এখান থেকেই গোলমালের শুরু। আমি কালকে যে দেয়ালটা দেখেছি, সেটা কি পার হয় সে? জার্নালে এরকম কিছুর বর্ণনা নেই।
বাড়িটা থেকে সোজা বনের দিকে দৌড় দেয়। এক পর্যায়ে ঢাল বেয়ে নামার সময় হোঁচট খায়, একদম রাস্তার মাঝখানে গিয়ে পড়ে। সেখানেই সাদা গাড়িটা তো দেয় তাকে।
একটা ভিন সম্ভাবনা উঁকি দিল মাথায়। হয়তো অপহরণকারী কোন কারণে কাজুয়ার অচেতন দেহটা অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়। ফলে সবাই ভাবে যে দুর্ঘটনাটাও সেখানেই হয়েছে।
নাই, এটা অসম্ভব। নিজের গাধামোতে নিজেই বিরক্ত হলাম প্রচণ্ড। গাড়িচালক নিজে অ্যাম্বুলেন্স ডাক দেয়। সুতরাং অপহরণকারীর পক্ষে কাজুয়ার অচেতন দেই সরানোর মত সময় পাবার কথা না।
তাহলে কি কংক্রিটের দেয়ালটা পরে বানানো হয়েছে? সেটা হলেই। কেবল বলা যায় যে লাইব্রেরির স্বপ্নতে আমি যা দেখেছিলাম, তা ঠিক। এখানকার লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেই অবশ্য জবাব পেয়ে যাবো।
মনে মনে প্রশ্নগুলো গুছিয়ে নিয়ে ক্যাফের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। এই শহরে আমি যাদের চিনি, তারা সবাই ওখানেই আছে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে, প্রায় দুপুর এখন। মেলানকলি গ্রোভেই লাঞ্চ সেরা নেয়া যাবে।
ক্যাফের ভেতরে বরাবরের মতনই আরামদায়ক উষ্ণতা। এক মুহূর্তের জন্যে অপহরণকারী কিংবা অন্য ব্যাপার সংক্রান্ত সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল। মুখে হাসি নিয়ে কাউন্টারের উল্টোপাশে বসে পড়লাম।
কিমুরা একাই আছে আজকে। “সাওরি ডেলিভারি দিতে গেছে, বললো সে।
লাঞ্চের অর্ডার দিলাম আমি। খাবারের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে ক্যাফেতে সাজানো ছোট ছোট কাপপিরিচগুলো দেখতে লাগলাম। কোনটাতেই ধুলো জমেনি। কেউ কি প্রতিদিন পরিষ্কার করে ওগুলো? কিমুরার আঙুলগুলো তো মোটা মোটা। তার পক্ষে এত ছোট কাপ পরিষ্কার
করা কষ্টসাধ্যই হবার কথা। হয়তো সাওরিই করে।
“আমি নিজেই পরিষ্কার করি সবকিছু,” যেন আমার মনে কথা ধরতে পেরেই খানিকটা রূঢ় ভঙ্গিতে বললো কিমুরা। অর্ডার দেয়া খাবারগুলো একটা ট্রেতে করে নিয়ে এসেছে সে।
“কাজুয়ার দুর্ঘটনাটা যে রাস্তায় হয়, সেটার একটু সামনে একটা লম্বা দেয়াল আছে। ওটা কবে বানানো হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলাম।
“অনেক আগে। তখন বোধহয় আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম।”
হতাশ ভঙ্গিতে হিতেমির ছবিটা দেখালাম তাকে। “এই মেয়েটাকে কখনো দেখেছেন?”
“পুলিশে চাকরি নিয়েছে নাকি?” ভ্রূ কুঁচকে কথাটা বলে ছবির দিকে তাকায় সে। “নাহ, দেখিনি।”
“বেশ… এখান থেকে কেউ কি হারিয়ে গেছে গত কয়েক মাসে?”
