তলকুঠুরিতে বেশ কয়েকটা তাক সারি সারি দাঁড় করানো। নিজেদের সবসময় ওগুলোর পেছনে অন্ধকারে লুকিয়ে রাখে শিনিচি আর ইউকি।
মিকি তাদের দিকে এগিয়ে গেল। শিনিচির মাথাটা দেখতে পাচ্ছে না ছায়ার কারণে, কিন্তু ইউকি ঘুমিয়ে আছে।
“তাকের ঐপাশ থেকে আমাদের সাথে কথা বলে ও,” বললো শিনিচি। “অতীতের ব্যাপারে কথা বলে। পরিবারের সদস্যদের সাথে ক্যাম্পিংয়ে যেত হিতোমি প্রায়ই। স্কুলে দৌড় প্রতিযোগিতায় সবসময় প্রথম হতো।”
হিতোমি প্রায়ই তলকুঠুরিতে শুয়ে শুয়ে অতীত রোমন্থন করে। নিজের প্রাত্যাহিক জীবনের স্মৃতিগুলো বড় পোড়ায় তাকে। হাত-পা গুলো একদম ঠিক ছিল তার, ছুটির দিনে ইচ্ছেমতন দেরি করে উঠতো, স্কুলের ডেস্কে বান্ধবীদের সাথে ফুটসি খেলতে।
স্মৃতিগুলোর কথা ভাবার সময় নিজের কাল্পনিক হাত পাগুলো আগের মতনই নাড়ায় হিতোমি।
একবার কাউচে বসে মিকির উদ্দেশ্যে সে বলেছিল, “বলুন দেখি আমি কি করছি?” কাঁধদু’টো ওপর নিচে নড়ছিল তার।
“বুঝতে পারছেন না? ডিম ভাজছি!”
কাল্পনিক হাতে একটা ফ্রাইং প্যান ধরে ছিল সে। মিকি বুঝতে পারল যে ফ্রাইং প্যানে ডিমটা ওল্টানোর চেষ্টা করছে হিমি।
“সবার ভালোবাসায় বড় হয়েছে হিতোমি,” শিনিচি বললো। “আপনি কি কখনো কারো ভালবাসা পেয়েছেন?”
মিকি বললো যে এই প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই।
“আমার সাথে আগে নিয়মিত কথা বলতেন আপনি। তখন একবার বলেছিলেন যে ছোটবেলায় এক বান্ধবী ছিল আপনার। তাকে কি ভালোবাসতেন?”
ঘাড় কাত করলো মিকি। শিনিচির চেহারায় নিঃসঙ্গতা ভর করেছে। “ওর কথা ভাবলে বড় কষ্ট হয় আমার। কি করবো বুঝে উঠতে পারি না। মাঝে মাঝে এত বেশি অসহায় লাগে যে মরে যেতে ইচ্ছে করে।
ইউকির প্রেমে পড়েছে সে। কিন্তু এ কথাটা ইছে করে গোপন করে রেখেছে এতদিন। মিকির সামনে ফিসফিসিয়ে সত্যটা কেন বললো, এর উত্তর তার জানা নেই। তবে ইউকি ঘুমিয়ে আছে বলেই কাজটা করেছে।
নিজের বিশাল দেহটা নাড়ালো শিনিচি। স্বাভাবিক ব্যক্তির তুলনায় অনেক বেশি লম্বা সে। তবে ইউকি সে তুলনায় খাটো। একই দেহের দু’পাশে দুটো মাথা। মিকির হাতের কাজ। তাদের জোড়া দিয়ে দিয়েছে সে। আগে সম্পূর্ণ আলাদা দু’জন মানুষ ছিল তারা।
“নিজের অদ্ভুত ক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখার জন্যে আমাদের এই দশা করেছেন আপনি। সেজন্যে আপনাকে সাধুবাদ জানাবো নাকি অভিশাপ দেব বুঝতে পারছি না।”
জোরে গুঙিয়ে উঠলো শিনিচি।
দুটো আলাদা মানুষকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করলে কি হবে?–এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্যে কাজটা করেছিল মিকি। প্রথমে শিনিচির ডান হাতটা কনুইয়ের নিচ থেকে কেটে ফেলেছে। ইউকির বাম হাতেরও একই অবস্থা করেছিল। এরপর তাদের পেশী আর রক্তনালীগুলো জুড়ে দিয়েছে সিন্থেটিক সুতোর সাহায্যে। সার্জারি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু অবশ্য জানতো na মিকি, তার বাবার বইগুলো এ ব্যাপারে সাহায্য করেছিল তাকে। তার ক্ষমতাবলেই হয়তো, শিনিচি আর ইউকির শরীর জোড়া লেগে গেছে। তাদের রক্তের গ্রুপ এক কিনা, সেটা নিয়েও কখনো ভাবেনি মিকি। রক্তের গ্রুপ আলাদা হলেও এক্সপেরিমেন্টটার ফলাফল বদলাতো বলে মনে হয় না।
