কিমুরা এক গ্লাস দুধ নিয়ে এলো আমার টেবিলে। সেটা খাবার সাথে সাথে ভেতর থেকে হিমের শেষ অনুভূতিটুকুও বিদায় নিল।
কিছুক্ষণ আগের সাওরি আর এখনকার সাওরির মধ্যে অনেক পার্থক্য। হাসিমুখে সুমিদার সাথে কথা বলে চলেছে, যেন ভাইয়ের কথা ভুলেই গেছে। কিন্তু কাছের কারো মৃত্যু চাইলেই সহজে ভোলা যায় না। এখন সে যা করছে, তা হচ্ছে অভিনয়। ভালো থাকার অভিনয়।
শিওজাকিকে আজকে দেখলাম না ক্যাফেতে, কিন্তু কিয়োকো ঠিক আগের জায়গাটাতেই বসে আছে। চোখাচোখি হলে একবার হাসলো সে, আমাকে তার টেবিলটায় বসায় আমন্ত্রণ জানালো।
“তুমি কি সাওরির ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড?”
“জ্বি?”
“কিমুরা তো সেটাই বলছিল।”
ওহ! আমাকে তাহলে কাজুয়ার প্রেমিকা ধরে নিয়েছে সবাই।
তার চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না। গাল লাল হয়ে উঠছে। চাই সেটা কেউ দেখুক।
“আমি কায়েদিতে এসেছি খুব বেশিদিন হয়নি,” কিয়োকো বললো। “তাই কাজুয়ার সাথে খুব বেশি মেশার সুযোগ পাইনি।
আমার বাঁ চোখে দেখা স্মৃতিগুলোর কোনটায় তাকে দেখেছি কিনা চিন্তা করলাম। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। আসলে কাজুয়ার সাথে দেখা হয়েছে এরকম অনেকের চেহারাই ভুলে গেছি। শুধু কাছের কয়েকজনের চেহারা ভালোমতন মনে আছে। যেমন মিঃ ইশিনো, কিমুরা।
আমার হাতটা মুঠো করে ধরলো কিয়োকো। আঙুলের চামড়াগুলো কুঁচকে গেছে তার বয়সের ভারে। “জানি, ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছে। তোমার বয়সী আমার একটা ছেলে ছিল।”
দুধের গ্লাসটা খালি হবার পরেও কিছুক্ষণ টেবিলে বসে থাকলাম। বিল মেটাতে গেলে হাত ঝাঁকিয়ে মানা করে দিল কিমুরা। “ক্যাফের পক্ষ থেকে ট্রিট ধরে নাও।”
“নামি,” সাওরি ডাক দিল এসময়। “কোথায় যাচ্ছো?”
“একটু হাঁটাহাঁটি করবো।”
“হারিয়ে যেও না।”
আমার জন্যে আসলেও চিন্তিত সে। হেসে মাথা নাড়লাম। সকাল বেলা মামার সামনে সাওরি আমাকে বলেছে যে যতদিন খুশি তাদের বাসায় থাকতে পারি।
বাইরে বেরোনোর সাথে সাথে ঠান্ডা বাতাসের ঝাঁপটা এসে লাগলো নাকে মুখে।
কাজুয়ার দুর্ঘটনাটা যেখানে হয়েছিল, সেদিকে রওনা হলাম। পথে তার কথা ভাবতে লাগলাম। বাঁ চোখের একটা স্মৃতিতে দেখেছিলাম বিশাল একটা খেলার মাঠে একা একা বসে কাঁদছে কাজুয়া। তবে দিনটা খুব সুন্দর ছিল।
কাজুয়াকে ভালোবাসি আমি। ওর দেখা দৃশ্যগুলো আলোকিত করে তুলেছে আমার মনের অন্ধকার কোণগুলোকে। আচ্ছা, একটা মানুষ তার জীবদ্দশায় কতগুলো দশ্য প্রত্যক্ষ করে?
