দোলনাটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। শিওজাকি পাশে এসে দাঁড়ালো।
“অনেক বছর আগে,” কৈফিয়তের সুরে বললাম। “কাজুয়া আর সাওরি এখানে নিয়মিত খেলাধুলা করতো,” দোলনাটা ঘিরে চক্কর দিলাম একটা। “কোন সন্দেহ নেই, এটাই সেই দোলনা।”
ভেতরে ভেতরে খুব ভালো লাগছে। কায়েদিতে আসার পর থেকে পরিচিত অনেক কিছু চোখে পড়েছে। কিন্তু এই দোলনাটা সাওরির হাসিমুখের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। প্রথম যে কোন কিছুরই বিশেষ মূল্য আছে।
মরিচা ধরা দোলনাটায় উঠে বসলাম। তখন মনে হলো যে শিওজাকি এতক্ষণ ধরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লজ্জা পেলাম কিছুটা। একটা ভদ্র মেয়ে এরকম আচরণ করবে না।
“আজকে খুব অদ্ভুত আচরণ করছেন আপনি,” শিওজাকি বলেই ফেললো।
আমার চোখের দিকে তাকালো সে। প্রথমে স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই দেখছিল, কিন্তু হঠাৎই কিছু একটা চোখে পড়ায় জমে গেল যেন।
“কোন সমস্যা?” জিজ্ঞেস করলাম।
“তাহলে ভুল দেখিনি আগে। আপনার দুটো চোখের রঙ দু’রকম। ভালো করে না তাকালে অবশ্য বোঝা যাবে না…”
হেসে কথাটা উড়িয়ে দিলাম। সে যদি জানতে পারে যে আমার বাম চোখটা অস্ত্রোপচার করে বসানো হয়েছে, তাহলে অনর্থক ঝামেলার সৃষ্টি হবে। কিছুক্ষণ পর আবারো গাড়ি উঠে বসলাম আমরা। এখনও আমার চোখ নিয়েই ভাবছে সে, আমি নিশ্চিত। সব শিল্পীরাই এমন হয়। ভিন্নতা আকৃষ্ট করে তাদের। খুব একটা আমলে নিলাম না ব্যাপারটা।
কিছুক্ষণ পর একটা পরিচিত রাস্তা চোখে পড়লো আমার। দু’পাশে সিডার গাছ থাকাতে এই বিকেল বেলাতেও অন্ধকার লাগছে সবকিছু।
“এখানেই তো কাজুয়া…”
মাথা নেড়ে সায় দিল শিওজাকি। কাজুয়ার দুর্ঘটনাটা যেখানে হয়েছিল সেই রাস্তাটায় আছি আমরা এখন।
তাহলে নীল ইটের বাড়িটায় এখান দিয়েই যেতে হয়। স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। বাম চোখে দেখা সেই স্বপ্নটা পুরোপুরি ভুল নয়, কিছু তথ্যের এদিক সেদিক হয়েছে কেবল।
জায়গাটা পেছনে ফেলে সামনে এগোতে লাগলাম আমরা। একটা গাড়িতে বসে কাজুয়ার দুর্ঘটনাস্থলের ওপর দিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা খুব একটা সুখকর নয়। চোখ বন্ধ করে নিলাম। কেউ যেন বরফ ছেড়ে দিয়েছে আমার শিরদাঁড়া বরাবর।
সামনে একটা তীক্ষ্ণ মোড়। বাম দিকে মোচড় খেয়েছে রাস্তাটা। পাশেই গার্ডরেইল। আর গার্ডরেইল থেকে একটু সামনে বেশ গভীর খাদ। শুধু নিচ থেকে উঠে আসা লম্বা সিডার গাছ দেখা যাচ্ছে গার্ডরেইলের ফাঁক দিয়ে।
কিমুরাকে যে প্রশ্নটা করেছিলাম, সেটাই জিজ্ঞেস করলাম শিওজাকিকে।
“রাস্তাটা কবে বানানো হয়েছিল?”
