হাতটা সামনে বাড়িয়ে ধরলো মেয়েটা। কারাসু বুঝতে পারলো যে সে চাইছে কেউ তার হাতে হাত রাখুক। একটা সিনেমায় এরকম দৃশ্য দেখেছিল কারাসু। কিন্তু হাতটা কিছুটা উঁচুতে ধরেছে মেয়েটা। কারাসু যদি সত্যি সত্যি একজন মানুষ হতো, তাহলে তার মুখ বরাবর থাকতো ওটা।
“তুমি কি তোমার আসল নামটা আমাকে বলবে না? নাহলে বুঝবো কি করে যে তুমি সত্যি নাকি কল্পনা? কখনো তোমার হাতটাও ধরিনি…”
কারাসুর মনে হলো তার হৃদয়টা বুঝি ফেটেই যাবে। মেয়েটাকে কোনভাবেই স্পর্শ করতে দেয়া যাবে না তাকে। সে একটা পাখি। মেয়েটা যদি জানতে পারে এতদিন একটা কাক চোখ এনে দিয়েছে তাকে, তাহলে কষ্ট পাবে নিশ্চয়ই।
“দুঃখিত মিস, আপনার হাতটা ধরতে পারবো না। কয়েক বছর আগে বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর সময় একটা খুব খারাপ অসুখ হয় আমার। আপনাকে স্পর্শ করলে আপনিও অসুস্থ হয়ে যাবেন। অনবরত হেঁচকি উঠতে থাকবে।”
এটক বলে জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো কারাস। মেয়েটা পেছনে কিছু একটা বলছিল, তবুও ডানা ঝাঁপটানো বন্ধ করলো না সে। তার ছোট্ট হৃদয়টা ছেয়ে উঠেছে বেদনায়। এই অনুভূতিগুলোর অর্থ ঠিক বুঝতে পারছে না সে।
মেয়েটাকে দেয়ার মত নতুন চোখের জন্যে শহরময় ঘুরে বেড়াতে শুরু করলো সে। ইদানীং খুব সাবধান থাকতে হয়। কাক দেখলেই এখন দূর দূর করে তাড়া করে সবাই। একটা কালো রঙের পাখি সুযোগ পেলেই চোখ উপড়ে নেয় এটা শহরবাসী জেনে গেছে। রাইফেল, গুলতি দিয়ে কাকদের আক্রমণ করে তারা। ছোট ছোট বাচ্চারা স্কুলে যাবার সময় চোখে হাত দিয়ে রাখে।
কারাসুর গায়েও গুলি লেগেছিল একবার। তবে যে গুলি করেছিল তার হাতের সই খুব একটা ভালো ছিল না, তাই বেঁচে গেছে। তখন থেকে অনেক উঁচুতে উড়ে বেড়ায় সে, যাতে নিচ থেকে দেখা না যায়। আর মেয়েটার জন্যে নতুন উপহারের খোঁজে দূর দূরান্তের শহর অবধি পাড়ি
চোখ তুলে নেয়ার জন্যে বেশ কয়েকটা কৌশলও আবিষ্কার করেছে সে। একদিন একটা আবাসিক এলাকায় উড়তে উড়তে একটা বাড়ির দেয়ালে ছোট ফুটো দেখতে পায়। যে কেউ চোখ রাখতে পারবে সেই ফুটোয়। দেয়ালটার পেছন দিকে গিয়ে অপেক্ষা করে সে। এরপর সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে মানুষের কণ্ঠে বলে, “এই যে! শুনছেন? যাদু দেখতে চাইলে এই ফুটোয় চোখ রাখুন দ্রুত।”
যেই না কেউ তার ফাঁদে পা দিয়ে ফুটোয় চোখ রেখেছে, অমনি চোখা চঞ্চুর সাহায্যে সেটা উপড়ে নেয় কারাসু। এর এক ঘণ্টা পরে সেই চোখটা নিজের কোটরে রেখে হেসে ওঠে মেয়েটা। আর সেই হাসিটা অমূল্য।
লাঠির বাড়ি বা মার খেয়েও বারবার তাই মানুষের চোখের রক্তে ঠোঁট রাঙাতে কোন আপত্তি নেই কারাসুর।