“একজন বয়স্ক লোক হারিয়ে যাবার কথা শুনেছিলাম। তার কোন আত্মীয় স্বজন নেই শহরে।”
হারিয়ে যাওয়া লোকটার নাম কানেদা। শহরের কাছেই থাকতো সে, কিন্তু অনেকদিন যাবত তাকে কেউ দেখেনি।
“লোকে খুব একটা পছন্দ করতো না কানেদাকে,” কিমুরা বললো। “কয়েকজন তার কাছে টাকাও পেতো। আমার ধারণা পাওনাদারদের ভয়ে পালিয়ে গেছে।”
এই কানেদা লোকটার সাথে আমি এখানে যা করতে এসেছি সেটার কোন সম্পর্ক নেই মনে হচ্ছে।
“আশেপাশে ইটের তৈরি কোন বাসা আছে নাকি?” (জাপানে বেশিরভাগ বাড়ি কাঠের তৈরি)।
“কিয়োকোর সাথে কথা হয়েছে না তোমার? সে ইটের বাসায় থাকে।”
“নীল ইটের তৈরি একটা বাসা খুঁজছি।”
“নীল ইট..” বলে গম্ভীর ভঙ্গিতে একবার মাথা নাড়লো সে। “সেটার ব্যাপারে জানতে পারি।”
হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল আমার। এরকম উত্তর আশা করছিলাম না তার কাছ থেকে। “আসলেই? কোথায় ওটা? প্লিজ বলুন!” উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গেলাম সিট ছেড়ে।
আমাকে ঠান্ডা করার ভঙ্গিতে হাত নাড়লো সে।
“কি এমন আছে ঐ বাড়িতে?”
থমকে গেলাম। এই প্রশ্নের উত্তরে কি বলবো তা আসলেও ভাবিনি। “না মানে… একজনের কাছে শুনেছি বাড়িটার কথা। নীল ইটের তৈরি যেহেতু, সুন্দর নিশ্চয়ই অনেক। সেজন্যেই নিজের চোখে দেখতে চাই।”
“শিওজাকি এসে পড়বে দ্রুত। সবসময় এখানেই লাঞ্চ সারে সে। জায়গাটা তার চেনা। তুমি বললেই নিয়ে যাবে।”
দেয়ালে ঝোলানো শিওজাকির আঁকা ছবিটা দেখলাম। একটা টলটলা পানির হ্রদের ছবি। সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে আশপাশের বন।
নীল ইটের বাড়িটা যে এভাবেও খুঁজে বের করতে পারি সেটা মাথায় আসেনি। শিওজাকি নাহয় আমাকে ওখানে নিয়ে যাবে, কিন্তু এরপর কি করবো?
না, সামনের দিক দিয়ে যাওয়া যাবে না। ঘুরে পেছন দিয়ে যেতে হবে যাতে অপহরণকারী লোকটার চোখে না পড়ি। তখন ছবি তুলে নিব প্রমাণ হিসেবে। বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি করে গেলে, অপহরণকারী সন্দেহ করতে পারে।
আচ্ছা, সে যদি সন্দেহ করেও, তখন কি হবে? হিতোমি বেঁচে থাকলে তার জন্যে বিপদ হবে।
এসময় ক্যাফেতে প্রবেশ করলো শিওজাকি। আবারো পেছনের সেই অন্ধকার টেবিলটায় গিয়ে বসলো সে। এমনভাবে ওটার দিকে এগিয়ে গেল যেন অন্য টেবিলগুলো চোখেই পড়েনি।
একটা ট্রেতে করে তার লাঞ্চ সাজিয়ে নিয়ে গেল কিমুরা। শিওজাকি নাকি প্রতিদিন একই সময়ে ক্যাফেতে এসে একই জিনিস অর্ডার করে। তার খাবার বিশেষ ভাবে রান্না করে কিমুরা। শিওজাকি নিরামিষভোজী, মাংস খায় না।
খেয়াল করলাম যে কিমুরা আমার ব্যাপারে কথা বলছে শিওজাকির সাথে। একবার আমার দিকে তাকালোও সে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে মাথা নামিয়ে নিতে বাধ্য হলাম।
