“একটুও বদলাননি,” তার উদ্দেশ্যে হেসে বললো সাওরি। মহিলার মুখেও হাসি ফুটেছে, রীতিমত একটা বেড়ালের মত লাগছে এখন তাকে।
কাজুয়ার ছেলেবেলার স্মৃতিগুলোতে তার চেহারা যেমন দেখেছি, এখনও একদম সেরকমই দেখাচ্ছে।
একটা ললিপপ কিনে বেরিয়ে এলাম আমরা।
আবারো নাক ঝারলো সাওরি। টিস্যুটা ফেলে দিল মাটিতে।
“এভাবে রাস্তায় ফেলাটা কি ঠিক হলো?” জিজ্ঞেস করলাম।
“সবকিছু তো একসময় ধুলোতেই মিশে যাবে।”
ওর যুক্তিহীন কথাটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম। আসলে প্রতিদিন এত বেশি পরিমাণে টিস্যুর প্রয়োজন হয় সাওরির যে ব্যবহৃত টিস্যুগুলো বাসায় বয়ে নেয়া সম্ভব না।
আশপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে এগোচ্ছি। পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে তাদের উদ্দেশ্যে বাউ করছে সাওরি। আমার দিকে প্রশ্নাতুর চোখে তাকাচ্ছে সবাই। নিশ্চয়ই ভাবছে, এটা আবার কে?
মনে হচ্ছে যে এখানে অনেক লম্বা সময় ধরে আছি আমি। যেদিকেই তাকাই, পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। কিন্তু এখানকার অধিবাসীদের চাহনি মনে করিয়ে দেয় যে শহরটায় আমি একজন আগন্তুক।
আগন্তুক। কথাটা হৃদয়ে গেঁথে গেল আমার। ভুল করে এই জগতটায় পা দিয়ে ফেলেছি। আমি নামি, আবার নামি না। তাহলে আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? প্রায়ই এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায় আমার মাথায়।
আকাশে মেঘ জমেছে। সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই। যে কোন মুহূর্তে তুষারপাত শুরু হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। পুরো শহরটা স্তব্ধ। ঠান্ডা বাতাস ছেড়েছে উত্তর দিক থেকে। খুব বেশি লোক নেই রাস্তায়। যারা আছে, তাদের মুখে হাসি নেই।
শহরটা মরে যাচ্ছে নাকি? ধীরে ধীরে মহাকালের ধূসরতায় অদৃশ্য হয়ে যাবে হয়তো।
মেলানকলি গ্রোভ থেকে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে থেমে গেল সাওরি।
“একটু ঘুরপথে যাওয়া যাক আজকে,” বললো সে।
একটা পার্শ্বরাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম আমরা। রাস্তা না বলে পাহাড়ি ঢালু পথ বলা ভালো। ঢাল বেয়ে যত ওপরে উঠতে লাগলাম, শহরটা নিচে নামতে লাগলো। রাস্তার এক পাশে সিডার বন, অন্য পাশে গার্ডরেইল। রেলিংগুলো থেকে কিছুটা দূরে আবারো সারি সারি গাছ।
কিছুদূর হাঁটার পর থেমে গেল সাওরি। নিচের পিচঢালা পথের দিকে তাকিয়ে আছে একমনে।
বুঝতে অসুবিধে হলো না, এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে কাজুয়া।
সাওরির চেহারায় কোন অনুভূতি নেই। পথটার ঠিক কোন জায়গায় আটকে আছে তার চোখ সেটা বুঝতে পারলাম না। গতরাতেই সে আমাকে বলেছে যে কাজুয়ার মৃত্যুর পর একটুও কাঁদেনি। আশপাশের সবাই ভীষণ কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু একমাত্র তার চোখ দিয়েই পানি ঝরেনি।
