“খাওয়া শেষ হলে তোমাকে ওখানে নিয়ে যাবে ও,” কিমুরা বললো একটু পর।
এক ঘন্টার মত সময় লাগবে শিওজাকির। তাই এই সময়টুকু ক্যাফেতে পত্রিকা পড়ে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।
স্মৃতি হারিয়ে ফেলার পর থেকে বেশ কয়েকটা উপন্যাস পড়েছি। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করার পর থেকে বইই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। খুব বেশি বাছাবাছি করি না। হাতের কাছে যা পাই, সবই পড়ি। সেটা উপন্যাসও হতে পারে, আবার মাঙ্গা বা পত্রিকাও হতে পারে। যা-ই পড়ি, সব নতুন ঠেকে আমার কাছে।
স্মৃতি হারাবার আগে কি ধরনের বই পড়তাম। রোমান্টিক উপন্যাস? যেগুলো পড়ে চোখে পানি চলে আসততা। নাকি কবিতার বই?
সেই সুন্দর স্মৃতিগুলো হারিয়ে ফেলার জন্যে মনে মনে নিজেকেই দোষারোপ করি প্রায়ই। জানি যে আমার কোন দোষ নেই। তবুও, কিছুদিন আগে যখন নামির ঘরটা নিজের মত করে গোছালাম, অতীতের বেশ বড় একটা অংশ মুছে ফেলেছি।
এগুলো ভাবতে ভাবতে পত্রিকার পাতা উল্টে গেলাম। এরপর ঠিক করলাম একটা নতুন বই পড়বো। বইয়ের শেলফ ঘাটতে গিয়ে একটা অদ্ভুত বই চোখে পড়লো। বেশ পাতলা। রূপকথার গল্পের বই।
দ্য কালেক্টেড ব্ল্যাক ফেয়ারি টেইলস : ভলিউম ১। নিচে ছোট্ট করে লেখা চোখের স্মৃতি।
উল্টেপাল্টে দেখলাম যে প্রতি পাতায় গল্পের সাথে ছবি জুড়ে দেয়া হয়েছে। কালো ছবিগুলো এমনভাবে আঁকা হয়েছে যে দেখলে অস্বস্তি লাগে।
মাঝের দিকের ছবিতে একটা দাঁড়কাককে একটা বাচ্চার চোখ তুলে নিতে দেখা যাচ্ছে। গা শিরশিরে একটা অনুভূতি হলো, আরেকটু হলেই হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল বইটা। একবার ভাবলাম রেখে দেই, কিন্তু কেন যেন চোখ সরাতে পারছি না। যেন আমার ওপর মন্ত্র করেছে লেখক।
শুরু থেকে বইটা পড়বো বলে মনস্থির করলাম, এমন সময় লাঞ্চ শেষ করে উঠে দাঁড়ালো শিওজাকি। অগত্যা বইটা আবারো শেলফে রেখে দিতে হলো।
“চলুন তাহলে,” কালো রঙের কোটটা গায়ে চাপিয়ে বললো সে।
দুরুদুরু বুকে তার গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে বসলাম। কিমুরা ক্যাফের বাইরে এসে হাত নেড়ে বিদায় দিল আমাকে। হাসি লেগে আছে তার মুখে, যেন সে এমন কিছু একটা জানে যেটা আমি জানি না। হেসে তার উদ্দেশ্যে পাল্টা হাত নাড়লাম আমি।
নিঃশব্দে চলতে শুরু করলো গাড়িটা। গাড়ি সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই আমার, তবে এই গাড়িটা নিঃসন্দেহে দামী। চকচক করছে ভেতরটা, এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধটাও দারুণ।
“শহর থেকে কিছু জিনিস কিনতে হবে আমাকে। থামলে আপনার অসুবিধে হবে?”
“না,” মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম।
“আপনি তাহলে কাজয়ার বন্ধু ছিলেন?”
“আপনি চিনতেন ওকে?”