উঁচ ডালে বা বাড়ির ছাদে বসে নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষদের খেয়াল করে সে। এরপর সুযোগ বুঝেই আঘাত হানে। যেইমাত্র তার শিকার বিস্ময়ে চোখ বড় করে ফেলে, ঠোঁট দিয়ে উপড়ে নেয় সেটা।
একবার চোখ উপড়ে নেয়ার পরে শিকারের সাথে জাপটাজাপটির কারণে প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে কারাসু। আরেকবার উপড়ে নেয়া চোখটা ঠোঁটেই পিষ্ট হয়ে যায়, সেটা আর মেয়েটাকে উপহার দিতে পারে না সে।
একদিন কারাসুর এনে দেয়া উপহার চোখে দিয়ে খুশিতে প্রায় লাফিয়ে ওঠে মেয়েটা। আসলে চোখটা যার ছিল, সে বিদেশ বিভুঁইয়ে ঘুরে বেরিয়েছে প্রচুর। তাই চোখের স্মৃতিতে অনেক কিছু দেখতে পায় সে।
ম্যানশনটা ছেড়ে আসার কিছুক্ষণ পর পাহাড়ের ওপরে ছোট একটা কবরস্থান চোখে পড়লো কারাসুর। আশপাশে কোন বাড়ি নেই। সূর্য মামা বিদায় নিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। চাঁদ মশাই গা ঝারা দিয়ে জেগে উঠেছে সেই সুযোগে। কবরফলকগুলো ভরিয়ে দিয়েছে সাদা আলোয়।
চাঁদের আলোয় একদিকে কবর খুঁড়ে যাচ্ছে গোরখোদক। একটা গাছের ওপরে বসে তার কাজ দেখতে লাগলো কারাসু। কাপড়ে মোড়া একটা মৃতদেহ রাখা আছে সদ্য খোঁড়া কবরটার পাশে। যে লোকটা মারা গেছে তাকে চেনে কারাসু। আজকেই তার চোখ উপড়ে নিয়েছিল। এরপর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে বেচারা।
কবর দেয়া শেষ হলে সেখান থেকে উড়ে গেল কারাসু। দিন দিন আরো সতর্ক হয়ে উঠছে লোকজন।
.
৪
“একটা ভালো খবর আছে,” মেয়েটা বললো একদিন। “চোখের অপারেশন হবে আমার।”
এর আগে অনেক চেষ্টা করেও মেয়েটার চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে পারেনি চিকিৎসকেরা। তবে নতুন একটা প্রযুক্তির কারণে এখন সেটা সম্ভব হলেও হতে পারে।
“দৃষ্টি ফিরে পেলে,” খুশি মনে বলে চলেছে মেয়েটা। “তোমাকে দেখতে পাবো।”
“শুনে খুবই খুশি হলাম, মিস,” কারাসু বললো।
তবে মনে মনে ভীষণ হতাশ সে। মেয়েটা দেখতে পাবার অর্থ হচ্ছে তার আসল পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়া। যখন অন্ধ কিশোরী জানতে পাবে যে এতদিন ধরে কারাসু ‘উপহার’ নাম করে তাকে যা দিয়েছে, সেগুলো আসলে অন্য মানুষের চোখ, তখন তার মনে কি চলবে?
মেয়েটার মনের সুখের জন্যে যদি অন্য কেউ মারাও যায়, তাতে কারাসুর কিছু আসে যায় না। সে যা করছে, তা ঠিক নয়, এটা ভালো করেই জানে। তবুও কোন অনুশোচনা বা অনুতাপ বোধ নেই তার।
কিন্তু মেয়েটা সত্য কথা জানার পর কষ্ট পাবে, সন্দেহ নেই। অনেকে তার সাময়িক সুখের জন্যে মারাও গেছে, এটাও সুস্থ মস্তিষ্কের কেউই ভালো ভাবে নেবে না। তখন কারাসুকে ঘৃণা করবে সে। এটাই তার সবচেয়ে বড় ভয়।