আমার ধারণা সাওরির হৃদয়ে এখন কেবলই শূন্যতা। বিশাল, অতলান্ত শূন্যতা। আসলে ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদের প্রাথমিক ধাক্কাটাই কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে।
দেখে মনে হচ্ছে যে কোন মুহূর্তে সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। কাঁধে হাত রাখলাম। অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালে সাওরি।
জানিনা কেন, আমার ভেতরেও একটা অচেনা কষ্ট বাসা বেঁধেছে। সেটা কাজুয়ার জন্যে, নাকি সাওরির জন্যে-তা ঈশ্বরই জানেন। আমার নিজের কষ্টেরও তো শেষ নেই। খুব বেশি নাটুকে শোনাচ্ছে বোধহয় কথাগুলো।
ওপরের পাহাড়ি এলাকাটার দিকে তাকালাম। ওখানেই কোথাও আছে সেই নীল বাড়িটা। যেখান থেকে সব ঘটনার শুরু।
চুপচাপ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলাম দু’জন। কারো মুখেই কোন সাড়া নেই। রাস্তার দু’পাশে লম্বা সিডার গাছগুলো নীরবে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে কাজুয়ার মৃত্যুস্থল।
*
আমরা ক্যাফের সামনের দরজাটা খোলার সাথে সাথে একটা ঘণ্টা বেজে উঠলো। ভেতরের উষ্ণ বাতাস স্বাগতম জানালো আমাদের।
“হঠাৎ করে ঠান্ডা জায়গা থেকে গরম কোথাও আসলে নাক দিয়ে পানি ঝরা বেড়ে যায় আমার,” কিমুরার উদ্দেশ্যে বাউ করে বললো সাওরি।
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ, আপনার সাইনাসের সমস্যা থাকলে বুঝতেন।”
নাক ঝারলো সাওরি। ক্যাফের ভেতরে ময়লার বাক্সেই টিস্যুগুলো ফেলে সে।
আমাকে গতদিন যে লোকটা লিফট দিয়েছিল তাকে বসে থাকতে দেখলাম কাউন্টারের উল্টোদিকের চেয়ারে। এতক্ষণ ঝিমাচ্ছিল, কিন্তু সাওরিকে দেখামাত্র সোজা হয়ে বসলো। “সাওরি!” বলে হাত নাড়লো ওর উদ্দেশ্যে। চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
“ফিরেছো তাহলে,” পাল্টা হাত নেড়ে বললো সাওরি।
কিছুক্ষণ পর জানতে পারলাম তরুণ ড্রাইভারের নাম সুমিদা। কাজুয়ার বন্ধু ছিল সে।
তবে তাদের বন্ধুত্ব খুব বেশিদিনের না হওয়াতে বাঁ চোখে স্মৃতিগুলোয় সুমিদাকে দেখিনি তেমন একটা। কিছুক্ষণ পর অবশ্য দু’জনের আড্ডা দেয়ার একটা দৃশ্য ভেসে উঠলো চোখের পর্দায়।
এক বছর আগে দেখা হয়েছিল সুমিদা আর কাজুয়ার। মাতাল কাজুয়াকে ট্রেন স্টেশন থেকে মেলানকলি গ্রোভে নিয়ে এসেছিল সুমিদা। সেদিন বিকেলেই একটা পাবে প্রথম কথা বলেছিল তারা।
“ক্লাসের কি খবর?” সাওরি জিজ্ঞেস করলো তাকে।
“ছুটি এখন।”
চেহারা একদম লাল হয়ে উঠেছে সুমিদার। মনে কি চলছে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।
“গতকাল আমাকে সাহায্য করার জন্যে ধন্যবাদ,” বললাম। সে কাজুয়ার বন্ধু ছিল শোনার পর আগের চাইতে আপন মনে হচ্ছে।
“কিমুরা আমাকে আপনার ব্যাপারে বলেছে,” আন্তরিক হেসে বলল সুমিদা।
একটা টেবিলে বসে সুমিদা আর সাওরিকে দূর থেকে আলাপ করতে দেখলাম।
