“আমি নিশ্চিত যে আপনার অস্ত্রোপচার সফল হবে। আমার পক্ষ থেকে নিরন্তর শুভকামনা।”
দুই গালে টোল পড়লো মেয়েটার। “ধন্যবাদ,” হাসিমুখে বললো সে।
“আপনার জন্যে শেষ একটা উপহার এনেছি। টেবিলে রাখা আছে।”
কারাসুর মনে হচ্ছে কেউ দু’হাতে চেপে ধরেছে তার হৃদযন্ত্র। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। শেষবারের মতন জানালাটা দিয়ে উড়ে যাবার সময় কথাটা বলবে। আমি আর ফিরবো না, মিস।
এরপর আর কখনো তাকে নিয়ে ভাববে না কারাসু।
জানালার চৌকাঠে গিয়ে বসলো সে। “আমি আর…” কথাটা বলতে গিয়ে থেমে গেল মাঝপথেই। চিৎকার করে উঠেছে মেয়েটা।
লম্বা একটা সময় ধরে আর্তচিৎকারের পর দু’চোখ নখ দিয়ে আঁচড়ে রক্তাক্ত করে ফেললো অন্ধ কিশোরী। পরমুহূর্তে বমি করতে করতে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। হাত-পা মোচড়াচ্ছে সমানে। পরিপাটি করে বাঁধা। চুলগুলো আউলে গেছে পুরোপুরি। টেনে টেনে চুল ছিঁড়তে লাগলো কিছুক্ষণ পর।
চোখভর্তি কাঁচের বয়ামটা মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লো কারাসুর এতদিনের সংগ্রহকৃত চোখগুলো। কয়েকটা ইতোমধ্যে পচে গেছে, আবার কয়েকটা তুলনামূলক নতুন এবং তাজা।
মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে আছে মেয়েটা। গাঁজলা ওঠা মুখটা হাঁ হয়ে আছে। কারাসু মেয়েটার পাশে এসে বুকে কান রাখলো। হৃৎস্পন্দন থেমে গেছে তার। ভয়ে বিকৃত ফ্যাকাসে মুখটা।
কারাসু জানতো না। জানতো না যে যার চোখ উপহার হিসেবে এনেছিল, সেই মহিলার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে মৃত্যুর আগ অবধি। মানুষের আচরণের নিষ্ঠুর দিকগুলো প্রত্যক্ষ করেছে তার চোখটা। ফলে মেয়েটাকেও সাক্ষী হতে হয়েছে সেই নির্মম, নিষ্ঠুর অত্যাচারের।
মেয়েটার বুকে মাথা চেপে বসে রইলো কারাসু। এই প্রথম তার শরীর স্পর্শ করছে সে। তবে সেই স্পর্শের অনুভূতি যে শীতল হবে, তা আশা করেনি কখনো।
মেয়েটার মা তাকে ডাকতে এসে দেখলো মেঝেতে মরে পড়ে আছে সে। চারিদিকে অসংখ্যা চোখ। আর তার পাশে একটা দাঁড়কাকের মৃতদেহ।
একইসাথে মৃত্যুলোকের অভিযাত্রী হয়েছে তারা।
৩. মানুষের বল তৈরি
তৃতীয় খন্ড
১
রূপকথার গল্পকার
স্বপ্নে মিকি দেখছে যে মানুষের বল তৈরি করছে সে।
স্বপ্নটা এরকমঃ ছোট একটা রুমে অন্য একজনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মিকি। রুমটায় আসবাব বলতে একটা আলমারি আর টেবিলের ওপর রাখা টিভি।
মিকির মুখোমুখি দাঁড়ানো ব্যক্তির হাতে বিশাল একটা ক্ষত।
