কিছুদিন পর দেখা গেল কানেদার গলার নিচ থেকে সবকিছু উল্টে ফেলা হয়েছে। কানেদার পক্ষে এখন আর নিজের শরীরের ভার বহন করা সম্ভব নয়। এজন্যে মাছ ধরার আংটা মাংসে বিধিয়ে তাকে সোজা করে রাখার ব্যবস্থা করেছে মিকি। কানেদার হাত আর পায়ের আঙুলগুলো শরীরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আছে। মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে ওগুলো।
কানেদার চেতনা তখনও লোপ পায়নি। তার চোখ দেখেই মনে কি চলছে তা বুঝতে পারে মিকি। মাঝে মাঝে চোখের মণিগুলো নড়ে ওঠে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। কখনো আবার চোখ দিয়ে পানি ঝরে। সেগুলোও আনন্দাশ্রু।
নিজের হাতের কাজের দিকে সন্তুষ্টচিত্তে তাকিয়ে থাকার সময় মিকি খেয়াল করে যে নাক বা মুখের কোন দরকার নেই কানেদার। মুখের চামড়া আড়াআড়িভাবে কেটে নিয়ে দলা পাকিয়ে মাথার পেছনে টানা দিয়ে রাখলো সে। কঙ্কালটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এখন। এর মধ্যে কেবল চোখটা ঠিক জায়গায় আছে। চোখের পাতা না থাকায় অক্ষিকোটরের চোখ দুটোকে বলের মত মনে হয়। তবে একটা ঝামেলা হচ্ছে কানেদার শরীরের নিচের অংশ সোজা করে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারলেও, মাথাটা কেবলই ঝুলে যাচ্ছিল। তাই তার কপাল বরাবর একটা পেরেক ঠুকে দিল মিকি। সে জানে যে মগজের ভেতর দিয়ে পেরেকটা চলে গেলেও মারা যাবে না কানেদা। হাতুড়ির প্রতিটা বাড়ির সাথে কেঁপে কেঁপে উঠছিল বুড়োর শরীর।
যথেষ্ট হয়েছে, ভাবলো মিকি। এবারে সুন্দর একটা শিল্পকর্ম দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে।
কানেদা চোখের পাতা ফেলতে না পারলেও তার চোখের আর্দ্রতা কমলো না। কথা না বললেও চোখের নাড়াচাড়ার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে কানেদা। দরকার মনে হলে আঙুলগুলোও নাড়ায়।
তবে কানেদার নতুন রূপের মধ্যে আগের জীর্ণ-শীর্ণ ভাবটা নেই। তার। অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো টকটকে লাল। হৃদযন্ত্রটা ঠিকই ধুকপুকাচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে। কেটে ছিঁড়ে যাওয়া শিরা আর ধমনীগুলো যতটা সম্ভব ঠিক করে দিয়েছে মিকি।
পরে সে আবিষ্কার করে যে তার বাড়ি থেকে হাঁটা দূরত্বেই থাকত কানেদা।
*
গর্তটা খোঁড়া শেষ হলে বাড়িতে ফিরে আসে মিকি। কানেদার দেহটা কবর অবধি টেনে নিয়ে যেতে হবে তাকে।
ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ শুনে ওপরের দিকে তাকিয়ে একটা কালো রঙের পাখি দেখতে পেলো সে। মনে হচ্ছে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দাঁড়কাকটা।
