বাড়িটায় কি রাস্তার দিক থেকে যাবো নাকি বনের দিক থেকে, সেটা ভাবতে লাগলাম। কিন্তু রাস্তা ধরে সামনে এগোলে যদি হঠাৎ শিওজাকি ফিরে আসে, তখন বানিয়ে কিছু বলতে পারবো না। এর চেয়ে বনের মধ্যে দিয়ে যাওয়াই ভালো।
বেশ ঢালু জমি হওয়াতে খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। ধীরে ধীরে ওপর উঠছি। মরা পাতার কারণে পা পিছলে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিছুটা ওপরে ওঠার পর সমতল হতে শুরু করলো জমি।
নীল বাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছানোর পর, সিডার গাছ বাদেও অন্য এক ধরনের গাছ চোখে পড়লো। কাজুয়ার স্মৃতিতে এই গাছগুলোও দেখেছি। এরকম একটা গাছের শেকড়েই হোঁচট খেয়েছিল সে।
প্রচণ্ড ঠান্ডা। মুখ দিয়ে বাষ্প বেরুচ্ছে রীতিমত। একটা একটা করে গাছ গুণতে গুণতে এগোলাম। পঞ্চাশটা অবধি গোণার পর হাত ব্যথা হয়ে গেল।
হঠাৎ করেই নীল বাড়িটার সামনে আবিষ্কার করলাম নিজেকে। দোতলা একটা বাড়ি। যে রকমটা ভেবেছিলাম, নীল ইটে তৈরি সবকিছু। বাড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছে গহীন বনে একটা দানো ঘাপটি মেরে আছে। শিকারের অপেক্ষা করছে। বাস্তবে বাড়িটার সামনে দাঁড়ানোর পর মনে হচ্ছে ওটাও তাকিয়ে আছে আমার দিকে। বাড়ির দেয়ালগুলো যেন শ্বাস নিচ্ছে। যেকোন সময় হুঙ্কার ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
চোখ বন্ধ করে মনে সাহস যোগাতে লাগলাম। কাজুয়ার কথা ভাবলাম, হিতেমির কথা ভাবলাম।
পকেট থেকে ক্যামেরাটা বের করে নিয়েছি আগেই। গাছের আড়াল থেকে দেখে নিলাম আশেপাশে কেউ আছে নাকি। শিওজাকি বাদে অন্য কারো থাকার কথাও না আসলে।
ছায়ার মধ্যে দিয়ে এগোতে লাগলাম। একপাশের দেয়ালে গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ পর। দেয়ালটা স্পর্শ করার পর মনের মধ্যে সন্দেহের যে শেষ দানাটুকু ছিল, সেটাও উধাও হয়ে গেল। এই বাড়িটাই দেখেছিলাম আমি বাঁ চোখের স্বপ্নে। হাতে গ্লাভস থাকা সত্ত্বেও ঠান্ডা ঠিকই টের পেলাম। আমার আত্মশুদ্ধ কেঁপে উঠলো সেই ঠান্ডায়।
আকাশে এখনও ধূসর মেঘ।
দেয়াল ঘেঁষে সামনে এগোচ্ছি। চোখ নিচের দিকে। তলকুঠুরির জানালাটা এখানেই কোথাও হবে।
বাড়িটার চারদিকে ঘন গাছপালা। তবে দেয়াল আর বনের মাঝে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ফাঁকা জায়গা আছে, সেখান দিয়ে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ হেঁটে যেতে পারবে। পায়ের নিচে শক্ত মাটি এখন। কায়েদির অন্যান্য জায়গার মতন সেখানকার ঘাসগুলোও মরা।
শুধুমাত্র বাড়িটার সামনের দিকেই কোন গাছপালা নেই। আমার যেহেতু কারো চোখে পড়ার ইচ্ছে নেই, তাই সেদিকটা এড়িয়ে গেলাম।
