বাঁ চোখের স্মৃতিগুলোতে কিন্তু দেখেছিলাম রাতের খাবারের সময় বেশ হাসিখুশি থাকতে সবাই। হয়তো তখন মিসেস ইশিনো বেঁচে ছিলেন বলেই গোমড়া ভাবটা জমাটবাধার সময় পেতনা কারো মনে। মাঝে মাঝে একজন মানুষের উপস্থিতিই বদলে দিতে পারে আশপাশের পরিবেশ।
ইশিনোদের বাড়িতে এখন যে দুজন মানুষ থাকে তারা দুজনই অবসাদের ভারে ন্যুজ। ক্ষিধে মরে গেল আমার। সাওরি আর মিঃ। ইশিনোকে এভাবে চুপচাপ আপনমনে খাবার খেতে দেখতে খুব খারাপ লাগছে।
এই থকথকে নীরবতার মাঝেই জিজ্ঞেস করলাম যে মানুষ হিসেবে কাজুয়া কেমন ছিল।
“কাপুরুষ, ভীতু,” সাওরি বললো সাথে সাথে। “আর ভীষণ অলস। পড়াশোনায় মন ছিল না, খেলাধুলাও পারতো না তেমন একটা ভালো কোণ গুণই ছিল না আমার ভাইটার।”
হাই স্কুলের পড়াশোনা চুকে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় কাজুয়া, কিন্তু শেষ করতে পারে না। ক্লাসগুলো নাকি খুব বেশি কঠিন লাগতো তার কাছে। দুর্ঘটনার বছরটা মোটামুটি শুয়ে বসেই কাটিয়েছে।
“তবে মনটা খুব ভালো ছিল,” কিছুক্ষণ পর বললো সাওরি।
মাথা নাড়লাম। আসলে কাজুয়ার নিজের ব্যাপারে খুব কমই জানি আমি। কারণ বাঁ চোখের স্মৃতিগুলোতে সবসময় অন্যদের দেখতাম। কদাচিৎ আয়নার দিকে তাকালে তখন তার চেহারা দেখেছি কয়েকবার। তবে সেই খণ্ড খণ্ড স্মৃতিগুলো থেকেই এটুকু বুঝেছিলাম যে ছাত্র হিসেবে খুব একটা ভালো নয় কাজুয়া। বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও খুব বেশি ছিল না। স্মৃতিশক্তি হারাবার পূর্বে আমি যেরকম ছিলাম, তার ঠিক উল্টোটা ছিল সে।
বাথরুমে গেলাম। সেখানকার আয়নার দিকে তাকাতেই অদ্ভুত একটা চিন্তা খেলে গেল মাথায়। এই যে কাজুয়ার বাম চোখটা ভাগ্যগুণে এখনও বেঁচে আছে, সেটা কি আগের বাসাতে ফিরে নস্টালজিয়ায় ভুগছে? কাজুয়ার টুথব্রাশটা এখনও বেসিনের একপাশে রাখা। দুর্ঘটনার পরেও সাওরি সেটা সরিয়ে ফেলেনি। তবে ব্রাশটা যে আসলেও কাজুয়ার, সেটা কিন্তু কেউ আমাকে বলে দেয়নি। স্বপ্নেও দেখিনি। তবুও মনে হচ্ছে এটাই সত্যি।
লিভিং রুমে ফিরে আসার পর খেয়াল করলাম সাওরি আর তার মামা দু’জনই কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
“বাথরুমটা খুঁজে পেয়েছে তাহলে একাই!” সাওরি বললো। “বেশিরভাগ লোকই হারিয়ে যায় ওটা খুঁজতে খুঁজতে।”
*
গেস্ট রুমে থাকার বন্দোবস্ত করা হলো আমার। ক্লোজেট থেকে একটা তোষক বের করে দিয়েছে সাওরি। কিন্তু ঘুমোতে যাবার আগে একটা কাজ, করতেই হবে আমাকে। আমাকে ইতস্তত করতে দেখে সাওরি জিজ্ঞেস করলো যে কোন সমস্যা হয়েছে কিনা।
কাজুয়ার ঘরটা দেখতে চাই, সত্যটাই বললাম।
এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে সাওরি, মলিন একটা হাসি ফুটলো তার চেহারায়।
বাম চোখের স্মৃতিতে ঘরটা যেরকম দেখেছিলাম, সেরকমই আছে।