“কয়েকবার দেখা হয়েছিল আর কি।”
“কায়েদিতে আপনি এসেছেন খুব বেশিদিন হয়নি বোধহয়?”
“গত বছর।”
ছবির ব্যাপারে কথা বলা শুরু করলো সে। গাড়ির মতনই, এই ব্যাপারেও আমি বিশেষ ‘অজ্ঞ। তাই শুধু হাঁ-হুঁ করে গেলাম। শিওজাকি কি বিখ্যাত কোন আঁকিয়ে নাকি?
ক্যাফেতে যে ছবিটা ঝুলছে সেটা বিদেশে থাকার সময় এঁকেছিল। “কেন যেন মনে হলো, মেলানকলি গ্রোভকেই দিয়ে দেই ছবিটা,” স্টিয়ারিং হুইল ধরে বললো সে।
ছবিটার দাম কত হতে পারে? এত জায়গা থাকতে কায়েদিতে কেন এলো সে? তাকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু চুপ থাকলাম। খুব বেশি কথা বলার অভ্যাস নেই তার, সেটা স্পষ্ট। বিরক্ত হতে পারে।
একটা ফার্ম সাপ্লাই স্টোরের পার্কিং লটে গাড়ি থামালো সে।
খুব বেশি সময় নাকি লাগবে না, তাই গাড়িতেই রয়ে গেলাম আমি। হাতে মাথা রেখে জানালা দিয়ে সাইড মিররের দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর শিওজাকি দোকান থেকে বেরিয়ে এসে সদ্য কেনা জিনিসগুলো ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে রাখলো।
“এবার তাহলে ঐ বাড়িটায় যাওয়া যাক,” ড্রাইভিং সিটে বসে বললো সে।
মাথা নাড়লাম। একটু নার্ভাস লাগছে।
অপহরণকারী আর হিতামি, দু’জনেই আছে সেখানে। বাড়িটা দেখা মাত্র গাড়ি থেকে নেমে যাবো। কোন রাস্তাটা দিয়ে যেতে হয় সেখানটায়, আপাতত সেটুকু জানাই যথেষ্ট আমার জন্যে।
কিছুক্ষণ পর শহরের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া হাইওয়েটায় উঠে পড়লাম। সেটা ধরে বেশ খানিকক্ষণ সামনে এগোনোর পর একটা পার্শ্ব রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে দিল শিওজাকি। পাহাড়ি এলাকার দিকে এগিয়েছে। রাস্তাটা।
“কি কিনলেন?”
“গত ভূমিকম্পের পর আমার বাসার একটা দেয়ালে ফাটল ধরেছে। সেটাই ঠিক করার জিনিসপত্র কিনেছি,” রাস্তার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বললো সে।
ভূমিকম্পের ব্যাপারে কারো কাছে কিছু শুনিনি। শিওজাকি বললো, আমি আসার আগেরদিন নাকি কায়েদিতে ভূমিকম্প হয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকে আজ অবধি কোথাও ভূমিকম্প হতে দেখিনি আমি।
জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম আনমনে। কিছুক্ষণ পর হঠাই আগে দেখেছি এরকম একটা দৃশ্য চোখে পড়লো।
“গাড়ি থামান।”
ব্রেক চেপে প্রশ্নাতুর চোখে আমার দিকে তাকালো শিওজাকি।
“একটা পার্ক!” বলে গাড়ি থেকে নেমে গেলাম আমি। রাস্তার পাশে খালি জায়গায় পরিত্যক্ত, পুরনো একটা পার্ক। বাইরে নোটিশ ঝুলছে-প্রবেশ নিষেধ। ভেতরে উঁচু আগাছা, খেলার সরঞ্জামগুলোতে মরিচা জমেছে। দোলনাটা অবশ্য এখনও বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে।
ক্যালেন্ডারের ছবিতে যে দোলনাটা দেখেছিলাম, এটাই সেই দোলনা! আমার দেখা কাজুয়ার প্রথম স্মৃতি।
