আমাকে কি আসলেও মন থেকে ঘৃণা করবে সে? যদি পাখি না হয়ে মানুষ হতাম, ভাবলো কারাসু। তার সামনে আজকে আনা চোখটা জায়গামত ঢুকিয়ে দিল মেয়েটা। কিছুক্ষণ বাদেই চেঁচিয়ে উঠলো সে।
“কি সমস্যা, মিস?” অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো কারাসু।
“দানোটাকে দেখেছি আমি-প্রতিটা স্বপ্নের শেষে ভয়ঙ্কর যে জন্তুটাকে দেখতে পাই। কালো রঙের একটা দানা। যখনই ওটা উদয় হয়, স্বপ্নগুলো শেষ হয়ে যায়। তখন আমার মুখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দানোটা। ভয়ঙ্কর একটা চেহারা,” কম্পিত কণ্ঠে বললো মেয়েটা। চেহারা ছাইবর্ণের হয়ে গেছে তার। স্ট্রবেরির মত ঠোঁটজোড়াও ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।
দাঁড়কাকটার বুঝতে অসুবিধে হলো না যে কি দেখেছে সে। যে দানোটাকে ভয় পাচ্ছে সে, ওটা তো আসলে আমি!
এখন কি হবে? আর কিছুদিন বাদেই তো চোখের দৃষ্টি ফিরে পাবে সে। তখন কার সাথে কথা বলবো? অপারেশনটা না হলেই ভালো হতো।
কিন্তু এই কথাগুলো মেয়েটার সামনে উচ্চারণ করতে পারবে না কারাসু। সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছে দৃষ্টি ফিরে পাবার জন্যে।
“অপারেশনটার কথা ভাবলেই ভয় লাগে,” মেয়েটা বললো। “তবে * আমি নিশ্চিত, এবারে কাজ হবেই। তোমাকে দেখতে পাবো খুব শিঘ্রই।”
কারাসুকে দেখতে পাবে এই ভাবনাটা মেয়েটার ভয় অনেকটাই দূর করে দেয়।
“আগামীকাল রাতে, দূরের একটা শহরে পাড়ি জমাতে হবে আমাকে অপারেশনের জন্যে। তাই সময়মত এসে পড়বে। যাওয়ার আগে তোমার সাথে কথা বলতে চাই আমি।
এটুকু শুনেই জানালা দিয়ে উড়াল দিল কারাসু। বিদায়ে সময় ঘনিয়ে এসেছে। কারাসুর ছোট্ট মস্তিষ্কটা ভরে আছে মেয়েটার স্মৃতিতে। এটাই তার প্রতিদিনের বেঁচে থাকার পাথেয়। গত ক’দিনে অনেকবার ভেবেছে যে দূরে কোথাও চলে যাবে, চিরদিনের জন্যে। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছে। সে হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে মন খারাপ হবে মেয়েটার। তার নিজেরও বড় খারাপ লাগবে।
খুব দ্রুত মেয়েটার চোখে অস্ত্রোপচার হবে শোনার পরেও আগের মতনই তার জন্যে উপহার খুঁজে বেড়ায় কারাসু। কিন্তু ইদানীং কাজটা বড় কঠিন হয়ে গেছে। সবাই খুবই সতর্ক থাকে। অনেকে তো চোখ বাঁচানোর জন্যে বিশেষ চশমাও ব্যবহার করে।
মানুষেরা তো আর একটা কাক থেকে অন্য কাককে আলাদা করতে পারে না। তাই অনেক নিরীহ কাক মারা পড়েছে তাদের হাতে। বুলেট ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে তাদের ছোট্ট বুক। এমনকি কারাসুর নিজের ভাইবোন আর বাবা-মাও সেই ভাগ্য বরণ করে নিয়েছে।
তাই কারো চোখ উপড়ে নেয়া এখন রীতিমত অসম্ভব একটা কাজ।
দেখতে দেখতে রাত শেষ হয়ে এলো। পূব দিকটা রক্তিম হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। মেয়েটা অস্ত্রোপচারের উদ্দেশ্যে রওনা হবে আজকেই। কিন্তু এখন অবধি তার জন্যে কোন উপহার যোগাড় করতে পারেনি কারাসু।
