অপহৃত মেয়েটার ব্যাপারে কাউকে কিছু বলেনি। হয়তো সে-ও আমার মতন শক্ত কোন প্রমাণের অপেক্ষায় ছিল। নিশ্চিত হবার জন্যে নীল দেয়ালের বাড়িটায় উপস্থিত হয়েছিল যাতে পুলিশকে ঠিকঠাক সব তথ্য দিতে পারে।
“আত্মহত্যা করেনি কাজুয়া,” বললাম আমি।
আমার চোখের দিকে তাকালে সাওরি। এক মুহূর্তের জন্যে বিস্ময় ভর করলো তার চোখে, তবে দ্রুত কেটে গেল সেই বিস্ময় ভাব।
লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে প্রায় ফিসফিসে কণ্ঠে বললো, “জানি আমি… জানি। কিন্তু ওর মৃত্যুর পর একটুও কাঁদিনি। এমনকি এখনও…অতটা খারাপ লাগে না। অন্য সবাই তো কাঁদছিল, কিন্তু ওর নিজের বোন হয়ে… আমি ঠিক আছি কিভাবে?”
হাতে কিছু একটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে সাওরি। কাজুয়ার পছন্দের সোনালি হাতঘড়িটা। এক পাশের স্ট্র্যাপ ছেঁড়া ওটার।
আমাকে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাওরি বললো, “ওর বিশতম জন্মদিনে এটা উপহার দিয়েছিলাম।”
এই তথ্যটা জানা ছিল না আমার, কিন্তু ঘড়িটা যে কাজুয়ার খুব প্রিয় সেটা জানতাম। স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেলেও সবসময় ঘড়িটা সাথে রাখতো সে।
“দুর্ঘটনায় নষ্ট হয়ে গেছে ঘড়িটা। ঠিক ওর মৃত্যুর সময়টায় কাটাগুলো আটকে যায়,” বলে ঘড়িটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো সে। “তুমি নেবে এটা?”
মাথা ঝাঁকালাম। “আপনার কাছেই ভালো থাকবে জিনিসটা। কাজুয়াও সেটাই চাইতো নিশ্চয়ই।”
কাজুয়ার একটা স্মৃতিচিহ্ন ইতোমধ্যেই আমার কাছে, আর কিছুর দরকার নেই।
উঠে দাঁড়ালো সাওরি।
“কালকে কবরস্থানে যাবে?”
মাথা নাড়লাম। আসলেও যেতে চাই আমি।
কাজুয়ার ঘর থেকে বের হলাম দুজনে। নিচে নামার সময় সাওরি বললো, “একটু আগে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বড় অবাক হয়েছিলাম। একদম ওর চোখের মতন।”
*
শহরের বাইরে মা-বাবার কবরের পাশেই কবর দেয়া হয়েছে কাজুয়াকে। মিঃ ইশিনোর বাসা থেকে হেঁটে যেতে এক ঘণ্টা লাগে।
“যদি গাড়িতে যেতে চাও, তাহলে আমার এক বন্ধুকে বলতে পারি, সাওরি বললো। “ওর ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে।”
সাওরি গাড়ি চালায় না সাধারণত। বললাম যে হেঁটেই যাব।
একটা বিশাল পাহাড়ি উপত্যকায় শত শত কবরফলক। এরকম একটা দৃশ্যও যে মন জুড়িয়ে দিতে পারে, জানা ছিল না। হয়তো আশপাশের পরিবেশটাই এমন। এতগুলো কবরফলকের মাঝে কাজুয়ার কবর খুঁজে বের করা কষ্টসাধ্য।
ফুইয়ুতসুকিদের পারিবারিক কবরটা গোরস্থানের একদম শেষ প্রান্তে। সাওরি গিয়ে কবরের আশপাশ পরিষ্কার করলে প্রথমে। শুকনো পাতা সরিয়ে দিল।