ধীরে ধীরে শিনিচি আর ইউকির পেশী আর স্নায়ু একীভূত হতে শুরু করে। তাদের শরীরের মধ্যকার সীমারেখা মিলিয়ে যাচ্ছে। দু’জনেরই আলাদা চেতনা আছে অবশ্য এখনও। একে অপরের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত তারা। জানে যে তাদের শরীরে কি হচ্ছে। তলকুঠুরিতেই প্রথমবার দেখা হয়েছিল দু’জনের। একজনকে এই বাড়িটার কাছে খুঁজে পেয়েছিল মিকি; অপরজন তার বই পড়ে একটা চিঠি লিখেছিল। সেই চিঠিতে আত্মহত্যার ইঙ্গিত থাকায় তাকে আমন্ত্রণ জানায় সে।
তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো কয়েকবার করে কেটে জোড়া দিয়েছে মিকি। বাড়তি জিনিসগুলো অবশ্য ফেলে দিতে হয়েছে। মিকি যাদের দেহে ক্ষত সৃষ্টি করে, তাদের শরীরে পচন ধরে না। কিন্তু কেটে ফেলা অঙ্গগুলোর কথায় সে কথা প্রযোজ্য না, কারণ হৃদয় এবং মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ওগুলোর। পচতে শুরু করে স্বাভাবিকভাবেই।
কেটে জোড়া দেয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো প্রথমে নড়াচড়া করতে পারতো না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হাড়ির মতন প্রবৃদ্ধি তৈরি হয়েছে ওগুলোর ভেতরে। এক সময় মিকি আবিষ্কার করে যে সেগুলোও নাড়াতে পারছে শিনিচি বা ইউকি। প্রথমদিকে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলেও, এক সময় পুরোপুরি অঙ্গগুলো নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয় তারা। তবে এখন শিনিচি-ইউকির শরীরে যে হাত-পা গুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো হিতোমির। কোন এক অজ্ঞাত কারণবশত হিতোমির কাটা হাত পায়ে পচন ধরেনি। তাই সেগুলো শিনিচি ইউকির শরীরে জুড়ে দিয়েছে সে।
মিকি জিজ্ঞেস করেছিল যে হিতোমির হাত-পা নিয়ন্ত্রণ করে কে। “জানি না,” ঘোরলাগা কণ্ঠে বলে ইউকি। “আমি করতে পারি বা শিনিচিও করতে পারে। এখন আর এসব আলাদাভাবে বুঝতে পারি না।”
শরীরের (আদৌ যদি মাংসের দলাটাকে শরীর বলা যায়) ওপর একক নিয়ন্ত্রণ নেই তাদের কারোরই। আর এটা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথাও নেই।
“নিজেদের মধ্যে গল্প করি আমরা সারাক্ষণ,” শিনিচি বলে। “আগের নিঃসঙ্গতা আর একাকীতু নিয়ে।”
ছোটবেলায় বাবা-মা’কে হারায় শিনিচি। পরিবার পরিজন বলতে কেউ ছিল না। তাই ইউকির সার্বক্ষণিক উপস্থিতি উপভোগ করে সে। ইউকি একবার বেঁচে থাকার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিল। সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজেকে শেষ করে দেয়ার। কিন্তু এখন শিনিচির কারণে বেঁচে থাকার উৎসাহ ফিরে পেয়েছে সে।
