আরো দশ মিনিট হাঁটার পর খেয়াল করলাম দেয়ালটার উচ্চতা কমছে। এক পর্যায়ে ভূমির সাথে সমতল হয়ে গেল।
বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে দেয়ালের ওপরের পথটা। আমি যদি বেড়া না টপকে পিচঢালা পথটা বেয়ে সামনে এগোতাম, তাহলে এই দেয়ালটা চোখে পড়তো কিছুক্ষণ পর।
অপহরণকারীর বাড়ির হদিস হারিয়ে ফেলেছি আমি। পরিস্থিতি যে কতটা ঘোলাটে তা বোঝতে অভিজ্ঞ কারো দরকার হবে না। দৈব সাহায্য না পেলে হিতোমিকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে।
গাড়িটার সাথে যে স্থানে ধাক্কা লেগেছিল কাজুয়ার, সে জায়গাটা খুঁজে বের করতে পারলেই অপহরণকারীর বাসাটা পেয়ে যাবো, এমনটাই ভেবে এসেছি আমি। কিন্তু বিধি বাম। অন্য কোন পরিকল্পনাও নেই মাথায়। অগত্যা বনের ভেতরে ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ পেয়েও যেতে পারি, বলা যায় না।
অন্ধকার নেমে আসা অবধি ঘুরে বেড়ালাম। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার বাঁ চোখটা গরম হয়ে উঠেছে। একটা পুরনো ভেন্ডিং মেশিন দেখার পর কাজুয়ার ছোটবেলার স্মৃতি ভেসে উঠেছিল চোখের পর্দায়। কিন্তু অপহরণকারীর বাড়ি খুঁজে পাইনি। কাজুয়ার স্মৃতিগুলোতে যা যা দেখেছি, কায়েদিতে আসার পর সবকিছুই মিলে গেছে। তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটার ক্ষেত্রে স্মৃতি কেন প্রতারণা করছে আমার সাথে?
.
৪
হলওয়ে থেকে আগত পদশব্দে ঘুম ভেঙে গেল আমার। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। ঘরে এই বিছানাটা বাদে আর কিছু নেই। একপাশে আমার ব্যাকপ্যাকটা দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে রাখা।
চোখ কচলে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। লিভিং রুমে মিঃ ইশিনোর সাথে দেখা হলো।
“সুপ্রভাত, মিঃ ইশিনো,” বলেই লজ্জা পেয়ে গেলাম। এমনভাবে কথা বলছি যেন তিনি আমার নিজের পরিবারের সদস্য।
মিঃ ইশিনোও অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। “আমি তো ভেবেছি তুমি কাজুয়া। বিশেষ করে এটা গায়ে দেয়ার কারণে, আমার পরনের জ্যাকেটটার দিকে নির্দেশ করে বললেন তিনি। রাতে বেশি ঠান্ডা পড়ায় সাওরি এটা বের করে দিয়েছে আমাকে।
সাওরির তৈরি করা নাস্তা খেলাম আমরা। খাওয়া শেষে কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলেন মিঃ ইশিনো।
কাঠুরেদের কাটা সিডার গাছ কাঠের মিল অবধি ট্রাকে করে পৌঁছে দেন তিনি। প্রতিদিন সকালে কাজের পোশাক পরে বাসা থেকে বের হন। রোজকার ব্যবহারে নরম হয়ে গেছে পোশাকগুলো।
তিনি গাড়ির দরজা খুলছেন এমন সময় পেছন থেকে ডাক দিলাম।
“একটা প্রশ্ন ছিল আমার,” বলে পকেট থেকে হিতোমির একটা ছবি বের করে তাকে দেখালাম। (লাইব্রেরির খবরের কাগজ থেকে অনুমতি না নিয়েই ছবিটা কেটে নিয়েছি)।
“এই মেয়েটাকে কখনো দেখেছেন আশেপাশে?”
