এরকম সময়ে চাইলেও তার সাথে কথা বলতে পারি না। পেছন থেকে দেখলে ভীষণ দুঃখী মনে হয় তাকে। যে কারো মনে করুণার উদ্রেক ঘটাতে বাধ্য দৃশ্যটা।
বাম চোখে খণ্ড খণ্ড অতীতের চিত্র দেখি আমি। আর সাওরির জন্যে সবকিছুই হচ্ছে অতীতের বোমন্থন। হয়তো কথাটা ঠিকমতো বোঝাতে পারছি না। আমি যে রকম কাজুয়ার স্মৃতিগুলোর জন্যে অপেক্ষা করি, সাওরিও সে রকমভাবে মৃত মানুষদের নিয়ে ভাবে।
“দুই মাস হয়ে গেল,” রাতের খাবার শেষে বললো সাওরি। “তবুও আমার মনেই হচ্ছে না কাজুয়া চিরদিনের জন্যে হারিয়ে গেছে। এটার কারণ কি? হয়তো আমি কষ্টই পাইনি ওর মৃত্যুতে।”
সাওরির মামার বাসায় ফিরতে দেরি হয় ইদানীং। তাই আমরা দুজন খেয়ে নেই। টেলিভিশন বন্ধ থাকায় তার প্রতিটা শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।
কোতসুর ওপরে রাখা একটা কাপের দিকে তাকিয়ে আছি আমরা। কাজুয়া নিয়মিত ব্যবহার করতে কাপটা।
“হয়তো উল্টোটা ভাবছো তুমি। আসলে কাজুয়া যে চলে গেছে এটা মেনে নিতে পারোনি, তাই কষ্ট অনুভব করছো না ভেতরে ভেতরে।”
“তুমি খুবই অদ্ভুত, নামি।”
একবার ঘাড় কাত করলাম।
“তোমাকে দেখলে মনে হয় আমার ছোটভাইটা এখনও এখানে আছে আমার সাথে।
“তাই?”
“হ্যাঁ। যাইহোক, তুমি কি জানো যে কাজুয়ার বাম চোখটা অন্য একজনের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে?”
এই বিষয়ে আরো আগে থেকেই কথা বলার ইচ্ছা আমার।
“মৃত্যুর পর ওর একটা চোখ সংরক্ষণ করা হয়। এমনটাই চেয়েছিল কাজুয়া।”
“কেন?”
“দেড় বছর আগে চোখে একটা ফোঁড়া হয় ওর। সেটা কেটে ফেলার পর কিছুদিনের জন্যে চোখটা ব্যান্ডেজ করে দেয় ডাক্তার। তিনদিনের জন্যে এক চোখ অন্ধ হয়ে যায় কাজুয়ার।”
সাওরি বললো যে চক্ষু হাসপাতালে মরণোত্তর চক্ষুদানের একটা লিফলেট দেখে কাজুয়া। তখনই সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয় সে।
“চোখ দুটো খুবই সুন্দর ছিল আমার ভাইয়ের,” স্মৃতি রোমন্থনের ভঙ্গিতে বললো সাওরি। মাঝে মাঝে ভাবি, এখনও কত কিছু দেখা বাদ ছিল ওর।”
যেরকমটা বললাম একটু আগে, সুযোগ পেলেই মৃতদের নিয়ে ভাবতে শুরু করে সাওরি।
সুমিদা যখনই আন্তরিক ভঙ্গিতে অভ্যর্থনা জানায় সাওরিকে, হেসে উত্তর দেয় সে। প্রথমে এটাই দেখেছিলাম কেবল। কিন্তু পরে ভালোমতো খেয়াল করায় বুঝতে পারি, কথার মাঝে কাজুয়া যে চেয়ারটায় বসততা, সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে সাওরি।
সময় বয়ে চলে। মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায় মানুষ। পরিত্যক্ত রাস্তা বা রেললাইন যেরকম অদৃশ্য হয়ে যায় শহর থেকে, মানুষের অস্তিত্বও মিলিয়ে যায়। চেনা পৃথিবীটাকে একটু অন্যরকম মনে হয় তখন। কিন্তু সাওরি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষদের নিয়ে এমনভাবে চিন্তা করে, যেন সময় থেমে গেছে।
সাওরির থমকে যাওয়া জীবন এখন কাজুয়ার রেখে যাওয়া ভাঙা সোনালি ঘড়িটার মতন। কাটাগুলো আর ঘুরছে না।
তার মামার ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য।
আমি যে ঘরটায় ঘুমাই, তার উল্টোদিকে একটা বৌদ্ধ বেদি আছে। সেই বেদিতে কাজুয়া, সাওরির বাবা-মা আর মিসেস ইশিনোর ছবি রাখা।
একদিন সকালে গায়ে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছি এসময় বাইরে থেকে শব্দ শুনতে পাই। দরজা খুলে দেখি সাওরির মামা বেদিটা ঠিকঠাক করছেন। এরপর হাত জোড় করে আমার দিকে তাকালেন তিনি, “তোমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছি?”
