ড্রয়ারের ভেতরে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো মিকি, কার হতে পারে এটা? চেনা কারো?
“এখন কি করবেন আপনি? মা’র সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করছে আমার। বাড়ি যেতে চাই,” ঘাড় ঘুরিয়ে মিকির দিকে তাকিয়ে বললো হিতোমি। তার লম্বা চুলগুলো চেহারা ঢেকে রেখেছে। পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করা উচিৎ আপনার। তারা নিশ্চয়ই মাফ করে দেবে আপনাকে।”
মিকি হিতোমিকে বলল যে আত্মসমর্পণ করার কোন ইচ্ছে নেই তার।
“তাহলে…” ভাঙা গলায় বললো হিতোমি। “আর কখনো বাড়িতে যেতে পারবো না আমি?”
তাকে একটা গল্প শোনানোর প্রস্তাব দিল মিকি।
“কিসের গল্প?”
তাক থেকে কয়েকটা বই নিয়ে এলো সে। এরমধ্যে তার নিজের লেখা বইও আছে।
“ওটা তো দ্য কালেক্টেড ব্ল্যাক ফেয়ারি টেইল, তাই না? আমাকে আগেই পড়ে শুনিয়েছেন গল্পগুলো। একটা গল্প পুরো শিনিচি আর ইউকির কাহিনির মত।”
“মানব গিটু’-গল্পটার কথা বলছে হিতেমি। একটা বিশাল দানো হাত দিয়ে চেপে কয়েকটা মানুষকে একীভূত করে ফেলে ওখানে।একীভূত অবস্থায় মানুষগুলোর হাত পা একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে যায়। কিম্ভুত দেখায় তাদের। বাকিটা সময় সেই পেঁচানো অবস্থা থেকে নিজেদের ছোটানোর চেষ্টা করে তারা।
গল্পটা তলকুঠুরির শিনিচি হিসামোতো আর ইউকি মোচিনাগার ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয় হিতোমিকে।
“ভিন্ন একটা গল্প বলুন এবারে। ওই পেপারব্যাকটা থেকে। না, আপনার ডান হাতেরটা।”
যে বইটা দেখাচ্ছে হিতোমি, সেটা একটা পুরনো কল্পবিজ্ঞান কাহিনির সংকলন। নামগল্পটা তাকে পড়ে শোনালো মিকি। খুব বেশিক্ষণ সময় লাগলো না শেষ হতে।
“শেষটা একটু কষ্টের,” ফ্যাকাসে হয়ে গেছে হিতোমির চেহারা। সত্যি কথা বলতে গল্পের শেষ পরিচ্ছেদটা পছন্দ হয়নি তার একদমই।
“আপনি যদি গল্পটার নায়ক হতেন, তাহলে কি করতেন?” মিকিকে জিজ্ঞেস করলো সে।
দৃশ্যকল্পটা অনেকটা এরকম:
* একটা স্পেসশিপ চালাচ্ছে নায়ক।
* অন্য এক গ্রহ থেকে কার্গো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে। কার্গোর উপাদান হচ্ছে ব্লাড সিরাম। সেগুলো তাড়াতাড়ি জায়গামত পৌঁছে না দিলে অনেক লোক মারা যাবে।
* বেশি পরিমাণ কার্গো পরিবহণের সুবিধার্থে জ্বালানির পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়েছে স্পেশ শিপটায়। শুধু ল্যান্ডিং আর গতি বাড়াতে যেটুকু জ্বালানি দরকার, সেটুকুই ভরা হয়েছে ট্যাঙ্কে।
* স্পেসশিপে বাড়তি কেউ থাকলে তাকে মহাকাশে ছুঁড়ে ফেলতে হবে, নতুবা স্পেসশিপের জ্বালানি দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। ল্যান্ড করার আগেই মুখ থুবড়ে পড়বে স্পেসশিপটা। বাড়তি লোকটার ওজনের সমান ব্লাড সিরাম নষ্ট করা যাবে না।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে
* বাড়তি ব্যক্তিটা যদি ফুটফুটে বাচ্চা একটা মেয়ে হয়, তাহলে নায়ক কি তাকে মহাশূন্যে ছুঁড়ে দেবে?
* ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়, কারণ নায়কের জন্যে অনেকে অপেক্ষা করে আছে। মেয়েটাকে না ছুঁড়ে ফেললে ল্যান্ড করা সম্ভব নয়। গল্পটার মতনই, মেয়েটাকে বাঁচানোর কোন উপায় আছে?
হিতোমি চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলো।
মিকিও সমস্যাটা নিয়ে মাথা ঘামালো। এরপর বললো যে মেয়েটাকে বাঁচানোর একটা উপায় জানা আছে তার।
হিতোমির চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। “তাই নাকি? আসলেও তাকে বাঁচাতে পারবেন আপনি?”
মিকি বুঝিয়ে বললো যে স্পেসশিপটার ওজন যদি ঠিকঠাক থাকে, তাহলে আসলেও বাঁচানো সম্ভব। প্রথমে তাকে এমন কিছু খুঁজে বের করতে হবে, যেটার সাহায্যে, মেয়েটার হাত পা কেটে ফেলতে পারবে। হাড়ি কাটতে পারে, এরকম শক্ত হতে হবে জিনিসটাকে।
“স্পেসশিপে নিশ্চয়ই কুড়াল বা এ জাতীয় কিছু থাকবে না।”
মেয়েটার হাত পা কেটে ফেলে তার ওজন যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। কাটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো মহাশূন্যে ছুঁড়ে দেয়া হবে এরপর। এক্ষেত্রে মেয়েটার বয়স কম হওয়াতে নায়কের সুবিধাই হবে।
এরপর নিজের শরীর থেকে মেয়েটার ওজনের সমান অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলে সেগুলোও মহাশূন্যে ছুঁড়ে দিতে হবে। তখন সহজেই স্পেসশিপটা তার গন্তব্যে ল্যান্ড করতে পারবে, জ্বালানিও নষ্ট হবে না।
“কিন্তু নিজের শরীরে কিভাবে কাটা ছেঁড়া করবেন আপনি?” হিতোমি বললো। “স্পেসশিপ চালাতে হলে তো হাত, পা সবই দরকার। তবে তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে মিকির প্রস্তাবটা পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আরেকটা ব্যাপার ভুলে যাচ্ছেন, স্পেস শিপটায় চেতনা নাশক জাতীয় কিছু নেই। জ্ঞান থাকা অবস্থায় এরকমটা করা নিশ্চয়ই সম্ভব হবে না? ব্যথার কারণে স্পেসশিপটা চালাতেই পারবেন না। সুতরাং ইচ্ছে হলো আর হাত পা কেটে ফেললাম-এই চিন্তাভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। হাত-পা ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না,” বলে নিজের দিকে একবার তাকালো হিতোমি। “আমার কথা অবশ্য আলাদা।”
*
ঘুমন্ত হিতোমিকে তুলে তলকুঠুরিতে নিয়ে এলো মিকি। ঘরটা বেশ অন্ধকার, আর্দ্রতাও ওপরের তুলনায় বেশি। ইটের দেয়ালগুলো কালচে হয়ে গেছে।
তলকুঠুরির একপাশে অনেকগুলো বর্শি চোখে পড়বে। লাল মাংস লেগে আছে ওগুলোর সাথে। কানেদার স্মৃতিচিহ্ন। এগুলোও পচতে শুরু করবে কিছুদিনের মধ্যে।
হিতোমিকে বিছানায় নামিয়ে রাখলো মিকি। “মা…” বিড়বিড় করে বলছে মেয়েটা।
দরজার দিকে ঘুরতে যাবে এমন সময় শিনিচির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “ও কি আপনাকে নিজের পরিবারের ব্যাপারে কিছু বলেছে?”