ছবিটা এক ঝলক দেখে আমার দিকে তাকালেন তিনি। “ওকে খুঁজছে নাকি?”
“জ্বি।”
আবারো ছবিটার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকালেন মিঃ ইশিনো। “নাহ, দেখিনি।”
সাওরিও একই কথা বললো। টিভি চালু করেই ঘরের কাজ করছে সে। নাস্তার বাসনগুলো ধুয়ে ফেলেছে ইতোমধ্যে। হিতোমির মত কাউকে নাকি কখনো দেখেনি।
“আজকে কি করবে?” আমাকে জিজ্ঞেস করলো সে।
“কাজুয়ার কাছে শহরের যে জায়গাগুলোর গল্প শুনেছি, সবগুলো ঘুরে দেখবো।”
“ঠিক আছে। যতদিন খুশি এখানে থাকতে পারবে, এটা তো বলেছিই আগে। তোমাকে বাইরের কেউ মনে হয় না, জানো? তুমি যেভাবে বাড়ির ভেতরে ঘুরে বেড়াও, হাঁটাচলা করো-সবকিছুর মধ্যে কাজুয়ার ছাপ খুঁজে পাই। এমনকি ভাত খাবার ভঙ্গিটাও একই।”
“আজকে কি ক্যাফেতে ডিউটি আছে আপনার?”
আলতো মাথা নেড়ে সিঙ্কের কল চালু করলো সাওরি।
“কাজুয়া মারা যাবার পর থেকে এই বাসা আর ক্যাফে ছাড়া আর কোথাও যাইনি। কিছু করিও না। সপ্তাহে একবার শুধু একটা বাসায় কফি ডেলিভারি করতে যাই, ব্যস। কিন্তু কায়েদির বাইরে বেরুই না।”
কাজ বন্ধ করে শূন্য দৃষ্টিতে সিঙ্কের দিকে তাকিয়ে আছে সে। লিভিং রুম থেকে টিভির শব্দ শোনা যাচ্ছে। প্রাত্যাহিক রাশিফল পড়ে শোনাচ্ছে এক উপস্থাপক। কল বন্ধ করে দ্রুত টিভির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সাওরি।
নাক ঝেরে বললো, “আহহা! কন্যারাশি লোকজনের জন্যে আজকের দিনটা খারাপ যাবে দেখছি।”
আমাকে বাসার একটা চাবি দিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল সে। আমি যে সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষ, সেটা নিয়ে কোন মাথাব্যথাই নেই। চাইলেই কিন্তু বাসার জিনিসপত্র চুরি করে পালিয়ে যেতে পারি।
কিছুদিন আগে লাইব্রেরিতে দেখা বাঁ চোখের স্বপ্নটার কথা ভাবলাম আবারো। হিতোমি আইজাওয়ার ছবি ট্রিগার হিসেবে কাজ করেছিল। স্বপ্নে কাজুয়াকে একটা গাড়ির সাথে ধাক্কা খেতে দেখি। দশদিন পেরিয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ব্যাকপ্যাক থেকে বাইন্ডারটা বের করে সেই স্বপ্নের বর্ণনাগুলো পড়তে লাগলাম।
তলকুঠুরির জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল কাজুয়া। তখনই হিতোমিকে দেখে সে। এরপর আশপাশে নজর বুলিয়ে খেয়াল করে যে বাড়িটা নীল ইটে তৈরি।
তার বাঁ চোখ দিয়ে পুরো বাড়িটা দেখার সুযোগ হয়নি আমার। ছাদ কিংবা সামনের দিকটা কেমন দেখতে-সেটাও জানি না। কাজুয়া চেষ্টা করেছিল ক্রু ড্রাইভার দিয়ে জানালাটা খুলতে, কিন্তু কারো পদশব্দে সতর্ক হয়ে যায়। ধরা পড়ে গেছে বুঝতে পেরে দৌড় শুরু করে। পাশের বনটাতে ঢুকে যায় দ্রুত।
