একবার দু’হাত ভর্তি অপোয়া বাসন নিয়ে সাওরি বলে, “নাক দিয়ে পানি পড়ছে আমার!”
কিন্তু হাত খালি করে যে নাক মুছবে সেই উপায় নেই।
“এবার ঠিক আছে?” একটা টিস্যু নিয়ে তার নাক থেকে সর্দি মুছে ফেলে বলি। ছোট বাচ্চাদের মতন নাকি কণ্ঠে আমাকে ধন্যবাদ দিল সারি।
এক ঝড়ের রাতে দু’জন কার্ড খেলে কাটালাম। স্টোভ জ্বালিয়ে আর কোতসুর নিচে পা দিয়েও যখন শরীর গরম হলো না, মোটা কাপড় গায়ে চাপিয়ে জড়াজড়ি করে বসে রইলাম। বাইরে থেকে শোঁ শোঁ বাতাসের আওয়াজ ভেসে আসছিল। মনে হচ্ছিল আমি আর সাওরি বাদে আর কেউ নেই পৃথিবীতে।
উনো খেলার সময় কাজুয়ার ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করলো সাওরি। আমার মুখ থেকে নিজের ভাই সম্পর্কে অজানা তথ্যগুলো জানতে চায় সে। কিন্তু কাজুয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই, ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি আমি।
তখন হেসে ওঠে সাওরি। সত্যটা কি, সে ব্যাপারে ধারণাও নেই তার।
“জানো একবার খেলার সময় কার্ড খেতে শুরু করে কাজুয়া। একদম ছোট্ট ছিল তখন। সেবার প্রথমবারের মতন নিজেকে বড় বোন মনে হয়েছিল, কার্ড বেটে দেয়ার সময় বললো সে।
গল্পটা শুনে হেসে ওঠার সময় খেয়াল করলাম যে কাজুয়া আর সাওরির জন্যে এক ধরনের মমতা অনুভব করছি ভেতরে ভেতরে। মমতাটুকু এতই প্রগাঢ় যে রীতিমত কান্না পাচ্ছে। কি অদ্ভুত? হাসছি, সেই সাথে কাঁদতেও চাইছি।
“সাওরি, তোমাদের বাবা-মা’র শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের কথা মনে আছে?” কয়েকদিন আগে সাওরি জোর দিয়ে আমাকে বলেছে তাকে তুমি করে বলতে। “কাজুয়ার কাছে সেদিনের কথা শুনে একটু অবাকই হয়েছিলাম…”
স্মৃতিটা কিছুদিন আগে বাঁ চোখে দেখেছি আমি। কালো পোশাক পরে সবাই দাঁড়িয়ে ছিল সাওরি আর কাজুয়ার উল্টোদিকে। তবে ভিড়ের মধ্যে এক তরুণকে আলাদাভাবে চোখে পড়ে আমার। সাওরি আর কাজুয়ার দিকে এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে কিছু কথা বলে সে। কথাগুলো শুনে চোখে পানি চলে আসে সাওরির। তরুণের চোখেও সেদিন ভর করে ছিল রাজ্যের বিষণ্ণতা।
তরুণ ছেলেটা কি বলেছিল ওদের উদ্দেশ্যে, সেটাই জানতে চাইলাম। সাওরি তাকে একবার জড়িয়ে ধরে কান্নার মাঝেই।
“এরকমটা করেছিলাম নাকি? আসলে ঠিক মনে নেই,” গালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলে সে। “ঐ ছেলেটার গাফিলতির কারণেই বাবা-মা মারা যায়। দড়িতে ঠিকমতো গিট দিতে পারেনি…।”
সাওরি বউ কষ্ট লেগেছিল ছেলেটার জন্যে। বারবার নাকি কাজুয়া আর সাওরির কাছে ক্ষমা চাইছিলো। অন্য এক শহর থেকে কাজ করার জন্যে কায়েদিতে আসে সে। নিজের ব্যাপারে সব খুলে বলে ওদের।
“এগুলো তোমাদের কেন বলে সে?”
