পাহাড়ের ওপর থেকে নিচের ছোট্ট শহরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কাজুয়ার দেখা শহরের দৃশ্যের সাথে এখনকার দৃশ্যে অবশ্য কিছু পার্থক্য আছে। নতুন কিছু বাড়ি বানানো হয়েছে, তৈরি হয়েছে নতুন রাস্তা। এ কারণেই জার্নালের বিবরণীর বাইরে কিছু বিল্ডিং চোখে পড়লো।
বাম চোখে এখনও পুরনো দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছি। এই চোখটা আসলে অতীতের একটা জলজ্যান্ত অংশ। শক্ত ক্যান্ডি যেরকম ধীরে ধীরে গলে যায়, ঠিক সেভাবে আমার অপটিক নার্ভে ধীরে ধীরে অতীতের দৃশ্য সরবরাহ করে চোখটা।
বনের ধারে গিয়ে শেষ হয়ে গেল রেললাইন। সামনে একটা প্লাটফর্ম। স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন এই প্লাটফর্মটাই দেখি স্বপ্নে। সেখানে অবশ্য পুরো সবুজ ছিল গাছগুলো, এখনকার মত পাতাবিহীন না। তবে বগিটা এখনও আগের মতনই আছে।
দৌড়ে গেলাম ওটার দিকে। ভেতরে ঢুকে পড়লাম কিছু না ভেবেই। এখন আর ঠান্ডা বাতাস আঘাত হানতে পারছে না আমার চোখেমুখে। বাইরের তুলনায় ভেতরে বেশ গরম। কিন্তু স্মৃতিতে যেরকম দেখেছিলাম তার চেয়ে খালি ঠেকলো বগিটা। সবকিছু সরিয়ে ফেলা হয়েছে, সিটগুলোও। এখন শুধু একটা ফাঁপা বাক্স বগিটা।
মনে আছে আমার, কাজুয়াকে এখানে খেলায় নিতে চাইনি অন্য বাচ্চাগুলো। একজন তো পাথর ছুঁড়ে মারে।
আমার বাঁ চোখের অনেক স্বপ্নেই একাকী সময় কাটাতে দেখি কাজুয়াকে। কিছু স্বপ্নে বন্ধুদের সাথে খেলা করতেও দেখেছি তাকে, কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই একা হাঁটতো।
হয়তো এটাই বাস্তবতা, জীবনের বেশিরভাগ সময়ই নির্জনেই কাটাই আমরা।
কাঠের মিলটাতে গেলাম এরপর। কাজুয়া আর সাওরির বাবা-মা যেখানটায় মারা গেছে, সেখানে ঢুকবো কিনা ভাবতে লাগলাম। একটা খাটো বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে জায়গাটুকু। সদ্য কাটা কাঠের গন্ধ নাকে এসে লাগলো। সাওরির কাছ থেকে নেয়া একটা স্কার্ফ দিয়ে নাক ঢেকে ভেতরে পা রাখলাম।
কিছুক্ষণ ঘোরাফেরার পর মিলের অফিসের দরজার দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলাম। পরিচিত একজন হাত নাড়ছে আমার উদ্দেশ্যে। সাওরি। দুজনেই দু’জনকে দেখে অবাক হয়েছি।
“এখানে খুব বেশি আসি না আমি,” বললো সে। “কিন্তু আজকে মা বাবার ব্যাপারে কিছু জিনিস জানতে ইচ্ছে করছিলো।” সাওরির বাবার কিছু সহকর্মী এখনও কাজ করে এখানে।
মেলানকলি গ্রোভের উদ্দেশ্যে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করি আমরা। চুপ করে আছে সাওরি। হয়তো বাবা-মা বা কাজুয়াকে নিয়ে ভাবছে। কিংবা সেই বিষণ্ণ চেহারার তরুণকে নিয়েও ভাবতে পারে।
ক্যাফের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলাম। কিমুরা বাদেও অপরিচিত কয়েকজন কাস্টমার বসে আছে টেবিলে। খুব বেশি একটা লোক হয়না ক্যাফেটায়, কিন্তু মাঝে মাঝে অনেকেই একসাথে চলে আসে সময় কাটানোর জন্যে।
কাউন্টারে বসেই জমে গেলাম। মনে হচ্ছে হিটারটা হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। দূরে অন্ধকার টেবিলটায় বসে আছে শিওজাকি। আশেপাশের কারো দিকে কোন খেয়াল নেই তার-অন্তত দেখে সেটাই মনে হচ্ছে।
বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল বরাবরের মতন। ঐ টেবিলটায় গিয়ে বসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ক্যাফেতে ঢুকেছি খুব বেশিক্ষণ হয়নি, এত তাড়াতাড়ি গেলে সন্দেহ করতে পারে। তাই চুপচাপ কাউন্টারের পাশেই বসে রইলাম।
“নামি?”