হাত জড়ো করে একসাথে প্রার্থনা করলাম দু’জন। কাজুয়াকে একদম মন থেকে ধন্যবাদ দিলাম তার উপহারের জন্যে। আমাকে তোমার চোখটা দেয়ার জন্যে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।
ওর স্মৃতিগুলোই যে আমার সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পাথেয়, সেটাও বললাম। নতুবা বিষণ্ণতার আস্তাকুঁড়ে এতদিনে আমাকে ছুঁড়ে ফেলতো মহাকাল। অবসাদের চক্র ভেঙে বেরুতে পারতাম না। চোখ হারাবার পর নিজের স্মৃতি বলতে কিছুই তো ছিল না।
হার্ডওয়্যার স্টোরটায় দেখা সেই কষ্টের স্মৃতিটার কথা ভাবলাম। কাজুয়া আর সাওরির বাবা-মা মারা যান সেটায়।
ফেরার পথে নাক ঝরতে ঝরতে সাওরি বললো, “মা-বাবা’র ভাগ্য প্রচণ্ড খারাপ ছিল সেদিন। যে দড়িটা দিয়ে খুঁড়িগুলো বেঁধে রাখা হয়েছিল, সেটা ছিঁড়ে যায় হঠাৎই।”
মেলানকলি গ্রোভের উদ্দেশ্যে হাঁটছি আমরা। শহরের মাঝ দিয়ে একেবেকে যাওয়া হাইওয়েটা পেছনে ফেলে এলাম। কাজুয়ার চোখ দিয়ে দেখেছি, এরকম অনেকগুলো জায়গা বাস্তবেও দেখলাম।
“শুনেছি, কাজুয়া নাকি দুর্ঘটনাটা নিজের চোখে দেখেছিল,” বললাম।
থেমে, বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো সাওরি।
“কাজুয়া বলেছে তোমাকে এটা?”
এরকম প্রতিক্রিয়া আশা করি নি। মাথা নাড়লাম কেবল।
“সেদিন ওখানে যারা ছিল, তারাও একই কথা বলে। কিন্তু কাজুয়ার নিজের মনে ছিল না। বরং সবসময় বলতে যে কিছুই দেখেনি। আমার ধারণা, স্মৃতিটা এতটাই দুঃসহ যে, ইচ্ছেকৃতভাবে সেটা ভুলে যায় কাজুয়া।”
সাওরির কথায় আসলেও যুক্তি আছে। আমার নিজের সাথেও তো একই রকম ঘটনা ঘটেছে।
ব্যাপারটা কাজুয়ার মন ভুলে গেলেও, ছবিগুলো ঠিকই জমা ছিল চোখের স্মৃতিতে।
“নতুন এক কর্মচারির ভুলে দুর্ঘটনাটা হয়েছিল সেদিন। মাত্র কয়েকদিন আগেই মিলে কাজ নিয়েছিল ছেলেটা।
“ছেলে?”
“হ্যাঁ। হাইস্কুল থেকে পাশ করেই কাজে ঢুকে গিয়েছিল। দড়ি দিয়ে সে-ই বেঁধেছিল গাছগুলো। কিন্তু অভিজ্ঞতা না থাকায় ঠিকমতো গিঁট দিতে পারেনি…।”
কোন রাগ নেই সাওরির কণ্ঠে। বরং মনে হচ্ছে যে ছেলেটার প্রতি সহানুভূতি কাজ করছে তার।
গোরস্থান থেকে মেলানকলি গ্রোভে পৌঁছুতে এক ঘণ্টার মত লেগে গেল।
আশপাশের দোকানপাট, বাড়িঘর সবই আমার পরিচিত। কে বলবে যে এই প্রথম সামনাসামনি দেখছি ওগুলো? স্টেশনারি দোকান আর নুডলস শপগুলো এখনও একইরকম আছে।
একটা ক্যান্ডি শপ চোখে পড়লো। ভেতরটা বেশ অন্ধকার। জানালা দিয়ে ভেতরে সারি সারি ক্যান্ডির প্যাকেট দেখা যাচ্ছে। তবে সেই ব্যাগগুলোর ওপর ধুলো জমেছে মনে হলো।
“ভেতরে যাবে নাকি?” সাওরি জিজ্ঞেস করলো। “আগে কাজুয়া প্রায়ই এখানে আসতে এখানে।”
ভেতরে পা রাখতেই পেছন থেকে বেরিয়ে এলো এক মহিলা। পেছনের ঘরে টিভি দেখছিল সে।