“এখনও নিয়মিত পরিষ্কার করি আমি,” গোটা ঘরটায় আমাকে নজর বুলাতে দেখে বললো সাওরি। “কোন দরকার নেই, জানি। তবুও না করে পারি না।”
একটা বড় জিগস পাজল দেখলাম একপাশে। মোটরসাইকেলে বসা একটা ছেলের ছবি ওটায়। গরম হতে শুরু করলো আমার বাঁ চোখ। স্মৃতির ঢাকনা খুলতে খুব বেশি সময় লাগলো না।
“এই পাজলটার…” নিজের অজান্তেই কথা বলে উঠলাম।
“একটা অংশ হারিয়ে গিয়েছিল। খুব ঝগড়া হয়েছিল সেটা নিয়ে আপনাদের মধ্যে…।”
মাথা নাড়লো সাওরি। “ভ্যাকুয়াম ক্লিনারে পেয়েছিল হারানো টুকরোটা। ওকে না বলেই ঘরটা পরিষ্কার করতে ঢুকেছিলাম সেদিন”
এজন্যেই তাহলে ঝগড়া করছে দুই ভাইবোন, ভাবলাম। বাম চোখের স্মৃতিতে তরুণী সাওরিকে দেখছি কোমড়ে হাত দিয়ে কাজুয়ার সাথে তর্ক করতে। কিন্তু কোন শব্দ না শুনতে পাওয়ায় ঝগড়ার বিষয়বস্তু বুঝতে পারিনি।
টিস্যু বক্স থেকে একটা টিস্যু বের করে নিয়ে নাক ঝরলো সাওরি। ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে।
“আমার ভাই তোমার সাথে সবকিছু নিয়েই কথা বলতো, তাই না?”
পাজলের স্মৃতিটা শেষ হবার সাথে সাথে আরেকটা স্মৃতি ভেসে উঠলো বাম চোখের পর্দায়। এই বাড়িটায় স্মৃতির কোন শেষ নেই কাজুয়ার। বিশেষ করে এই ঘরের বইখাতা, টেবিল, ল্যাম্প থেকে শুরু করে জানালার শার্সি পর্যন্ত ট্রিগার হিসেবে কাজ করছে। কাজুয়ার স্মৃতিগুলো এখানে আরো ভালোমতো অনুভব করতে পারছি।
কাজুয়ার বিছানায় বসে আছে সাওরি।
“আমার ভাই যে মারা গেছে সেটা কার কাছে শুনেছো?”
তৎক্ষণাৎ কোন জবাব মুখে এলো না। কি বলবো? বিশ্বাসযোগ্য উত্তর হিসেবে কি বলা যায় সেটা ভাবছি, এ সময় সাওরি বললো, “পুলিশের ধারণা, কাজুয়ার মৃত্যু আত্মহত্যাও হতে পারে।
কি বলছে সাওরি এসব? আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম যে সবাই এটাকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছে, এর বেশি কিছু না।
“যে গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগেছিল কাজুয়ার, সেটার ড্রাইভার বলেছে-হঠাৎ করেই নাকি লাফ দিয়ে তার গাড়ির সামনে এসে পড়ে সে। দুর্ঘটনার আগের কয়েকদিন বাসাতেও বড্ড অদ্ভুত আচরণ করছিল কাজুয়া। কিছু একটা ভেতরে ভেতরে খোঁচাচ্ছিল ওকে। আর কেউ না বুঝলেও আমি ঠিকই বুঝতে পারি। কোন কাজে মন বসাতে পারছিল না। কি যেন ভাবতে সারাদিন,” বলে আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো সারি। “ভেবেছিলাম তুমি হয়তো এ ব্যাপারে জানো…?”
তার জন্যে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো আমার। আমি জানি কাজুয়া কেন ওরকম অদ্ভুত আচরণ করছিল। হিতোমি আইজাওয়ার হদিস পেয়েছিল সে। ঘটনাস্থল থেকে পালানোর সময় গাড়ির সামনে পড়ে। এর আগের দিনগুলোতে নিশ্চয়ই ঘটনাটা নিয়ে দিনরাত ভাবছিল সে।