“জানি না। আমি এসে এরকমই দেখেছি।”
একটা পার্শ্বরাস্তা পার করে আসলাম আমরা। এবারে ডানে মোড় নিল রাস্তাটা। কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামিয়ে বাইরে দেখতে বললো আমাকে শিওজাকি। এমন একটা জায়গায় গাড়ি থামিয়েছে সে যে ঢালটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সেই ঢালু জমিতে সারি সারি সিডার গাছ। তবে ওগুলোর ফাঁকে রংটা ঠিকই চোখে পড়ছে।
নীল রঙ। তবে আকাশি নীল নয়। একদম গাঢ় নীল। গোধূলিতে কিছুটা কালচে দেখাচ্ছে।
সিডার বনের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে নীল বাড়িটা, যেটার খোঁজে এতদূর ছুটে এসেছি। গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। এখান থেকে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না যে বাড়িটা ইটের তৈরি। কিন্তু স্বপ্নে যেরকম নিল রঙ দেখেছিলাম, সেরকমটাই দেখছি বর্তমানে।
অপহরণকারী ওখানেই আছে। হিতোমিকে লুকিয়ে রেখেছে সে। লোকটা কেমন তা ভাবলাম।
বাম চোখে হিতোমির শরীরের যে অবস্থা দেখেছিলাম তা মন থেকে দূর করার চেষ্টা করেও সফল হইনি। আমার ধারণা, হাত-পা কেটে ফেলা হয়েছে তার। কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব?
কাজটা যদি অপহরণকারীর হয়ে থাকে, তাহলে কতটা নিষ্ঠুর সে? “বাড়িটার ব্যাপারে কিছু জানেন?” শিওজাকিকে জিজ্ঞেস করলাম। সে যা জানে, খুলে বললো আমাকে। গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম।
“এই বাড়িটা যে আসলেও আছে, এটা জেনেই খুশি আমি,” বললাম।
“কাজুয়ার সাথে বাজি ধরেছিলাম একটা, বলেছিলাম বানিয়ে কথা বলছে।”
“চাইলে আপনাকে ক্যাফেতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি আমি।”
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিলাম। “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। রাস্তা মনে আছে আমার। একাই ফিরে যেতে পারবো।”
তার উদ্দেশ্যে একবার বাউ করলাম। চোখে সংশয় নিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেল শিওজাকি।
বাড়িটার ব্যাপারে সে আমাকে বলেছে-”কিমুরা বললো আপনি নাকি বাড়িটা খুঁজছেন, চা খেয়ে যান? আমিই থাকি ওখানে।”
*
শিওজাকির গাড়িটা দৃষ্টির আড়াল হয়ে যাওয়া অবধি পাশের দেবদারু বনে অপেক্ষা করলাম। এখনই বাড়িটায় যাওয়া ঠিক হবে না। সে ভেতরে গিয়ে আয়েশ করে বসার পর যাবো।
নীল বাড়িটায় শিওজাকি থাকেসে-ই অপহরণকারী। এতক্ষণ না জেনে তার গাড়িতে বসে ছিলাম আমি। কথাও বলেছি। ব্যাপারটা বিশ্বাসই হচ্ছে না আমার।
এজন্যেই ওভাবে হাসছিল কিমুরা। শিওজাকি যে নীল বাড়িটায় থাকে, এটা ভালো করেই জানতো সে। খুব রাগ লাগছে, কিন্তু কিমুরা যে নেহায়েত মজা করার জন্যেই কাজটা করেছে, সেটা জানি।
আধা ঘণ্টা পর বাড়িটার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমি। এই সময়টায় মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েছি।
এই রাস্তাটায় গাড়ির সংখ্যা খুবই কম। প্রতি দশ মিনিটে একটা কিংবা দুটা। একটু পেছালেই কাজুয়ার সাথে সাদা গাড়িটার যেখানে সংঘর্ষ হয়েছিল, সেখানটায় পৌঁছে যাব। তার ভাগ্যটাই আসলে খারাপ ছিল সেদিন।
