিন,” আমাকে দেখে বিস্মিত স্বরে বললো সে।
*
একদিন ক্যাফের ভেতরেই ভুল করে কোট রেখে আসে শিওজাকি। ওটা পেছনের দিকের টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে ঝুলন্ত অবস্থায় আবিষ্কার করে কিমুরা।
কিছুক্ষণ মনে মনে নিজের সাথে যুদ্ধের পর বললাম, “আমাকে দিন। ফেরত দিয়ে আসি।”
“তোমার কষ্ট করতে হবে না,” কিমুরা বললো। “কালকে তো সে আসবেই।”
কিন্তু এরকম একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়া যাবে না। তার ফেলে যাওয়া জিনিস ফেরত দেয়ার ছুতোয় বাড়ির ভেতরটা দেখতে পারবো। কিছু সন্দেহও করবে না শিওজাকি।
আরো কিছুক্ষণ জোরাজুরির পর আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিল কিমুরা। সুমিদা এতক্ষণ ধরে আমাদের কথা শুনছিলো। আমাকে নীল বাড়িটা পর্যন্ত পৌঁছে প্রস্তাব দিল সে। রাজি হওয়ার কোন কারণ খুঁজে পেলাম নেই।
শিওজাকির বাড়ির ভেতরে গাড়ি চালিয়ে ঢুকে পড়লো সে। শিওজাকির কানে গাড়ির শব্দ যাচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে মাথাব্যথার কোন দরকার নেই এবারে, তবুও বাড়িটার যতই কাছে গেলাম, ভয়ভয় করতে লাগলো ভেতরে।
শিওজাকির গাড়িটা সামনেই পার্ক করা। ওটার পাশে গাড়ি থামালো সুমিদা।
প্যাসেঞ্জার সিট থেকে বের হয়ে বাড়িটার দিকে তাকালাম। খুব একটা লম্বা না, এরকম নকশার বাড়ি আমাদের শহরে বেশ কয়েকটা দেখেছি আগে। তবে বাড়িটাকে ঘিরে রাখা পাতাবিহীন গাছগুলো অবশ্য নেই সেখানে।
বাড়িটার অবস্থান এমন জায়গায় যে সামনের দিকটায় বেশিরভাগ সময়েই ছায়ায় ঢাকা থাকে। নীল দেয়ালগুলো অনেকটাই কালো মনে হয় তাই দূর থেকে। বাইরেই যদি এরকম অন্ধকার হয়, না জানি ভেতরে কি অপেক্ষা করছে।
হিতোমি আইজাওয়া এই বাড়ির তলকুঠুরিতে বন্দী, সেখানে নিশ্চয়ই আরো বেশি অন্ধকার। কথাটা ভাবার সাথে সাথে কেঁপে উঠলো আমার শরীর।
“খুব বেশি সময় তো লাগবে না তোমার?” গাড়ি থেকে বের না হয়েই বললল সুমিদা। গাড়ির ভেতরকার আরামদায়ক উষ্ণতা ছেড়ে বের হবার ইচ্ছে নেই তার, বোঝাই যাচ্ছে।
কিন্তু সে আমার সাথে থাকলে আরো সাহস পাবো। তাই বললাম, “আমার সাথে আসুন।”
অন্য দিকে তাকিয়ে কথা না শোনার ভান করলো সুমিদা।
অগত্যা কোটটা দুহাতে চেপে ধরে একাই গেলাম আমি। গাড়িতে আসার পথে কোটটার পকেটগুলো হাতড়ে দেখেছি, কিছু নেই ভেতরে।
দুরুদুরু বুকে দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কালো কাঠের দরজায় সোনালি রঙের নব শোভা পাচ্ছে।
কড়া নাড়ার কিছুক্ষণ পর শিওজাকির পদশব্দ শোনা গেল ভেতর থেকে। দরজা খুলে পাতলা ফ্রেমের চশমার ওপাশ থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো সে।
কথা জড়িয়ে গেল আমার। তবুও কোনমতে বুঝিয়ে বললাম যে কেন এসেছি।
“ধন্যবাদ,” বলে পেছনে দাঁড়ানো গাড়িটার দিকে তাকালো সে। “ওটা সুমিদার গাড়ি না? সেও এসেছে তাহলে।”
কেউ সাথে থাকার জন্যে এর আগে কখনো এতটা স্বস্তিবোধ করিনি। হারামিটা এখন আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
“এতদূর যখন এসেছোই, কফি খেয়ে যাও?”
