ডান পাশের আরেকটা জোড়ার দিকে কিছুক্ষণ পর নির্দেশ করে সে। “ক্যাফের উদ্বোধনের দিন এটা ছিল পরনে। তখন অবশ্য ক্যাফের : মালিকানা আমার ছিল না। আমার এক চাচা চালাতে।”
একটা মানুষের জীবন ইতিহাসের স্বাক্ষী এই জুতোগুলো।
একদম ডান দিকের জুতোটার দিকে বিমর্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কিমুরা। “এই জুতোটা খুলে রেখে রেলওয়ে ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ে। ওর বাসার দরজার বাইরে পাই এগুলো। রাতের অন্ধকারে খালি পায়ে ব্রিজ পর্যন্ত গিয়েছিল সে।
কিমুরার কথা বলা শেষ হলে ভেতরে গিয়ে ব্যাকপ্যাক থেকে বাইন্ডারটা বের করি। কিমুরার গল্পটা শুনে একটা অদ্ভুত স্মৃতির কথা মনে পড়ে গেছে।
“কি করছো?” কোমরে অ্যাপ্রন জড়ানো সুমিদা জিজ্ঞেস করে। কৌতূহলী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সে। যা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে ভালো মানিয়েছে তাকে ক্যাফের কর্মি হিসেবে।
“আমার গোপন ডাইরি এটা, কাউকে দেখাই না।”
ওর কাছ থেকে লুকিয়ে ভেতরের পাতায় উঁকি দেই।
প্রথমে ভাবলাম ভুল দেখছি। কিন্তু না, কিমুরা যে রাতের কথা বললো, সেদিনকার দৃশ্যটা দেখেছিল সে।
অন্ধকারে মিডল স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল সে। সাইকেলটা পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসছিল। তখন মিডল স্কুলে পড়তো সে, এটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারলাম সাইকেলটার কারণে।
ল্যাম্পপোস্টের আলোয় একটা লোককে বিপরীত দিকে হেঁটে যেতে দেখে সে। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিলো লোকটা। আশপাশের কোন কিছুর প্রতি মনোযোগ ছিল না।
তবে দৃশ্যটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগে কারণ লোকটা খালি পায়ে হাঁটছিল।
*
কাজুয়ার অনুসন্ধানের শুরুটা যে কারণে হয়েছিল, সেই স্মৃতিটা দেখলাম একদিন!
সেদিন বাইরে বেরিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না শিওজাকির বাড়িতে যাবো কিনা। ঢাল বেয়ে বাড়িটার দিকে এগোচ্ছিলাম ঠিকই, কিন্তু বারবার থেমে যাচ্ছিলাম। এসময় কাজুয়ার দুর্ঘটনাটা যেখানে হয় সেই জায়গাটা চোখে পড়ে আমার পাশ দিয়েই কিয়োকোর বাড়িতে যাবার রাস্তা। এই রাস্তাটার দু’পাশেও সিডার গাছ ভর্তি। আশপাশের সব শব্দ শুষে নেয় গাছগুলো।
এসময় একটা গাড়ির শব্দ শুনতে পেলাম পেছন থেকে। শিওজাকি আসছে, এই ভয়ে জমে গেলাম রাস্তায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম যে অন্য মডেলের একটা গাড়ি, চালকও ভিন্ন।
আমার সামনে গাড়ি থামিয়ে জানালা দিয়ে মাথা বের করলেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক।
“এক্সকিউজ মি, আমি মনে হয় হারিয়ে গেছি। একটু সাহায্য করতে পারবে?”