বাড়ির পেছন দিকে একটা ছাউনি। আগের ভাড়াটিয়া তৈরি করেছিল ছাউনিটা। স্লাইডিং দরজাটা ঠিক মতো কাজ করে না, বেশ জোর খাটাতে হয়। ফ্রেমের কাঠ পচে যাওয়াতে এই অবস্থা।
দরজা খোলাতে রোদ খেলে গেল ভেতরে। কানেদার শরীরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যাচ্ছে। একটা ময়লার ব্যাগে করে তলকুঠুরি থেকে তাকে বয়ে এনে এখানে রেখেছে মিকি।
তলকুঠুরিতে ইঁদুরের কারণে মারা গেছে কানেদা। তার হৃৎপিণ্ডটা চাবিয়েছে ইচ্ছেমতন। শুনিচি আর ইউকি কিছু খেয়াল করার আগেই নিঃশ্বাস থেমে গিয়েছিল বুড়োর।
ময়লার ব্যাগটা টানতে টানতে ছাউনি থেকে বের করে আনলো মিকি। এসময় অচেনা একটা জিনিস চোখে পড়লো তার। কিছুটা দূরে ধুলোর ওপর পড়ে আছে।
ওটা উঠিয়ে নিল মিকি। তার নিজের না নিশ্চিত। কেউ একজন আসলেও এসেছিল এখানে। স্টাডি থেকে ভুল কিছু শোনেনি। নিজের ধারণার ওপর বরাবরই ভরসা আছে মিকির।
কেউ তাকে সন্দেহ করেছে, এমনটা প্রথম নয়। আগেও তার কার্যকলাপ সম্পর্কে জেনেছে কয়েকজন। ঘুরঘুর করেছে বাসার আশপাশে। তাদের আগন্তুক বলে ডাকে সে। অনাহুত আগন্তুক।
এর আগে অল্পবয়সী একটা ছেলে মোক ছোঁক শুরু করেছিল। সেবারেও এরকম অনুভূতি হয়েছিল, যেন কেউ নজর রাখছে তার ওপর।
আগন্তুক কি তার অপরাধের কোন প্রমাণ পেয়েছে? সেরকমটা হলেও ব্যবস্থা নেয়া যাবে। যেমনটা নিয়েছিল শেষ আগন্তুকের।
*
চোখের স্মৃতি
উপসংহার
৩
একদিন জানালার পাশে বসে মেয়েটা বলে উঠলো, “আমার ভয় লাগছে…”
কারাসুর আনা নতুন স্টপার দু’টো শোভা পাচ্ছে তার দুই অক্ষিকোটরে। থেকে থেকে কেঁপে উঠছে সে। দুটো চোখই উল্টোভাবে ঢুকিয়েছে, কিন্তু তাতে দৃশ্যগুলো দেখতে কোন সমস্যা হচ্ছে না।
“ভয় কেন পাচ্ছেন, মিস?”
নতুন উপহার দুটো সরাসরি মেয়েটার হাতে দিয়েছে কারাসু।
“তোমার আনা স্টপারগুলো চোখে দিলেই স্বপ্নের মত দৃশ্য দেখতে শুরু করি। আমার জন্যে এই অভিজ্ঞতাগুলো অমূল্য। কিন্তু সবগুলো স্টপারের ক্ষেত্রেই শেষদিকে একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটে। কয়েকদিন আগে প্রথম খেয়াল করি সেটা।
“ভয়ঙ্কর ব্যাপার?”
মাথা নেড়ে সায় জানালো মেয়েটা। ঝাঁকুনিতে বাম চোখটা কোটর থেকে বেরিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। নিচু হয়ে সেটা তুলে কাঁচের বয়ামে রেখে দিল সে। আগের চোখগুলোও সেখানেই আছে। প্রায় ভরে গেছে বয়ামটা।
কারাসু আবারো জিজ্ঞেস করলো ভয়ানক জিনিসটা কি। কিন্তু জবাবে কেবল মাথা ঝাঁকানো মেয়েটা।
“জানি না আমি। কখনোই কয়েক সেকেন্ডের বেশি দেখতে পারিনি। দেখে মনে হয় একটা দানো, যেটাকে ভয় পাওয়া উচিৎ। কিন্তু…”
তার চেহারায় ভয় ছাপিয়ে একটা হাসি ফুটলো। “কিছু মনে করবে না। তোমার উপহারগুলো পেতে খুবই ভালো লাগে আমার। নতুবা এই অন্ধকারেই বাকি জীবনটা কাটাতে হতো। রঙ আর দেখতে পেতাম না। চিরকৃতজ্ঞ থাকবো তোমার কাছে।”