মাথা নেড়ে সায় জানালাম তার প্রস্তাবে। গাড়ির কাছে ফিরে সুমিদাকে বললাম শিওজাকির কফি খাওয়ানোর কথা। ঘুম ঘুম চোখে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো সে।
ভেতরে গেলাম আমরা। পশ্চিমা নকশা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। বাড়িটা, আমাদের জুতোও খুলতে বললো না শিওজাকি।
দেয়াল এবং মেঝেতে খুব বেশি কারুকাজ নেই। সিলিং থেকে কোন ঝারবাতিও ঝুলতে দেখলাম না। বরং ভেতরটা একটা উপাসনালয় বা পুরনো আমলের স্কুলের মতনই সাদামাটা।
আমাকে আর সুমিদাকে লিভিংরুমে নিয়ে গেল শিওজাকি। ঘরের মাঝখানে একটা সোফা আর কফি টেবিল। পাশেই ছোট একটা বুক শেলফ। দেশি বিদেশি দামী দামী সব বই সাজিয়ে রাখা সেখানে।
পেছনের দেয়ালে কালো ফ্রেমে একটা ছবি ঝোলানো। সেটার ব্যাপারে শিওজাকিকে জিজ্ঞেস করায় বললো যে সে নিজেই এঁকেছে ছবিটা। এক বৃদ্ধ মহিলাকে আপেল ভর্তি ঝুড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে সেখানে।
আমাদের জন্যে কফি নিয়ে এলো শিওজাকি।
রুমের আশপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কাজুয়া কখনো এসেছে কিনা। তবে কোন দৃশ্যই আমার বাঁ চোখে কোন প্রকার উত্তাপের উদ্রেক ঘটালো না।
“এগুলো সবই অ্যান্টিক,” সোফায় হাত বুলিয়ে বললো সুমিদা। বসলে শরীর একদম দেবে যায় সোফাটায়। “আমি যে রুমটায় থাকি, সেখানে এরকম একটা কাউচ বোধহয় ঢোকানোও যাবে না।”
“এখানকার আসবাবের বেশিরভাগই আগের ভাড়াটিয়ার ফেলে যাওয়া।”
“সে কি এগুলো আগের ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে পেয়েছিল?” জিজ্ঞেস করলাম।
“বলতে পারবো না, তার সাথে দেখা হয়নি আমার,” মাথা কাত করে বললো শিওজাকি।
ছয় মাস আগে বাড়িটায় উঠেছে শিওজাকি। হিতোমি উধাও হয়েছে এক বছর আগে। তাকে কি এখানেই নিয়ে এসেছিল সে? হিসেব তো মিলছে না।
সুমিদা আর শিওজাকি কথা বলছে কি যেন একটা বিষয়ে। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম যে বাথরুমে যাব আমি। শিওজাকি বলে দিল কোথায় সেটা।
এরকম একটা বাড়িতে নির্দেশনা ভুলে যাওয়াটা নিশ্চয়ই সন্দেহের চোখে দেখবে না কেউ। ভুল করে অন্য একটা ঘরের দরজা খুলে ফেলতেই পারি।
হলওয়ে ধরে সামনে এগিয়ে অন্য ঘরগুলোর দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দেয়া শুরু করলাম। লিভিং রুম থেকে আমাকে দেখতে পাচ্ছে না সুমিদা বা শিওজাকি। ঘরগুলো ভালোমতো খুঁজে দেখতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ধরা পড়ে যাবার ভয়ে সেটা করতে পারছি না। একবার উঁকি দিয়েই দরজা ভিড়িয়ে দিচ্ছি। কয়েকটা ঘরে কোন আসবাব নেই। দেখে মনে হলো ছবি আকার স্টুডিও।