যতদূর মনে আছে, তলকুঠুরিটা বাড়ির সামনের দিকে ছিল না। তাছাড়া কাজুয়া নিজেও দেয়ালের আড়ালে লুকিয়েছিল। জানালাটা দেয়ালের কোনা বরাবর কোথাও। আর কাজুয়া যেখান দিয়ে বনের উদ্দেশ্যে দৌড় দিয়েছিল, সেখানকার জমি ছিল ঢালু। সুতরাং জায়গাটা বাড়ির পেছনের দিকে হবার সম্ভাবনাই বেশি।
একটু পরেই বাম চোখে দেখা একটা জায়গা খুঁজে পেলাম। বাড়িটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। আশপাশের দৃশ্যগুলোও পরিচিত ঠেকছে এখান থেকে। তবে বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়াতে কিছু কিছু ব্যাপার বদলাতেও পারে।
তবুও তলকুঠুরির জানালাটা খুঁজে পেলাম না। বরং পায়ের নিচে ইটের তৈরি প্ল্যান্টার এখানে।
হয়তো এই প্ল্যান্টারটা পরে বানানো হয়েছে, জানালাটা ঢেকে দেয়ার জন্যে। দু’মাসে এরকম দেয়াল সহজেই বানানো যাবে। প্ল্যান্টারটা ভাঙলে অপর পাশের ইট জানালা দেখা যাবে নিশ্চিত।
জানালাটা ঢেকে দেয়া হয়েছে। তাই ক্যামেরা দিয়ে কোন কিছুর ছবিও তুলতে পারছি না।
খুবই হতাশ লাগতে লাগলো। তবে একদিনের জন্যে যথেষ্ট হয়েছে। বাড়ির চারপাশটা আরো ভালোমতন দেখতে হলে পরে আসতে হবে। এখন মানসিক আর শারীরিক, দুদিক দিয়েই ক্লান্ত আমি।
বাড়িটার পেছন দিকে উঁকি দিলাম। একটা কাঠের ছাউনি সেদিকে। দেয়ালের সাথে লাগানো। শিওজাকি বলছিল যে সাপ্লাই স্টোর থেকে দেয়াল ঠিক করার জিনিসপত্র কিনেছে। সেগুলো হয়তো ছাউনিতেই আছে।
ফেরার আগে ছাউনির ভেতরে উঁকি দিয়ে যাব বলে ঠিক করলাম।
এসময় দোতলা থেকে একটা জানালা খোলার শব্দ ভেসে এলো।
জমে গেলাম সাথে সাথে। তবে বোকার মত কিছু না করে দেয়ালের ছায়া মিশে যাওয়ার চেষ্টা করলাম সাবধানে। যে কোন মুহূর্তে মাথা বের করে বাইরে উঁকি দিতে পারে শিওজাকি।
ধীরে ধীরে ঢুকে গেলাম বনের ভেতরে। কিছুদুর আসার পর দৌড়াতে শুরু করলাম। হয়তো কাজুয়াও এই পথেই দৌড়িয়েছিল। পেছন থেকে শিওজাকির ছুটে আসার শব্দ কানে আসছে না। তবুও মনে হচ্ছে কেউ যেন ছায়ার মধ্যে পিছু নিয়েছে আমার।
অবশেষে ঢাল পার হয়ে বেরিয়ে এলাম খালি রাস্তাটায়। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো যেন। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অঝোরে।
.
৫
রূপকথার গল্পকার
হাতের পিষে ফেলা মাছিটার দিকে তাকালো মিকি। কাউচে বসে থাকা হিতোমিকে বিরক্ত করছিল হতচ্ছাড়া।
“খুবই রাগ হচ্ছিল,” বলে হিতোমি। “কিন্তু ওটাকে যে তাড়াবো, সে উপায় নেই।”
এমনটা নয় যে তার ক্ষতস্থানগুলো পচন ধরেছে, সেখানে মাছি ওড়াউড়ি করছে। মিকির সৃষ্ট ক্ষতস্থানগুলো কখনো পচে না। মাছিটা পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় হিতোমিকে দেখেছিল।
শেষবার বস্তাটার এক পাশে বসা মাত্র হাত চালিয়েছে মিকি। এখনও হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করছে মাছিটা।