অস্ত্রোপচারের পরে কারাসুর উপহারের কোন মূল্য থাকবে না। দেখতে দেখতে অনেক দূরের একটা শহরে চলে এলো সে। ক্লান্তির কাছে নতি স্বীকার করেনি। একনাগাড়ে ডানা ঝাঁপটানোর কারণে ব্যথা করছে ও’দুটো।
তার মনে একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে। যে করেই হোক, শেষবারের মতন হাসি ফোঁটাতে হবে মেয়েটার চেহারায়। এরপর মারা যেতেও কোন দ্বিধা নেই কারাসুর।
কয়েকজন তোক পাথর ছুঁড়ে মারলো তার দিকে। বেশিরভাগই লক্ষ্য ভ্রষ্ট হলেও একটা পাথরের আঘাতে ঠোঁট ফেটে গেল কারাসুর। আরেকবার অসাবধানতার কারণে একটা লোক তার ডান পাখনাটা আঁকড়ে ধরলো। কোনমতে তার হাত থেকে ছাড়া পেলেও পালক ছিঁড়ে গেল। তবু চোখ খোঁজা থামালো না কারাসু। কিন্তু লাভ হচ্ছে না কিছুতেই।
কোনমতে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সে। একটু মনোযোগ বিঘ্নিত হলেই মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়বে।
অবশেষে কোন চোখ খুঁজে না পেয়ে তার নিজের চোখের কোণে পানি জমলো। এরকম ব্যর্থ জীবন জিইয়ে রাখার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না সে।
সূর্য ডুবে গেছে, মেয়েটা আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে পড়বে। এসময় আগের দিনের কবরস্থানটা চোখে পড়লো কারাসুর। আজকেও একটা মৃতদেহ শুইয়ে রাখা হয়েছে একপাশে। কিছুক্ষণের মধ্যে মাটি চাপা দেয়া হবে। গোরখোদকের মাথার ওপরে চক্কর দিল কারা।
একটা বুদ্ধি এসেছে তার মাথায়।
কিছুটা দূর থেকে মানুষের ভাষায় চিৎকার করে উঠলো সে, “ঐদিকে দেখুন, একটা শেয়াল।”
বিস্মিত হয়ে হাতের কোদালটা নামিয়ে রেখে শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করতে লাগলো সে। কারাসু যেখানটায় লুকিয়ে আছে, সেদিকে হেঁটে এলো। এই সময়টারই তক্কে তক্কে ছিল কারাসু। নিঃশব্দে মৃতদেহটার পাশে উড়ে এসে বসলো সে।
ঠোঁটের সাহায্যে মৃতদেহের চেহারা থেকে চাদরটা সরালো। একজন বয়স্ক মহিলাকে দেখতে পেলো সে। দেখে মনে হচ্ছে ঘুমাচ্ছে। চেহারায় অনেকগুলো আঘাতের চিহ্ন। নাক-মুখ থেতলে গেছে। একপাশের চোখও নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু অন্য চোখটাকে দেখে মনে হচ্ছে ঠিকই আছে।
এক মুহূর্ত দেরি না করে মৃত মহিলার ভালো চোখটা উপড়ে নিয়ে উড়াল দিল কারাসু।
*
“ভেবেছিলাম, তুমি আর আসবেই না আজকে,” কারাসুর উদ্দেশ্যে বললো মেয়েটা। অপারেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হবার জন্যে তৈরি সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িতে উঠে পড়বে। “ফিরতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে আমার।”
সাথে করে আনা চোখটা মাঝের গোল টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলো কারাসু। টেবিলের ওপরে ফুলদানির পাশে একটা কাঁচের বয়ামও রাখা আছে। ওটা সাথে করে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে মেয়েটার।