মাথা ঝাঁকিয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। পা ভাঁজ করে বসলাম বেদির সামনে।
“একবার আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছিলাম কোন কারণ ছাড়াই, দুর্বল কণ্ঠে বললেন মিঃ ইশিনো। “কেন যে একটুতেই রেগে যেতাম।”
তার স্ত্রীর ছবিটার দিকে তাকালাম। নিউমোনিয়ায় মারা গেছে সে।
এরপরেও বেশ কয়েকবার তাকে বেদিটার সামনে দেখেছি আমি। বেদনার্ত মানুষকে সান্ত্বনা দিয়ে আসলে খুব বেশি কিছু বলা যায় না, তাই মুখ বন্ধ রেখেছি প্রতিবারই।
মিঃ ইশিনোকে দেখে মনে হয় যেন অনুতাপ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে।
একদিন ক্যাফের কাজে কিমুরাকে সাহায্য করি আমি। সাওরি কোথায় যেন গিয়েছে, তাই তার জায়গায় আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে ক্যাফে মালিক। অবশ্য খুব বেশি কিছু যে করেছি তা-ও না। একদমই অল্প কাস্টমার এসেছিল সেদিন। আমার একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে বসে বসে কিমুরার অভিযোগ শোনা।
কিছুক্ষণ পরে কিমুরা উধাও হয়ে গেল।
“সুমিদা, একটু এখানে বসুন,” বলে তার হাতে অ্যাপ্রনটা ধরিয়ে দেই আমি।
অবাক হয়ে যায় সে। “দাঁড়াও… মানে কি? এখানে কি করবো আমি?”
তার কথা আমলে না নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ক্যাফের পেছনে ছিল কিমুরা। সে কি করছে তা বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো আমার।
একসারিতে জুতো সাজিয়ে রাখা হয়েছে প্রায় ত্রিশটার মতন হবে। প্রত্যেকটাই ব্যবহৃত। সব ধরনের জুতো আছে সেখানে। বাচ্চাদের থেকে শুরু করে পূর্ণবয়স্ক মানুষ, সবার।
“এগুলো কি?”
“আমার বন্ধুর রেখে যাওয়া জুতো। ওর অদ্ভুত একটা স্বভাব ছিল। কখনো কোন জুতো বাইরে ফেলে দিত না। মারা গেছে কিছুদিন আগে। কিন্তু এই জুতোগুলো রয়ে গেছে।”
হাতে সময় পেলেই জুতোগুলো বাইরে নিয়ে এসে রোদে শুকোতে দেয় কিমুরা। শুধু গায়ে গতরেই না, মনটাও বড় মানুষটার।
“ব্যবহারের ক্রমানুযায়ী জুতোগুলো সাজাচ্ছি। বাম দিকেরগুলো ছোট বেলায় পড়তো। আর ডান দিকেরগুলো মৃত্যুর কয়েকদিন আগে পড়েছে। এই চামড়ার জোড়াটা দেখতে পাচ্ছো?” মাঝের দিকের একটা জুতো দেখিয়ে বললো সে। “আমাদের যখন প্রথম দেখা হয়, তখন পায়ে এটাই ছিল তার।