তার গাড়িটার দিকে হেঁটে যাচ্ছি, এই সময়ে বাঁ চোখটা গরম হয়ে উঠলো। সিডার গাছের পাশে দাঁড়ানো গাড়িটা দেখে আমার মাথায় একটা স্মৃতির ছিপি খুলে গেছে। তবে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি স্মৃতিগুলোর এরকম হঠাত আগমনে।
“আমি আসলে এদিকটা ঠিকমতো চিনি না,” লোকটার উদ্দেশ্যে বললাম। “দুঃখিত।”
বাম চোখে দেখছি সিডার গাছের পাশ দিয়ে একটা গাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছে কাজুয়া। হয়তো আমি যে রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে আছি, সেই রাস্ত টা ধরেই হাঁটছিল সে। গাড়িটা তার সামনে পার্ক করা। তবে আমার মত গাড়িটার কাছে না থেমে পাশ দিয়ে হেঁটে যায় সে।
যখনই ডান চোখে এমন কিছু দেখি যেটার সাথে আমার বাম চোখে দেখা দৃশ্যটা মিলছে না, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। তাই এই অবস্থায় চোখ বন্ধ করে নেই। কিন্তু এ মুহূর্তে আমার সামনে অন্য একজন লোক থাকায় সেটা করা সম্ভব না।
“এই রাস্তাটা ধরে গেলে…পরের প্রিফেকচারটায় পৌঁছুতে পারবো তো?”
তার উদ্দেশ্যে মাথা নাড়ার সময় এমন একটা অনুভূতি হলো যে আর একটু হলেই হার্ট অ্যাটাক করতাম।
গাড়িটার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আয়নায় চোখ পড়ে কাজুয়ার। সেখানে সে দেখতে পায় যে পেছনের সিটে একটা মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটার চেহারা এতবার দেখেছি আমি যে একদম মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে। হিতোমি আইজাওয়া।
তবে দৃশ্যটা দেখে কাজুয়ার মনে কোন সন্দেহ জাগেনি। চুপচাপ পাশ কাটিয়ে হেঁটে যায় সে। ড্রাইভিং সিটে কে বসে আছে সেদিকে তাকায় না, লাইসেন্স প্লেটটাও দেখে না।
এখানেই শেষ হয়ে গেল স্মৃতিটা।
সামনের লোকটা কি বলছে সেটা শোনা অনেক আগেই বাদ দিয়ে দিয়েছি আমি। আসলে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি বললেও অত্যুক্তি হবে না। হাল ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন বয়স্ক ভদ্রলোক।
ভাগ্যক্রমে হিতোমিকে গাড়িতে দেখে ফেলেছিল কাজুয়া। তখন অবশ্য জানতো না যে অপহরণ করা হয়েছে তাকে। স্মৃতিতে হিতোমির হাত পা’গুলো তো ঠিকই ছিল, তাই না? নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবো না।
পরে খবরে হিতোমিকে দেখালে সত্যটা বুঝতে পারে সে। সেটা কি অপহরণের পরপরই, নাকি দুই মাস আগে, জানার উপায় নেই। কিন্তু যখনই হোক, হিতোমিকে গাড়িটার পেছনের সিটে দেখার কথা মনে ছিল তার।
কাজুয়া কি জানতো যে গাড়িটা শিওজাকির? অবশ্য স্মৃতিতে যে গাড়িটা দেখেছি, সেটার সাথে শিওজাকির এখনকার গাড়ির মডেলের কোন মিল নেই। হয় নতুন গাড়ি কিনেছে, নতুবা দুইটা গাড়ি আছে তার।
এমনটাও হতে পারে যে শিওজাকির বাড়িতে যাবার রাস্তাটায় গাড়িটা দেখে কাজুয়া। এভাবেই হয়তো সে বুঝতে পারে যে নীল রঙের বাসাটায় থাকে অপহরণকারী।
শিওজাকির বাসায় যাওয়ার রাস্তাটা ভালোমতো খুঁটিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঠিক কোথায় দৃশ্যটা দেখেছিল সে, এটা হয়তো জানতে পারবো। কিন্তু এই এলাকার সবগুলো জায়গা একইরকম দেখতে। সবখানে একই চেহারার গাছ। শেষ পর্যন্ত হতাশ মনোরথে রওনা দিলাম মেলানকলি গ্রোভের উদ্দেশ্যে।
