“কিন্তু আপনি বড় নিষ্ঠুর,” অনুযোগের কণ্ঠে বলে মিকি। “আপনি যদি আমাদের ঘাড়দুটো আরেকটু কাছাকাছি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতেন…”
দু’জনের মাথা দেহের দু’প্রান্তে। এসময় নড়ে উঠলো বিশাল দেহটা। “জেগে আছো নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম ঘুমাচ্ছো।”
“এখনও বুঝতেই পারলাম না,” ছায়া থেকে উত্তর এলো।
“আমাদের শরীরের যা অবস্থা, কখনো বুঝতে পারবে বলে মনে হয় না।”
জোড়া শরীর নিয়ে কিভাবে আরামে ঘুমানো যায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করছে দু’জনে।
শিনিচি মাথা উঁচু করলে, ইউকির গাল প্রায় মেঝের সাথে লেগে যায়। আর ইউকি নিজেকে সুবিধাজনক অবস্থানে আনলে শিনিচির দুর্বল হাতটাকে ভারী শরীরটা ভার বহন করতে হয়। দু’জনেই যাতে আরামে থাকতে পারে, সেই অবস্থানটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে তারা অনেকদিন ধরে। কিন্তু সেটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। একজনকে অস্বস্তিদায়ক অবস্থান মেনে নিতেই হবে। এজন্যেই খুব সম্ভবত ‘মানব গিট্ট’ গল্পটার সাথে তাদের মিল খুঁজে পেয়েছে হিতোমি।
“আপনার ক্ষমতাটা যে কি,” মিকি কথা বলে ওঠে আবারো। “আমাদের অনেক আগেই মরে যাবার কথা ছিল। আপনি কারো শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করা মাত্র, মৃত্যু দূরে পালিয়ে যায় তার থেকে। আমার ক্ষতস্থানগুলোতেও জীবনের অস্তিত্ব স্পষ্ট টের পাচ্ছি। জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে আমাদের রেহাই দিয়েছেন আপনি…”
ঘুরে দাঁড়ালো মিকি।
তলকুঠুরি ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় পেছনের কাঠ আর ইটগুলোর দিকে একবার তাকালো সে।
তলকুঠুরির দরজাটা বুজে দিতে হতে পারে। প্রয়োজনীয় মাল-মশলা আছে এখানে। যদি আগন্তুকের হদিস না পাই, এটাই করতেই হবে।
এর কিছুদিন পর কেউ একজন কড়া নাড়লো তার দরজায়।
.
২
শিওজাকিই অপরাধী, এটা একরকম নিশ্চিত আমি। কিন্তু সেটার কোন প্রমাণ নেই। পুলিশ ফোন দিতে গিয়ে থেমে গেছি বহুবার। প্রতিবারই রিসিভারটা উঠিয়ে একটু পরেই নামিয়ে রেখেছি। যদি আমাকে বলা হয় যে কিসের ভিত্তিতে তাকে দোষ দিচ্ছি, তখন কি বলবো? আমার দেয়া ব্যাখ্যাগুলো নিশ্চয়ই মনঃপুত হবে না তাদের।
এক সপ্তাহ যাবৎ শিওজাকির ব্যাপারে তথ্য জোগাড়ের চেষ্টা করছি। কিন্তু কাউকে যে তার ব্যাপারে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করবো, সেটা সম্ভব না। তার মনোযোগ আকৃষ্ট হয়, এরকম কিছু করা যাবে না। একবার যদি বুঝে যায় যে তাকে সন্দেহ করি আমি, হিতোমির ক্ষতি হতে পারে।
একদিন মেলানকলি গ্রোভে সুমিদাকে বলতে শুনলাম, “শিওজাকির বিয়ে হয়েছিল আগে।” বরাবরের মতনই কাউন্টারের উল্টোদিকের সিটটায় বসে একদৃষ্টিতে সাওরিকে কাপে কফি ঢালতে দেখছে সে।