অপহরণকারীকে যে করেই হোক খুঁজে বের করতে হবে আমার। তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে চাই। তার কারণে নিরীহ একটা মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেছে, এর মূল্য চুকাতেই হবে।
দুর্ঘটনার জায়গাটা আশপাশের অন্য জায়গাগুলোর তুলনায় একটু বেশিই ঠান্ডা মনে হলো। আকাশ এখনও মেঘলা, বড় বড় সিডার গাছগুলোর ছায়ার কারণে অন্ধকার আরো জমাটবেঁধেছে। বনের ভেতর থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে একটানা।
শরীর কাঁপছে আমার। দু’মাস আগে কাজুয়া রাস্তার ওপরে যেখানে পড়ে যায়, এ মুহূর্তে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি আমি। বাঁ চোখের স্মৃতিতে দেখেছি যে অপহরণকারী লুকিয়ে ছিল গাছের পেছনে। কাজুয়ার মৃত্যুর দৃশ্যটা আড়াল থেকে উপভোগ করেছে সে।
রাস্তার পাশে রেলিং টপকে বনের ভেতরে পা রাখলাম। ভয় লাগছে, তবে পাত্তা দিলাম না। সিডার গাছের ঝরা পাতাগুলোর কারণে নিজের পদশব্দ শুনতে পাচ্ছি না। স্মৃতির স্বপ্নে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে দেখেছিলাম কাজুয়াকে। যেদিক দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে সে, সেই পথটা অনুসরণের চেষ্টা করলাম।
কিন্তু হাজার খুঁজেও নীল দেয়ালের বাড়িটা খুঁজে পেলাম না। সামনে কেবল সারি সারি সিডার গাছ আর জমাটবাঁধা সবুজ। ওগুলোর মাঝ দিয়ে হাঁটতে লাগলাম।
ভেবেছিলাম হাঁটাহাঁটি করলে শরীর গরম হবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ঠান্ডা আরো জাঁকিয়ে বসছে। এই সিডার বনের নৈঃশব্দ্য আমার শরীরের উষ্ণতা শুষে নিচ্ছে যেন।
জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে নিলাম। বাম পকেটে ডিম্পোজেবল ক্যামেরাটার অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। কায়েদিতে আসার পূর্বে কিনেছি ক্যামেরাটা। অপহরণকারীর বাড়িটা খুঁজে পেলে ছবি তুলে রাখবো প্রমাণ হিসেবে। তলকুঠুরির জানালাটা দিয়ে হয়তো দেখতে পাবো হিতোমি আইজাওয়াকে।
এসব ভাবতে ভাবতেই থমকে যেতে বাধ্য হলাম। অপহরণকারীকে ধরার আমার পরিকল্পনা মাঠে মারা যেতে বসেছে। সামনে দশ ফুট লম্বা একটা কংক্রিটের দেয়াল। দেয়ালের ওপরে স্টিলের রেলিং। দেখে মনে হচ্ছে একটা পথ চলে গিয়েছে দেয়ালটার ওপর দিয়ে। যতদূর চোখ যাচ্ছে দুই দিকেই বিস্তৃত দেয়ালটা।
বিভ্রান্তি ভর করলো আমার চিত্তে। কাজুয়ার স্মৃতিতে তো দেখেছিলাম যে নীল বাড়িটা থেকে সরাসরি বনের ভেতরে প্রবেশ করেছিল সে। তখন তো এরকম কোন দেয়াল ছিল না। নতুবা ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে দেয়ালটার সাথে ধাক্কা লাগতো তার, রাস্তায় গিয়ে পড়তো না।
কোথায় আছি আমি?
রাজ্যের হতাশা নিয়ে দেয়ালটার পাশ দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। কোথাও কোথাও নিশ্চয়ই ওপরে ওঠার সিঁড়ির দেখা মিলবে।
এরকমটা তো হবার কথা ছিল না, হতাশ ভঙ্গিতে মাথা কঁকালাম। বাড়িটা উধাও হয়ে গেছে, সেই জায়গাই এই দশফুটি দেয়াল। এর ব্যাখ্যা কি?