সেই হাতটা ধরে ম্যাসাজ করতে শুরু করলো মিকি। অবাক হয়ে খেয়াল করলো যে লোকটার ত্বক অনেকটা কাদার মতন। মিকি লেপে দেয়া। মাত্র ক্ষতটা দূর হয়ে গেল। নিজেকে অনেকটা মাটির কুমোরের মতন মনে হলো তার। তাই কুমোর যেরকম তার সৃষ্ট কাজে মসৃণতা আনার চেষ্টা করে, মিকিও লোকটার দেহ থেকে সব অমসৃণতা দূর করে ফেলবে বলে ঠিক করলো।
প্রথমেই হাত দুটো একসাথে চেপে ধরলো। জোড়া লেগে গেলো ও’দুটো। এরপর রুটি বানানোর আগে আটা যেভাবে কাই করতে হয়, সেভাবে তার পুরো দেহটাই পিষতে শুরু করলো মিকি। পুরোটা সময় চোখ বড় বড় করে সবকিছু দেখলো লোকটা।
কিছুক্ষণ পর দেখা গেল মিকির সামনে কোমর সমান উচ্চতার একটা গোলক। তবে এখান সেখান থেকে বেরিয়ে থাকা কিছু চুল দেখে বোঝা যাবে যে গোলকটা একজন মানুষের তৈরি। সমতল পৃষ্ঠে একটা চোখ অবশ্য দেখা যাচ্ছে। মিকি যেদিকে যাচ্ছে, চোখটা সেদিকে অনুসরণ করছে তাকে।
বলে পরিণত হওয়ায় নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে লোকটা। মিকি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেও সেটা দেখা ছাড়া আর কিছু করার রইলো na তার।
“আবারো ঘুমিয়ে পড়েছিলেন,” চমকে জেগে ওঠায় পর মিকির উদ্দেশ্যে বললো হিতোমি।
সময় কাটানোর জন্যে এতক্ষণ পেটের পেশিগুলো প্রসারিত আর সংকচিত করছিল সে। কাউচের স্প্রিংগুলোর ফলে তার ছোট্ট শরীরটা লাফাচ্ছিল ওপরে। এই ব্যাপারটা উপভোগ করে সে।
সামনে খোলা অসম্পূর্ণ খসড়ার পাতাগুলো সোজা করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় মিকি। আকাশ মেঘলা। তুষারপাত শুরু হবে শিঘ্রই। স্টোভে। আগুন জ্বালিয়ে এক কেতলি পানি চাপিয়ে দিল সে কফি বানানোর জন্যে।
‘কফিটা সুস্বাদু মনে হচ্ছে,” হিতোমি বললো। “স্টোভ জ্বালিয়ে রেখেছেন কেন? ঠান্ডা নেই তো।”
মিকি তাকে বুঝিয়ে বললো যে যাদের শরীরের সে ক্ষতের সৃষ্টি করে তারা তাপমাত্রার তারতম্য অনুভব করতে পারে না।
“আমার ক্ষতগুলো কি ঠিক হয়নি?”
মিকি বললো যে তার ক্ষতগুলো এখনও তাজা দেখাচ্ছে, যেন কিছুক্ষণ আগেই কেটে ফেলা হয়েছে হাত পা।
কফির কাপ হাতে নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো মিকি। কানেদাকে যেখানে পুঁতে ফেলেছে সেদিকে দৃষ্টি। একটা গাছেও পাতা নেই। যতদূর চোখ যায় কেবল সিডার আর দেবদারু গাছ।
“কারো আসার শব্দ পেয়েছেন নাকি?” হিতোমি জিজ্ঞেস করলো।
তাকাশি কানেদাকে উঠোনের পেছনে কবর দিয়েছে চার দিন হতে চললো। জানালার পাশ থেকে সরে এসে ডেস্কের ড্রয়ারটা খুললো মিকি। ভেতরে সেদিন ছাউনির পাশে পাওয়া জিনিসটা শোভা পাচ্ছে।
“আপনার ওপর নজর রাখছে কেউ। জিনিসটা সেটারই প্রমাণ। হঠাৎ করে বাড়ির পেছনে নিশ্চয়ই উদয় হয়নি ওটা।”
কিন্তু আমি তো কাউকে দেখলাম না। আসলেও কেউ আমাকে সন্দেহ করেছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।