সাওরি যে আমার নাম ধরে ডাকছিল, সেটা এতক্ষণে খেয়াল করলাম। কোমরে অ্যাপনের ফিতেটা বেঁধে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “লাঞ্চ করেছো? কিছু লাগবে?”
বললাম যে খাইনি।
না চাইতেও বারবার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে শিওজাকির দিকে। আমার লাঞ্চ শেষ হয়েছে কেবল, এসময় উঠে দাঁড়ালো সে। কাঠের মেঝেতে তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কাউন্টারে বিল মেটানোর জন্যে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো হারামিটা।
চোখাচোখি হওয়াতে একবার ঝড়ের বেগে মাথা নাড়লাম কেবল। অপহৃত হিতোমি আর মৃত কাজুয়ার ছবি ভেসে উঠলো মনে। রাগে ফেটে পড়ছি, এটা ঠিক। কিন্তু সেই সাথে প্রচণ্ড ভয় আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে আমাকে। নিজেকে ছোট্ট একটা অবলা প্রাণীর মত মনে হচ্ছে। সামনে থেকে দানোটার চলে যাওয়ার অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
শিওজাকি বের হয়ে গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। পরক্ষণেই নিজের এহেন কাপুরুষতায় বিষিয়ে উঠলো মন।
কিয়োকো ক্যাফেতে এলো এসময়। হাতে একটা হার্ডকভার বই। আমাকে দেখে হাসলো সে আন্তরিক ভঙ্গিতে। নিজের প্রিয় সিটটায় বসে কফির অর্ডার দিল। “হাউজ ব্লেন্ড, প্লিজ।”
“নিশ্চয়ই…” সাওরিকে দেখে মনে হচ্ছে অনিচ্ছাস্বত্তে কথাটা বললো।
ততক্ষণে হাতের বইটা পড়া শুরু করেছে কিয়োকো।
*
একা একা বসে থাকলে সবসময় মৃত মানুষদের নিয়ে ভাবে সাওরি। কখনো নিজ থেকে একথা আমাকে বলেনি সে, কিন্তু সেটাই ধারণা আমার।
ব্যাখ্যা করছি, দাঁড়ান। ধরুন, লিভিং রুমের জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে সাওরি। বাড়িটা একটা পাহাড়ি ঢালে তৈরি তাই নিচের রাস্তাটা পরিষ্কার দেখা যায়। এই মুহূর্তে সেখানে কেউ না থাকলেও সাওরি নিশ্চয়ই দেখছে কাজুয়া স্কুল থেকে ফিরে আসছে বা তার বাবা কাজে যাচ্ছে।
ওয়াশিং মেশিনের দিকেও একই দৃষ্টিতে তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি আমি। নিশ্চয়ই মা’র কথা ভাবছিলো সে তখন। অবশ্য ছোটবেলা থেকে মামার বাসায় বড় হয়নি সে। তবুও, আমার ধারণা মা’র কথাই ভাবছিল সাওরি।