“সুমিদা, তোমার তো এই সময়ে ক্লাসে থাকার কথা, যেন কোন বাচ্চার সাথে কথা বলছে, এমন ভঙ্গিতে বললো সাওরি।
“আপনার কি মনে হয়? কোনটা বেশি জরুরি আমার জন্যে? ক্লাসে যাওয়া, নাকি এখানে আসা?।”
সুমিদা এরকম কিছু বললে কিমুরা সবসময় কাউন্টারে রাখা গোল ট্রেটা দিয়ে বাড়ি বসায় তার পিঠে। মজাচ্ছলেই কাজটা করে সে।
“শিওজাকি বিবাহিত?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
জবাবে দেয়ালে ঝোলানো ছবিটা দেখালো সুমিদা। “ভালো করে খেয়াল করো। হ্রদটার তীরে একটা লাল বিন্দু দেখতে পাবে।”
ছবিটার কাছে চোখ নিয়ে গেলাম আমি। আসলেও একটা লাল রঙের বিন্দু দেখতে পাচ্ছি, আগে চোখে পড়েনি কোন রহস্যময় কারণে।
“আমার কাছে মনে হয়েছিল, বিন্দুটা কোন মহিলার আদলে আঁকা। শিওজাকিকে জিজ্ঞেস করায় সে বলে তার স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে বিন্দুটা দিয়েছে সেখানে।
পুরো চিত্রকর্মটার তুলনায় বিন্দুটা একদমই ছোট। কাছে চোখ না নিলে দেখতে পেতাম না। আমার কাছেও একটা মহিলার অবয়বের মত ঠেকছে বিন্দুটা। লাল রঙের পোশাক তার পরনে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ছবিতে আঁকা হ্রদটা আর গাছগুলো উধাও হয়ে গেল। একদৃষ্টিতে লাল বিন্দুটার দিকে তাকিয়ে আছি আমি। এখন মনে হচ্ছে, ছবিটার বাকি অংশটুকু আঁকাই হয়ে মহিলাকে ঘিরে।
কাঁধ ঝাঁকালো সুমিদা। “সে আসলেও বিবাহিত কিনা জানি না। আমাকে যা বলেছিল সেটাই বললাম।”
শিওজাকির ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য নেই আমার কাছে। তার অতীত বা পরিবার-পরিজন সম্পর্কে কিছু জানি না। এই বাড়িটা হঠাৎ ভাড়া নিয়েছে কেন সে? কায়েদিতে তার পরিচিত কেউ আছে?
তদন্তের সময়টুকুতে মিঃ ইশিনোর বাসাতেই থাকলাম আমি। সাওরি আর তার সাথেই খাওয়া দাওয়া সারি। মাঝে মাঝে একইসাথে লিভিং রুমে বসে টিভি দেখি।
কখনো কখনো মনে হয় যে তাদের অনর্থক বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছি, আবার কখনো মনে হয় ইশিনোদের বাড়িতে কাজুয়ার জায়গা দখল করেছি আমি।
প্রতিদিন বাসায় একবার ফোন দেই। তাদের কাছে বেশ কয়েকবার ক্ষমা চেয়েছি এভাবে হুট করে চলে আসায়। যতই নিজেকে প্রবোধ দেই না কেন, কাজটা ঠিক করছি না।
“পুরনো নামি কখনো এভাবে বাড়ি থেকে চলে যেত না,” বলে তারা।
বাবা প্রায়ই খেই হারিয়ে ফেলে কথা বলার সময়। আর মার সাথে সম্পর্ক এখনও ঠিক হয়নি। দু’জনেই রিসিভার কানে চেপে চুপ করে থাকি। কিছুক্ষণ অবিচ্ছিন্ন নীরবতার পর বাবার দিকে ফোন এগিয়ে দেয় সে।
“তাড়াতাড়ি ফিরে এসো,” বাবা বলে। “একবার চেকআপের জন্যে হাসপাতালে যেতে হবে।”
শিওজাকির ব্যাপারে মাথা না ঘামালে সেই সময়টুকু সাওরিকে কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করি। ক্যাফেতেও, বাসাতেও। অ্যাপ্রন পরে পাশাপাশি বসে অপেক্ষা করি কাস্টমারের জন্যে। বাসন ধুতে ধুতে এটাসেটা নিয়ে গল্পে মেতে উঠি।