“হয়তো কারো সাথে কথা বলে মন হালকা করতে চাচ্ছিলো।”
এর দুই সপ্তাহ পরে গলায় ফাঁস নেয় ছেলেটা। সুইসাইড নোট লিখে রেখে যায় যে তার কারণে দু’জন ছেলেমেয়ে অনাথ হয়ে গেছে, এটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিল না।
বিষণ্ণ কণ্ঠে আমার কাছে ছেলেটার গল্প করলো সাওরি।
*
হাতে সময় থাকলে বাঁ চোখের স্মৃতি ভর্তি বাইন্ডারটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বেরিয়ে পড়ি শহর ভ্রমণে। ভারি জিনিসটা পিঠে নিয়ে হেঁটে বেড়ানোর সময় নিজেকে ভিক্ষু মনে হয়।
যে করেই হোক, খুব তাড়াতাড়ি শিওজাকির বিরুদ্ধে প্রমাণ যোগাড় করতে হবে আমাকে। কিন্তু সেটার জন্যে কাজুয়ার পদচিহ্ন অনুসরণ করা দরকার।
শহরময় হেঁটে বেড়ানোর সময় তার দেখা জিনিসগুলোই নিজের চোখে দেখি। তার অভিজ্ঞতাগুলোকে আরো আপন করে নেয়ার চেষ্টা করি। সেদিন কাজুয়ার প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার পর স্মৃতির স্রোতে বাঁধ ভেঙে যায়। একটার পর একটা ভেসে উঠতে থাকে বাঁ চোখে।
শহরের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া হাইওয়ের পাশেই একটা সুপারমার্কেট। আর সেটার পেছনে পরিত্যক্ত কিছু জমি। ছোটবেলায় নিভৃতে সময় কাটানোর জন্যে এখানে প্রায়ই আসততা কাজুয়া। আমিও তার মতন ঘাপটি মেরে বসে থাকি জায়গাটায়। নিজেকে কাজুয়া মনে হয় তখন।
সারি সারি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভর্তি একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎই থমকে দাঁড়াই। পাশেই খালি একটা পার্ক। কায়েদি শহরের অনেক মানুষের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হচ্ছে কাঠ। একটা লোক পুরু পোশাক পরে গাছের গায়ে করাত চালাচ্ছিল। কাছে এগিয়ে যাই ভালো করে দেখার জন্যে। কিন্তু হাত নেড়ে আমাকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় সে। যে কোন সময় বিপদ হতে পারে। কিছুক্ষণের মধ্যে গাছটা ভেঙে পড়ে নিচে।
বাইন্ডারটা বের করে সেটা পড়তে পড়তে রাস্তা দিয়ে হাঁটি। দেখে মনে হবে গাইডবুক হাতে কোন পর্যটক হেঁটে বেড়াচ্ছে।
এক হাত দিয়ে বইটা ধরে অন্য হাত দিয়ে স্মৃতিগুলোর পাতা ওল্টাতে থাকি। হাতে গ্লোভস থাকায় পাতা উল্টাতে একটু কষ্ট হচ্ছে অবশ্য। তবে এক হাতে ভারি বাইন্ডারটা ধরে থাকা আরো কষ্টসাধ্য।
ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে হাঁটছি তো হাঁটছিই। শহর থেকে কিছুটা দূরে একটা পরিত্যক্ত রেললাইন খুঁজে পেলাম। সেটার পাশ দিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠে গেছে একটা নুড়ি বিছানো পথ। রেললাইনগুলোয় মরিচা পড়ে লালচে রঙ ধারণ করেছে।
বাইন্ডারটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে রেললাইনের ওপরে উঠে পড়লাম। আগের নামি হলে হয়তো খুব সহজেই ভারসাম্য রক্ষা করে সামনে এগোতে পারতো। কিন্তু আমি বারবার হোঁচট খাচ্ছি।
